বুধবার,২১ নভেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / ক্যারোলা
০৫/০১/২০১৬

ক্যারোলা

-

কোনো একঝড়ের রাতে আফ্রিকার উপকূলে একটা জাহাজডুবি হয়। জাহাজটি দু’ খন্ডে ভাগ হয়ে এক মিনিটের মধ্যেই সমুদ্রের অতলে তলিয়ে যায়। জাহাজের সমস্ত যাত্রী, নাবিক এবং খালাসিদের সলিলসমাধি হয়। তবে ভাগ্যক্রমে একজন নাবিক বেঁচে যায়। কেননা দুর্ঘটনার সময় সজোরে ধাক্কা খেয়ে সে অনেক দূরে ছিঁটকে গিয়েছিল। প্রচ- ঢেউয়ের ঝাঁপটায় সে প্রায় ডুবে যাচ্ছিল। আসলে নাবিক ভালো করে সাঁতার জানে না। আসন্ন মৃত্যুর ভয়ে সে শুধু ঈশ্বরের কাছে আকুল প্রার্থনা করেছিল এবং বারবার নিজের জীবনকে চিরবিদায় জানিয়েছিল। হঠাৎ ক্যারোলা নামের গাভীটির দিকে তার নজরে পড়ে। দেখামাত্রই সে আপ্রাণ কষ্ট করে সাঁতার কেটে গাভীর কাছে পৌঁছে।
ক্যারোলাকে আমস্টার্ডাম থেকে জাহাজে তোলা হয়েছিল।
উন্নত জাতের এই ক্যারোলা নামের গাভীটির গন্তব্য ছিল দক্ষিণ আমেরিকার কোনো এক দেশের এক খামারবাড়ি।
যুবক নাবিক দু’হাতে শক্ত করে গাভীর শিং ধরে রাখে। গাভী যেন নিজের ইচ্ছায় সাঁতার কাটতে পারে, সেই জন্য সে চুপ করে থাকে। পরদিন ভোরের আলোয় তারা একটা ক্ষুদ্র দ্বীপের বালুর ওপর এসে পৌঁছে। ক্যারোলা সেখানে নাবিককে শুইয়ে দেয় এবং জিহ্বা দিয়ে অনবরত নাবিকের সমস্ত মুখমন্ডল লেহন করতে থাকে। একসময় নাবিকের সম্বিত ফিরে আসে।
নাবিক যখন বুঝতে পারে যে, সে একটা অচেনা-অজানা নির্জন দ্বীপে বালুর ওপর একা পড়ে আছে, তখন আকুল কান্নায় তার চোখ বেয়ে অশ্রুর ঢল নেমে আসে।
‘হায়রে আমার পোড়া কপাল ! এই বিরান দ্বীপের আশপাশে জাহাজ চলাচলের মতো কোনো সমুদ্রপথ নেই। আমি আর কোনোদিনও মানুষের দেখা পাবো না।’
চিৎকার করতে করতে নাবিক বালির ওপর শুয়ে হাত-পা ছুঁড়তে থাকে এবং অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করে। সেই সময় তার পাশে ক্যারোলা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে বাদামি চোখে তাকিয়ে থাকে।
একসময় নাবিকের কান্না থেমে যায় এবং দু’চোখের নিচে জমে থাকা অশ্রুফোঁটা মুছে সে ওঠে দাঁড়ায়।
নাবিক চারপাশে ইতিউতি তাকিয়ে দেখে। পাথর এবং বৃক্ষ ছাড়া সেখানে আর কিছুই নেই। তার ভীষণ ক্ষুধা পেয়েছে। সে আদর মেশানো নরম গলায় গাভীটিকে কাছে ডাকে, ‘এদিকে এসো, ক্যারোলা।’
নাবিকের ডাক শুনে ক্যারোলা কাছে এসে সুবোধ ভঙ্গিতে দাঁড়ায়। নাবিক গাভীর দুগ্ধ দোহন করে। তারপর উষ্ণ এবং ফেনায়িত দুগ্ধ গোগ্রাসে পান করে। কিছুক্ষণের মধ্যে তার শরীরে সামান্য শক্তি ফিরে আসে। একসময় সে বিশাল সমুদ্রের দিকে ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
‘হায়রে আমার পোড়া কপাল!’ নাবিক তিরস্কার করে নিজেকে অভিসম্পাত দেয়। তবে মাঝেমধ্যে সে বিলাপ করে কাঁদতে পারতো, কিন্তু সেই মুহূর্তে তার সেরকম পরিস্থিতি ছিল না। কেননা উষ্ণ এবং ফেনায়িত গাভীর দুগ্ধ পান করার পর তার শরীরে খানিকটা শক্তি ফিরে এসেছে।
নাবিক রাতের বেলা ক্যারোলাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে। সারারাত তার দারুণ ঘুম হয়েছে, এমনকি সে ভালো এবং রীতিমতো চিত্তাকর্ষক স্বপ্ন দেখেছে। পরদিন সকালে যখন তার ঘুম ভাঙে, তখন সে দেখতে পেল যে, তার নাগালের মধ্যেই দুধের ভারে গাভীর ওলান ফুলে ঢোল হয়ে আছে।
এভাবে অনেকদিন চলে যায়। গাভীর সঙ্গে যুবক নাবিক ক্রমশ একধরনের সখ্য গড়ে তোলে।
‘এদিকে এসো, ক্যারোলা।’
বেচারি গাভী নাবিকের আদর মেশানো আহ্বান নতমুখে মেনে চলে।
ক্যারোলা কাছে এলে ওর শরীর থেকে নাবিক একটুকরো নরম মাংস কেটে নেয় এবং তাজা কাঁচা মাংস উষ্ণ থাকা অবস্থায় সে ভক্ষণ করে। খাওয়ার সময় তার থুতুনি বেয়ে রক্ত চুঁইয়ে পড়ে। নিরুপায় গাভী ব্যথায় একবারও হাম্বা করে কেঁদে ওঠেনি। বরং সে জিহ্বা দিয়ে ক্ষত স্থান চাটতে থাকে। একটা বিষয়ে নাবিক অত্যন্ত সতর্ক যে, সে কোনোমতেই গাভীর জীবনদায়ক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ স্পর্শ করবে না। সে যদি গাভীর একটা ফুসফুস কেটে নেয়, তারপরেও আরেকটা ফুসফুস থাকবে। একসময় সে ক্ষুদ্রান্ত্র ভক্ষণ করে, কিন্তু হৃদপি- নয়। এভাবে সে গাভীর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একের পর এক সাবাড় করে।
একসময় গাভীর চামড়া কেটে নাবিক নিজের জন্য পোশাক এবং জুতা তৈরি করে। এছাড়া রোদ-বৃষ্টি থেকে নিরাপদে থাকার জন্য চামড়া দিয়ে সে একটা তাঁবুও বানায়। এক পর্যায়ে গাভীর লেজ কেটে মাছি তাড়ানোর জন্য ছড়ি তৈরি করে।
ক্যারোলার শরীরের মাংসের পরিমাণ ক্রমশ নিঃশেষিত হতে থাকে। তাই নাবিক গাছের ডাল ভেঙে লাঙল বানায় এবং গাভী দিয়ে নরম ও উর্বর মাটিতে হালচাষ করে। পরবর্তীতে সে গাভীর গোবর সেই জমিতে সার হিসাবে ব্যবহার করে। যেহেতু পর্যাপ্ত পরিমাণে গোবর ছিল না, তাই সে গাভীর কয়েকটা হাঁড় গর্ত করে মাটির নিচে পুঁতে রাখে। পরে সে ক্ষয়ে যাওয়া হাঁড় জমিতে সার হিসেবে ছড়িয়ে দেয়।
আবাদের জন্য জমি তৈরি করে নাবিক কয়েকটি ভুট্টার দানা বপন করে, যা ক্যারোলার দাঁতের ফাঁকে আটকে ছিল। কয়েকদিনের মধ্যেই ভুট্টার বীজ অঙ্কুরিত হয় এবং তা দেখে নিরাশার মাঝে সে আশায় বুক বাঁধে।
একদিন নাবিক ভুট্টার পুডিং খেয়ে ঐতিহ্যবাহী ‘সেইন্ট জন্স’ দিবস পালন করে।
অতঃপর একসময় বসন্ত আসে। রাতের বেলা দূর থেকে একধরনের সুগন্ধি মাখানো হালকা বাতাস এসে নাবিকের মন উতলা করে তোলে।
বিশাল আকাশের দিকে তাকিয়ে নাবিক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। এক রাতে সে ক্যারোলার একটা চোখ তুলে নিয়ে সমুদ্রের নোনা পানির সঙ্গে গলধঃকরণ করে।
সেই থেকে নাবিকের দৃষ্টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা আগে তার কখনই ছিল না। তার বিশ্বাস, অমন স্পষ্ট দৃষ্টি সাধারণ মানুষের থাকার কথা নয়। একসময় তার মনের মধ্যে আকুল আকাক্সক্ষা জেগে ওঠে। সে গাভীর কাছে যায়। নাবিকের মনোতুষ্টির জন্য ক্যারোলা আগেভাগেই নিজেকে তৈরি করে রেখেছে।
এরই মাঝে আরও অনেকটা সময় কেটে গেছে। হঠাৎ একদিন নাবিক দূরে একটা জাহাজ দেখতে পায়। তাই দেখে সে মহাআনন্দে রীতিমতো আত্মহারা। জাহাজের নাবিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য সে কণ্ঠস্বর সপ্তমে তুলে চিৎকার করে ডাকতে থাকে। কিন্তু উল্টোদিক থেকে সে কোনো উত্তর পায় না। ক্রমশ জাহাজটি অনেক দূরে, দিগন্তের কাছাকাছি চলে যেতে থাকে। নাবিক চটজলদি ক্যারোলার একটা শিং এনে শিঙার মতো ভীষণ জোরে বাজায়। সেই বিকট শব্দ আকাশে-বাতাসে অনুরণিত হতে থাকে। তারপরেও জাহাজের কেউ তা শুনতে পায়নি।
অবশেষে নাবিক ভীষণ বেপোরোয়া হয়ে ওঠে। ইতিমধ্যে চতুর্দিকে রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে এবং জাহাজ আরোও দূরে সরে যাচ্ছে। অবশেষে উপায়ান্ত না দেখে নাবিক ক্যারোলাকে মাটিয়ে শোয়ায় এবং তার পেটের কাছে একটা জ্বলন্ত দেশলাইয়ের কাঠি নিক্ষেপ করে। ক্যারোলার পেটের কাছে সামান্য পরিমাণে মেদ জমা ছিল।
মুহূর্তেই গাভীর শরীরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তখনো ক্যারোলার একটা চোখ ছিল এবং সেই এক চোখে গাভীটি কালো ধোঁয়ার ফাঁক গলিয়ে নাবিকের দিকে পলকহীন তাকিয়ে থাকে। নাবিকের মনে হলো ক্যারোলার চোখের কোণে এক ফোঁটা অশ্রু চিকচিক করছে। কিন্তু আসলে সে-টা ছিল তার দেখার ভুল।
একসময় আগুনের লেলিহান শিখা অনেক ওপরে ওঠে এবং সেই আগুন জাহাজের নাবিকের দৃষ্টিগোচর হয়। পরবর্তীতে জাহাজ কাছাকাছি এলে ইঞ্জিন চালিত একটা ডিঙ্গি এসে তীরে ভিড়ে এবং নাবিককে উদ্ধার করে। ডিঙ্গি ছাড়ার মুহূর্তে হঠাৎ সে চিৎকার করে ওঠে, ‘একটু দাঁড়াও।’
যুবক নাবিক পুনরায় বিজন দ্বীপে ফিরে যায়। তারপর সে ভস্মস্তূপ থেকে এক মুঠো ছাই তুলে নিয়ে কোটের পকেটে রাখে।
‘বিদায়, ক্যারোলা।’ বিড়বিড় করে নাবিক বললো।
ডিঙ্গির লোকজন যুবক নাবিকের দিকে আড়চোখে তাকায়। ‘ভয়ংকর,’ তাদের মধ্যে একজন মন্তব্যের সুরে বললো।
শেষপর্যন্ত নাবিক মাতৃভূমিতে ফিরে আসে। সে নাবিকের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে খামারের মালিক হয়ে রাতারাতি একজন সম্মানিত এবং বড়লোক হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে। তার সেই খামারে সে দুগ্ধজাত প্রক্রিয়ার কারখানা স্থাপন করেছে এবং সেখানে কয়েকশ’ গাভী আছে।
কিন্তু এত বিত্ত-বৈভব থাকার পরেও নাবিক একাকিত্ব এবং অসুখী জীবনযাপন করছিল। তার বয়স চল্লিশ বছর হওয়া পর্যন্ত প্রতিরাতে বিভিন্ন দুঃস্বপ্ন তাকে তাড়া করে বেড়াতো। যাহোক, চল্লিশ বছর পূর্ণ হলে সে পুনরায় জাহাজে চড়ে ইউরোপ ভ্রমণে বেরোয়।
জাহাজে দীর্ঘ যাত্রার সময় একরাতে নাবিক কিছুতেই ঘুমোতে পারছিল না। একসময় সে সুন্দর পরিপাটি বিছানা ছেড়ে উপরতলার ঝুলবারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। সেখানে অমল-ধবল জোসনা এসে রীতিমতো লুটোপুটি খাচ্ছিল। সে সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করে এবং বারান্দার লোহার গরাদে হেলান দিয়ে সমুদ্রের দিকে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
হঠাৎ নাবিক আগ্রহী হয়ে ঘাড় কাত করে এবং সামনের দিকে মাথা বাড়ায়। অস্পষ্ট আলোয় সে অনেক দূরে একটা ছোট্ট দ্বীপ দেখতে পায়।
‘এই যে !’ পাশে দাঁড়িয়ে কে যেন বললো।
সঙ্গে সঙ্গে নাবিক মাথা ঘুরিয়ে তাকায়। মেয়েটি অপ্সরী, মাথায় সোনালী চুল, বাদামি চোখ এবং ঈর্ষণীয় বুক।
‘আমার নাম ক্যারোলা,’ মেয়েটি বললো।

লেখক পরিচিতি : ব্রাজিলের আধুনিক কথাসাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক মোয়াসার স্কিলিয়ার পোর্তো আলেগ্রে শহরের বৃদ্ধ ইহুদীদের হাসপাতালে চাকরি করেছেন এবং পরবর্তীতে যক্ষ্মা প্রতিরোধ ও চিকিৎসা কেন্দ্রে কর্মরত ছিলেন। ১৯৮১ সালে তার অন্যতম সফল উপন্যাস ‘ম্যাক্স অ্যান্ড দ্য ক্যাটস্’-এর ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশের পরপরই আন্তর্জাতিক সাহিত্য মহলে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে। বলা হয়, এই উপন্যাসের কাহিনির ছায়া অবলম্বনে কানাডীয় লেখক ইয়ান মার্টেল ‘লাইফ অফ পাই’ উপন্যাস রচনা করেন। পর্তুগীজ ভাষায় তিনি একশ’ বিশের অধিক ছোটগল্প রচনা করেন। এসব লেখায় তিনি অত্যন্ত দক্ষ হাতে যাদু-বাস্তবতার সঙ্গে হাস্যরস এবং কৌতুকের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। তিনি ২০১১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।
‘ক্যারোলা’ গল্পটি মোয়াসার স্কিলিয়ারের ইংরেজিতে অনূদিত ‘দ্য কাউ’ গল্পের অনুবাদ। পর্তুগীজ ভাষা থেকে গল্পটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন ইলোয়া গিয়াকোমেলি। গল্পটি ‘দ্য কালেক্টেড স্টোরিজ অফ মোয়াসার স্কিলিয়া’ সংকলন থেকে নেওয়া হয়েছে।



মূল : মোয়াসার স্কিলিয়ার
অনুবাদ : ফজল হাসান