মঙ্গলবার,২২ অক্টোবর ২০১৯
হোম / বিনোদন / সূতায় সূতায় বাধা হ্যানা ও শাপলার জীবন
১০/০২/২০১৯

সূতায় সূতায় বাধা হ্যানা ও শাপলার জীবন

মঞ্চ

- আবু সাঈদ তুলু

গত ১০ ও ১১ মে, ২০১৯ তারিখে সন্দ্রেবলস অপেরার আমন্ত্রণে স্টকহোমের ফ্রিয়া টিটার্নে প্রদর্শিত হলো বাংলাদেশের থিয়েটার আর্ট ইউনিটের নাটক ‘সূতায় সূতায় হ্যানা ও শাপলা’। নাটকটি রচনা করেছেন আনিকা মাহিন একা ও নির্দেশনা দিয়েছেন রোকেয়া রফিক বেবী। এটি সুইডেনে প্রদর্শন উপলক্ষে নতুন নির্মিত নাটক। নাটকটি গত ২৬ এপ্লিল, ২০১৯ তারিখে ঢাকার মহিলা সমিতি মঞ্চে উদ্বোধনী প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।
নাটকের গল্পটি দুই দেশের দ্ইু সূঁচশিল্পীর। সুইডেনে ‘হ্যানা’ নামের এক সূঁচশিল্পীর জীবন-বাস্তবতার সঙ্গে বাংলাদেশের ‘শাপলা’ নামের এক সূঁচশিল্পীর জীবনসংঘাত সমান্তরালে রূপায়িত হয়েছে। এ দুই মৃতনারীর কথোপকথনের মধ্যদিয়ে দুদশের মানুষ, সমাজবাস্তবতা অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে ওঠেছে। হ্যানাÑযার কিনা উপত্যকার সুনিবিড় সান্নিধ্যে প্রজাপতির খেলায় বেড়ে ওঠা জীবন। যে প্রত্যাশা করে তার প্রেমিকের স্পর্শ। সূচকর্ম যার জীবনের আনন্দ। যার জীবন রঙিন স্বপ্নগুলো তাড়িয়ে বেড়ায়। অথচ ব্যর্থতার-ছলনার বিষবাষ্প ছুঁয়ে জীবনকে ভারাক্রান্ত করে তুলে। অপরদিকে বাংলাদেশের প্রতীক ‘শাপলা’ নামের এক গ্রামীণ নারী। মৎস্যজীবী কন্যা কাদা-মাটিতে বেড়ে ওঠা। বৃষ্টির শব্দ যাকে উতলা করে। জীবিকার সন্ধানে তাকে শহরে এসে গার্মেন্টেসে চাকরি নিতে হয়। গার্মেন্টস যখন ধস হয় কিংবা আগুন লাগে তখন সে পুড়ে মারা যায়। মৃত্যুর পর এ দুই নারীর কথোপকথনে, সংগীতের ভাষায়, চরিত্রাভিনয়ে, গায়েনের মধ্যস্থতায়, কোরিগ্রাফিতে মঞ্চে ফুটে উঠে।

ভিন্ন দু’সংস্কৃতির কোনো বিষয়কে তুলনামূলক উপস্থাপন করতে খুব সচেতন থাকতে হয়। আর নির্দেশনকেও দক্ষ থাকতে হয় ‘রিপ্রেজেন্টেশন’নে। রিপ্রেজেন্টেশন বলতে কী দেখাচ্ছি, কীভাবে দেখাচ্ছি, যাকে দেখাচ্ছি তার কী বোধ তৈরি করতে চাচ্ছ্ িবা কী বোধ তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের রয়েছে হাজার বছরের বয়নশিল্পের ঐতিহ্যম-িত ইতিহাস। গ্রিক, আরবীয়, ইরানীয় ও প্রাচীন ভারতের নানাগ্রন্থে এদেশের গর্ব করার মতো বয়ন শিল্পের সমৃদ্ধপরিচয় বিধৃত হয়। আর সমুদ্র উপকূলবর্তী নদীমাতৃক এ মৌসুমী জলবায়ুর বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির লীলা-তা-ব-সৌন্দর্য পৃথিবীর মধ্যে অনন্য। শীতপ্রধান অঞ্চলের মানুষ এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হয়ত কিছুই বুঝবে না বরং বিরক্তিই উৎপাদিত হতে পারে তাদের। এ নাটকে সুইডেনের সঙ্গে বাংলাদেশকে কিভাবে দেখানো হলো তা নিয়ে নাট্যকার নির্দেশকের খুব মনোযোগ প্রয়োজন। আমরা যেন শুধু বিদেশি টাকা বা সুবিধার জন্য নিজেদের টেনে নিচে না নামাই। শিল্প শুধু শিল্প তৈরি জন্য নয়; দেশ-সমাজ-সভ্যতার জন্য দায়বোধও থাকাও জরুরি।

প্রায় ১ঘণ্টা ব্যাপ্তির এ নাটককে বাংলার ঐতিহ্যবাহী নাট্যরীতির নৃত্য-গীত-অভিনয় দিয়ে দর্শককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। প্রথমে কোরিওগ্রাফির মাধ্যমে প্রধান প্রধান ধর্মগুলোর স্ত্রোস্ত বন্দনার মাধ্যমে নাটকটি শুরু হয়। তারপর গায়েনের বর্ণনার মাধ্যমে নাটকের কাহিনিতে প্রবেশ। নাটকে বাংলাদেশের শাপলাকে পরানো হয় নিষ্প্রভ হালকা শাড়ি। কোনো গার্মেন্টসকর্মী এরকমের শাড়ি পড়ে কিনা! অপরদিকে সুইডেনের হ্যানাকে পরানো হয় শতরঙের শতরঞ্জের মতো রঙিন পোশাক। সুইডেনের বাস্তবতায় অত কালারফুল পোশাকের প্রচলন আছে কিনা! গল্প বর্ণনার ঢঙ, কোরিওগ্রাফি, মিউজিক অনবদ্য ঐকতানিক সুরে গাথা। অভিনয় ও সংলাপ প্রক্ষেপণ অসাধারণ। নাটকের মিউজিকগুলো তো যেন নাটকের বক্তব্যগুলোকেই অনবদ্যভাবে জীবন্ত করে তুলছিল। অনবদ্য প্রাণদীপ্ত প্রযোজনা। স্ইুডেন এ্যা€^াসির সহায়তায় বাংলাদেশের গার্মেন্টসকর্মীদের নিয়ে ইতোপূর্বে একটি নৃত্যনাট্য তৈরি হয়েছিল। ওখানেও অবদমনের একটি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কৌশল ছিল। যদিও পরে সে প্রযোজনাটি বন্ধ হয়ে যায়। ব্রিটিশ উপনিবেশ শাসনের কারণে দীর্ঘদিনের গোলাম হওয়া থাকা এ জাতির, ইতিহাস ঘেঁটে সত্যের উদ্ধার ও আত্মপরিচয় সৃষ্টি হওয়া জরুরি। নাটকটির উত্তরোত্তর মঞ্চ সাফল্য কামনা করি।
নাটকটিতে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করছেন-সুজন রেজাউল, সঙ্গীতা চৌধুরী, মিতালী দাস, মেহমুদ সিদ্দিকী, নূরুজ্জামান বাবু, এস আর সম্পদ, সজল চৌধুরী, আবীর সায়েম, অপ্সরা মৌ প্রমুখ। নাটকটির মূল গায়েন- সেলিম মাহবুব, গায়েন দলে রয়েছেন চন্দন রেজা, কামরুজ্জামান মিল্লাত, আনিকা মাহিন একা, মাহফুজ সুমন। কিবোর্ড- বিল্পব সরকার, পার্কাশন- বাবু ইসলাম, গিটারÑ সুজন রেজাউল ও বিপ্লব সরকার। নাটকটির মঞ্চপরিকল্পনা করেছেন- আবীর সায়েম, সহযোগী রানা সিকদার, সংগীত পরিকল্পনাÑ সেলিম মাহবুব, কোরিওগ্রাফি- সঙ্গীতা চৌধুরী ও মেহমুদ সিদ্দিকী, আলোক পরিকল্পনা- নাসিরুল হক। নাটকটি রচনা আনিকা মানিক একা ও নির্দেশনা রোকেয়া রফিক বেবী।