মঙ্গলবার,২২ অক্টোবর ২০১৯
হোম / ভ্রমণ / প্রাচীনতম নগরের খোঁজে
১০/০৬/২০১৯

প্রাচীনতম নগরের খোঁজে

বেড়ানো

- সাদিয়া ইসলাম

আপনি ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী হলে অবশ্যই আগে ভাববেন পুন্ড্রনগরীর কথা, যা গড়ে উঠেছিল যিশু খ্রিষ্টের জন্মেরও প্রায় ৩ হাজার বছর পূর্বে। বর্তমানে মহাস্থানগড় নামে পরিচিত বঙ্গমল্লাটের প্রাচীনতম এই রাজধানী থেকে চলুন ঘুরে আসি-

২০১৬ সালে তাই সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয় মহাস্থানগড়। শতাব্দীর পর শতাব্দীজুড়ে এই শহর ছিল মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেনবংশের রাজাদের প্রাদেশিক রাজধানী। এরপর তৃতীয় খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে পঞ্চদশ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী রাজারা এই গড় শাসন করেন। প্রাচীন প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শনসমৃদ্ধ এই নগরীতে তাই রয়েছে বিভিন্ন আমলের শিল্পকর্ম। এছাড়াও বৌদ্ধ শিক্ষার জন্য প্রসিদ্ধ হওয়ায় চীন ও তিব্বত থেকে ভিক্ষুরা তখন মহাস্থানগড়ে আসতেন লেখাপড়া করতে। এরপর তাঁরা বেরিয়ে পড়তেন দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। সেখানে গিয়ে তাঁরা বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষার বিস্তার ঘটাতেন।

বগুড়া শহর থেকে ১৩ কি.মি. উত্তরে শিবগঞ্জ উপজেলায় ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের পাশে অবস্থিত মহাস্থানগড় গড়ে উঠেছে করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরঘেঁষে। এর কেন্দ্রে অবস্থিত ১৮৫ হেক্টর এলাকায় বিস্তৃত আয়তাকার দুর্গটি শহরের প্রবেশের পর প্রথম চোখে পড়বে। এরপর সবাই ছুটে যায় বাল্যকাল থেকে যে বেহুলা-লখীন্দরের গল্প শুনে বড় হয়েছে তাদের বাসরঘরখ্যাত ‘গোকুল মেধ’ দেখতে। এটি মূলত একটি বৌদ্ধস্ত€¢ যার উচ্চতা প্রায় ৪৫ ফুট। সম্রাট অশোক এটি নির্মাণ করেছিলেন বলে মনে করা হয়। এখানকার আরো একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপনা হলো রাজা পরশুরামের রাজবাড়ি। গড়ের পূর্বপাশে করতোয়া নদীর তীরেই রয়েছে ‘শীলাদেবীর ঘাট’। এই শীলাদেবী ছিলেন পরশুরামের বোন। এখনও এখানে প্রতিবছর হিন্দুদের স্নান হয় এবং একদিনের একটি মেলা বসে। দুর্গের ভেতর অসংখ্য ঢিবি ছাড়াও রয়েছে কিছু উল্লেখযোগ্য কুয়া। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ও বিখ্যাত হচ্ছে ‘জিয়ত কু-’। জনশ্রুতি রয়েছে এর পানি পান করে মুমূর্ষু ব্যক্তিও সুস্থ হয়ে উঠত, অনেকে আবার একডিগ্রি বাড়িয়ে বলেন, মৃত মানুষও জীবন ফিরে পেত! এছাড়াও এই দুর্গেই রয়েছে ‘মানকালীর ধাপ’ যা তৎকালীন সনাতন ধর্মাবল€^ীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত হতো। আরও রয়েছে সন্ন্যাসীদের আখড়া বৈরাগীর ভিটা’, ঈশ্বরে উদ্দেশ্যে উৎসর্গিত খোদার পাথর ভিটা’, ‘মুনির ঘোন’ নামক একটি কেল্লা। রয়েছে একাধিক মন্দির, যাদের মধ্যে সবচেয়ে দর্শনীয়গুলো হলো, গোবিন্দভিটা, খুল্লনার ধাপ, মঙ্গলকোট, গদাইবাড়ি ধাপ, স্কন্ধের ধাপ। নরপতির ধাপ তথা বাসুবিহার ও তোতারাম প-িতের ধাপ- এই দুটি আশ্রমও বেশ পরিচিত।

দুর্গের নানাবিধ স্থানে রয়েছে কয়েকটি প্রবেশদ্বার। উত্তরে কাঁটা দুয়ার, পূর্বে দোরাব শাহ তোরণ, দক্ষিণে বুড়ির ফটক এবং পশ্চিমে আছে তাম্র দরজা। এর উত্তর-পূর্ব কোণে পরবর্তীসময়ে কয়েকটি ধাপ সংযুক্ত করা হয়েছে যা জাহাজঘাটায় গিয়ে মিলেছে। জাহাজঘাটার কিছুটা সামনে করতোয়া নদীর তীরে গোবিন্দ ভিটা (গোবিন্দের মন্দির) অবস্থিত। গোবিন্দ ভিটার সামনেই ১৯৬৭ সালে স্থাপিত হয় স্থানীয় জাদুঘর রয়েছে যেখানে প্রদর্শিত হয় এখানকার উল্লেখযোগ্য কিছু নিদর্শন। মহাস্থান গড় খননের ফলে মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন ও অন্যান্য রাজবংশের হাজার বছরের পুরানো অসংখ্য স্মৃতিচিহ্ন সোনা, রুপা, লোহা, ব্রোঞ্জ, পাথর, কাঁসাসহ বিভিন্ন মূল্যবান ধাতব পদার্থ, পোড়ামাটির তৈরি মূর্তি, কালো পাথরের মূর্তি, বেলে পাথরের মূর্তি, মাটি দিয়ে তৈরি খোদাই করা ইট, স্বর্ণবস্তু, বিভিন্ন শিলালিপি, আত্মরক্ষার জন্য ধারালো অস্ত্র, নিত্যপ্রয়োজনীয় তৈজসপত্র ও নানাধরনের প্রাচীন অলংকারসহ ইত্যাদি সামগ্রী পাওয়া গেছে যা এই জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। মহাস্থান গড় ছাড়াও আরও বিভিন্ন স্থানের প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন আছে এখানে। জাদুঘরের পাশেই রয়েছে একটি রেস্ট হাউজ। এ তো গেল মহাস্থানগড়ের শাসক ও রাজাদের নির্মিত কীর্তিসমূহ। ১৪শ শতাব্দীর দিকে এই অঞ্চলে ইসলামধর্ম প্রচার করতে আসেন হযরত শাহ সুলতান মাহমুদ বলখী (র.)। মহাস্থান বাসস্ট্যান্ড থেকে কিছুটা পশ্চিমে তার মাজার অবস্থিত। কথিত আছে তিনি মাছের আকৃতিবিশিষ্ট নৌকায় করে শীষ্যসমেত বরেন্দ্রভূমিতে আসেন। তাই তাকে মাহিসওয়ার নামেও ডাকা হয়। তার মাজারটি এই অঞ্চলের অনেকের কাছে একটি বেশ শ্রদ্ধার জায়গা। অনেক মুসলমানই নানান সমস্যার সমাধান অথবা রোগমুক্তি লাভের আশায় এখানে মানত করেন। এছাড়াও এই এলাকায় ইসলাম বিস্তৃত হওয়ার পর সুলতানি ও মোঘল আমলে একাধিক মসজিদ নির্মিত হয়। এগুলোর ধ্বংসাবশেষও খননকার্যের পর উদ্ধার হয়েছে।