শনিবার,১৭ নভেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / ঘরভাঙা ঘর (তৃতীয়-পর্ব)
০৫/০১/২০১৬

ঘরভাঙা ঘর (তৃতীয়-পর্ব)

- রিজিয়া রহমান

নগরীর সন্ধ্যা তো সে কথাই বলে : এসো, পান করে নাও এই সন্ধ্যার আনন্দ, রাত্রির অমৃত। এই সন্ধ্যা তোমাদেরই।
তবু ভিখারি কুষ্ঠরোগী আতুর পকেটমার, দলাল আর দেহোপজীবীনিরা এসে দাঁড়ায় আলোকোজ্জ্বল শহরের প্রাণকেন্দ্রে। ছায়া ফেলে সুখের ঝরনায়। রাত্রির একটি পাপিষ্ঠা হাত ওদেরকে ঠেলে সরিয়ে রাখে অন্ধকারের আবছায়ায়। সন্ধ্যা যেখানে কুটিল, কুৎসিত আর উপবাসী, সেখানে ওদের বিচরণক্ষেত্র। সেখানে আছে ক্ষুধা, লোভ পাপ আর অরাজকতা।
তবু সেই বস্তিবাড়ির দুই সারি ঘরে সন্ধ্যা অনেকটা আশীর্বাদের মতো। শহরের বড় বড় দালানকোঠার মাথায় সূর্যের আলো যখন স্তিমিত হয়ে আসে। আকাশের রঙ নীল থেকে ফিরোজা, তারপর ফিরোজা থেকে ফ্যাকাশে ম্লান হয়ে ধোঁয়ার মতো হয়ে যায়। একটা দুটো করে সাতটা তারা ফোটে আকাশে। চুপি চুপি আদরের মতো শিরশিরে আবছা একটু হাওয়া শহরতলীর হালকা গাছপালায় দোলা দেয়। তখন সেই বাড়িটা যেন অবেলায় ঘুমিয়ে হঠাৎ জেগে কর্ম-কোলাহলে কলরবে আবার মুখর হয়ে ওঠে। তিন টাকা, পাঁচ টাকা, আট টাকা ভাড়ার প্রায় সব ঘরেরই ঝাপ খোলা দেখা যায়। শিশুদের কান্না, ছোটদের চিৎকার-মারামারি, মেয়েদের কলহ আর পুরুষদের তম্বিতে একটা সজীব প্রাণ যেন চঞ্চল হয়ে ওঠে।
ধোয়াবাছা, কোটাকুটি আর কূয়োতলার ভাগের অধিকার নিয়ে তর্কাতর্কিতে প্রতিটি ঘর তৎপর। প্রায় সবাই এখন ঘরে ফেরে, বিশেষ করে মেয়েরা। ঘরে ঘরে চুলোয় গনগনিয়ে ওঠে আগুন। চুলোর তিনটে ঝিকের মাথায় সগর্বে বসা চালভর্তি মাটির রাইঙ টগবগ করে হয়ে আসা ভাতের গন্ধ ছড়িয়ে সারাদিনের ক্ষুধাকে অসহিষ্ণু করে তোলে।
জোলেখার মার আট বছরের যে ছেলেটা পথ থেকে কুড়িয়ে আধপোড়া একটা সিগারেট বিড়ির দোকানের ঝুলন্ত জ্বলন্ত রশি থেকে অগ্নিসংযোগ করে মহাতৃপ্তিতে ধূমপানের নবিসি করতে করতে বিকেলে গলির মোড়ে ঘুরেছে আর স্বসংযোজিত সুরারোপে গান ধরেছে : ‘ও দাইমা, কিসের বাইদ্য বাজে... আমার দাইমা... আ... আ.... গো’- সেই ছেলে সেই শামছেলই এখন ভাইবোনদের সঙ্গে ভাতের হাঁড়ি ঘিরে বসে নাকি কান্নার সুর ধরে : ‘মালো, জলদি ভাত দে। ভোকে প্যাট মুছরায়।’ ওপাশ থেকে আমিরন ভেংচি কাটে : ইঃ, প্যাট মুছরায়! তুই বাবার থনে পয়সা চাইয়া আইসক্রিম খাইছস না? আমাগো দিছিলি?
শামছেল একটা আচমকা কিল বসাল আমিরনের পিঠে : খাইছি তো খাইছি, তর কিলো মাগী? তুই আর আলেকজা ম্যাছের সাহেবের থনে পয়সা লইছস আমি বুঝি জানি না?’
আমিরন তার হাড়সর্বস্ব পায়রার বুকের মতো পাঁজর ফুলিয়ে শরীরের সর্বশক্তি প্রয়োগে কান্না জুড়ল : ইঃ... ই... পয়সা বড় আমারে দিছে নি। পয়সা আমি কবে নিছি... ই... ই...। আলেকজা আমারে...।’
ঘরের কোণে চট পেতে বিছানা পাড়ছিল আলেকজান। আমিরনের কান্নায় বাধা দিয়ে চিলের মতো উড়ে এসে পড়ল শামছেলের ওপর। এক হাত দিয়ে চুল টেনে ধরে আর এক হাতে দমাদম কিল-চড় বসাতে লাগল। ক্ষীণ স্বাস্থ্যের আট বছরের শামছেল বাড়ন্ত শরীর বারো বছরের আলেকজানের সঙ্গে পেরে উঠল না। প্রবল চিৎকারে বাড়ি মাথায় করে তুলল। সেই সঙ্গে অনুনাসিক ক্রন্দনে আলেকজানের কীর্তি জাহির করতে লাগল।
: আমারে মারছ... খানকি। ম্যাছের সাহেব তরে লইয়া দরজার কপাট দেয় নাই? পয়স... লইছস তুই... হারামি।
আলেকজানের কণ্ঠও কম নয়। শামছেলকে চুল ধরে মাটিতে শুইয়ে ফেলে গর্জাতে লাগল।
: ওই মিথ্যুক কুত্তা! খুন করুম তরে।’
শামছেল এতক্ষণে মওকা পেয়ে আলেকজানের তৈলহীন ঝুঁটি খুলে পড়া লাল চুল ধরে ঝুলে পড়ল।
: শয়তান... মিথ্যুক... তরে চুরি কিনার আলতা চুলের ফিতা কিনবার পয়সা দিছে কে... তুই কস নাই আমিরনেরে?... আমারে মারে... হারামিতে...।
: আরেকজান!
বাজের মতো চিৎকার করে উঠল জোলেখার মার গলা। চিৎকার নয়, যেন প্রবল কান্না আর রাগ একাকার হয়ে জোলেখার মার কণ্ঠনারী চিরে বেরিয়ে এল বিকৃত এক শব্দের দলা। জোঁকের মুখে নুন পড়ল। থমথমে হয়ে গেল সারা ঘরের আবহাওয়া। অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দাড়াল আলেকজান। নিজেকে মনে মনে তৈরি করতে লাগল আসন্ন নির্যাতনের জন্য। মেয়ের পা থেকে মাথা অবধি তীব্র সন্ধানীদৃস্টি নিক্ষেপ করল জোলৈখার মা। পরনে একটা ছেঁড়া ময়লা ডুরে শাড়ি তৈল-সাবানের স্পর্শবিহীন একবেলা আধপেটা খাওয়া বারো বছরের মেয়ের বাড়ন্ত শরীরের লাবণ্য ঢাকতে পারেনি। বড় বড় চোখ আর রুক্ষ চুলে ঘেরা মুখটাকে শীর্ণ করুণ লাবণ্যভরা মনে হয়। অথচ এই মুহূর্তে জোলেখার মার চোখে এসব কিছুই পড়ল না। জোলেখার মার জ্বালা- করা দৃষ্টিতে জ্বলজ্বল করে উঠল শীর্ণ হাতে জলমলে একগোছা কাচের চুড়ি। ধুলিমলিন দুখানি পায়ে ম্লান আলতার ছোপ। শামছেলের হাতের টানে খুলে পড়া রুক্ষ চুলের মাথায় লাল ঝুলন্ত ফিতের একটা প্রান্ত। লাল শস্তা সিলকের ফিতে নয় যেন কুটিল পাপের মতো লাল একটা সাপ কিলবিল করে দুলে উঠল জোলেখার মার চোখের সামনে। আর সঙ্গে সঙ্গে অসহ্য অন্ধ একটা রাগ দপ করে জ্বলে উঠল মস্তিষ্কের শিরায় শিরায়। চুলোর ধার থেকে লোহার বেড়িটা তুলে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল আলেকজানের ওপর। বেড়ির নিষ্ঠুর প্রহারের সঙ্গে চলতে লাগল অবিশ্রান্ত গালাগাল- মর হারামজাদী! ছেনালনী মইরা যা তুই। তরে আইজ গোরে দিয়া তয় ভাত খামু। এত বাড়! ওরে খানকি, তরে প্যাটে ধরছিলাম ইয়ার লাইগ্যা?
মারতে মারতে নিজের শাড়ির আঁচলটা ছিঁড়ে দুফালি হয়ে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। বড়ির মতো ছোট করে বাঁধা চুলের গিঁট খুলে আলুথালু হয়ে ছড়িয়ে পড়ল পিঠে। একসময় ক্লান্ত হাত থেকে বেড়ি পড়ে গেল। পরিশ্রমে হাঁপরের মতো ওঠানামা করতে লাগল নেতিয়ে পড়া বুক।
ঘরের অন্য কটি শিশু ভয়ে জড়সড় হয়ে এই লোমহর্ষক দৃশ্য দেখছিল। কোলেরটাও কাঁদতে ভুলে গিয়েছিল। শুধু অথর্ব জরাগ্রস্ত বুড়ি নাতনীকে আগলাবার জন্যে ছেঁচড়ে এগিয়ে আসতে চাচ্ছিল। কিন্তু সারাদিনের অভুক্ত শরীর হাতের ভর সয়ে এগুতে পারছিল না। বারবার টলে পড়ে যাচ্ছিল।
দরজায় এসে উঁকি দির ফুলজান : কি বুজি, ম্যায়াডারে মাইরে ফ্যালাইবা নিহি। ফুলজানকে দেখে ডুকরে কেঁদে উঠল জোলেখার মা : বইনলো এই আছিল কপালে। গইগেরামের সদগিরস্তের বউ আমরা। বাড়িতে বইয়া ধান সিজাইছি। মরিচ বাছচি। ঢেঁহিতে পাড় দিছি। স্বামী বাদে পরপুরুষের মুখ দেহি নাই। এই কুত্তার বাচ্চাগো প্যাট বাঁচানের লিগা আইলাম ঢাকার শহর। শইলের রক্ত পানি কইরা ছয়টা বাসার কাম করি। আব্রু গেল। পথে পথে ঘুরি কাগো লাইগ্যা? এই হারামের বীজেরা আমার সব খাইল। আমার শইলের রক্ত আমার আব্রু আমার ইজ্জ্বত। ওহো আল্লারে আর কত?
জোলেখার মা হঠাৎ মাটিতে মাথা কুটতে আরম্ভ করল।
ফুলজান জোলেখার মাকে তুলে ধরল : ‘দেহ দিহি কী করে। পাগল হইলা যে!’
অদূরে দ-ায়মান আলেকজান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পায়ের নখ দিয়ে জেদী বিড়ালের মতো মাটি আঁচড়াচ্ছিল। নাক আর কপাল দিয়ে রক্তের ধারা নেমেছে তার। সেদিকে তাকিয়ে শিউরে উঠল ফুলজান : ‘ইস, করছে কী! যা, মুখ ধুয়ে মুইছা ফ্যালা। ডরও নাই তগো।’ ঘাড় বাঁকা করল বারো বছরের স্বৈরিণী। রক্তমাখা ঠোঁট কুঞ্চিত করল : ‘ক্যান, কিয়ের ডর? কিয়ের ডর? দিছিল ক্যান আমারে ম্যাছের কামে? আমি আইয়া কই নাই মার কাছে যে, ম্যাছের সাবরা ভালো না! তখন কান বন্ধ কইরা আছিল? চক্ষু উলডাইয়া আছিল? না মাসের শ্যাষে পাঁচটা ট্যাহায় ভুলাইয়া দিছিল? অহন মারে ক্যা? মা হইছে বাপ হইছে, এক বেলা পেট ভইরা ভাত খাওয়াইবার পারে না, মারবার পারে। কাপড় দিবার পারে না, ইজ্জত মানে! নিমু তো ট্যাকা সাবগো থনে। ক্যান দুঃখু করুম। প্যাট ভইর্যা ভাত খামু। কাপড় কিনুম। বায়স্কোপ দেখুম। থাকুম না তোমাগো কাছে... আমি দ্যাশে যামু... আমি দ্যাশে যামু, থাকুম না খারাপ শহরে...।’
অজস্র লৌহবেড়ির আঘাতে যে-চোখে পানি আসেনি, দেশের কথা মনে হতে মনের কোনো কোমল বেদনার্থ অশ্রুর উৎস খুলে গেল। দুচোখ বেয়ে অজস্র ধারায় অশ্রু গড়িয়ে ধুয়ে গেল ঠোঁটের রক্ত। চোখের প্রান্তে জমে-ওঠা অশ্রুকণিকায় ছায়া পড়ল খালের পাড়ে বাঁশঝোপের পাশ দিয়ে সরু একটা পায়েচলা মেঠো পথ। গাব, আমতলি, তেঁতুল আর খেজুরগাছের ছায়ায় ছোট একটি ভিটে। তার পিছনে দিগন্তবিসারী চক। বেগুনি রঙের কুচরী ফুল আর লাল শাপলায় ভরা। বর্ষায় চক পানিতে ভরে ওঠে। সেইসঙ্গে বেড়ে ওঠে ধানের লকলকে সবুজ মাথা। কোথায়? কোথায় সে ঘর, সে দেশ? কোথায় সেই বাগানে ঘুরে কচুর লতি, পুকুরপাড়ের হেলঞ্চে শাক আর গামছা দিয়ে গুঁড়া ইচা সংগ্রহের আনন্দ! এই বারো বছরের জীবনের কঠিন শহুরে অভিজ্ঞতা ম্লান করে দিয়েছে সেই নিষ্পাপ আনন্দের জীবন। পৃথিবীতে কোথাও এখনো আছে কি সেই দেশ যেখানে বর্ষার দিনে খাল দিয়ে টিকারা বাজিয়ে গয়নার নৌকা যায়? তালের ডোঙায় করে ফেরিয়ালা আসে মুড়ি, মোয়া, ডাবলী আর আউখা মিঠাই ফেরি করতে। চৈত্র সংক্রান্তির মেলায় কাঠের আর মাটির পুতুল, খেলার ছোট হাঁড়ি-পাতিল কিনে কোঁচড়ে বিন্নি বাতাসা, খই আর চিনির মঠ ভরে দুই পয়সার রঙিন বাঁশি বাজাতে বাজাতে অস্তগামী বেলায় ভাই-বোনেরা বাড়ি ফেরে। সেখানে ভাতের কষ্ট নেই। শহরের নিষ্ঠুর অন্যায্য প্রলোভনের দাবি নেই।
চোখের পানি গড়িয়ে সেই সব মুহূর্তের স্বপ্ন ধুয়ে যেতে লাগল। না নেই, আলেকজানদের জন্য সে দেশ বোধহয় নেই।
পাশের ঘর থেকে সমীরনের খরখরে গলা ব্যঙ্গ করে উঠল : ‘আহা রে, আমার হালাল রুজি খাওয়ানীরা! দুধের বাচ্চাটারে দিয়া ছিনালীর পয়সা কামাইতে শরম করে না! উহ, উয়ারা আহে ঠ্যাহার দেখাইবার। শাক দিয়া মাছ ঢাকে। ইয়ারেই কয়, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।’ সমীরণের খনখনে কুটিল গলার হাসি বেঁধে এসে জোলেখার মার বুকে।
একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ায় জোলেখার মা। আপন মনে যেন শুধু নিজেকে শুনিয়েই বলল : বেশি তো কিছু চাই নাই আল্লাহ্। খালি ইজ্জতের সঙ্গে থাইক্যা গতর খাটাইয়া বাচ্চাগো দুগা ভাত জোটান। তাও তুমি দিবা না?
খানিক বাদেই বাজারের ঝুড়ি মাথায় বিকিকিনির পাট দিনের মতো চুকিয়ে ঘরের সওদা নিয়ে বাড়ি ফিরল জোলেখার বাপ অছিমুদ্দি। ঘরের বিষন্ব আবহাওয়ার খেয়াল মাত্র না করে মাথায় ঝুড়ি নামিয়ে ময়লা ছেঁড়া গামছা নেড়ে হাওয়া খেতে-খেতে দরাজ গলায় ডাকল : কো রে আলেকজান আমিরন শামছেল? জলদি আয়। আইজ মিঠাই আনছি, ইলিশ মাছ আনছি...।
মুহূর্তে বদলে গেল ঘরের হাওয়া। যেন দখিনা এক ঝলক খুশির বাতাস পথ ভুলে অযাচিতে ঢুকে পড়েছে এই ঘরে। ভয়ার্ত কালো মেঘটা উড়ে গেল কয়েকটি সঙ্কুচিত শিশুমুখের ওপর থেকে। বাপের মাথা থেকে নামানো ঝুড়িটাকে ছুটে এসে ঘিরে ধরল সবাই। চোখের পানি না মুছেই মুখে হাসি ফুটিয়ে আলেকজানও এল। মাটির দেলকার ওপর থেকে টিমটিমে কেরোসিনের কুপিটা তুলে পায়ে পায়ে জোলেখার মা এল। প্রসন্নকণ্ঠেই বলল : ‘আইজ বুঝি মাল ভালো বিকছে?’ তারপর উত্তরের অপেক্ষা না করেই সওদা নামাল ঝুড়ি থেকে। এক ঠোঙা গরম জিলাপি, একটা শাদা চকচকে চ্যাপটা ইলিশ, কাঁচামরিচ, সর্ষের তেল, আরও সামান্য কয়েকটা টুকিটাকি। জিলাপির ঠোঙা খুলে হাতে হাতে ছেলেমেয়েদের ভাগ করে দিল। মাটিতে হাতের ভর দিয়ে কোনোমতে একরকম হামাগুড়ি দিয়ে এসে পড়ল জোলেখার নানী : ‘আমারে দিবি এক কোণা?’
মায়ের অতিরিক্ত ছেলেমানুষির জন্য শক্ত কী একটা কথা বলতে গিয়েও বলতে পারল না মায়ের মুখ চেয়ে। দন্তহীন মাড়ি আর জিভ লালায় ভরে উঠেছে। গড়িয়ে পড়েছে গালের রস বেয়ে। ঘোলাটে চোখদুটি লোভে চকচকে। মায়ের হাতে একখানা জিলাপি বেশি দিয়ে স্বামীকে এগিয়ে দিল দুটো। সেইসঙ্গে প্রশ্ন করল : জোলেখার শ্বশুরবাড়ির খবর নিছ? কী হালে আছে ম্যায়াডা আল্লায় জানে। মনিষ্যি না তো জামাইডা। তা না হইলে এতো জ্বালা কী শাশুড়ি বেডি দিবার পারে? জামাইরে কও, জোলেখারে লইয়া আলাদা বাসা করুক।
জোলেখার বাপ নিঃশ্বব্দে জিলাপি দুটোর সদগতি করে গামছায় হাত মুছল : আরে ভিন্ন বাসা কইলেই কী হয়... দিন ভইরা ঠ্যালাগাড়ি বাইয়া কয়শো ট্যাহা তোমার জামাই কামায়?
ঝংকার দিয়ে উঠল জোলেখার মা : তয় আর একখান থনে ছাড়ান লইয়া ম্যায়ারে ফিরা ঠ্যালাআলার কাছে দিছিলা ক্যা বিয়া?... আমার মানা তো শুন নাই!... তা নাইলে আইজ আমার জোলেখার সোনার থালে ভাত। স্কুটার বাইয়া দোকান কিনছে জামাল... অহনও আর বিয়া করে নাই খবর রাহ নি?
জোলেখার বাপ ঝাঁঝিয়ে উঠল : আর থো থো। কী আছিল জামাইলার আগে! তহন তো কানছস, নয় বছইরা ম্যায়ারে বিয়া দিলা বুড়া ব্যাটার কাছে। তগো কথার ঠিক আছে? পয়সা দেখলেই তরা...
মা-বাবার জমে-ওঠা কলহে বাধা দিল আলেকজান। চ্যাপ্টা রুপোর মতো চক চকে মাছটা হাতে তুলে হাসল : কী সুন্দর মাছটা আনছ বাবা আইজ! খুব ত্যাল হইব। মাছটা আমি কুটি মা?
জোলেখার মা মুখ তুলল। নির্যাতিত অশ্রুধোয়া মুখটায় আবার শিশুর নিষ্পাপ সারল্য ঝলমলিয়ে উঠেছে। মেয়ের মুখে তাকিয়ে ঈষৎ কোমল কণ্ঠে বলল : ‘যা কুটগা, আমি ভাত নামাইয়া মশলা বাঁটি।’ ঘরের অন্য ছেলেমেয়ের দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দিল : ‘অই তরা কইল ঘুমাইছ না। সালুন হইলেই ভাত দিমু।’
জোলেখার বাবা কানে গোঁজা একটি আধপোড়া বিড়ি নামিয়ে কুপির আগুনে ধরিয়ে সশব্দে টেনে ধোঁয়া ছাড়ল। তারপর উঁচুকণ্ঠে অনেকটা যেন বাড়ির অন্যান্য বাসিন্দাকে শুনিয়ে বলল : ‘হ খুব জবর একখান সালুন রান্ধ দেহি, এমুন বড় ত্যালয়ালা মাছ কি সবদিন বাজারে উঠে!’ বলাবাহুল্য জোলেখার বাপের ঘোষিত গুণাবলির তুলনায় মাছটি অনেক খর্ব ও কম তৈলযুক্ত।
সব ঘরেই প্রতীক্ষিত এই সন্ধ্যাটি অতি ব্যস্ততার চঞ্চল হাওয়া দেয়।
ভেদরগঞ্জ থানার ফুলজান অনেক আগেই জোলেখার মার ঘর থেকে সরে এসেছিল। এঘর, ওঘর, আরো দুচার দরজায় ঘুরে সবাইর খবর নিয়ে নিল একফাঁকে। ছাওনারার খালার চুলোয় টগবগিয়ে ফুটে উঠেছে খুদের জাউ। কার্তিকার নানী আজ ভাত রাঁধেনি। মুনির বাড়িতে আজ বিশেষ কোনো উৎসব ছিল। তার ফলে অযাচিতভাবে পোলাও গোশতের যে ভাগ জুটেছে, তা দৈনিক বরাদ্দ বাঁধা মাপা ভাতের বেশি। খুশিমুখে ছেলে আর নাতি-নাতনীদের খাওয়াতে বসেছে। যেন এই উৎসব কার্তিকের নানীর নিজেরই কৃতিত্ব।
সব ঘরেই সারি সারি আলো জ্বলেছে। ঝাপ খোলা সব দরজার। বন্ধ কেবল ফকিরচাঁদের আর সোনাবড়–র ঘর। দৈনন্দিন নিয়মে ফকিরচাঁদ বেরিয়ে গেছে বাবড়ি চুল ফুলিয়ে পাঞ্জাবি উড়িয়ে। আর সোনাবড়– বেরিয়েছে বিকেলে তেস্তরি বাজারে ওর কোন গাঁ সম্পর্কের ভাইয়ের বাড়িতে।
ময়না চা চড়িয়েছে চুলোয়। এ বাড়িতে এই শৌখিন পানীয়টির আবির্ভাব মাঝে মাঝে সোনাবড়– আর ময়নার ঘরেই ঘটে। ঠোঁট বাঁকিয়ে ব্যঙ্গ করে অন্যান্য অনেক বাসিন্দা : ইঃ, ভাত জোটে না মিয়াইর খাট্টা খাইবার চায়। কালে কালে কত কী দেহুম। এই বাড়িতে থাইকা আবার ভদ্দরনোকেগো নাগাল চা খাওয়া। ঢং দেইখ্যা মরি। তয় হাতে ভেনেটি ব্যাগ ঝুলাইয়া, কোচাইয়া কাপড় পিন্দা ইস্কুল-কলেজে গেলেই হয়।
টিপ্পনীকারিণী দলের অধিনায়িকা হিসেবে সমীরনই প্রধান অংশগ্রহণ করে। অবশ্য এর পিছে সমীরনের মনোজগতের ক্ষুদ্র একটি ক্ষোভ সক্রিয়। সমীরনের স্বামীর রোজগারের প্রাচুর্যের দম্ভ শুধু কি ভালো ভালো খাওয়ার ঢোল পিটিয়ে ক্ষান্ত হবে? আভিজাত্যের দিক দিয়েই বা সমীরন সবার উপরে যাবে না কেন? ওই রূপগর্বিণী সতীন-ভাগিনী ময়না আর সন্দেহজনক চরিত্রের সোনাবড়– ওরাই শুধু ভদ্দরলোকদের মতো বিকেলে শাড়ি বদলে আরশি দেখে পাতা কেটে চুল বাঁধবে। ছোট কাচের গেলাসে করে কম দুধের কালচে চা ঢেলে ঢেলে খাবে। চামচ দিয়ে গেলাসে অনর্থক চা নেড়ে টুং টাং শব্দ করে চা খাওয়ার গৌরব জাহির করবে। এর কী সহনীয়! অথচ সমীরণের কতদিনের ইচ্ছা, বিকেলে সেও চায়ের পাট বসায়। পুরোনো কাপড়চোপড়ের বদলে কাপ-পীরিচ-থালা-বাসন বিক্রিয়ালাদের কাছ থেকে দুটো টিনের এনামেলের রঙিন ফুলতোলা হাতলঅলা পেয়ালাও সংগ্রহ করে রেখেছে সমীরন। কিন্তু মনের এই একান্ত ইচ্ছাটাÑ এক প্যাকেট চা-দুধ-চিনির প্রস্তাব স্বামীর কাছে পেশ করে ধমক খেয়েছে সে। মুখিয়ে উঠেছে সমীরনের স্বামী : আকামের প্যাচাল পাড়বি না। যা পাইছাস শুকুর কর। বেশি ফরফরাইছ না। সমীরন তাও মিনমিন করেছে : ক্যান আমাগো অবস্থা বড় খারাপ নি? ওই ময়না আর সোনাবড়–ও তো চা খায়। ওরা তো...।
সমীরনের স্বামী বাধা দিয়ে ধমকে উঠেছে : ভাত-মাছ-গোশত খাইয়া বুঝি মন ভরে না। চা খাইয়া শহুইরা বিবি হইবার মনে কয়। ময়না আর সোনাবড়–র নাহাল উড়াল দিবার সাধ হইছে? খবরদার, এইসব কথা মুখে আনবি না। আমি হালায় সারা দুইন্যা ঘুইরা শইলের রক্ত পানি কইরা কামাই, আর বিবিজান- তাল পায় না। চা...!
অগত্যা সমীরনের এনামেলের ফুলতোলা কাপ ঘরের বাতায় আর চা-পানের ইচ্ছা মনের মধ্যেই তোলা থাকে। ফলে সমীরন চায়ের ওপরে আর ময়না সোনাবড়–র ওপর দ্বিগুণ ব্যঙ্গের বিষ ঢালে।
সোনাবড়– মুখরা ধারালো মেয়ে। তার কানে কথা গিয়ে নিরুত্তরে ফিরে আসে না। তিন ডবল ঝাঁঝের সঙ্গে সে ঈর্ষাকারিণীদের মুখে জবাব ছুড়ে দেয়।
ময়না কিন্তু এসবের পরোয়াই করে না। এ বাড়িতে থেকেও যেন সে এ বাড়িতেই নেই। এ বাড়ি তুখোড় কলহকারিণীদের তালিকায় তার নাম নেই। আপন আনন্দে সে যেন আপনিই বিভোর। পৃথিবীতে এত দুঃখ আছে, এত অভাব-অনটন-হিংসা-ঈর্ষা প্রতিনিয়ত জীবনকে ঘুলিয়ে তুলছে, তা যেন ময়না জেনেও জানে না। জীবনের গভীরে সেই নির্মম পাঁকে পা না ছুঁইয়ে জীবনের উপরের স্বচ্ছ আবরণটুকুতে সে হালকা প্রজাপতির মতো ভেসে বেড়াতে চায়। এমনকি নিজে সে দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী, তার সতীন আছে, এতেও সে কিছু যেন দোষের দেখতে পায় না। নিজের রূপ আর আঠারোটি বসন্তের আনন্দে সে মশগুল। আর তাই সে এ বাড়ির অনেক পুরুষদের হƒদয়চাঞ্চল্য ও মেয়েদের ঈর্ষার পাত্রী।
বিশামোল্লা এখনো ফেরেনি। ফিরতে তার রাত হয়। একটু দেরি করেই তাই ভাত বসায় সে। ফুলজান বারান্দা থেকে সামান্য উঁকি দিল।
কিডাগো ময়না বিবি তুমার ঘরে?
চলবে...