রবিবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / ক্যালেন্ডারের গোল দাগ
০৪/১৬/২০১৬

ক্যালেন্ডারের গোল দাগ

- সোনালী ইসলাম

যোহরের আযান হবে এখুনি।
সাজেদা খাতুন ওযু করে কোরআন পড়ছিলেন, এই ওযুতেই নামাজ আদায় করবেন। তারপর দুপুরের খাওয়া সারবেন।
আযানের আগেই মাইকে ঘোষণা ভেসে আসল
-একটি শোক সংবাদ ...একটি শোক সংবাদ... ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন!’
খুব খেয়াল করে কান পেতেও মাইয়্যাতের নামটা শুনতে পেলেন না তিনি। কানটা এক্কেবারে গেছে। কোরআন শরীফ পাশে রেখে দুহাত তুলে দোয়া করলেন সদ্যমৃত মানুষ টার জন্য, তার পর ডাক দিলেন,
-‘রুবি, এই রুবি’ -
- ‘কি কন?’
- ‘কে মারা গেলোরে ?’
- ‘কি জানি আমি শুনিনি- ।’
- ‘আবার বলবে, শুনে নামটা বলিসতো।’
- ‘কেন?’
- ‘কাজ আছে’
- ‘দিন দিন পাগলামি বাড়ছে আপনার!’
মুখ ঝামটায় রুবি। সে অধিকার তার আছে। বিগত আঠারো বছর ধরে রুবি সাজেদা খাতুনের খাস কাজের লোক। সব কিছুতেই রুবির উপর নির্ভর করেন তিনি। ফলে, রুবিও কর্তৃত্ব ফলাতে কসুর করে না। ছেলেমেয়ে থাকে আমেরিকা আর কানাডায়, বছরান্তেও দেখা নেই। রুবি ছাড়া গতি আছে বুড়ির? মনে মনে গজগজ করে সে।
দ্বিতীয় বার আবার ঘোষণা হয়। রুবি শুনে এসে বলে,
- ‘হাশেম খানের স্ত্রী মারা গেলেন- মরিয়ম বেগম’
- ‘ও, আচ্ছা! খাতাটা দে।’
রুবি খাতা আর কলম এগিয়ে দেয়। সাজেদা খাতুন পাতা উল্টে একশ’ সতের নম্বর দিয়ে লেখেন,
মরিয়ম বেগম জওজে হাশেম খান।
মাগরিবের নামাযের পর দুই রাকায়ত নফল নামায পড়েন তিনি। তারপর সকল চেনা অচেনা মাইয়্যাতের নাম ধরে দোয়া করেন, মাগফেরাত কামনা করেন তাদের জন্য। এখন এমন হয়েছে যে বাদ গেলে মনে হয় মৃত স্বজনেরা যেন অভিমান করলেন। শুরু করেছিলেন নিজের আব্বার ইন্তেকালের পর থেকে। একে একে নামের সংখ্যা বাড়তে থাকে। মনে রাখার জন্য এখন খাতায় নাম লিখতে শুরু করেছেন।
অবশ্য সব কিছুই আজকাল লিখে রাখতে হয়। নতুবা ভুল হয়ে যায়। বরাবরই তিনি ভুলো মনের মানুষ, এ নিয়ে সংসার জীবনে অনেক ঝামেলা হয়েছে। সব সময় জরুরি জিনিষ ভুলে যাওয়া তো ঠিক না। তাই তিনি একটা খাতা আর একটা ক্যালেন্ডার ব্যাবহার করা শুরু করেছেন। এখন আর ভুল হয়না। লজ্জায় পড়তে হয় না।
বুদ্ধিটা অবশ্য নাতনি দিয়েছিল। ও এদেশেই ডাক্তারি পড়ে। ছুটিতে চলে যায় কানাডায়। তা এত বড় বাড়িতে নানীর কাছে থাকলেই পারত, কিন্তু ডাক্তারী পড়া নাকি হোস্টেলে থেকে করতে হয়। কে জানে? তিনি ওকে দেখলেই প্রশ্ন করতেন,
- ‘তোর পরীক্ষা কবে রে ?’
আসলে জানতে চাইতেন; আর কতদিন মেয়েটা দেশে থাকবে, সেটা তো মুখ ফুটে জানতে চাওয়া যায়না, তাই আর কি।
নাতনি তখন ক্যালেন্ডার নামিয়ে তারিখগুলো গোল গোল করে দাগ দিয়ে পাশে লিখে দিল। ভারী খুশি হয়েছিলেন তিনি নাতনির বুদ্ধি দেখে। এখন আর জিজ্ঞেস করতে হবেনা। ক্যালেন্ডারে তাকালেই বেশ মনে পড়বে। বার বার জিজ্ঞাসা করে কাউকে বিরক্ত করতে মন চায়না। এই বয়সে মানুষের বিরক্তি হজম করা বড় কষ্টের।
পরের দিনই রুবিকে দিয়ে বাজার থেকে তিন রঙের তিনটে কলম আনিয়েছিলেন সাজেদা খাতুন, লালা কালো আর সবুজ। তারপর ক্যালেন্ডারে জানুয়ারি মাস থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত কোন দিন কি করতে হবে তা গোল দাগ দিয়ে পাশে লিখে রাখেন তিনি।
জন্মদিনগুলো লালকালি দিয়ে দাগ দেন, কারো মৃত্যুদিন হলে কালো কালি দিয়ে দাগ দেন, আর টাকা পয়সার ব্যাপার গুলো দাগ দেন সবুজ কালি দিয়ে। পাশে লেখেন নাম আর সম্পর্ক। টাকা খরচের ব্যাপার থাকলে কি বাবদ খরচ করতে হবে তাও মনে রাখার জন্য লিখে রাখেন। খুবই সুবিধা হয়েছে তার। ভাইপো ভাইঝিদের জন্মদিন আর ভুল হয় না। ঠিকঠাক সকাল নয়টার মধ্যেই উইশ করে ফেলেন। তারাও তখন, লজ্জার খাতিরে হলেও একবার এসে দেখা করে যায়। একা একার জীবনে এটাই বা কি কম পাওয়া? একটা ফোন করলে যদি এক আধ ঘণ্টার জন্য ওদের সঙ্গে দেখা হয়, ওরা বেড়াতে আসে, তাহলে কত যে ভালো লাগে এটা কাকে বোঝাবেন সাজেদা খাতুন।
ডায়েরি খাতাটাও প্রায় ভরে এসেছে। আর একটা কিনতে হবে। তবে পুরনো খাতাটাও সঙ্গে রাখতে হবে। কত ফোন নম্বর, ঠিকানা, খরচের হিসেব, দোয়া দরুদ, এতে লেখা আছে তার এই খাতায়। এই যেমন মৃত ব্যাক্তিদের নামের তালিকা ... এটা তো খুবই জরুরি। প্রতিদিনই লাগে, আবার প্রায়ই নতুন নাম লিখতে হয়। নাতনি একদিন দেখে ঠাট্টা করে বলেছিল,
-‘ও বাবা, নানি- এত্ত লম্বা লিস্টি কাদের নামের?’
- ‘ওরা আমার সঙ্গীসাথি রে!’
- ‘ফ্রেন্ডলিস্ট?’
- ‘তা বলতে পারিস।’
- ‘তাহলে ঠিকানা, ফোন নম্বর নেই কেন ?’
- ‘ওদের ওসব লাগেনা। ওরা অন্য দুনিয়ার বাসিন্দা। মাগরিবের নামাজের পর ওদের সাথে আমার কথা হয়।’
- ‘যাহ, কি যে বল না।’
- ‘হ্যাঁ রে, প্রত্যেকদিন মাগরিবের নামাজের পর ওদের নাম ধরে ধরে দোয়া করি। ওরাও যেন অপেক্ষা করে থাকে। একদিন বাদ পড়লে ওরা অভিমান করে। আশা করে বসে থাকে তো ... এই যেমন আমি তোদের জন্য আশা করে বসে থাকি, তেমনটাই মনে কর।’
- ‘যতদিন যাচ্ছে ততই তোমার পাগলামি বাড়ছে কিন্তু নানু। এই যুগে তুমি ভূতে বিশ্বাস কর?’
- ‘ভূত কেন হবেরে ? আমাদেরই পরিচিত জনেরা, এই দেশ ছেড়ে যেমন তোর মা বাপ তুই চলে গেছিস কানাডায়, তোর মামা চলে গেছে আমেরিকায়, তেমনই ওরাও চলে গেছে অন্য ভুবনে।’
- ‘তুমি না নানু, ইম্পসিবল, যাই এখন !’
- ‘বস না আর একটু, এখুনি তো এলি ...’
- ‘না গো নানু যাই, অনেক কাজ।’
কিন্তু বসেনা নাতনি, ওর এখন কত কাজ কত কাজ। যেমন দশ-পনের বছর আগে সাজেদা খাতুনের ছিল। এখন শুধু একা, শুধু একা। ক্যালেন্ডারের গোল গোল দাগ তার দিকে গোল গোল চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে। উঠে ক্যালেন্ডারটা পাড়লেন তিনি। এ মাসে আর কি কি কাজ আছে দেখে রাখবেন।
এখন সেপ্টেম্বর মাস, এই মাসে ছোট ভাইটার জন্মদিন। তারও বয়স হয়েছে, উত্তরায় থাকে, তাই আসা যাওয়া প্রায় নেই বললেই চলে। দেখা হয় না, তবু ফোন করবেন। কুশল জানাবেন। আবার এক ভাইপোর মৃত্যুবার্ষিকী আছে সেপ্টেম্বরের সতের তারিখে- ডায়েরি খুলে দেখলেন, এক খতম কোরআন আর দেড় লাখ কলেমা জমা আছে। একলাখ কলেমা বকশে দেবেন ভাইপোটার নামে, হয়ত এটাই ওর কাজে দেবে পরকালে। এমনটাই বিশ্বাস করেন তিনি। তাহলে নিজের জন্য রইল এক খতম কোরআন আর পঞ্চাশ হাজার কলেমা। এ কয়দিনে আরো পঁচাত্তর হাজার পড়ে সোয়া লাখ কলেমা তৈরি রাখতে হবে। সাজেদা খাতুন প্রতিদিনই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকেন। তাঁর জন্মদিন ৭ই অক্টোবর, কিন্তু মৃত্যুদিন কবে ? যদি জানা যেত ? জানা যায়না। তাইতো প্রতিদিনই মৃত্যুদিন মনে করতে হয়। রোজ ফজরের নামাজের পর তিনি আল্লাহ পাকের দরবারে শুকরিয়া আদায় করেন আরও একটা পুরো দিন বেঁচে থাকার জন্য।
জীবন যে তাঁকে এত একা করে দেবে তা কখনো ভাবেননি সাজেদা। দাপটে সংসার করেছেন, স্বামীর সকল কর্মকা-ে জড়িয়ে থেকেছেন, সন্তান পালন করেছেন, আত্মীয় পরিজনদের সুবিধা আসুবিধায় পাশে থেকেছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর প্রথম একা হলেন নিজের শোবার ঘরে। তারপর একে একে সবাই চলে যেতে লাগল উন্নত থেকে উন্নত জীবনে আর তিনি একা হতে থাকলেন। এখন দেখেন চারপাশে কেউ নেই। তাই ধর্মকে ধারণ করেছেন তিনি। অভিযোগ করেন না, অনুযোগ করেন না। শুধু অপেক্ষা করেন। অপেক্ষা করেন মানুষের জন্য। অপেক্ষা করেন মৃত্যুর জন্য।
ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো আবার উল্টালেন তিনি। কিছু বাদ পড়ল কি? ডিসেম্বর মাসের ২৪ তারিখে গোল দাগ দেয়া। কি আশ্চর্য! তিন রঙের কালিতেই দাগ গুলো দেয়া। কিন্তু পাশে কিছুই লেখা নেই। এমনতো হয় না কখনো! তিন রঙের কালিতে দাগ দেয়া মানে কি? খুব খুব জরুরি কিছু। কিন্তু কি হতে পারে সেটা? সাজেদা খাতুন ডায়েরি খুলে বসলেন। ডিসেম্বর মাসে ব্যাংকের কোনো লেনদেন করেন না তিনি, সে সময় বড্ড ভিড় থাকে ব্যাংকে। কারো মৃত্যুদিনও নেই। তাহলে এত গভীর করে দুই তিনবার কলম বুলিয়ে দাগ দিলেন কেন? আর দাগ দিলেনই বা কবে? কিছুতেই মনে পড়ছে না। কি মুশকিল, কি মুশকিল। এই না মনে পড়া রোগ বড় কষ্টের, বড় অসহায় করে দেয় তাকে।
- ‘রুবি, রুবি’
ডাক দেন তিনি।
- ‘কি কন ?’
রুবি স্পস্টতই বিরক্ত, জি টিভির সিরিয়াল দেখছিল সে। এ সময় ডাকাডাকি মোটেও পছন্দ হয় না তার ...কিন্তু পাগুলে বুড়ি এসময়ই চেঁচামেচি শুরু করবে প্রত্যেক দিন।
- ‘ডিসেম্বর মাসের ২৪ তারিখে কি হবে বলতে পারিস ?’
- ‘আমি কেমনে কমু ?’
- ‘এখানে দাগ দেয়া আছে, কিন্তু লেখা নেই কিছু, কি হতে পারে বলত? ’
- ‘ভুইল্যা গেছেন মনে হয়।‘
- ‘আরে, ভুলে গেছি বলেই তো তোকে ডাকছি,’
- ‘ভুইল্যা গেছেন ভুইল্যাই থাকেন না, অত মনে করনের কাম কি ?’
- ‘ঐযে, কার জন্মদিন জানতে পারলে ফোন করতাম!”
- ‘কাজ কাম তো নাই কিছু, শুধু শুধু মানুষরে ফোন কইরা বিরক্ত করেন ক্যান?’
- ‘না না বিরক্ত হবে কেন? ফোন করি বলেই তো কথা হয়। ওরাও খুশি হয় ... ‘
থেমে যান সাজেদা খাতুন। তিনি নিজেও এখন মনে মনে জানেন যেসবাই খুব একটা খুশি হয় না। নিজেরা তো খোঁজ খবর নেয়ই না।
কিন্তু ডিসেম্বর মাসের ২৪ তারিখে কি হতে পারে? একটা জিজ্ঞাসা চিহ্ন মাথায় ঢুকে কিলবিল করতে থাকে। আলমারি খুলে সব দলিলপত্র বার করেন তিনি। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন প্রত্যেক পাতায়। নাহ কোনো হদিস পাওয়া যায় না। নাতনি যদি আসে, জিজ্ঞাসা করে দেখবেন। এখন বরং কলেমা পড়ে রাখাটাই দরকার। ভাইপোকে একলাখ কলেমা বখশে দিলে, নিজের কম পড়ে যাবে। অচিন ভুবনের আজানা যাত্রায় পূর্ণ প্রস্তুতিতে রওয়ানা হতে হবে। সেখানে কেউ কারো নয়। এই ভুবনেই কারো দেখা পাওয়া সাহায্য পাওয়া যায়না। উদাস হয়ে যান সাজেদা খাতুন। তাদের আমলে তো মানুষ এত নির্লিপ্ত ছিল না। একে অপরের খোঁজ খবরটা রাখত। সাজেদা খাতুন তসবিহ নিয়ে কলেমা পড়তে বসেন।
এবারের ডিসেম্বরের শীতটা বড্ড বেশি প্রবল শৈত্যপ্রবাহে কাঁপছে সারা দেশ। সাজেদা খাতুন প্রতিদিনের মতো রাত তিনটায় উঠে ওজু করে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়েন; ফজরের নামাজ পড়ে শোকরানা আদাহ করেন আরো একটা দিন বেঁচে ছিলেন বলে। তীব্র ঠান্ডায় আঙুলের ডগাগুলো নীল হয়ে গেছে তার। নীলচে আঙুল দিয়ে তসবিহর দানা টানতে টানতে তার মনে পড়ে আজ ডিসেম্বর মাসের ২৪ তারিখ। খুব জরুরি একটা দিন, কিন্তু কেন জরুরি তা মনে করতে পারেননি সাজেদা খাতুন।
যোহরের আজানের আগে বশিরউদ্দিন জামে মসজিদের মিনার থেকে ঘোষণা ভেসে আসে,
‘একটি শোক সংবাদ, একশত ঊনসত্তর গ্রিন রোড নিবাসী মোসাম্মাৎ সাজেদা খাতুন আজ সকাল সাতটায় ইন্তেকাল করেছেন... ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন! মরহুমার নামাজে জানাযা বাদ জোহর বশিরউদ্দিন জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত হইবে।