রবিবার,২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭
হোম / সম্পাদকীয় / রেকর্ড ভাঙার খেলা
০৫/০১/২০১৬

রেকর্ড ভাঙার খেলা

-

কালিদাস নাকি মহাবোকা ছিলেন। এমন একটি ডাল তিনি কাটছিলেন, যার ওপর স্বয়ং বসে ছিলেন তিনি। আধুনিক সভ্যতা সৃষ্টি করতে গিয়ে আমরাও যেন সবাই কালিদাস হয়ে যাচ্ছি। সভ্যতার নামে পৃথিবীর উষ্ণায়ন এমন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছি, যা মানুষের অস্তিত্বকেই ধ্বংসের মুখে নিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং মাত্রই কিছুদিন আগে এ-ব্যাপারে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, আধুনিক সভ্যতার নামে মানুষ পৃথিবী নামক ডালে বসে সেই ডালটাই কর্তন করছে। সেই ডাল কেটেও ফেলেছে অনেকখানি। সুতরাং মানবসভ্যতার পতন অবশ্যম্ভাবী।
এসব শুনতে আমাদের ভালো লাগে না নিশ্চয়ই। বসন্ত পার করে গ্রীষ্মে পা ফেললেই আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি উষ্ণতার চড়া পারদ। সতেরো শতকে যখন প্রথম আধুনিক যন্ত্রনির্ভর সভ্যতার বিকাশ শুরু হয়, তখন থেকে মানুষ নির্গতকরা শুরু করে গ্রিনহাউস গ্যাস। এই গ্যাসের নির্গমন এখন আধুনিক জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আমরা এখন একবিন্দু পরিমাণ পথ সামনের দিকে এগোতে পারব না এই গ্রিনহাউস গ্যাসকে নির্গত না করে। প্রতি মুহূর্তে বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি টন গ্রিনহাউস গ্যাস ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে। আর বেড়ে চলেছে ধরিত্রীর উষ্ণতা। জলবায়ু চুক্তির মাধ্যমে এর লাগাম টেনে ধরার যতই চেষ্টা হোক, আমরা সত্যিকার অর্থে অনেক দেরি করে ফেলেছি। দক্ষিণ গোলার্ধে গত ডিসেম্বর, জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি ছিল বিশ্বের এ-যাবৎকালের সবচেয়ে উষ্ণ দিন। অর্থাৎ তাপমাত্রা মেতে উঠেছে রেকর্ড ভাঙার খেলায়। এ-খেলা চলতেই থাকবে। আমরা দর্শক মাত্র।
উষ্ণয়ানের এইসব ঘেমে-নেয়ে ওঠার খবরকে পাশ কাটিয়ে আমরা একটু নিজেদের দেশের দিকে তাকাতে পারি। সেখানে অনেক খারাপ খবরের পাশাপাশি কিছু ভালো খবরও আছে। ব্যারিস্টার সারা হোসেন, যিনি বাংলাদেশের খ্যাতনামা আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেছেন। আমরা গর্বের সঙ্গে জানাতে চাই যে, এই সারা হোসেনকে ২০০৫ সালে ‘অনন্যা শীর্ষদশ’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যে, এই দেশের প্রখ্যাত অনেক নারীর কর্মস্বীকৃতি ও কিংবা প্রতিভার প্রথম পুরস্কার ‘অনন্যা শীর্ষদশ অ্যাওয়ার্ড’ দিয়ে শুরু হয়েছে। সুতরাং সারা হোসেনের আন্তর্জাতিকমানের পুরস্কারের গর্ব অনন্যাও অনুভব করে বটে।
পয়লা মে, বিশ্ব মে-দিবস। এই মানবসভ্যতা গড়েই উঠেছে মানুষের শ্রমের বিনিময়ে। একটি সময় ছিল যখন শ্রমিক ছিল ক্রীতদাসতুল্য। ছিল না কোনো ব্যক্তিগত জীবনও। ছিল অস্বাস্থ্যকর, ঝুঁকিপূর্ণ ও ভয়াবহ কর্মপরিবেশ। স্বাস্থ্যহীনতা ও মৃত্যুঝুঁকি ছিল নিত্যসঙ্গী। কাজ করতে হতো ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৮ ঘণ্টার অধিক। এরপর আসে তীব্র প্রতিবাদ, দুর্বার আন্দোলন। এবং যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহর ১৮৮৬ সালের পয়লা মে সৃষ্টি হয় বিরল ইতিহাস। নির্ধারিত হয় শ্রমিকের যথোপযুক্ত শ্রমঘণ্টা, শ্রমের মর্যাদা। মে দিবস আমাদের এই বার্তা দেয় অনিয়ম-অমানবিকতা চিরকাল কখনো বহাল-তবিয়তে চলতে পারে না।
মানবিক বিশ্ব গড়তে সবাইকে হাতে হাত রেখে এগিয়ে চলার আহ্বান জানাই।

তাসমিমা হোসেন