বুধবার,১৬ অগাস্ট ২০১৭
হোম / জীবনযাপন / আজকের শিশু-কিশোর ও প্রযুক্তি আসক্তি
০৫/১৬/২০১৬

আজকের শিশু-কিশোর ও প্রযুক্তি আসক্তি

- নাইব

বিজ্ঞানের ক্রমবর্ধমান উন্নতির বদৌলতে দিনে দিনে সহজলভ্য হয়ে আসা এই গ্যাজেট বা ইন্টারনেট শিশু-কিশোরদের জন্য একদিকে যেমন শিক্ষার বিরাট মাধ্যম হতে পারে, অন্যদিকে আবার মারাত্মক আসক্তি সৃষ্টি করতে পারে।

নিত্য-নতুন ডিভাইস বা গ্যাজেটের সঙ্গে পরিচিত থাকাটা মোটেও দোষের কিছু নয়। তবে ট্যাবলেট, টেলিভিশন, মোবাইল বা কম্পিউটারের মতো ডিভাইস কিংবা ইন্টারনেট যখন আপনার সন্তানের হাসি-আনন্দের একমাত্র উপলক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় তখন তা আসক্তির পর্যায়ে পড়ে। আর স্বভাবতই যে কোনো আসক্তিই জীবনে চলার পথে ফুল স্টপ আনার জন্য যথেষ্ট। আপনার সন্তান সম্পূর্ণভাবে গ্যাজেটে আসক্ত হয়ে পড়েছে কিনা তা বোঝার জন্য কিছু বিশেষ জিনিসে খেয়াল রাখতে হবে।

গ্যাজেটের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির ফলে অনেক সময় শিশু অন্যান্য কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এমনকি একটা সময়ে তার সবচেয়ে প্রিয় কাজ যেমন মুভি দেখতে যাওয়া, বাইরে বন্ধুদের সঙ্গে খেলা এসব থেকেও বিরত থাকে। এই ধরনের আসক্তি কাজ করলে শিশু তার ডিভাইস বা গ্যাজেটের ব্যাপারে অতিরিক্ত সচেতন হয়ে পড়ে। বাবা-মা বা অন্য কেউ এ নিয়ে অভিযোগ করলে তার প্রতিবাদে তর্কে জড়িয়ে পড়ে। এর পাশাপাশি বাসায় কোনো সময় ইন্টারনেট সংযোগ না থাকলে তা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তিত হয়ে পড়ে বা সংযোগ ফিরে আসলে খুশির মাত্রা অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছায়। এছাড়া মা-বাবার কাছে গ্যাজেট বা ডিভাইস ব্যবহার নিয়ে মিথ্যা কথা বলাটাও অভ্যাসে পরিণত হয়। আপনার সন্তানের আচরণে এ ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলে অবশ্যই বুঝতে হবে সে গ্যাজেট, ডিভাইস বা ইন্টারনেট আসক্তির শিকার।

সমস্যা যখন তীব্র

ইন্টারনেট বা গ্যজেটের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশু ওবেসিটি বা স্থূলতার সমস্যায় ভোগে। হাতের কাছে ডিভাইস-ইন্টারনেট থাকায় শিশু তার অবসর সময়টা বাইরে খেলাধুলা না করে ঘরে শুয়ে-বসে ট্যাবলেট, মোবাইল বা আইপ্যাডের পর্দায় কাটিয়ে দেয়। ফলে যথেষ্ট পরিমাণ শারীরিক পরিশ্রমের অভাবে শিশুর ওজন বাড়তে থাকে। এর সঙ্গে যদি শিশুর ফাস্টফুড খাওয়ার অভ্যাস থাকে তবে স্থূলতা, হৃদরোগ বা ডায়াবেটিসের মতো ভয়াল ব্যাধিগুলো কচি বয়স থেকেই শরীরে বাসা বাঁধে।

অতিরিক্ত গ্যাজেট আসক্তি এডিএইচডি (অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার অ্যাক্টিভিটি ডিসর্ডার) নামক মানসিক রোগের সৃষ্টি করে। এই ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তি নির্দিষ্ট কোনো কাজে পূর্ণ মনোযোগ প্রদান করতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশান-এর মতে চার থেকে সতেরো বছর বয়সি অন্তত ৬০ লক্ষ শিশু-কিশোর বর্তমানে এডিএইচডি-তে আক্রান্ত। গত দুই দশকে এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়েছে এবং মোবাইল ডিভাইসে অতিরিক্ত আসক্তিকেই এর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা।

এছাড়া এ ধরনের আসক্তিতে ভোগা শিশু-কিশোরদের মধ্যে আচরণগত সমস্যাও দেখা যায়। বাবা-মা বা ভাই-বোনের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়া, মিথ্যা কথা বলা, পর্ণোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে পড়া কিংবা টিভি-কম্পিউটারের সামনে বসে অহেতুক সময় নষ্ট করাটা অভ্যাসে পরিণত হয়।


প্রতিকারের উপায়

শিশুর এধরনের আসক্তি দূর করতে মা-বাবার ভুমিকাই মুখ্য। এক্ষেত্রে ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে সঠিক নৈতিক শিক্ষা প্রদান করতে হবে। সন্তানের সঙ্গে এ ব্যাপারে তর্কে না জড়িয়ে তাকে এর ক্ষতিকারক দিকগুলো সম্পর্কে বুঝিয়ে বলতে হবে। সন্তানের সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় ব্যয় করাটাও এক্ষেত্রে বেশ জরুরি কেননা অনেক সময় একাকিত্বে ভোগা শিশুরা এধরনের কার্যকলাপে যুক্ত হয়ে পড়ে। সন্তানকে সব ধরনের ডিভাইস ব্যবহারের সুযোগ দেয়াটা মোটেও দোষের কিছু নয়। তবে সেই সঙ্গে ব্যবহারের সময়সীমা আগে থেকে নির্ধারণ করে দিতে হবে এবং সন্তান যেন তা মেনে চলে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এক্ষেত্রে টেলিভিশন বা কম্পিউটার কোনো ঘরের কোণে না রেখে সবার মুক্ত চলাচল থাকে এমন জায়গায় রাখা উচিত।
সর্বোপরি সন্তানের সঙ্গে আপনার সহজ-স্বাভাবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এ ধরনের আসক্তি নিরাময়ে সর্বাপেক্ষা কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে তা বলাই বাহুল্য।