মঙ্গলবার,২২ অক্টোবর ২০১৯
হোম / ফিচার / যুগে যুগে নারীর প্রতি বর্বরতা
১০/০৩/২০১৯

যুগে যুগে নারীর প্রতি বর্বরতা

ইতিহাস

- মীর মাইনুল ইসলাম

প্রতিদিনই পত্রিকার পাতাজুড়ে হাজারও নারীর নির্যাতনের খবর যেন এদেশের নিয়মিত ব্যাপার। এত খবরের ভিড়েও এই কথা অবশ্যই সত্য যে, নারীর ক্ষমতায়নও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। ঘরে-বাইরে এমনকি পুরো রাষ্ট্র শুদ্ধসফলতার পরিচালনা করে যাচ্ছে মেয়েরা। এক সময়ের ঘরের পুতুল খেলা নিয়ে বসে থাকা মেয়েরা ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং এটি পুরো সমাজব্যবস্থায় এক ইতিবাচক সাড়া ফেলে দিয়েছে। তবে এই ঘুরে দাঁড়ানোর পথ কিন্তু কখনই সহজ ছিল না। বহু নির্মমতার ইতিহাসে ঘেরা রয়েছে আজকের এই পথ চলার মূলে। এমনি কিছু ইতিহাস নিয়েই আজকের আয়োজন।


নববধূ অপহরণ

ব্যাপারটা এখনকার সময়ে বেশ অদ্ভুত শোনালেও এটাই সত্যি যে, ইতিহাসে নববধূকে অপহরণের ঘটনার বহু নজির পাওয়া যায়। এমনকি উন্নত রাষ্ট্র বলে পরিচিত চীনেও গত শতকের চল্লিশের দশক পর্যন্ত নববধূকে অপহরণ করা হয়েছে। শোনা যায়, জাপানে এমনটা সর্বশেষ ঘটেছিল ১৯৫৯ সালে। আঠারো শতকে আয়ারল্যান্ডে অন্যতম দুশ্চিন্তার বিষয় ছিল এই বধূ অপহরণ। রোমের ইতিহাসের সাথেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে নববধূ অপহরণের কালিমা।

সতীত্ব হারানোর জন্য মৃত্যু পরোয়ানা

বহুকাল আগে প্রাচীন এথেন্সে যদি কোনো বাবা জানতে পারতেন যে, তার মেয়ে অবিবাহিতা অবস্থায় অন্য কোনো পুরুষের শয্যাসঙ্গী হয়েছে, তাহলে তিনি তাকে দাসী হিসেবে বিক্রি করে দেবার ক্ষমতা রাখতেন। স্ত্রীর সতীত্বের ব্যাপারেও ছিল নানানধরনের নিয়ম। স্ত্রীর সতীত্বের ব্যাপারে সামোয়ার অধিবাসীরা ছিলেন ভয়ঙ্কর তারা নিজেরা যেমন এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে চাইতেন, তেমনি তারা আর সবাইকেও সেই ব্যাপারে জানাতে চাইতেন। সেখানকার কোনো বিয়ের সময় গোত্রের প্রধান সবার সামনেই আঙুল দিয়ে নববধূর হাইমেন ছিঁড়ে দেখাতেন। এটা প্রমাণ করতে যে, মেয়েটি পবিত্র। এমনকি প্রাচীন রোমে দেবী ভেস্টার কোনো পূজারিণী যদি ৩০ বছর বয়সের আগে কুমারিত্ব হারাতেন, তাহলে তাকে জীবন্ত পুঁতে ফেলা হতো।

সন্তান হত্যায় বাধ্য করা

এই ব্যাপারটি কিছু কিছু উন্নত সমাজেও এখনও লক্ষ্য করা যায়। তবে প্রাচীন অবস্থা ছিল খুবই ভয়ঙ্কর। বহু সভ্যতার ইতিহাস ঘাটলে জানা যায় তাদের সময়ে কোনো শিশু জন্মের পর দুর্বল হলে তাকে মেরে ফেলার চল ছিল। এমনটা বহুবার ঘটেছে স্পর্টায়। এমন অমানবিক রীতি এককালে প্রচলিত ছিল বিশ্বের আরো অনেক দেশেই। সন্তান যদি জন্মগত ত্রুটি নিয়ে পৃথিবীতে আসত, তাহলে সবাই এটাই চাইত যেন মা তার সন্তানকে হত্যা করে ফেলে। এমনকি রোমে তো এটা আইন হিসেবেই চালু ছিল বহুকাল। এভাবে ঠিক কতজন শিশু মারা গিয়েছিল তার সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও ইতিহাসবিদগণ ধারণা করেন, প্রতি চারজন রোমান শিশুর একজনই একবছর বয়সের আগে এ প্রথার কারণে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে সেই সময়ে।

কন্যাসন্তানের দুর্ভাগ্য

বহুকাল আগে এথেন্সে যদি কোনো ঘরে কন্যাসন্তানের জন্ম হতো, তাহলে বেশির ভাগ সময়ই তাকে ভয়ঙ্কর বন-জঙ্গলে ফেলে রেখে আসত। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, সেখানেই যেন অনাহারে কিংবা বন্যপশুর আক্রমণে মারা যায় এই নিষ্পাপ মেয়েটি। এখনকার দিনে ব্যাপারটা ভাবতে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে উঠলেও তখনকার দিনের খুবই সাধারণ ঘটনা ছিল এটি। এমন একটি নির্মম চর্চার তারা নাম দিয়েছিল শিশুকে প্রকাশিত করা। এমন ঘটনা রোমেও ছিল বেশ নিয়মিত ব্যাপার। এমনকি প্রাচীন মিশরে, যেখানে নারীরা অন্যান্য অনেক সভ্যতার তুলনায় পুরুষের কাছাকাছি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারত, সেখানেও কন্যা সন্তানদের সাথে এমন আচরণ করা হতো।

মাসিক কালীন সময়ে নারী অস্পৃশ্য

প্রাচীন মিশরের ইতিহাস থেকে জানা যায় বহু প্রাচীনকালে তাদের নারীরা ঋতুচক্র চলাকালে আলাদা একটি স্থানে গিয়ে থাকত। যেই জায়গাটিতে কোনো পুরুষের প্রবেশাধিকার ছিল না। এমন এক বাজে কুসংস্কার অন্যান্য আরো সভ্যতাতেও প্রচলিত ছিল বলে জানা যায়। এমনকি প্রাচীন ইহুদীরা তো এই সময় একজন নারীকে স্পর্শও করত না। তারা বিশ্বাস করত এ সময় যে জিনিসেই নারীর শরীরের ছোঁয়া লাগবে, সেটাই অপবিত্র হয়ে যাবে। এমনকি হাওয়াইতে ঋতুমতী নারীদের জন্য আলাদা করে রাখা ঘরে যদি কোনো পুরুষ প্রবেশ করত, তবে তার মৃত্যুর পরোয়ানা পর্যন্ত জারি করা হতো। এই অমানবিক নিয়মটি এখনও ভারত ও ভুটানের কিছু অঞ্চলে পালন করে থাকে।

বাক-স্বাধীনতাহীন

প্রাচীন গ্রিস কিংবা রোমে বাড়িতে কোনো পুরুষ অতিথি এলে তাদের সামনে গিয়ে কথা বলা, এমনকি তাদের সাথে বসা নারীদের জন্য একপ্রকার নিষিদ্ধই ছিল। এটা করা হতো এই আশঙ্কায় যে, নারীদের উপস্থিতি না আবার পুরুষদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ডেনমার্কে যদি কোনো নারী অবাধ্য হয়ে কাউকে গালাগালি করত কিংবা কোনোভাবে রাগ প্রকাশ করত, তাহলে তার অবস্থা হতো খুবই করুণ। জানা যায় তাকে ‘বদমেজাজির ভায়োলিন’ নামক একটি যন্ত্রের সাহায্যে শাস্তি দেওয়া হতো। কাঠের তৈরি এ জিনিসটি দেখতে ছিল অনেকটা ভায়োলিনের মতো। এর সাহায্যে সেই নারীর দু’হাত আর মুখ আটকে দেওয়া হতো। এরপর তাকে পুরো নগরী ঘুরিয়ে বেড়ানো হতো। প্রকাশ্যে রাগ দেখানোয় রাস্তার জনগণ তাকে তখন দুয়ো দিতে থাকত। এই ক্ষেত্রে ইংরেজ নারীদের অবস্থা হতো আরো খারাপ। তারা প্রকাশ্যে বদমেজাজ দেখালে তাদের একধরনের ধাতব মুখোশ পরানো হতো, যেটার মুখের দিকে কাটার মতো অংশ এবং একটি ঘণ্টা লাগানো থাকত। ঘণ্টার শব্দ শুনে আশপাশের লোকজন জড়ো হতে থাকত আর সেই নারীকে নিয়ে সবাই মজা করত।