রবিবার,১৮ নভেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / জিরো ডেসিবেল
০৪/১৬/২০১৬

জিরো ডেসিবেল

- ম্যারিনা নাসরীন

অনিমা গোছল সেরে এসেছে। গোছলের পরে ও এই পারফিউম মাখে। কি জানি ওর চুলের গন্ধও হতে পারে। কাঁঠালি চাপার গন্ধ। পারফিউমটার নাম ভাবতে ভাবতে অমর অনিমাকে আর খানিকটা মনোবীক্ষণে রাখে। অনিমার দৃষ্টি জানা-লার বাইরে। বাম হাতটি জানালার পাল্লায় ধরা, ডান হাত নিতম্বের পাশে ঝুলছে। অলস, স্থির। মুখের একাংশ দেখা যাচ্ছে। পাথর মুখে খোদাই করা নাক, কান, চোখ। অনুভূতিবর্জিত, অভিব্যক্তিহীন। ভীষণভাবে নির্লিপ্ত! খোলা জানালার শার্সি বেয়ে রোদ্রের নদীটি মেঝেতে গড়িয়ে এইমাত্র কপাটের কাছটিতে গিয়ে থেমে গেল। হু-হু করে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে। অনিমার ভেজাচুলের গোছা দুলে ওঠে। অমরের গা শিরশির করে।
অনিমা, জানালা বন্ধ করে দাও। ঠান্ডা লাগছে তো।
অনিমা নড়ে না। ওর নাক ফুলের সাদা পাথরটি সূর্যের কিরণে অল্প খানিকটা সময়ের জন্য ঝিকমিকিয়ে ওঠে। বিয়ের পর পাশের গ্রামের অতুল বেনের দোকান থেকে অমর বানিয়ে দিয়েছিল। অতুল পাথরটির নাম বলেছিল ‘ভোরের আলো’। সে কতবছর আগের কথা। তখন অমল সবে কলেজে পড়ানোর চাকরিতে ঢুকেছে। কিন্তু ও শুনছে না কেন? উহ, শীতে শ্বাসকষ্ট আবার বেড়ে না যায়।
এই অনিমা!
অনিমা শুনছে না। আলোর রিফ্লেকশনে ওর শাড়ির রং কখনো লাল কখনো ম্যাজেনটা। খানিকবাদে মনে হলো ম্যাজেনটা শাড়িটা হেলতে দুলতে অমরের দিকেই আসছে। অমরের শরীরঘেঁষে বসে মুখটা অমরের মাথার খুব কাছে নামিয়ে এনেছে। কয়েক গোছা ভেজা চুল চোখে মুখে। কতদিন পর বিষাদবর্ণের বিছানাটিতে রঙের ছোঁয়া লাগলো। প্রাচীন শ্যাওলা পড়া শরীরে আফ্রোদিতির ওম। ভার্সিটিতে পড়ার সময় অমর গ্রিক মিথলজি পড়ে এই দেবীর প্রেমে পড়েছিল, তারপর থেকে যে নারী তার কাছে এসেছে তাকেই আফ্রোদিতি মনে হতো। বিয়ের পর মনে হয়েছিল অনিমা আফ্রোদিতির থেকেও সুন্দর। অনিমা আরও খানিকটা ঝুঁকে আসে। ওকে খুব কাছে, বুকের একদম উপরটিতে টেনে আনার অদম্য ইচ্ছায় অমর ডান হাতটি তোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। বাম হাতের আঙুল উত্তেজনায় নড়েচড়ে ওঠে কিন্তু ডান হাত জড়বৎ, নিশ্চল, নিথর, বিরতিহীন সন্ন্যাস!
বাবা! কিছু বলবেন?
অমরের ভাবনায় চিত্রকল্পটি সেখানেই থেমে যায়। সিলিংমুখি দৃষ্টির সামনে সুতপা আধা অবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সুতপা। আহ! ওকে কেন যে অনিমার মতো লাগে! সুতপার পরনে অলিভ রঙের ভারি রাতপোশাক। নাকে কানে কোথাও কোনো অলঙ্কার নেই। ওর মাথায় আগে কোমর অবধি ঢেউ তোলা ঘন কালো চুল ছিল। এখন দেখলে মনে হয় ও চুলগুলোকে আয়রন করে এনেছে। টানটান, সটান। নড়তে চড়তে চুলে বেগুনি রঙ খেলে। আর্টিফিশিয়াল সুতার মতো।
বৌমা, শীত লাগছে। জানালাটা বন্ধ করে দাও।
শ্বশুরের ঘড়ঘড়ে আওয়াজ সুতপা বুঝতে পারে না। জানালা খোলাই থাকে। সাইড টেবিল থেকে টিস্যু নিয়ে অমরের চোখের কোণের পিচুটি মুছে দেয়। শরীর থেকে উৎকট গন্ধ বেরুচ্ছে। ঘৃণায় সুতপার ঠোঁট কুঁচকে আসে। বেডশোরের ভয়ে প্রতিদিন দুবার করে পাশ বদলে পিঠের নীচে ট্যালকম পাউডার ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবুও কিভাবে যে গন্ধ ছড়ায় কে জানে!
আপনি একটু শুয়ে থাকেন আমি চা নিয়ে আসছি।
বলার জন্যই বলা। সুতপা না বললেও অমর শুয়ে থাকবে। নিজের ইচ্ছায় উঠে বসা বা চলাফেরা করা দুবছর আগে থেকে বন্ধ। রোদের গ্রোতটা দেওয়ালে চড়তে শুরু করেছে। রেণুরেণু ধুলোবালি রোদের মধ্যে স্বাধীনভাবে উড়ছে। পুরো ঘর জুড়ে এই ধুলোবালির অস্তিত্ব। কিন্তু যেখানে আলো সেখানেই শুধু তারা দৃশ্যমান। প্রকৃতির ধর্মই তো তাই। আঁধারে যা কিছু গোপন, অদৃশ্য। আলোতে সরব, প্রকাশ্য। সুতপা দরজার পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে যায়। ওর চুলের গোছা আগের চেয়ে একটু বেশি দুলছে। নির্দিষ্ট একটা রিদমে দুলছে। বহুদিন থেকে সুতপা শাঁখা সিঁদুর পরে না। শেষ বিকেলের সেই সময়টুকু ছাড়া ওকে কখনো হাসতেও দেখা যায় না।
ভার্সিটি থেকে আচমকা একদিন সুতপাকে নিয়ে বাসায় হাজির হয়েছিল অনিমেষ। সুতপার পরনে জিন্স, শার্ট ছিল না বা হবু শ্বশুর-শাশুড়িকে সে প্রণাম করতেও ভুলে যায়নি। দেখতে ভীষণ মিষ্টি। কারোরই অপছন্দ হবার কথা নয়। তবুও অনিমা সাফ বলে দিল মেয়ে তার পছন্দ নয়। অনিমেষও মায়ের মতো করেই মুখের উপর জবাব দিয়েছিল, তোমাদের পছন্দ না হলেও আমি ওকে বিয়ে করব। অমরের খুব ভালো লেগেছিল সুতপাকে। খুনসুটি ভরা মুখ। আহ্লাদী, চুলবুলে।
অনিমা কথা বাড়ায়নি। ও চিরটাকাল এমন। প্রতিবাদ করে না। উচ্চপর্যায়ের অভিযোজন ক্ষমতা। শুধু একদিন অমরকে চুপিচুপি বলেছিল, মেয়েটির চরিত্র ভালো নয় গো। আমরা মেয়েরা মেয়েদেরকে চিনি। ও এক পুরুষে কখনই সুখী থাকবে না। দেখে নিও।
পাশের ঘর থেকে সেন্ডেল ঘষটানোর শব্দ আসছে। কিছুক্ষণ বাদে বেসিনের সামনে খুটখাট, পানির ছড়ছর আওয়াজ। অনিমেষ উঠল বোধ হয়। হয়ত সেভ করছে।
ওরে অনি, একবার আমার কাছে আয় বাবা!
অমর তারস্বরে ডাকছে। কি আশ্চর্য! বাবার ডাক ছেলে শুনছেই না। ওর নিজের করা সিডিউলের আগে বাবার ঘরে প্রবেশ যেন নিষেধ। স্যুট-টাই পরে হাতে এটাচি নিয়ে পুরো বাবু হয়ে অফিসে যাবার আগেভাগে বাবার ঘরে ভিজিট করতে আসবে। রোজ একই প্রশ্ন, বাঁধা কথা,
বাবা আজ কেমন লাগছে? শরীর ভালো? সুতপা ওষুধ ঠিকমতো খাওয়াচ্ছ তো?
অমর অনেক কথা বলতে চায়। অনি আমার কাছটিতে বস বাবা! এত শুকিয়ে গেছিস কেন? তোর কপালে এত্তগুলো ভাঁজ এল কিভাবে? সেই সন্ধ্যার কথাও জোরে একবার বলে।
অনিমেষ শুনতে পায় না। শোনার আশাও করে না। পায়ের জুতোয় থপথপ শব্দ তুলে বেরিয়ে যাবার সময় সুতপাকে ডাকে,
সুতপা, বাবার মুখের ফেনাটা মুছে দাও। আর দোরটাও বন্ধ করে দিও।
কোনো কোনো সময় অনিমেষ রাতেও বাবাকে দেখতে আসে। দেখতে ঠিক নয়, গল্প করতে আসে। একদম বেহেড, পাড় মাতাল। অমরের পাশে শুয়ে অসংলগ্ন কথা বলে। একেকদিন একেক গল্প। বুঝেছ বাবা, আজ বিলে একটাও মাছ নেই। মাছরাঙ্গা প্রচুর উড়ছে। কাল বলছিল, নিপেনটা খুব ফাঁকিবাজ। বিকেলের পর ওকে আর অফিসে পাওয়া যায় না। আমার কাজে খুব হ্যাম্পার হয় কোথায় যায় বলত? অফিসের অনেকেই বলাবলি করে, ওর নাকি গোটা কয়েক প্রেমিকা আছে। শালা! রাবিশ! বৌ বাচ্চা রেখে...
অমর ছেলের উপর ক্ষেপে ওঠে,
বাহ, বাহ! ভাষা কি! হতচ্ছাড়া কোথাকার।
অনিমেষ কথা বলতেই থাকে,
ওই যে সুতপাকে দেখছ না? বেড়ালের মতো হেঁটে বেড়ায়। ও আসলে একটা চিতা। কালো চিতা। যে কোনো সময় লাফিয়ে এসে ঘাড় মটকে দেবে। ওর থেকে সাবধানে থেকো বুঝলে?
বিয়ের দুবছরের মাথায় একদিন অনিমা চুপি চুপি বলল, সে তার গতমাসের পিরিয়ড মিস করেছে। ওরেব্বাস! স্ত্রীর পিরিয়ড মিসের খবরটি এত মধুর! বুকের মধ্যে অষ্টমীর ঢাক বেজে উঠেছিল। প্রেগন্যান্সি রিপোর্ট পজেটিভ। অমরের মনে আছে এই উপলক্ষে সে কলেজ থেকে দুদিনের ছুটি নিয়েছিল। ইচ্ছে হয়েছিল ছুটির দরখাস্তে এই কারণটিই লেখে। কিন্তু কলেজ জুড়ে হাসাহাসি পড়ে যাবে ভেবে বাতিল করেছে। কয়মাস অমর কচুরিপানার মতো ভেসে ভেসে অনিমার কাছে কাছে ঘুরে বেড়াত। দুজন মিলে ঠিক করল, মেয়ে হলে নাম দেবে অরুণিমা আর ছেলে হলে অনিমেষ।
অনিমেষ আজ আসতে এত দেরি করছে কেন? ডাইনিং টেবিলে মৃদু টুংটাং শব্দ। ওর এখন নাস্তার সময়। অনিমা বেঁচে থাকতে একটা রীতি ছিল। সকাল আর রাতের খাওয়া সবাইকে একসাথে খেতে হবে। সুতপা সেই রীতি ভেঙ্গে ফেলেছে। মাঝে মধ্যে ছিটকে আসা কথাবার্তায় অমর বুঝতে পারে ওরা যার যার মতো খায়। আজ নাস্তার কি আয়োজন? লুচি- লাবড়া নাকি ঢিলা খিচুড়ি? সুতপা অমরকে প্রতিদিন পানির মতো পাতলা স্যুপ গেলায়। হলদে রঙের ডিম গোলার ফাঁকে গুটি কয় নুডুলস কৃমির মতো করে ঘুরে বেড়ায়। এগুলো সড়সড় করে গলা দিয়ে নামতে থাকে। অমরের ওয়াক করে বমি উঠে আসে। কিন্তু সুতপার পাথর মুখের দিকে তাকিয়ে গিলে ফেলতে হয়।
মা আজ আবারো খিচুড়ি করেছ? আমি বলেছি না পরোটা খাব?
অনির্বাণের চিৎকার শোনা যাচ্ছে। ওর গলা কৈশোর ছাড়িয়েছে। চোয়াড়ে বেয়াড়া চেহারায় রাজ্যের রুক্ষতা। ছোট্ট বেলায় অমরের খুব ন্যাওটা ছিল। এখন সুতপার বকুনিতে ক্বচিৎ দাদুর ঘরে আসে। অমরের পায়ের কাছে বসে মোবাইল টেপে আর মাঝে মাঝে দাদুর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে টন্টিং করে,
হ্যালো ইয়াং ম্যান, আজ কি খবর? এভাবে কতকাল আর বিছানায় লেংচে কাটাবে বলত? ভালো হয়ে যাও। তোমাকে নিয়ে সিনেপ্লেক্সে থ্রিডি মুভি দেখতে যাব।
সত্যি নিয়ে যাবি তো? অমর মুখভর্তি করে হেসে ওঠে।
অনির্বাণ কিছু শোনে না। হাসিও দেখতে পায় না। মোবাইলে চোখ রেখে বেরিয়ে যায়।
ডাইনিং টেবিলে অনির্বাণ এখনো ঘ্যান ঘ্যান করছে। সুতপা কিছু একটা বলল কিন্তু শোনা গেল না। কি বলল সুতপা? ছোট্ট বেলায় মা মুগের ডালের সাথে নানা পদের সব্জি দিয়ে পাতলা খিচুড়ি রান্না করত। ওরা বলত ঢিলা খিচুড়ি। মা মরার পর ঠিক এমন খিচুড়ি অনিমাও রাঁধতে শিখেছিল। অনিমার পর সুতপা। এরপর হয়ত অনির্বাণের বৌ করবে। বংশ পরম্পরায় মানুষ কি শুধু জিন বহন করে? ওদের হাত ধরে পরিবারের খুঁটিনাটি কত কি যে উত্তরপুরুষে বয়ে যায়!
ভারি জুতোর মচমচে আওয়াজ আসছে। অনিমেষ! এলজিডি অফিসের বড়কর্তা।
বাবা, আজ শরীর কেমন? সুতপা, বাবাকে ঠিকমতো ওষুধ খাওয়াচ্ছ তো?
অনিমেষের চোখের নীচে ব্যাগ। কাল বেশ রাত করে বাড়ি ফিরেছিল। ও কোনটা খায় ব্ল্যাক হর্স? নাকি ওয়াইন? অমর দুই একবার বিয়ার খেয়েছে কিন্তু কখনো নেশা করেনি। অনিমেষ কেন এমন নেশায় জড়াল?
দরজা বন্ধ হলো দুবার। অনিমেষের পরেরবার অনির্বাণ স্কুলে গেল। উচ্চস্বরে সুতপাকে বাই বলল। অনির্বাণকে স্কুলে নিয়ে যাবার কাজটা আগে অমর করত। ড্রাইভারের উপর ছেড়ে দিতে ভয়। এখন ছেলেটা কত বড়! গাড়ী চালাতেও শিখেছে।
কি সুনসান চারপাশ! কি অসহ্য নীরবতা। চোষা কাগজের মতো সমস্ত শব্দ যেন কে চুষে নিয়েছে। অন্যদিন এসময়টাতে সুতপা টেনে হিঁচড়ে অমরকে দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসায়, মুখে একটু একটু করে লাল চা ঢেলে দেয়। অমর কিছুটা গিলে বাকিটুকু ডান গাল বেয়ে পড়ে যায়। আজ ওর কোনো শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না।
এই চৌকোণ ঘরের চৌহদ্দিতে শুয়ে মোনোটনাস পৃথিবীর তেমন কোনো খবরই অমর পায় না। বাড়ির বাকি বাসিন্দাদের টুকরো গল্পের সাথে অমর কিছু বাড়তি সুতো যোগ করে। তারপর শুরু হয় জাল বোনা। জালের গিঁটে গিঁটে অমর কাহিনী সাজায়। এই ঘরটি থেকে শুরু করে পৃথিবীর নানা প্রান্তের খবর গেঁথে রাখে। ঘরের এক কোণে টিভির স্ক্রিন প্রায় সারাদিন চালু থাকে। শব্দহীন। কখনো শরীরটা যখন সুতপা কাত করে রেখে যায় তখন টিভি স্ক্রিনে মানুষের নড়াচড়া দেখে। দেখতে ভালো লাগে। বেশিরভাগ সময় অমর সিলিংমুখি থাকে। সিলিং এ কোনো মানুষ নেই।
সুতপা...
বৌমা...
নাহ, সাড়া নেই।
বেশ খানিকবাদে ডোরবেল বেজে উঠল। দোর খোলার শব্দ।
বৌদি আজ সব কাজ করবার পারতাম না। সিনেমা দেখতি যাব।
মালতির কথাগুলো ঝনঝন করে বেজে উঠল।
সিনেমা দেখার আর দিন পেলে না। আজ বাসায় অনেক কাজ আছে, মাছ কাটা, তরকারি বাছা এগুলো কে করবে শুনি?
সুতপার কণ্ঠ শান্ত অথচ কি দৃঢ়।
এমা, বৌদি আইজকা মাফ চাই। হেই আমার লাইগা টিকেট লইয়া বইয়া থাকব।
আচ্ছা সে দেখা যাবে, আগে কাজ শেষ কর।
কে বসে থাকবে, মালতির স্বামী নাকি প্রেমিক? অমর এলেবেলে চেহারার একটি ছেলেকে দেখে। নিউমার্কেটের উল্টোপাশের জুতোর দোকানের ঠিক সামনে। ওর হাতে সিনেমার দুটি টিকেট। ছেলেটিকে দেখে মনে হচ্ছে না কারো জন্য অপেক্ষা করছে বরং ওকে খুব উদাসীন লাগছে। ছেলেটি সম্ভবত মালতির স্বামী নয়, প্রেমিক।
মালতির বয়স বেশি না। শরীরের ঢক ভালো। আগে এ বাড়িতে দুটো করে কাজের লোক ছিল। গত কয়েকবছর হল সুতপা তাদেরকে বাদ দিয়েছে। মালতীকে দিয়ে পার্ট টাইম কাজ করায়। ও এ বাড়ির যাবতীয় কাজ করে। বাড়তি কাজের মধ্যে প্রতিদিন একবার করে অমরের গা মুছে কাপড় বদলে দেয়। শরীরটাকে উঠিয়ে দুবাহুর মধ্যে বেশ খানিকটা সময় বসিয়ে রাখে। হাওয়া লাগায়। মালতির বুকের দু-তাল উদ্ধত মাংস ওর পিঠে চেপে বসে। অমরের পুরুষ ইন্দ্রিয় কিঞ্চিৎ সজাগ হয়। বোধ হয় কেউ ইটের টুকরো ছুঁড়ে মারল। মরা গাঙ্গে হাওয়ার ঝোঁকায় ফিনেফিনে দোল ওঠে। নিমিষ মাত্র, তারপরই জড়ভরত।
মালতি আসার পর থেকে অনেকক্ষণ ধরে রান্নাঘর, গেস্টরুম, ব্যালকনি, সবখানে শব্দরা ঘুরে বেড়ায়। ও যতসময় কাজে ব্যস্ত থাকে অমর তত সময় ঘুমায় না। কান পেতে শব্দ শোনে। হাঁড়ি পাতিলের ঝমঝম শব্দ। মেঝে দিয়ে পানির বালতি ঘষটে নেবার শব্দ। কি মধুর এসব আওয়াজ। অমরের বেঁচে থাকার অকাট্য সাক্ষী সুবোদ।
আজ মালতি অমরের ঘরে এল না। অমর ধ্যানমগ্ন হয়ে মনে মনে অনেক গুলো ছবি সিলেক্ট করল। তারপর মাথার উপরের সিলিঙটাকে ফটোফ্রেম ভেবে সেখানে তৈরি করে ফেলল একটা দারুণ কোলাজ। একটি ছবিতে নদীর তীরে কিছু বালক ঢিল ছোঁড়ার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। অন্য একটি ছবিতে বাবার সাইকেলের সামনে ছোট্ট শিশু। নৌকার উপর দেবী দুর্গা। একটি বিশাল বট গাছ। গাছ থেকে অসংখ্য ঝুরি ঝুলছে। একজন ঝাপসা নারীমুখের পাশে অন্য আর একটি অস্পষ্ট পুরুষ চেহারা। নারীটি সুতপা কিন্তু পুরুষ চেহারাটি সে কিছুতেই স্পষ্ট করতে পারে না।
বুড়ো বটগাছ আর কতটা ঝুরি ফেলল কে জানে? সূতলি নদীর এপার ওপারের নতুন করে কে কে মরল? দুবছরে জানা হল না। অমর প্রতিবছর পুজোয় বাড়িতে যায়। ফি বছরই নতুন নতুন মৃত্যুখবর শোনে। নতুন জন্ম খবর। দুরের কাছের। শেষবার দুর্গাপূজায় বাড়িতে গিয়ে খুঁজে খুঁজে পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা করেছিল। সবথেকে কাছের বন্ধু সাধন, রাব্বানি আর নেই। রজব হাই স্কুলের মাস্টারি থেকে বেশ আগে অবসর নিয়েছে। ওর ছেলে পিজির ডাক্তার। অমরের সাথে পুরো সময়টা ছেলের গল্পই হলো। ঢাকায় বাড়ি, গাড়ি ক্লিনিক কোনোকিছুর অভাব নেই। অভাব শুধু সময়ের। গ্রামে বাবা মাকে দেখতে যেতে পারে না।
অমরের সাথে পড়ত জাবেদ। ক্লাস ওয়ান থেকে টেন অবধি ওর এক নম্বর জায়গাটা কেউ নিতে পারেনি। ম্যাট্রিক ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করে উপজেলা সদর কলেজে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু শেষ করতে পারল না। চাষী বাবার সাধ্যে কুলায়নি ছেলেকে পড়াবার। শ্যামপুর বাজারে একটা মনোহারীর দোকান দিয়েছে। সেখানে বাবা ছেলে মিলে দোকানদারী করে। জাবেদকে দেখে অমর এগিয়ে গিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে সংসার, ছেলেমেয়ের খোঁজ নিয়েছিল। কিন্তু জাবেদ সেভাবে বুক মেলাতে পারেনি। কিসের একটা দ্বিধা, জড়তা! হয়ত প্রথম হয়েও প্রথম থাকতে না পারার কষ্ট!
বহুক্ষণ হয় মালতি চলে গিয়েছে। অমরকে স্যুপ খাইয়ে সুতপা সেই যে নিজের কামরায় গেল আর এদিকে এল না।
দেওয়ালে ধীরে ধীরে বিষণতা গাঢ় হয়ে আসে। বাতাসে ঢেউতোলা পর্দা হালকা দুলছে। ওপাশে ছায়া ছায়া। একটা আরশোলা দৌঁড়ে দরজার সামনে দিয়ে পালিয়ে গেল। সেই সুযোগে পর্দার ছায়া নিঃশব্দে বিভক্ত হলো। অমরের খুব ঘুম পাচ্ছিল কিন্তু জোর করে জেগে রইল। কলবেল বাজছে। সুতপা বিড়াল পায়ে দরজা খোলে। বাতাসে টুকরো হাসি উড়ছে। পুরুষ হাসি।
দুবছর আগের এক সন্ধ্যায় প্রথম এই হাসিটি অমর শুনেছিল। অনিমেষ সাতদিনের ট্রেনিংয়ে তখন থাইল্যান্ড। অনির্বাণ প্রাইভেট টিউটরের বাসায়। সন্ধ্যায় ঘণ্টা দুই লম্বা পায়ে হাঁটা অমরের দীর্ঘদিনের অভ্যাস। কলাবাগান লেকের পাশ ধরে হাঁটছিল। শীতের মাঝামাঝি সময় অথচ টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হলো। শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। বেশ খানিকটা বিরক্তি নিয়ে অমর ঘরমুখী হয়েছিল। লোডসেডিং চলছে। চারপাশ নিপাট অন্ধকার। দরজায় হাত লাগাতেই কপাট খুলে গেল। কি অদ্ভুত, সুতপা দরজা খুলে রেখে ঘুমলো নাকি? অমরের পায়ে নরম সোলের কাপড়ের কেডস। শব্দহীন। ঘরে একটা মোমবাতিও জ্বলছে না। অমর নিজের রুমের দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু সুতপার ঘরের সামনে এসে পা দুটো মেঝের সাথে গেঁথে গেল। সুতপার আদুরে গলার সাথে মিলেমিশে হাসছে পুরুষ হাসিটি। খুব পরিচিত। কিন্তু কি যে হলো ঠিকমতো স্মরণে আনার আগেই শরীর ঝিমঝিম করে উঠল। আজ পর্যন্ত পা দুটো হড়কে পড়ার মুহূর্তটুকু শুধু অমর স্মরণ করতে পারে। বাকি অনেকটা সময় ব্ল্যাক আউট। গত দুবছর ধরে অমর মনছবিতে এই সময়ের কোলাজ করেই চলেছে। কিন্তু হাসিটি চিনতে পারেনি। পুরুষটিকেও নয়।
সুতপার ঘরে যুগল হাসির শব্দের মাত্রা বাড়ছে। অমর কোলাজ থেকে সুতপার পাশের পুরুষটিকে আলাদা করে। নামিয়ে আনে চোখের একদম সামনে। মন থেকে আর একটি ছবি নেয়। তারপর একটির উপর আর একটি রাখে। দুটো ছবি একে অপরের সাথে অবিকল সেঁটে গিয়েছে। নিপেন, অমরের ছোটবেলার বন্ধু, অফিসের কলিগ।
ওদের হাসি ক্রমশ হার্জ এড়িয়ে ডেসিবেলে পৌঁছে যায়। সত্তর থেকে আশিতে। এরপর নীল তিমির শব্দমাত্রায়।
আহ, থাম তোমরা। অমর চিৎকার করে ওদেরকে থামাতে চায়। অমরের সে চিৎকার এঘর থেকে ও ঘরে ভেসে বেড়ায়। জিরো ডেসিবলে।