মঙ্গলবার,১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / ভূমিষ্ঠ কিছু আ-হা
০৫/১৬/২০১৬

ভূমিষ্ঠ কিছু আ-হা

- দিলরুবা আহমেদ

যখন তুমি কাছে আস আমি কেমন করে যেন বুঝতে পেরে যাই।
হালকা একটা ছোঁয়া। খুব হালকা। খুব কাছ থেকে পাওয়া একটা শ্বাস। নরম মায়াবী দুটো চোখের চাহনি, আমাকে ছুঁয়ে যায়। আমি বুঝতে পারি তাতে ঠাসা রয়েছে দুষ্টুমি। বয়সটাই যে এখন দুষ্টুমি করার, করবার আর চেয়ে দেখবার মিষ্টি মিষ্টি মায়াবী চাহনি মেলে। বয়স ঘিরেই বাড়ছে আমার ভাবনাগুলো। একে এক ছিল, দুই এ দুই রকম, তিনে ত্রিতালা, চারে চতুমর্ ুখী দৌড়াদৌড়ি, পাঁচে স্কুলে, পোশাকে সাজে দৌড়ানোতে বাদরামি। সবই আমি দেখি, বুঝতেও পারি। ওই বয়সি যে কেউ কাছে এলে অনুভবগুলো সজাগ হয়ে ছুঁয়ে আসে অনন্ত স্বপ্নকে। নাম রাখতাম না স্বপ্ন তবে অবশ্যই এখন, তখনও, এবং সকল সময়ের জনই সে আমার স্বপ্ন বালক। এতোদিনে বালক হতো। সাবালক হতে যদিও বহু বাকি।
কোনো সাবালিকাকে সেই চাঁদকুমার যেদিন সাবালক হয়ে বলতো ভালোবাসি আমি সেই দিনটিও মনে মনে ছুয়ে আসতে পারি। কি বিশাল এক আকাশ দিয়েছে অনন্ত আমাকে, কি অবিনাশী অশ্রুঘন মেঘমালা। সাদাটে তুষারের সতেজে ¯œাত যেন এক আঁখি কল্পোলোক। আসবে না তারপরও আশ্বাস যেন আকাশ কুসুম কল্পনার জ্বালবোনে চারিধারে। মিহি মিহি রবে যেন চৌচির কর্ণধার। কান খাড়া করে সত্যিই যেন শুনি সেই কলতান। কিছু নেই কি কোথাও কোনো শব্দ বা কোনো আ-হা।

কাল যখন পার্টিতে ছেলেটির চোখের কোনে দুষ্টামি দেখলাম তাও আবার চেয়ে আছে আমার মেয়ের দিকে হঠাৎ মনে হলো সে কি এসেছে হঠাৎ। হঠাৎ মন চেয়েছে চলে আসতে এই ধরণীতে। একটু দেখে যেতে। দুষ্টু চোখে ছুঁয়ে যেতে। সাত কি ছয় বছরের বালকটি! ছো মেরে নিয়ে গেল শুমশুমের প্লেটের উপর রাখা কেকটি। আমি তো অবাক। শুমাও হা। মহাউন্নত এই দেশিয় ফরমাল সাংস্কৃতিতে বেড়ে উঠা বাচ্চাগুলো ভুলেও ছোঁয় না অপরের কিছু। সেখানে ছো মেরে পার্টির ভেতর এক মহল মানুষের মাঝে চারদিকে এত খাবার থাকতে এসে আমার মেয়ের পাতে রাখা ছোট্ট কেকটা তুলে নিয়ে দৌড় দেওয়া, বেশ অবাক করা কিছুই তো।

তারচেয়েও বেশি অবাক লাগলো যখন চেয়ে দেখলাম বাচ্চাটি যেন বেশ বুঝে বুঝে একটা দুষ্টামির হাসি দিচ্ছে আমার শুমের দিকে চেয়ে। পিছন ফিরে চেয়ে চপল চোখে যেন বলছে কি আপু পারলে না তো কই ধরতে। আমার মেয়ে বললো, মাম তুমি কি জান কার বাচ্চা ওটি। ওর পেরেন্টসকে কমপ্লেইন করা দরকার।

মেয়ের রাগ দেখে আমি হাসলাম। ওই বাচ্চা থেকে সে আট নয় বছরের বড় হবে। তারপরও একলা ঘরের একলা রাজকন্যা, ভাইবোন নেই, থাকলে কত থাবাথাবি হতো। এটা আমার ওটা তোমার। এখন সবই তার। ভাগাভাগি নেই। এ-তো তাতে অভ্যস্তও নয়। সেখানে কিনা এ ধরনের হরির লুট স্টাইলে ছুটে এসে বাচ্চাটি কেক নিয়ে পালালো! পাঞ্জাবিপরা ছোট এক বালক চোর। পাঞ্জাবির উপর কোটের মতন কি যেন একটা চাপিয়েছেও। ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে শুমাকে দেখছেও। ভাবখানা আপু কেমন মজা, পারলে ছুটে এসে কেড়ে নাও।

আমার অন্তত তাই মনে হলো ঐ শিশুর হাসি দেখে, চোখ দেখে। জানে না আপু ডাকেই অভ্যস্ত নয় আমার রাজকন্যাটি। বেবি শাওয়ারে হাজার রকম খাদ্য থাকে। সবাই আসে কিছু না কিছু নিয়ে। আয়োজকরা চেষ্টা করেন উপচেপড়া আনন্দের সাথে সাথে যেন প্রচুর পরিমাণে বহুবিধ খানাপিনারও যোগাড়যন্ত্র থাকে। আচার থেকে ভর্ত্তা হয়ে মিষ্টি ছুয়ে মোগলাই সব। দেশে থাকতে বেবি শাওয়ারে তেমন যাওয়া হয়নি। এখন হয়তো দেশেও জমকালো বেবি শাওয়ারের আয়োজন হয়। সবাই একটা করে খাবার নিয়ে আসে। আমাকে আনতে বলা হয়েছিল পিৎজা। আরো কয়েকজনকে বলা হয়েছিল পিজ্জা আনতে। এদেশে এই প্রবাসে বড় হয়ে উঠা বাচ্চাদের প্রিয় খাবার এটা। সবার বাসাতেই অধুনা দেখি ভাত-মাছের পাশাপাশি বাচ্চাদের জন্য পিজ্জাও থাকে। তবে বেবি শাওয়ার আমার সব সময়ই পছন্দ অনেক ভর্ত্তা থাকে বলে। মাঝে মাঝে আমারও খুব জানতে ইচ্ছে করে আমার যে বেবি শাওয়ারটা হওয়ার কথা ছিল কোনো একদিন তাতেও কি প্রচুর ভর্ত্তা থাকতো। অনেক রকম ভর্ত্তা! আচ্ছা ভাবছি কেন থাকতো কিনা ভর্ত্তা! আমি তো গিয়েছিলাম। আমি গিয়েছিলাম সেই বেবি শাওয়ারে। তবে চীফ গেষ্ট হয়ে না হোস্ট হয়ে।

আমরা দুজন একসাথে পেগনেন্ট ছিলাম। একসাথে তাই সাধ দেবে বলা হয়েছিল। আমার বাচ্চাটা ঠিক এক সপ্তাহ আগে চলে গেল। কোথায় যেন হারিয়ে গেল। শুধু তার সাধ হলো। আমি গেলাম অন্যদের অনেক আনন্দে শরীক হতে। পুতুল ভাবী বেশ কয়েকবার বললেন আমাকে এবং সবাইকে যে ওনার মন অনেক বড়, তাই আসতে পেরেছেন।

আমি জানি আমি খুব সংযমী হৃদয়বতী, মায়াবতী একটি মেয়ে। হ্যাঁ মনটাও বিশাল। মাছ নিয়ে যাবার দায়িত্ব নিয়ে আমি গেস্ট থেকে হোস্ট হয়ে গেলাম। এখানে যার বেবি শাওয়ার সেই শুধু গেস্ট বাকিরা হোস্ট, আয়োজক। আমিও হাসি মুখে অন্য মা-টির আনন্দের সাথী হতে পাশে দাড়ালাম। পাশ ফিরিয়ে রাখলাম আমার আনন্দ। অন্যের আনন্দে আনন্দিত হতে পারার মহৎ কাজের একজন হয়ে সত্যিই আনন্দিত হয়ে উঠলাম। এবং উঠলাম যে পর্যন্ত না বেবী শাওয়ারের কেকটার সামনে গিয়ে দাড়ালাম। বিশাল কেক। শুভকামনার বানীতে ভারা অনাগত সন্তানের জন্য। অনেক উইশ। অনেক স্বাগতমবাণী। আমি থমকে চেয়ে থাকলাম।

মুহূর্তে বুঝলাম, অনুভব করলাম, সেই বিশাল মনটা প্রচ- নিনাদে ফেটে চৌচির হচ্ছে। বুক যে নড়ে উঠে এই জানলাম প্রথম। কাপন অনুভব করলাম। কলিজা মোচড় দিয়ে কাকে যেন হারানোর কষ্ট যেন আবারও বুকের ভেতর নড়ে উঠলো। নড়ে চড়ে উঠে বুকই যেন বললো, কেমন লাগছে তোমার। নিজের কষ্ট বনবাসী করা কি এত সহজ। নিজের সাথে তা থাকে, থেকে যায়। সুরঙ্গ তৈরি হয়ে যায় হৃদয়ের পথ ধরে। ঐ সুরঙ্গে যেন বুকের এধার থেকে ওধারে উথাল পাতাল করা প্রচ- হাওয়া, ঝড়, ধূলিকণা। বুক ফাটানো হাহাকার। একেই কি বলে বুকফাটা।

আমি বহুকাল হলো সরে এসেছি বুকের সেই রাস্তা থেকে। জানি খুব নিভৃতে গোপনে আছে খুব কষ্টের এক হিরোশিমা। অনেক তলে তা। অনেক তল তার। আমার চারদিকের ব্যস্ততা দৌড়ঝাপ, আনন্দ, বেড়ানো, হাসির বহু নীচে চাপা পড়ে আছে একটি দুঃখের নদী। সুরঙ্গের ঐ ধারেই সেই নদী। সুরঙ্গের মুখটাই খুব জোরে আমি ঠেসে বন্ধ করে দিয়েছি। তারপরও হঠাৎ হঠাৎ কিছু কিছু মুঠো মুঠো বাতাস যেন বেরিয়ে আসে। ওপাশের নদীটার বয়ে যাওয়ার শব্দ যেন শুনতে পাই। খুব কষ্ট করে দাবড়িয়ে ফিরিয়ে নিয়ে আসি নিজেকে মাটির পৃথিবীতে। গোপন থাকুক বুকের মাঝের গহিন অরণ্যের সেই সুরঙ্গপথ। হঠাৎ হঠাৎ তবে ভয়ও হয়। যদি ঝড় উঠে, সব কটা বাধ যদি ভেঙে যায়, আর পাথর সরিয়ে হু হু করে সুরঙ্গ বেয়ে ছুটে আসে অশ্রুজল। আমি তো তাহলে হেরে যাব। সব কষ্ট জয় করার যুদ্ধই তো জীবনযুদ্ধ। কষ্ট আমাকে ছুঁতে পারবে না কখনোই। কিন্তু ঐ যে ছেলেটি চেয়ে ছিল বাকা চোখে আবির মেখে আমার দিকে, চমকে কেন মনে হলো, একি আরিয়ান!

অন্য কোনো রূপে এসেছে কি আবার আমাদের দেখতে! দেখে যেতে! বোনকে একটু বিরক্ত করতে। জন্মালে তো ঐ রকমই বয়স হতো।
পিজ্জার বক্স গুটাচ্ছিলাম। ছুটে এসে আমার বাক্স খুলে নিয়ে গেল দুটো পিজ্জার টুকরো। আমি হা করে চেয়ে থাকলাম।
এ কি বাদরামি।

দূরে গিয়ে সে হাসতে লাগলো ঢলে ঢলে গলে গলে পড়ে যেতে যেতে।
মাগো, কি সুন্দর সেই হাসি। চোখ নাচালো। আমার চোখ জুড়ালো, বুক কাপালো তাতে।
কার ছেলে কে জানে। যাদের বাসায় গেছি ঐ ভাবীকে জিজ্ঞেস করলে জানা যাবে। কিন্তু কি দরকার। কার ছেলেতে আমার কি কাজ। কী-ই বা যায় আসে। আবার ছুটে বেরিয়ে গেল আমার ডান পাশ দিয়ে। মনে হলো ছেলেটি তার পিজ্জামাখা হাত মুছতে চাইলো আমার আঁচলে। তাই বা কি করে সম্ভব!

আমেরিকার ছোট, এক্কেবারে ছোট বাচ্চারাও ন্যাপকিন পেপার টাওয়েল চেনে। টেবিলের উপরে পড়েও আছে অনেকগুলো। তুলে নিয়ে একটা হাত বাড়ালাম ওর দিকে। এসো। নাও। এলো না কাছে। রইলো দূরেই। বললো, তোমার ওড়নাটা লাইক করি। শাড়ির আঁচলকে ওড়না বলছে। ওড়না লাইক করে বলে হাত মুছবে! এই ছেলের মা নিশ্চয়ই শাড়ি কম পরে। গিয়ে এর কানটা টেনে দিলে কেমন হয়। আরে এত এবার জিভ ভেংচি দিচ্ছে। এক্কেবারে বাঁদর।

শুমা কি আর এমনি এমনি এই পিচ্ছি বিচ্ছুটার উপর বিরক্ত হয়েছে। একটু সামনে এগোচ্ছে আর ঘাড় বাঁকিয়ে বাঁকিয়ে আমাকে দেখছে। চোখে সেই দুষ্টামির হাসি। আমি দেখা বন্ধ করে দিলাম। এদেখা আমার অনন্তকাল ধরে দেখার ইচ্ছের পথে নিয়ে যাবে আমাকে। সকল আবিল, নভেল, জাইন, জাহির, ফাহিম, দামাল, বা কৃষ্ণ সবাইকে আমি ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকি একজনকে হঠাৎ দেখে ফেলার লোভে। অদেখা সেই একজনকে। ছয়মাস যে আমার সাথী ছিল মিশে থেকে এই দেহে।

পরেরদিন অনেক রাতে বরকে বললাম বাচ্চাটির কথা। ও বললো আমি জানি কার কথা বলছো। আমি দেখেছি। এত মানুষের মাঝে সেও আমার পায়ে পায়ে ঘুরছিল। আমি চা নিচ্ছিলাম। সে পাশে এসে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো আমার চা বানানো তাকে দেখতে হবে। যেন শিখতে হবে, আমি ভয় পাচ্ছিলাম চা না আবার তার গায়ে গিয়ে পড়ে।

জানতে চেয়েছিলাম, কিরে বড় হয়ে ডালাসে চায়ের দোকান দিবি।
বাচ্চাটি হেসে বললে, ঘড় অৎরধহ তা না করবে। আমি এই আজব বাংলায় না হেসে পারলাম না।
আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, কি নাম বললো, আরিয়ান!!!
এক পলকের জন্য আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে গেল যেন। আমার দুচোখ ভরলো জলে। নোনা জল। আরিয়ানের সাথে আমার বারেবারেই দেখা হয়ে যায়। বাহুভাবে সে এসে আমাকে দেখে যায়। আমাদের ছুঁয়ে যায়। আমি অনুভব করি তার শ্বাস। অসাধারণ এক বালক আমার শুকিয়ে যাওয়া মরা মরুময় দুচোখে ভরে দেয় জলে জলে।

কেউ যা দেখে না আমি তাই যেন দেখে ফেলি। দেখে ফেলি অবাক বিস্ময়ে। কোনো এক ভূমি না ছোঁয়া ভূমিষ্ঠের অতীত এক শিশুর মা হবার গৌরবেই যেন অনেক কিছু ভেবে ফেলতে পারি বিপুল অধিকারে।