মঙ্গলবার,২২ অক্টোবর ২০১৯
হোম / জীবনযাপন / স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ হতে পারে সন্তানের সাথে নয়
১০/০৪/২০১৯

স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ হতে পারে সন্তানের সাথে নয়

-

আদৃতা, একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩য় বর্ষে ফাইন্যান্স পড়ছে। তুখোড় মেধাবী আদৃতাকে পছন্দ করে না এমন লোক কমই পাওয়া যাবে ক্যাম্পাসে । সমস্যা একটাই, ভীষণ বদমেজাজী ও। রেগে গেলে আর হুঁশ থাকে না, কাকে কখন কী বলে ফেলে, আর এ নিয়ে বন্ধুমহলে করচাও কম হয় না। আদৃতার মতো এমন সমস্যায় ভুগছে হয়ত অনেকেই। এই অস্থির সময়ে স্বস্তির সুবাতাস সবার জীবনে বয়ে যায় না সবসময়। একটু খতিয়ে দেখেই জানা গেল আদৃতা বড়ো হয়েছে মায়ের কাছে। ওর বাবা-মায়ের ডিভোর্সের পরে বাবা নিজের মতো করে জীবন গুছিয়ে নিয়েছেন ঠিকই; কিন্তু আদৃতা কিংবা তার মায়ের সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগই রাখেননি তিনি। ব্রোকেন ফ্যামিলিতে স€úর্কের টানাপড়েন দেখে দেখে বড়ো হওয়াতে আদৃতা এক অদ্ভুত হীনমন্যতায় ভোগে।


সন্তানের সুস্থ মন-মানসিকতা নিয়ে বড়ো হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হলো পরিবারের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। আর সেই পরিবেশ তখনই তৈরি হয় যখন পরিবারে থাকে বাবা-মায়ের বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থান। এর ব্যত্যয় ঘটলে তার প্রভাব পরে সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর। ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তানেরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বড়ো হয়ে ওঠে প্রচ- অনিরাপত্তাবোধ নিয়ে আর যার চূড়ান্ত প্রভাব পরে পরবর্তীকালে তাদের ব্যক্তি ও সমাজজীবনে। একথা যেমন সত্যি যে, একটা মন্দ-দম্পতির সন্তানদের প্রতিনিয়ত ঝগড়া-কোলাহলের মাঝে বড়ো হয়ে ওঠার দুঃসহ অভিজ্ঞতা তাড়া করে বেড়ায়, তেমনি একথাও সত্যি যে, সিঙ্গেল প্যারেন্টিং-এর বিশাল বোঝা মাথায় নিয়ে খেই হারিয়ে ফেলেন অনেক অভিভাবকই আর তার মূল্য অবধারিতভাবে চুকাতে হয় সন্তানেরও। স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ শান্তির প্রয়োজনে হতেই পারে। কিন্তু সন্তানের উপর তার প্রভাব পড়বে কি পড়বে না তা প্রায় পুরোটাই নির্ভর করে দুজনের ইতিবাচক মনোভাব ও আচরণের উপর। দাম্পত্য সম্পর্কে ফাটল ধরলেই যে সন্তানের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হবে কিংবা সন্তান তার প্রাপ্য ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হবে তেমনটা মোটেই কাম্য নয়।

তার সবচেয়ে কাছের দুটো মানুষের বিচ্ছন্ন হবার সিদ্ধান্ত যে তাকে প্রচণ্ড একাকিত্ব ও দুশ্চিন্তার ঘেরাটোপে আটকে ফেলে তার থেকে মুক্তির চাবিকাঠিও কিন্তু থাকে বাবা-মায়ের কাছেই।

সন্তানের জীবনে সুস্থভাবে বড়ো হয়ে ওঠার পেছনে বাবা-মায়ের যৌথভূমিকা অনস্বীকার্য। সেক্ষেত্রে সন্তান প্রতিপালন ও হেফাজতের বিষয়ে আইনিবিচারে কে বেশি অধিকার রাখে এরচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সন্তানের সার্বিক কল্যাণ। বাবা-মায়ের দুজনেরই উচিত সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে লক্ষ্য রাখা এবং সেদিক বিবেচনা করেই অধিকার ও দায়িত্ব বণ্টন করে নেওয়া। বাবা-মায়ের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের ভূমিকার বিষয়টাও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিচ্ছেদকে কখনই স্বভাবিকভাবে দেখা হয় না বরং বিচ্ছেদের পরে বিভিন্ন তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় সবাইকেই, যার আঁচ এসে পড়ে সন্তানের উপরেও। ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তানদের শোনানো হয় কটুকথা কিংবা তাদের সাথে করা হয় রুঢ় আচরণ। বিচ্ছেদের পরে তাই বাবা-মায়ের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে কিনা তা অনেকাংশে নির্ভর করে পরিবার, সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতার উপরেও।

বাংলাদেশের প্রচলিত সকল পারিবারিক আইনেই সন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজতের অধিকার কার রয়েছে সে স€úর্কে সুনির্দিষ্ট করে বলে দেওয়া আছে। প্রায় সকল পারিবারিক আইনেই সন্তানের প্রকৃত আইনগত অভিভাবক থাকেন বাবা। তবে সন্তানের হেফাজতের অধিকার একটা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত মায়েরই থাকে এবং মায়ের অধিকার এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে স্বীকৃত। এ সময়ের মধ্যে মায়ের অগোচরে যদি বাবা জোরপূর্বক সন্তানকে নিজের হেফাজতে গ্রহণ করেন, সেক্ষেত্রে বাবার বিরুদ্ধে অপহরণের মামলা পর্যন্ত দেওয়া যাবে। বাংলাদেশে প্রচলিত আইনের অধীনে এই নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর সন্তানের হেফাজতের অধিকার মায়ের কাছে অবশিষ্ট থাকে না। স্বস্তির বিষয় এই যে, আমাদের জুডিশিয়ারি এই প্রচলিত আইনের সীমানায় নিজেকে আবদ্ধ করে রাখেনি। বিভিন্ন বহুলআলোচিত মামলায় কোর্ট বারংবার এই মর্মে সিদ্ধান্ত দিয়েছে যে, হেফাজতের বিষয়টি নির্ধারণ করার জন্যে সন্তানের সার্বিক কল্যাণকেই প্রাধান্য দিতে হবে। যার সাথে সন্তানের বোঝাপড়া ভালো এবং সন্তান যার কাছে থাকতে স্বাছন্দ্যবোধ করে, তার কাছেই থাকবে। বাবা কিংবা মা’র মধ্যে যার হেফাজতে থাকলে সন্তানের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সুস্থ ও স্বাভাবিক হবে এবং তার সর্বোচ্চ স্বার্থ রক্ষা হবেÑ আদালত তাকেই ওই সন্তানের জি€§াদার নিয়োগ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে অবশ্যই অর্থনৈতিক বিষয়টাও বিবেচনায় আসে। কিন্তু সন্তান যদি একজনকে বেছে নেয় তার সাথে থাকবার জন্যে এবং অন্যজনের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ ও যাতায়াত রক্ষা করে সেক্ষেত্রে যার আর্থিক সঙ্গতি আছে তার দায়িত্ব বর্তায় সন্তানের খরচ দেবার।
দুজন সুস্থ মানসিকতার মানুষ পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে কিংবা তিক্তভাবে সম্পর্কের ইতি টানতেই পারে। কিন্তু সন্তানের সাথে স€úর্কের ছেদ কখনই কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়। বাবা-মায়ের উচিত যতটা স€¢ব সরলভাবে বিচ্ছেদের বিষয়টা সন্তানকে বোঝানো। সে যাতে কোনোভাবেই নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগে, সেদিকেও বিশেষ লক্ষ্য রাখতে হবে। সন্তানের মঙ্গলের জন্যে তাকে আশ্বাস দেওয়া জরুরি যে, বিচ্ছেদের পরেও বাবা-মা একইভাবে তার পাশে থাকবে ও ভালোবাসবে। আর তাই বিয়ের স€úর্ক মিটে গেলেও বন্ধুত্বটা টিকিয়ে রাখা বড্ড প্রয়োজন।

-প্রিয়াংকা বোস কান্তা
প্রভাষক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।