শুক্রবার,২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / রং-তুলিতে দেশজ-শিল্পের পুনর্বয়ন
০৫/০১/২০১৬

রং-তুলিতে দেশজ-শিল্পের পুনর্বয়ন

- মোজাফ্ফর হোসেন

দেশজ-শিল্পের পুনর্বয়ন নিয়ে রাজধানীর ধানমন্ডির আলিয়ঁস ফ্রঁসেসের জুম গ্যালারিতে হয়ে গেল ‘বৈশাখ এবং দেশজ-শিল্পের পুনর্বয়ন’ শীর্ষক সামিনা নাফিজের একক চিত্রপ্রদর্শনী। প্রদর্শনীটির উদ্বোধন হয় ১২ এপ্রিল। চলে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত। এখানে ঠাঁই পেয়েছে শিল্পীর সম্প্রতি আঁকা ২৩টি ছবি।
ছবিগুলোর মধ্যে ২১টি ছবি তেলরং-মাধ্যমে এবং দুটি ছবি মিশ্র-মাধ্যমে আঁকা হয়েছে। সবগুলো ছবিতে শিল্পী আশ্রয় নিয়েছেন দেশজ শিল্পভাষার। সেই ধারার সঙ্গে ক্যানভাসে ব্যবহার করেছেন উজ্জ্বল রংয়ের ছায়া-খেলা।

সামিনা মূলত ‘শিল্পের শিল্পী’ (Artist of Art) কারণ তার শিল্পের প্রধানতম অনুষঙ্গ হলো বাংলার লোকজশিল্প। লোকজশিল্পের নানা উপকরণ তিনি তার ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলেন। বাংলাদেশের লোকজশিল্পী বাঁচানোর জন্যে নানাজন নানাভাবে কাজ করছেন। চিত্রশিল্পী সামিনা তার রং-তুলি-ইজেল নিয়ে এই অ্যাক্টিভিজমে অংশ নিয়েছেন। যে কারণে তার আঁকা ছবিগুলোতে ফুটে উঠেছে রঙিন পাখা, শোলার বাঘ, পাখি, ফুল, মাটির পুতুল, শখের হাঁড়িসহ বাংলার নানা লোকজ উপাদান।

বাংলাদেশের লোকজশিল্প-মৃৎশিল্প-কারুশিল্প এখন মৃতপ্রায়। বাণিজ্যিক ক্ষেত্র না তৈরি হওয়ায় নতুন করে এই শিল্পক্ষেত্রে কেউ আসছে না। এখন যারা কাজ করছেন তারাই এই শিল্পের শেষ প্রজন্ম হিসেবে চিহ্নিত করা চলে। দেশজ শিল্পের মার্কেট তৈরি না হওয়ার অন্যতম কারণ খুব স্বল্পমূল্যে চীনা পণ্যে বাজার ভরে যাওয়া। আগে যেখানে শিশুদের খেলনা-সামগ্রীর জন্যে আমাদের নিজস্ব দেশজ-শিল্পের বিকল্প ছিল না, সেখানে এখন খুব কমমূল্যে আধুনিক প্রযুক্তি-সংবলিত শিশুদের খেলনা রপ্তানি করা হচ্ছে চীন থেকে। শিশুরা রঙচঙা, শব্দযুক্ত এসব খেলনায় আকৃষ্ট হচ্ছে বেশি। খেলনার বাইরে যে-সকল নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস তৈরি করত লোকশিল্পীরা, তারও কদর পড়ে গেছে। গ্রামে-গঞ্জে ৪০০ থেকে ১ হাজার টাকায় চার্জার ফ্যান পাওয়া যাচ্ছে, ফলে কেউ আর হাত-পাখা কিনছে না। যারা হাত-পাখা শিল্পের সঙ্গে জড়িত তারা অন্যপেশায় যেতে বাধ্য হচ্ছে। ডিজিটাল প্রিন্ট এসে কারুশিল্পীদের অবস্থাও শোচনীয় হয়ে উঠেছে। কারুশিল্পী মৌলুদা বেগমের বাসায় গিয়ে আমি দেখেছি, কয়েকশ প্রতিকৃতি বাঁধানো অবস্থায় নষ্ট হচ্ছে, তিনি ক্রেতা পাচ্ছেন না। তিনি আগে কয়েকশ ছেলে-মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিতেন, এখন আর কেউ যায় না। এই বাস্তবতা এখন দেশজ-শিল্পের প্রতিটা ক্ষেত্রেই।

দেশজ-শিল্পের প্রধান বাজার ছিল গ্রামীণ মেলাগুলো। বছরের বিভিন্ন সময়ে গ্রামে গ্রামে মেলা বসত, এখন সেই গ্রামীণ মেলার ঐতিহ্য উঠে গেছে, সেখানে এখন বাণিজ্যিক মেলা হচ্ছে ঠাঁটওয়ালা দেশি-বিদেশি পণ্য নিয়ে। এভাবেই প্রাতিষ্ঠানিক বাণিজ্যের কাছে মার খাচ্ছে ব্যক্তিনির্ভর দেশজ শিল্প। আড়ং-যাত্রার মতো যে গুটিকতক দেশি প্রতিষ্ঠান দেশজ-শিল্প নিয়ে বাণিজ্য করে তাদের প্রসার রাজধানীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। গুটিকতক মানুষ শখে সেসব পণ্য কেনে। জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের সভাপতি ও টাঙাইল শাড়ি কুটিরের কর্ণধার মনিরা এমদাদ ও কারুশিল্প পরিষদের নির্বাহী সদস্য কারুশিল্পী রুবি গজনবীর সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, তারা বলেছেন, গুটিকতক মানুষের সখ দিয়ে দেশের এত বড় শিল্পক্ষেত্র টিকিয়ে রাখা যাবে না। এ ব্যাপারে দেশের সমগ্র জনতাকে সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে।

সেই পথেই হেঁটেছেন চিত্রশিল্পী সামিনা। তিনি দেশজ-শিল্প বাঁচানোর আন্দোলন হিসেবে তুলে নিয়েছেন রং-তুলি। তিনি তার শৈশবে দেখা গ্রামীণ ঐতিহ্যকে ফুটিয়ে তুলছেন ক্যানভাসে।

শিল্পী সামিনা নাফিজের জন্ম ১৯৬১ সালের ১৩ জুন। তার শিল্প শিক্ষার শুরু চট্টগ্রাম চারুকলা কলেজ থেকে। পরবর্তী সময়ে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে এমএফএ (চিত্রকলা) উত্তীর্ণ হন ১৯৮৬ সালে। তিনি অনেক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থ ‘চিত্রকলায় স্যুরিয়ালিজম’ ও ‘ছবি আঁকি আর পড়ি’। তিনি কয়েকটি শিশুতোষ বই অলংকরণ করেছেন।