মঙ্গলবার,১৩ নভেম্বর ২০১৮
হোম / খাবার-দাবার / বাহারি বাকরখানী
০৫/০১/২০১৬

বাহারি বাকরখানী

-

ইতিহাস আর ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক পুরান ঢাকা। পুরান ঢাকা মানেই জিভে জল আসা সব খাবার-দাবার। আর সেই খাবারের তালিকায় প্রথমেই থাকবে বাকরখানীর নাম। কিন্তু এই বাকর সৃষ্টির ইতিহাস মোটেই সুখপ্রদ নয়।

জনশ্রুতি আছে, জমিদার আগা বাকের তথা আগা বাকির খাঁর নামে এই রুটির নামকরণ করা হয় বাকরখানী। নবাব মুর্শিদ কুলী খাঁর দত্তক ছেলে ছিলেন আগা বাকের। তৎকালীন রাজধানী মুর্শিদাবাদের নর্তকী খনি বেগম এবং আগা বাকের পরস্পরের প্রেমে পড়েন। অপরদিকে উজিরপুত্র নগর কোতোয়াল জয়নাল খানও খনি বেগমকে প্রেম নিবেদন করেন এবং প্রত্যাখ্যাত হন। প্রত্যাখ্যাত হবার পর জয়নাল খনি বেগমের ক্ষতির চেষ্টা করে। খবর পেয়ে আগা বাকের সেখানে যান ও তলোয়ারবাজিতে জয়নালকে হারিয়ে দেন। অন্যদিকে জয়নালের দুই বন্ধু উজিরকে মিথ্যা খবর দেয় যে, বাকের জয়নালকে হত্যা করে তার লাশ গুম করেছে। স্বাভাবতই উজির তার ছেলের হত্যার বিচার চায়। এতে শাস্তিস্বরূপ নবাব মুর্শিদ কুলী খাঁ পুত্র বাকেরকে বাঘের খাঁচায় নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু বাকেরের হাতে মারা যায় বাঘ। ইতিমধ্যে জয়নালের মৃত্যুর খবর যে মিথ্যা তা ফাঁস হয়ে যায় ও সে জোরপূর্বক খনি বেগমকে ধরে নিয়ে যায় দক্ষিণ বঙ্গে। বাকের ছুটে যান খনি বেগমকে উদ্ধার করতে আর তার পিছু নেন উজির জাহান্দার খান। উজির ছেলে জয়নাল খান বাকেরকে হত্যার চেষ্টা করলে উজির নিজেই তার ছেলেকে হত্যা করেন তলোয়ারের আঘাতে। এই অবস্থায় জয়নাল খনি বেগমকে তলোয়ারের আঘাতে হত্যা করেন। বাকেরগঞ্জে সমাধিস্থ করা হয় খনি বেগমকে। আর বাকের সবকিছু ত্যাগ করে রয়ে যান প্রিয়তমার সমাধির কাছে দক্ষিণ বঙ্গে। বাকের খাঁর নামানুসারেই বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ (পটুয়াখালী-বরিশাল) অঞ্চলের নাম হয় বাকেরগঞ্জ। বাকরখানী রুটির নামের পেছনেও রয়েছে বাকের-খনির প্রেমের ইতিহাস। তার আবিষ্কৃত এবং প্রিয় খাদ্য বিশেষভাবে তৈরি রুটির নাম তার প্রেমকাহিনির উপর ভিত্তি করেই হয়েছিল বাকের-খনি রুটি। পরবর্তীতে এই নাম কিছুটা অপভ্রংশ হয়ে বাকরখানী নাম ধারণ করে। জনশ্রুতি মেনে নিলে ধরে নিতে হয়, বাখরখানীর সৃষ্টি আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে।

আগে এই বাকরখানি মূলত দুই ধরনের রুটি ছিল- খাস্তা (নরম) আর নিমসুকা। নিমসুকা রুটিকে কেউ কেউ পাপড়ি বলত, যা ছিল পাতলা, হালকা ও মুচমুচে। ঐসময় সম্ভ্রান্ত পরিবারে বাদামতেলের বদলে ঘি দিয়ে তৈরি হতো বাকরখানি। কোরবানির মাংস দিয়ে বানানো বাকরখানিও ছিল জনপ্রিয়। আরও ছিল চারিদিকে কান্নি কাটা পনীর দেয়া বাকরখানী। এখনকার মতো চিনি দেয়া বাকরখানী তখন ছিল না একেবারেই। এটির প্রচলন হয় অনেক পরে।

প্লেইন বাকরখানী বানানোর মূল উপকরণ ময়দা/আটা, তেল ও লবন। এছাড়া এতে উপরিভাগে পনীর দিয়ে পনীর বাকরখানী ও চিনি দিয়ে মিষ্টি বাকরখানী বানানো হয়। বাকরখানী বানাতে ব্যবহৃত হয় কয়লার গোল মাটির চুল্লি যেটির দেয়ালে হালকা পানি দিয়ে লাগিয়ে দেয়া হয় গোল নরম বাকরখানী।

একসময় সময় আদি ঢাকাইয়ারা বিয়ের পরে বাবার বাড়িতে কনে আনতে যাবার সময় নিয়ে যেত বাকরখানী যা চিনির শিরা, দুধ, গোলাপ জল ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক উপকরণে ডুবিয়ে ভিজিয়ে রাখা হতো। এই রীতি কালক্রমে হারিয়ে যায়। পুরান ঢাকার আদি বাসিন্দারা তাদের দৈনন্দিন খাবারের তালিকাতে রাখেন বাকরখানী যা খাওয়া হয়ে থাকে মিষ্টি, ঝাল মাংস, ফিরনি আর দুধ চায়ের সাথে।

পুরান ঢাকার বাকরখানীর স্বাদ ও মান দুটোই তুলনাহীন। পুরান ঢাকার অলি-গলিতে দীর্ঘদিনের বাকরখানীর দোকানগুলো ঢাকার ঐতিহ্যের কথাই বলে দেয়। তাই দেখা যায় লালবাগের হরনাথ ঘোষ রোড, নাজিমুদ্দিন রোড, কলতাবাজার বড় মসজিদসংলগ্ন, গেন্ডারিয়ার লোহারপুল, নাজিরাবাজার চৌরাস্তা, কসাইটুলি, আবুল হাসনাত রোড, নারিন্দা ইত্যাদি জায়গাতে রয়েছে বাকরখানীর দোকান। আদি ঢাকার ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক পুরান ঢাকার মানুষেরা এখনো ছুটে যান এসব দোকানে তাদের পছন্দের গরম গরম বাকরখানী আনতে যা তারা বংশানুক্রমে করে আসছে শত শত বছর ধরে।

ছবি ও লেখা: মোহাম্মদ ওয়াসিম, ক্রিয়েটর ফেইসবুক পেইজ: পুরান ঢাকার খাবার; এডমিন: আপনার রান্নাঘর। কৃতজ্ঞতা: মোহাম্মদ আজিম বখস, চেয়ারম্যান, ঢাকা কেন্দ্র।