বুধবার,১৪ নভেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / বাঙালি মেয়ের ভাবনামূলক গদ্য
০৫/০১/২০১৬

বাঙালি মেয়ের ভাবনামূলক গদ্য

- মোজাফ্ফর হোসেন

সুতপা ভট্টাচার্য সম্পাদিত ‘বাঙালি মেয়ের ভাবনামূলক গদ্য’ গ্রন্থটি বাঙালি চিন্তাশীল নারীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করার জন্যে খুবই উল্লেখযোগ্য। এই গ্রন্থে মোট ৩৩ জন লেখকের লেখা প্রবন্ধ ও প্রত্র স্থান পেয়েছে। সকলের জন্ম উনিশ শতকে। লিখেছেন উনিশ শতকের শেষ অংশ থেকে বিশ শতকের শুরুর দিকটায়। বাঙালি জীবনে নারীর ঐতিহাসিক অবস্থান কেমন ছিল সেটি জানার জন্যে বাংলা সাহিত্যের উন্মেষকালে যে সকল নারী ভাবনামূলক গদ্য লিখেছেন, তাদের পাঠ অনিবার্য। অনিবার্য এই কারণে যে, এই সকল নারী তাদের লেখার প্রধানতম বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন তাদের দৃষ্টিতে দেখা এবং অভিজ্ঞতায় পাওয়া সমাজ বাস্তবতাকে। চিপিউয়া এলডালের একটা কথা এক্ষেত্রে পাসঙ্গিক বিবেচনায় তুলে ধরছি। তিনি বলেছেন When other people tell your story, it always comes out crooked. আমি মনে করি, এই কথাটি সাবল্টার্ন স্টাডিরও মূলকথা। কেননা এখানে ইতিহাসকে এলিট বা শোসক শ্রেণির প্রভাব থেকে উদ্ধার করার কথা বলা হচ্ছে। এটা তো ঠিক যে, পৃথিবীতে জ্ঞানচর্চার যে একটা ধারা তৈরি হয়েছে সেটিতে বরাবরই নারীরা সাবল্টার্ন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। থরু, নিরাঞ্জনা, স্পিভাক ও আলীর মতো উপমহাদেশীয় সাবল্টার্ন স্টাডিজের নারীবাদী সমালোচকরা নারীদের ইতিহাসের অচিহ্নিত কণ্ঠস্বর হিসেবে চিহ্নিত করছেন।
কথাগুলো এই জন্যে বলছি যে, এই বইটির পড়ার সময় অনেক গদ্য পড়ে মনে হয়েছে, এমন সরল সত্যভাবে বাঙালি নারীর বিবর্তনবাদের ইতিহাস বুঝি আর কেউ বলতে পারেননি। অথচ আমাদের এখানে নারীর সমাজ বাস্তবতার যে ঐতিহাসিক পাঠ সেখানে এই নারীদের লেখাগুলো মোটেও পঠিত হয় না। আমরা পুরুষ গবেষকদের দৃষ্টিতে নারীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নির্ণয় করার চেষ্টা করি। দৃষ্টিভঙ্গি একটা বড় ফ্যাক্টর। যেটা স্বীকার করে নারী ইস্যুতে ‘পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বাস করি না’ বলে একরকম ঘোষণাই দিয়েছেন নারীবাদী কানাডীয় কথাসাহিত্যিক মার্গারেট অ্যাটউড।
রাসসুন্দরীর আত্মজীবনী পড়ে জানতে পারি, উনিশ শতকে নারীদের জন্য শিক্ষা একরকমের নিষিদ্ধ ছিল। এরই ফাঁককোঁকর দিয়ে কিছু নারী অতি আগ্রহে অক্ষরজ্ঞানটুকু অর্জন করতে পেরেছেন। উনিশ শতকের শুরুতে নারীরা এখনকার মতো গদ্য লিখতেন না। তারা বিভিন্ন সাময়িকীতে পত্রাকারে নিজের একান্ত অনুভূতির কথা লিখতেন। তাও অবশ্য সব কাগজে লিখতে পারতেন না। হিন্দু ‘ভদ্রজন’ দ্বারা সম্পাদিত কাগজে নারীরা লিখতে পারতেন না। ‘সমাচার-দর্পণ’-এ লিখতে পারতেন কারণ সেটি ছিল মিশনারিদের দ্বারা পরিচালিত। আর লিখতে পারতেন ‘সম্বাদ-কৌমুদী’তে, কারণ সেটির পেছনে ছিলেন রামমোহন রায়ের মতো প্রগ্রেসিভ ভারতীয়। ‘জ্ঞানান্বেষণ’ পত্রিকায়ও লিখতে পারতেন। কয়েকটি লেখা (পত্র) প্রকাশিত হয়েছে সোমপ্রকাশেও।
তবে সেসময় নারীদের লেখার আরেক যন্ত্রণা ছিল, স্বনামে তারা লিখতে পারতেন না। নানা ছদ্মনামে লিখতেন। যে কারণে এখনো অনেক লেখার প্রকৃত লেখকের নাম বা পরিচয় পাওয়া যায় নি।
এই বইতে নারীর অধিকার ও নারীজীবনের ট্রাজেডি নিয়ে বামাসুন্দরী, মনোমোহিনী দাসী, মায়াসুন্দরী, রাসসুন্দরী দেবী, শরৎকুমারী, স্বর্ণকুমারী দেবী, স্বর্ণময়ী গুপাসহ আরো কয়েকজনের গদ্য (পত্রে) স্থান পেয়েছে।
সামাজিক নানা প্রসঙ্গ, যেমন- বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ, বিধবা বিবাহ, ধর্মীয় অনুশাসনের বেড়াজালে নারীজীবন এসব নিয়ে লিখেছেন শ্রীমতী অমুকী দেবী, শ্রীমতী সারদা, লক্ষ্মীমণী, প্রমীলাসুন্দরীসহ আরো কয়েকজনে।
নারী শিক্ষা বা স্ত্রীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সৌদামিনী দেব্যা, কৃষ্ণভাবিনী দাস, নিরুপমা দেবী, কামিনী রায়, অনুরূপা দেবীসহ আরো কয়েকজনের লেখা আছে।
সাহিত্যাংশে স্থান পেয়েছে প্রসন্নময়ী দেবী, অনামা, হিরণবালা গুপ্তাসহ কয়েকজনের লেখা। এই অংশে ব্রাউনিংয়ের ‘মাই লাস্ট ডাচেস’ কবিতার অতি চমৎকার আলোচনা করেছেন সরলা দেবী। তার বাংলা খুবই সমৃদ্ধ। ননীবালা গুপ্তা লিখেছেন ‘নভেল- কেন পড়ি’ গদ্যটি। এটি প্রথম চৌধুরীর সবুজ পত্রে প্রকাশিত হয়। লেখক উপন্যাসের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট থেকে গদ্যটি লিখেছেন। আজও লেখাটি পাঠকদের ভাবিয়ে তুলতে সক্ষম।
এমনি করে, সেই সময়ের নারী লেখকদের বিজ্ঞান-ব্যক্তিত্ব, দেশ-কাল-জাতিচেতনা, মূল্যবোধ প্রভৃতি বিষয়ভিত্তিক লেখা এই বইটিকে ঋদ্ধ করে তুলেছে। যারা নারীর দৃষ্টি নারীকে তথা সমগ্র সমাজ বাস্তবতাকে দেখতে চান, তাদের জন্যে একমলাটের ভেতর এতগুলো গদ্য প্রাপ্তি নিশ্চয় সুখকর অভিজ্ঞতা হবে। বোনাস প্রাপ্তি হল, বইটির ভূমিকা। সম্পাদক সুতপা ভট্টাচার্য পেশায় অধ্যাপক। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়ান। তিনি বইটির চমৎকার একটি ভূমিকা লেখার পাশাপাশি গদ্যগুলোকে সুনিপুণভাবে বিন্যস্ত করেছেন।

সংকলন ও সম্পাদনা :
সুতপা ভট্টাচার্য


প্রকাশক : সাহিত্য আকাডেমি, পশ্চিমবাংলা
পৃষ্ঠা: ২৮৮
দাম : ৯০ রুপি, বাংলাদেশে ১৮০টাকা।