মঙ্গলবার,২২ অক্টোবর ২০১৯
হোম / বিনোদন / ১টি নারী ও ৬টি নরপশুর গল্প
১০/০২/২০১৯

১টি নারী ও ৬টি নরপশুর গল্প

ফিল্ম রিভিউ

- রিফাহ তাসনিম অর্না

হালের জনপ্রিয় অনলাইন স্ট্রিমিং সার্ভিস নেটফ্লিক্সের নতুন অবদান ভারতীয় টিভি সিরিজ দিল্লি ক্রাইম। নেটফ্লিক্স ভারতে আসার পর থেকে দর্শকদের একের পর এক মানস€§ত টিভি সিরিজ উপহার দিয়ে আসছে। দিল্লি ক্রাইম তার ব্যতিকক্রম নয়। বাস্তবতাও যে ঘোর সৃষ্টি করতে পারে তার উধাহরণ দিল্লি ক্রাইম। ‘বিঞ্জ ওয়াচিং’ বা একবসায় শেষ না করে উঠতে পারবেনা দর্শক এমন একটি সিরিজ দিল্লি ক্রাইম। পুরো ঘটনা সাজানো হয়েছে ২০১২ সালে দিল্লিতে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ কেস যা ‘নির্ভয়া ধর্ষণ মামলা’ নামে পরিচিত তার আদলে। বাস্তব ঘটনার আদলে সাজানো হলেও চরিত্রের নামগুলো বদলে ফেলা হয়েছে। নির্ভয়াকে দেখানো হয়েছে দীপিকা নামে আর ডেপুটি কমিশনার ছায়া শর্মাকে উপস্থাপন করা হয়েছে ভার্তিকা চতুর্বেদী নামে। ৬ পর্বের ধারাবাহিকটি মূলত ক্রাইম ড্রামা বা থ্রিলার বা বলা যায় পুলিশ পদ্ধতিগত গোয়েন্দা উপাখ্যান। ল’, পুলিস প্রসেডিউর, জুডিশিয়ারিতে যাদের আগ্রহ তারা অবশ্যই দেখুন এই সিরিজটি। আর যদি নির্ভয়াকে অনুভব করতে পারেন, চোখের প্রান্তে একফোঁটা অশ্রু চলে আসা অস্বাভাবিক নয়।

কাহিনির শুরুতে দেখানো হয় ২০১২ সালে রাজধানী দিল্লির বুকে ঘটে যাওয়া ইতিহাসের অন্যতম বর্বর ও নৃশংস এক ঘটনা। সাউথ দিল্লির মুনিরকা নামক স্থানে একজন ছেলে এবং একজন মেয়েকে নগ্ন ও আহত অবস্থায় রাস্তার পাশ থেকে উদ্ধার করা হয়। এরমধ্যে মেয়েটি ধর্ষণের শিকার এবং নির্মমভাবে আহত। জানা যায়, মেয়েটির নাম দীপিকা। সে তার বন্ধুর সাথে রাত ৯টার দিকে সিনেমা হল থেকে বাড়ি ফিরছিল। দিল্লি পুলিশের ডেপুটি কমিশনার ভার্তিকা চতুর্বেদী একটি ফোন কলে ঘটনাটি জানতে পারেন এবং বিল€^ না করে ছুটে যান হাসপাতালে। ডাক্তারের কাছে দীপিকার অবস্থা শুনে তিনি নির্বাক হয়ে যান। ভিক্টিমের শরীরের ভয়ঙ্কর অবস্থা তাকে ভীষণভাবে তাড়িত করে।

জানা যায় ৬জন নরপশু মিলে গণধর্ষণের পর মেয়েটিকে চলন্ত বাস থেকে ছুড়ে ফেলে। ছুঁড়ে ফেলার আগে তাকে ভয়ানকভাবে পেটানো হয়, লোহার রড দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে, তার শরীরের ভেতরের মাংস টেনে ছিঁড়ে ফেলে। ছেলেটিও আক্রমণের শিকার হয়। এমন নৃশংসতা মানবজাতির অস্তিত্বকে যেন প্রশ্নবিদ্ধ করে। টনক নড়ে দিল্লি পুলিশের। ভার্তিকা চতুর্বেদী তৎক্ষণাৎ নিজের বাছাই করা পুলিশ সদস্যদের নিয়ে একটি তদন্ত দল গঠন করেন। পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত সেই তদন্ত দল সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষা করে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে কি করে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসে তা নিয়ে কাহিনির বিস্তার।


এই ছায়া শর্মা/ভার্তিকা চতুর্বেদী চরিত্রে অভিনয় করেছেন শেফালী শাহ। পুরো সিরিজজুড়ে তার দাপুটে অভিনয় সবার মন কাড়তে বাধ্য। একই সাথে তিনি দায়িত্বপরায়ণ কঠোর একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা এবং সাথে সাথে একজন মমতাময়ী উদ্বিগ্ন মা। মানবচরিত্রের কঠোর এবং মানবিক দিকটি তিনি একই সাথে সুনিপুণভাবে রূপায়ণ করতে পেরেছেন।
অন্যান্য চরিত্রগুলোর মাঝে উল্লেখযোগ্য নিতি সিং চরিত্রে রাসিকা দুগাল। শিক্ষানবিশ পুলিশ অফিসার এর চরিত্রে অভিনয় করেছন তিনি। বর্তিকা চতুর্বেদী নিতির উপর কেসের নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়ভার তুলে দেন। নিতির অন্যতম দায়িত্ব ছিল ভিকটিম দীপিকাকে হাসপাতালে সঙ্গ দেওয়া। এছাড়া অফিসার ভুপেন্দ্র সিং চরিত্রে রাজেশ তাইলাং-এর অভিনয়ও চোখে পড়ার মতো। আরেকজন এর অভিনয়ের কথা না বললেই নয়, তিনি হলের ধর্ষক জয় সিং চরিত্রে মৃদুল শর্মা। নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করে
দর্শকদের মন থেকে ঘৃণা জাগ্রত করা চাট্টিখানি কথা নয়। মৃদুল সিং তা ভালোভাবেই পেরেছেন।

পরিচালক রিচি মেহতার প্রায় ৫ বছরের কষ্টের ফলাফল দিল্লি ক্রাইম সিরিজটি। মামলার রায় শোনার পর তিনি নির্ভয়ার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। তাদের অনুমতি পাবার পরপর তিনি এই ধারাবাহিকের কাজে নেমে পড়েন। তিনি মনে করতেন এ কেসে যে ঘটনায় সারাদেশ ক্ষোভে ফেটে পড়েছে সেই ঘটনায় বিক্ষোভকারীরা আসামিদের ওপর ততটা ক্ষেপে ছিল না, যতটা ক্ষেপে ছিল পুলিশের ওপর। তার কারণ মনে করেন ভারতে পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের একধরনের অবিশ্বাস ও অনাস্থা, যে-কারণে মানুষ ধরেই নেয় যে, পুলিশের নিশ্চয়ই গাফিলতি রয়েছে।

সিরিজটি দেখলে মনে হতে পারে কোনো লেখকের কল্পনাপ্রসূত গোয়েন্দা চরিত্রের কোনো লোমহর্ষক কাহিনি। লোমহর্ষক বটেই কিন্তু মোটেই কোনো লেখকের কল্পনাপ্রসূত লেখা নয়। একদম সত্যিকারের ঘটে যাওয়া ঘটনা।

তবে এই সিরিজের সমালোচনাও কম হয়নি। ভারতের অনেক সংবাদপত্র বলছে, এই সিরিজের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল পুলিশের কাজের প্রতি মানুষের সহানুভূতি তৈরির চেষ্টা করা। এ ঘটনার অন্যান্য চরিত্র যেমন মিছিলকারী, নির্ভয়ার পরিবার, মিডিয়া, রাজনীতিবিদদের ভূমিকা সঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে আসামিদের গ্রেফতার ও ফাঁসির জন্য সারাভারতের রাস্তায় মানুষ আন্দোলনে নেমেছিল এবং মামলার রায় তাড়াতাড়ি হবার পিছনে এই আন্দোলনের যে ভূমিকা রয়েছে সেদিকে আলোকপাত করেছেন পরিচালক। তবে এর নেতিবাচক দিকটিও দেখানো হয়েছে সাথে সাথে।

বলা যায়, যে-কোনো থ্রিলার গল্পকে হার মানায় এই নির্ভয়া কেস। গল্পের অপরাধীদের থেকেও বাস্তবের অপরাধীরা যে কত নৃশংস হতে পারে তার প্রমাণ এই কেস। বাস্তবে অপরাধরহস্য তদন্তে রোমাঞ্চ-উত্তেজনার চেয়ে একাগ্রতা আর পরিশ্রমের চিহ্ন অনেকবেশি। কিছু তদন্তে অপরাধীকে চিহ্নিত করাতে রহস্যের কিছু নেই; কিন্তু আদালতে তার উপযুক্ত শাস্তির জন্য অপরাধ প্রমাণ করা নিয়েই সৃষ্টি হয়ে টানটান রুদ্ধশ্বাস ঘটনার। তা খুব নিখুঁতভাবে উঠে এসেছে দিল্লি ক্রাইম সিরিজে। পরিচালক রিচি মেহতার বক্তব্য হলো এই সিরিজ ভারতীয়দের মধ্যে এবং ভারতীয় পুলিশদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে আর সেটাই তার উদ্দেশ্য।