শুক্রবার,২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / নারীর বিরহগাথার অনুপম শিল্পভাষ্য
০৫/০১/২০১৬

নারীর বিরহগাথার অনুপম শিল্পভাষ্য

- আবু সাঈদ তুলু

নাটকটির বিভিন্ন চরিত্রেঅভিনয় করেছেন
সেলিম মাহবুব, চন্দন রেজা, প্রশান্ত হালদার, রিয়াজ হোসেন, ফেরদৌস আমিন বিপ্লব, সাইফ সুমন, কামরুজ্জামান মিল্লাত, ফৌজিয়া করিম অনু, আনিকা মাহিন, দীপ্তা, হাসনাত প্রদীপ, সুজন, শাপলা ও লেলিন।

সম্প্রতি ভারতের দিল্লি ও রাজস্থানে প্রদর্শন করে এলো থিয়েটার আর্ট ইউনিট নাট্যদলের ‘আমিনা সুন্দরী’ নাটক। এক নারীর বিরহগাথা অনবদ্য শিল্পভাষ্যে রূপান্তরিত হয়েছে নাটকে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী জীবনের প্রেম-বঞ্চনার চিত্র এক অপরূপ নাট্যভাষ্যে উদ্ভাসিত এ নাটক। এস এম সোলায়মান রচিত এ নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন রোকেয়া রফিক বেবী।

বাঙালি সমাজে বহমান ‘নছর মালুম’ ও ‘ভেলুয়া সুন্দরী’ উপাখ্যানে আশ্রয় করে নতুন এক গল্প ‘আমিনা সুন্দরী’। বাঙালি নারীর চিরন্তন প্রেমের স্বরূপ এতে প্রস্ফুটিত। পুরুষ শাসিত সমাজে নারীর প্রতি পুরুষের প্রবঞ্চনার অধূনা দৃষ্টিভঙ্গি এতে বিধৃত। নাটকের গল্প শুরু হয়- ‘আমিনা’র অপেক্ষার মধ্য দিয়ে। আমিনার ভালোবাসার মানুষ নছর বর্মামুল্লকে গিয়েছে বাণিজ্যে। কিন্তু পুরুষশাসিত সমাজে নারীর মন-মানসিকতা, চাওয়া-পাওয়ার কোনো মূল্যই নেই। একের পর এক সমাজের নানা কুচক্রী নানা সমস্যার বিস্তার ঘটাতে থাকে। কিন্তু আমিনা মন-প্রাণ সঁপে নছরের জন্যই প্রতীক্ষা করতে থাকে। একসময় আমিনার পরিবার সমাজের নানা ঘাত-প্রতিঘাতের কাছে হার মানে। অথচ আমিনার আদ্যোপ্রান্ত অপেক্ষাই নছরকে ঘিরে। নিজের সম্মান ও অর্থলোভে নিজের মা কৌশলে আমিনাকে অন্যত্র বিয়ে দিতে চায়। বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে রক্ষা পেলেও শেষ পর্যন্ত আমিনাকে পরাস্ত হয় পুরুষ শাসিত সমাজের কৌশলের কাছে। পলায়নরত আমিনা ধৃত হয় ভোলোা সওদাগরের কাছে। ভোলো সওদাগরকে নানা কৌশলে অবদমিত করেও নছরের জন্যই প্রতীক্ষার প্রহর গুণতে থাকে আমিনা। অপর দিকে নছর বর্মামুল্লুকে এক সওদারের সুন্দরী কন্যাকে মিথ্যা কৌশলে বিয়ে করে সুখে দিনাতিপাত করতে থাকে। নছর যেমন প্রতারণা করেছে ঠিক তেমনি তাকেও প্রতারিত হতে হয় একসময়। নছর ভুল বুঝতে পেওে আমিনার জন্য পাগল হয়ে যায়। নছর আমিনা সুন্দরীর সন্ধান পেলে আমিনা ভোলোর কাছে বন্দি। বিচারের কৌশলে আমিনা রক্ষা পায় বটে কিন্তু পরক্ষণেই পুরুষ বিচারণের চক্রান্তের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। নানা ভাবে আমিনা উদ্ধার হয়। নজর ও আমিনার মিলনের মুহূর্ত ঘনিয়ে আসে। নজরের কৌতূহল ও সন্দেহ জাগে। ১২ বছরের বিরহে আমিনা কী তার সতিত্ব ধরে রেখেছে! আমিনা মর্মাহত হন। স্বাধীকার মূর্তি জেগে উঠে। ১২ বছরের বিরহ আমিনা কষ্টে কাটিয়েছে তার খবর না নিয়ে সতিত্ব নিয়ে প্রশ্ন্। পুরুষের কী এতই নিচু মানসিকতা। আত্মমর্যাদায় আঘাত হানে। পুরুষ প্রেম ভালোবাসার প্রতি ঘৃণার বিষ তীব্র হয়ে ওঠে আমিনার। আত্মহননের মধ্যদিয়ে পুরুষতান্ত্রিকতায় নারী-যন্ত্রণা থেকে মুক্তি খুঁজে। এভাবেই কাহিনি পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়।

প্রসেনিয়াম মঞ্চে আবহমান বাংলা নাট্য আঙ্গিকে উপস্থাপিত হয়েছে। বন্দনার মধ্য দিয়ে নাটকটি শুরু হয়। বর্ণনা, নাচ, গান ও উক্তি-প্রত্যুক্তির মধ্য দিয়ে নাট্যটির প্রবহ। আমিনা চরিত্রে বিভিন্ন জন অভিনয় করেছেন। উড়না পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আমিনার চরিত্রে অভিনেত্রীর পরিবর্তন ঘটেছে। সেট হিসেবে একটি সাম্পানের সাজেশন রাখা ছিল। সাম্পান ভেঙে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দৃশ্য তৈরি করেছে। অসাধারণ শিল্পবোধের পরিচয় পাওয়া গেছে নাটকটিতে। সংগীতগুলো অসাধারণ। সাত্ত্বিক অভিনয় দেখে সত্যিই বিস্ময় জাগে। অসাধারণ প্রাণবন্ত ও মেধাদীপ্ত অভিনয়। স্বরের বৈচিত্র্য ও বাচিক প্রক্ষেপণও অসাধারণ। নাটকের দ্বন্দ্বগুলো অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। চরিত্রায়নগুলো খুবই সূক্ষাতিসূক্ষè। প্রায় সবারই অভিনয়ই অসাধারণ, শৈল্পিক ও উপভোগ্য। রঙের ব্যবহারও আনন্দের দোলা দেয়। সুখদর্শন ও পরিমিতিবোধ সম্পন্ন অত্যন্ত শৈল্পিক প্রযোজনা। আমরা নাটকটির উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।