বুধবার,২১ নভেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / রুদ্র প্রেম
০৫/০১/২০১৬

রুদ্র প্রেম

- তাহমিনা হক


শিখা তসলিমা নাসরিনকে সব কথা খুলে বললো। উনি গভীর মনোযোগ দিয়ে সব কথা শুনলেন। মাঝে মাঝে কেঁপে কেঁপে উঠলেন। কথা বলার সময় লেখিকা কয়েকবার শিখার চোখে চোখ রাখছিলেন। দুঃখ-ভারাক্রান্ত চোখ দুটোর দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। ওই মুহূর্তগুলোতে শিখার খুব অস্বস্তি লাগছিল। ও মনে মনে চাচ্ছিল লেখিকা অন্য কোনো দিক তাকিয়ে থাকুক। শিখার সব বলা শেষ হলে উনি কিছু বললেন না। শুধু বললেন, ‘শিখা, আমার রুদ্রর কথা খুব মনে পড়ছে। কিছু মনে না করলে তুমি কি আর একদিন আসবে?’ উনার বিনয়টা শিখার নজর এড়ালো না। উনি কিন্তু বলেননি ‘তুমি আজ চলে যাও’। উনি কি নিখুঁত করে বললেন, ‘তুমি কি আর একদিন আসবে?’ শিখা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। মনে মনে ভাবলো লেখিকারা কত বিনয়ী হয়। এদের সংস্পর্শে কত কিছু শেখার আছে। আহসানের সংস্পর্শেও শিখা নিজেকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে আবিষ্কার করেছিল।
রাস্তায় উঠে এল শিখা। একা একা হাঁটতে লাগল। কারো সাথে সব কথা শেয়ার করলে নাকি নিজেকে অনেক হালকা লাগে। শিখার ব্যতিক্রম অনুভূতি হলো। ও বুকের মধ্যে গাঢ় চাপ অনুভব করতে লাগলো। এপ্রিল মাস। খাঁ খাঁ রোদ। শিখার খুব কান্না পেল। বৃষ্টির মতো করে কান্নার জলে ভিজে ধুয়ে যেতে ইচ্ছা করলো শিখার। আহসানকেও কত ভীষণ রকম ভালোবাসে। প্রচ- টান অনুভব করে আহসানের জন্য। শরীরের ভিতর রক্তগুলো কেমন কামড়ে কামড়ে ধরে আহসানকে কাছে পাবার জন্য। দুই হাতে মুখ ঢেকে শিখা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। শিখার খুব চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করছে, ‘আহসান, ভালোবাসি। তোমাকে আমি ভীষণ রকমের ভালোবাসি। দেখে যাও, তুমি ছাড়া কত অসহায় হয়ে বেঁচে আছি।’
বেশিরভাগ মানুষের ভালোবাসার অনুভূতিগুলো একই রকম হয়। প্রকাশভঙ্গিও কমবেশি একই রকম। শুধু আহসানই আলাদা। ভীষণ রকমের আলাদা। আর কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহও। প্রিয় কবির জন্য কবিতার মগ্ন আসরে আহসানকে খুঁজে পেয়েছিল শিখা। কথাটা আসলে উল্টো বললে ঠিক হতো। সে যাই হোক, ওরা দুজনই আসলে দুজনকে খুঁজে পেয়েছিল জানুয়ারির সেই শীতের সন্ধ্যায়। কুয়াশাভরা সন্ধ্যায়। দৈনিক পত্রিকায় ছাপা হওয়া আহসানের কিছু কবিতা পড়া ছিল শিখার। অবিবাহিত এই লেখক কীভাবে এত মায়াভরা কবিতা লিখে ফেলে তা কিছুতেই বোধগম্য হয়নি শিখার। ভালো না বাসলে কি ভালোবাসার কবিতা লেখা যায়? এর গভীরতা বোঝা যায়? শিখার বিশ্বাস হয় না। ওর বিশ্বাস কিছুদিন পড়েই সত্যি হয়েছিল। যখন আহসান শিখার কাছে গল্প করেছিল তার প্রথম প্রেমের কথা। লাবণ্যর সাথে প্রথম ভালোবাসার কথা। কি অদ্ভুত! শিখাকে তাদের দুজনের বিচ্ছেদের গল্পও শুনতে হয়েছিল। কবিদের প্রেম-ভালোবাসা-বিচ্ছেদ এই সবই কেমন জানি কাব্যিকতায় ভরপুর থাকে। হয়ত তাই তারা কবি হয় কিংবা উল্টোটাও হতে পারে। তারা কবি বলেই তাদের সবকিছু কাব্যময়।

আহসান তার দরাজগলায় রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর বিখ্যাত কবিতা ‘বাতাসে লাশের গন্ধ পাওয়া যায়’ আবৃত্তি করছিল। কবিতাপ্রেমিক সকল শ্রোতা কেমন নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিল, পিনপতন নীরবতা আকাশ-বাতাসজুড়ে। নামকরা কবি এবং মেয়েদের প্রিয় আবৃত্তিকারকে প্রথমবার দেখার জন্য কোণায় বসা শিখা উঠে দাঁড়াল। ঐ মুহূর্তেই আহসান ওটা শেষ করে পড়া শুরু করল ‘দূরে আছো দূরে’। একই সময় শিখা আর আহসান চোখাচোখি হলো। কবি পুরো কবিতা আবৃত্তি করলেন শ্রোতার কাজলটানা চোখে চোখ রেখে। অপলক দৃষ্টিতে আর নির্ভাবনায়।
তোমাকে পারিনি ছুঁতে, তোমার তোমাকে-
উষ্ণ দেহ ছেনে ছেনে কুড়িয়েছি সুখ,
পরস্পর খুড়ে খুড়ে নিভৃতে খুঁজেছি।
তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারি নাই।
যেভাবে ঝিনুক খুলে মুক্ত খোঁজে লোকে
আমাকে খুলেই তুমি পেয়েছো অসুখ,
পেয়েছো কিনারাহীন আগুনের নদী।
শরীরের তীব্রতম গভীর উল্লাসে
তোমার চোখের ভাষা বিস্ময়ে পড়েছি-
তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারি নাই।
জীবনের ’পরে রাখা বিশ্বাসের হাত
কখন শিথিল হয়ে ঝরে গেছে পাতা।
কখন হৃদয় ফেলে হৃদপি- ছুঁয়ে
বোসে আছি উদাসীন আনন্দ মেলায়-
তোমাকে পারিনি ছুঁতে-আমার তোমাকে,
ক্ষাপাটে গ্রীবাজ যেন, নীল পটভূমি
তছ নছ কোরে গেছি শান্ত আকাশের।
অঝোর বৃষ্টিতে আমি ভিজিয়েছি হিয়া-
তোমার তোমাকে আমি ছুঁতে পারি নাই।।
শিখার শরীরে বিদ্যুৎ খেলা করে গেল। আশ্চর্য, শিখাও একইভাবে তাকিয়েছিল আহসানের দিকে। যেন দুজনই একই সাথে কবিতা আবৃত্তি করলো। দুই একজন উৎসুক জনতা ঘাড় ঘুরিয়ে শিখাকে দেখল। দুই একটা অল্পবয়স্ক ছেলে শিখাকে পিছন থেকে শিস দিল। শিখা আস্তে করে বসে পড়লো। পাশে বসা অচেনা একমেয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘আপু, আপনি চিনেন ওনাকে’? শিখা উত্তর দিল, ‘চিনি, যেমনটা আপনি চিনেন।’
আহসান পরের কবিতাটা আবৃত্তি করবে। সামনে রাখা ছোট টেবিলের উপর কবিতার খাতাটার পৃষ্ঠাগুলো এলোমেলো ভাবে উল্টাচ্ছে। কিন্তু চোখ দুটো শিখাকে খুঁজছে। শিখা বসে পড়াতে আহসান ওকে ঠিক খুঁজে পাচ্ছে না। আহসান আবার শুরু করলো।
এতো সহজেই ভালোবেসে ফেলি কেন!
বুঝি না আমার রক্তে কি আছে নেশা-
দেবদারু-চুলে উদাসী বাতাস মেখে
স্বপ্নের চোখে অনিদ্রা লিখি আমি,
কোন বেদনার বেনোজলে ভাসি সারাটি স্নিগ্ধ রাত?
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর অন্যতম একটা কবিতা ‘উল্টো ঘুড়ির’ বিখ্যাত সেই লাইনগুলো। শিখার ইচ্ছে হলো ও আবার উঠে দাঁড়ায়, ওর চোখে চোখ রাখে। আহসান আমিন কি করে পারে এত সুন্দর করে কবিতা আবৃত্তি করতে। একি আবৃত্তিকার নাকি স্বয়ং কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ!
আশপাশের মানুষের উৎসুক চোখ আর ফিসফিসানিতে শিখা অস্বস্তি বোধ করে। ও উঠে দাঁড়ায়। আহসানকে পিছনে ফেলে, জনতা সকলকে পাশ কাটিয়ে শিখা স্টেজের বাইরে রাস্তার মেইন সড়কের দিকে হাঁটতে থাকে। আহসানের গলাটা ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে।
সহজেই আমি ভালোবেসে ফেলি, সহজে ভুলি না কিছু-
না-বলা কথায় তন্ত্রে তনুতে পুড়ি,
যেন লাল ঘুড়ি একটু বাতাস পেয়ে
উড়াই নিজেকে আকাশের পাশাপাশি।
সহজে যদিও ভালোবেসে ফেলি
সহজে থাকি না কাছে...।
শিখা দাঁড়িয়ে পড়লো। কবিতার পরের লাইনটা শুনবে এই আশায়। কিন্তু না। কিছু শোনা যাচ্ছে না। কবিতার পিনপতন নীরবতা ভঙ্গ হয়েছে; এখন কেবল জনতার কথা শোনা যাচ্ছে। শিখা পিছন ফিরে তাকালো না। ভাবলো মাইকের কোনো সমস্যা হয়েছে হয়ত। যান্ত্রিক গোলযোগ। ও সড়কটা পার হলো। একটা রিকশার জন্য এদিক-ওদিক তাকালো। কোনো সিএনজিও নেই। রিকশার জন্য একটু অপেক্ষা করতে হবে।
-‘কি নাম মেয়ে তোমার?’
শিখা চমকে পিছন ফিরে তাকালো।
আহসান পৃথিবীর সুন্দর হাসিটা দিল। প্রেম নিবেদনের হাসি।
- ‘আমি আহসান। আহসান আমিন। ‘উল্টো ঘুড়িতো’ শেষ করতে দিলে না। গুরুর প্রতি অসম্মান হলো। সূরা যেমন মাঝপথে ছেড়ে দিতে হয় না। কবিতা আবৃত্তিও মাঝপথে ছেড়ে দিতে হয় না।’
এর পরের সব কিছু কবির কবিতা। পাঠকের প্রিয় সব লাইন। কবিতার মতো করে প্রেম। কবিতার মতো ছন্দ বিন্যাস। এবং শেষে এসে ছন্দবিহীন কিছু লাইন।


আহা! ভালোবাসার মাদকতা বুঝি এমনই মাতাল করা হয়। এর ঘ্রাণে অনন্তকাল বুঁদ হয়ে থাকা যায়। এতদিন কোথায় ছিল আহসান। এত পড়ে কেন ওকে খুঁজে পেল শিখা। শিখার খুব আফসোস হয় কতগুলো বছর কেটেছে আহসান ছাড়া। সবাই বলছিল, ‘শিখা বিয়ে করছো না কেন? সব কিছুর একটা সময় থাকে। তুমি এখন বিয়ের উপযুক্ত সময়ে। স্বর্ণযুগ পার করে ফেলছো। বিয়ে করাটা এখন জরুরি তোমার... ইত্যাদি ইত্যাদি।’ এসব কোনো কথাই কোনোদিন শিখাকে বিচলিত করতে পারেনি। শিখা শুধু চাকরিটা করে গেছে। আর বইপড়া। বহু গল্প, উপন্যাস, কবিতা। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা। আহসান আমিনের ভালোবাসার কবিতা। অপলক চোখে মুগ্ধ হয়ে পড়েছে ওর প্রেমের যত কবিতা। দুজনের পরিচয়ের পর শিখা ঠিক বুঝতে পারতো কোন কবিতাটা আহসান ওকে উদ্দেশ্য করে লিখে। শিখা সেই কবিতা বহুবার পরে। শত শতবার। আবৃত্তি করে শুনায় আহসানকে।
-আমার আবৃত্তিটা তোমার মতো করে হয়েছে?
-না।
-মিথ্যে বলছো।
-না।
-কোথায় ভুল হয়েছে?
-ভুল হয়নি কোথাও।
-তাহলে বললে যে তোমার মতো করে হয়নি।
-কারণ আমার থেকে অনেক বেশি ভালো হয়েছে।
শিখা লজ্জা পেয়ে যায়। ভীষণ লজ্জা। সুযোগটা হাতছাড়া করে না আহসান। কোলগাছা করে শিখাকে কোলে নেয়। শিখা ছোট শিশু হয়ে যায়। আবৃত্তির মতোই ওর আদরেও মাতাল হয়ে উঠে শিখা। আহসানের ঘামে শিখার সারা শরীর ভিজে যায়। সেই ঘামের ঘ্রাণে শিখা বুঁদ হয়ে থাকে সারা রাত।
খুব অনাড়ম্বর করে শিখা আর আহসানের বিয়ে হয়। শিখার মার ভীষণ আপত্তি ছিল। লেখকদের নাকি না খেয়ে মরতে হয়। এরা শুধু প্রেম করে বেড়ায়। যেই দেশে যায় সেই দেশেই বিয়ে করে। এদের ধর্মে বিশ্বাস নেই। এদেরকে নাস্তিক বলে। আরো কত কি! শিখা কান্নাকাটি করে হাতেপায়ে ধরে মা-বাবাকে রাজি করিয়েছিল।
আহসান সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে। বাবা-মার অবাধ্য। রুদ্র ভক্ত। মা চেয়েছিল ছেলে আর ছেলের বউ ঘরে রাখতে। শিখারও শখ ছিল শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে সংসার করার। বাঁধ দিল আহসান। ও আলাদা জগৎ বানাবে। নিজের মতো করে সবকিছু। তার জন্য কুড়েঘরও সই।
দুই রুমের ছোট একটি বাসায় টোনাটুনির সংসার। টানা ব্যালকনিতে রাতভর কবিতা আবৃত্তি। এক কবিতা বহুবার। এক লাইন বারবার। তারপর একে অপরের ঘামে সিক্ত হওয়া। ঘামের গন্ধে মাতালের মতো বুঁদ হয়ে থাকা।
বছর না ঘুরতেই ফুটফুটে নতুন অতিথি। আহসান ছেলেকে কোলে নিয়ে ডাক দিল ‘রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ।’ তারপর শিখাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল, ‘বুঝলে, ভাবছি নিজের নামটা পাল্টে ফেলব। নাম হবে আমার রুদ্র মুহম্মদ আহসানউল্লাহ।’

কোনোরকম হুট করে নয়। ধীরে ধীরেই টের পেল শিখা। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে নিয়ে আগ্রহ আর গবেষণার শেষ নেই আহসানের। কবি আসক্তি থাকবেই। কিন্তু আহসানের গুরুভক্তি স্বাভাবিক পর্যায়কে অতিক্রম করে ফেলছে। হুট করে আহসান মুখভর্তি দাড়িগোফ রাখা শুরু করলো। পুরোই রুদ্র স্টাইল। আহসানকে বেশ ভালো মানিয়েছিল। শিখার তাই কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। শিখা আতঙ্কিত হলো যেদিন রাতে আহসান ঘুমের ঘোরে শিখাকে ‘শিমুল’ বলে ডাক দিল। শিখা চমকে উঠলো। তার বেশ কিছুদিন আগেই আহসান শিখার কাছে গল্প করছিল কবির প্রেম নিয়ে। ‘সকাল’ দিয়ে শুরু আর ‘শিমুল’ দিয়ে শেষ। তসলিমা নাসরিনকে ‘সকাল’ বলে ডাকতেন কবি। শিমুল নামের এক মেয়ের প্রেমেও ডুব দিয়েছিলেন। মাঝে কোনো এক ভদ্রমহিলার সাথেও প্রেম ছিল কবির।
-শিখা, আমার গুরু ছিলেন ‘প্রেম আর দ্রোহের কবি’। উনি যেমন লিখতে পেরেছিলেন ‘বাতাসে লাশের গন্ধ পাওয়া যায়’ তেমনি লিখে গেছেন ‘আমার ভিতর বাহির অন্তরে অন্তর’। শেষেরটা ওনার সুইসাইড নোট ছিল। সবাই বলে। আমার বিশ্বাস হয় না।
-কেন নয়?
-উনি বাঁচতে চেয়েছিলেন। আরো কিছুদিন। সুন্দর কিছু দিন।
-তোমার এমন কেন মনে হলো?
-উনার শেষের দিকের আরো কিছু কবিতা পড়ে।
-হুম
-আমিও মনে হয় বেশিদিন বাঁচব না। গুরুর মতো ৩৪ কিংবা ৩৫ বয়সেই মারা যাব। কি করে থাকবে তখন? বলেই হাঁ হাঁ করে হেসে উঠে আহসান।
-ফাজলামোটা বেশি সিরিয়াস হয়ে গেল না?
-আরে না। আমি তো কেবল দুষ্টমি করছিলাম। সিরিয়াস কিছু না।
-এই রকম দুষ্টমি আমার ভীষণ অপছন্দ।
আহসানের মনের ভিতর ব্যাপারটা বেশ সিরিয়াস ছিল। ও নিজেকে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ভাবতে শুরু করলো। কবিকেও মনে-প্রাণে নিজের মধ্যে ধারণ করলো। ছোট্ট রুদ্র বড় হচ্ছে সেদিকে আহসানের কোনো খেয়াল নেই। ওর শুধু আজ ঢাকা ভার্সিটিতে রুদ্রমেলা, কাল বাংলা একাডেমিতে রুদ্র সমাবেশ, পরশু রুদ্র আলোচনাসভা। প্রতিবছর কবির জন্মবার্ষিকী ১৬ অক্টোবর আর মৃত্যুবার্ষিকী ২১ জুন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় আহসানের অনেক লেখা ছাপা হয়। কবির যত অজানা বিষয়বস্তু। তার কবিতা নিয়ে গবেষণাধর্মী লেখা ছাড়াও তার একাকিত্ব, প্রেম, বিয়ে, সংসার ইত্যাদি নিয়ে শত লাইন। আহসানের প্রতিটি কবিতার বই এই এক কবিকেই উৎসর্গ করা।
শিখা ওর সব কিছু টের পাচ্ছে। কিন্তু কিছু বলতে পারছে না। একরাতে আহসান মদ খেয়ে বাড়ি ফিরল। শিখার হাত টেনে ধরে ব্যালকনিতে নিয়ে গেল।
‘সকাল, একটি কবিতা লিখেছি। কোনো ভুল হলে শুধরে দিও।’
আমার ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে
আছো তুমি হৃদয় জুড়ে
ঢেকে রাখে যেমন কুসুম
পাপড়ির আবডালে ফসলের ঘুম
তেমনি তোমার নিবিড় চলা
মরমের মূল পথ ধরে
পুষে রাখে যেমন ঝিনুক
খোলসের আবরণে মুক্তোর সুখ
তেমনি তোমার গভীর ছোঁয়া
ভিতরের নীল বন্দরে
ভালো আছি, ভালো থেকো
আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখ
দিও তোমার মালাখানি
বাউল এর এই মনটা রে...।
আহসান একটানে পুরোটা শেষ করলো।
শিখা ভয় পেয়ে কেঁদে উঠলো। ‘আহসান, আমি সকাল না আমি শিখা। আর এই কবিতাটা তুমি লেখনি। এটা তোমার প্রিয় কবির লেখা।’
এরপর প্রতিদিন দেরি করে ঘরে ফেরা। কখনো সন্ধ্যা রাতে, কখনো মাঝ রাতে আবার কখনো ভোররাতে। সময় যখনই হোক আহসান এর মুখে মদের গন্ধ লেগেই থাকবে।
‘তুমি রাগ করো না। মাতাল না হলে রুদ্র হওয়া যায় না। ‘আমার ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে’ এই বিখ্যাত লাইন লেখা যায় না। তুমি দেখো একদিন আমি অনেক বিখ্যাত হবো। অন্য সবাই আমাকে দ্বিতীয় রুদ্র বলে ডাকবে। আমি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ হয়ে বেঁচে থাকতে চাই, শিখা।’
আহসান চলে গেল। সেভাবেই যেভাবে ও চেয়েছিল। সেই সময় যেই সময় একরকম নির্ধারিত ছিল। বয়স ৩৪। ঠিকানা দিয়ে গেল প্রযতে আকাশ।