মঙ্গলবার,২২ অক্টোবর ২০১৯
হোম / পার্শ্বরচনা ও অন্যান্য / জেন্ডার বাজেট ও নারীর ভবিষ্যৎ
১০/০২/২০১৯

জেন্ডার বাজেট ও নারীর ভবিষ্যৎ

- জাহিদ হাসান দিপু

জেন্ডার বাজেট হলো জাতীয় বাজেটের এমন একটি অংশ যেখানে আর্থিক বরাদ্দ, করারোপ ও রাজস্বনীতির মাধ্যমে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করা হয়ে থাকে। জেন্ডার বাজেটের মাধ্যমে বাজেটের সব খাত তথা রাজস্ব আয়, ব্যয় ও বিন্যাস ইত্যাদি বিষয়গুলোতে তাদের সমতা রক্ষার কাজ করে। এটি মূলত নারীদের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা, নারী-পুরুষের বৈষম্য দূরীকরণ, কর্মক্ষেত্রে তাদের নিরাপত্তাসহ অন্যান্য অধিকারের বিষয়গুলোতে সকল মন্ত্রণালয়কে সংযুক্ত করে।

গত ১৩ জুন জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয় ২০১৯-২০ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রস্তাবনা। এবারের প্রস্তাবিত বাজেট থেকে দেখা যায়, গত অর্থবছরের তুলনায় আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ বেড়েছে জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেটে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে নারী উন্নয়নে ১ লাখ ৬১ হাজার ২৪৭ কোটি টাকার জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। যা গত অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ২৩ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা বেশি।

এবারের বাজেট প্রস্তাবনায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় নারী মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও ডাটাবেজ তৈরির পাশাপাশি স€§ুখ সমরে অংশ নেওয়া নারী মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা প্রচারে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, নৌপরিবহন ও রেল মন্ত্রণালয় জানিয়েছে বিভিন্ন খাতে কর্মরত নারীদের সন্তানদের ডে কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা করার উদ্যোগের কথা। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ ন্ত্রণালয় বলছে ২০১৯ সালের মধ্যে ৭০ শতাংশ অঞ্চলে এলপিজি ব্যবহার নিশ্চিত করে গৃহস্থালি কাজে নারীদের সময় সাশ্রয় ও সেই সময়কে অন্য কোনও আয়বর্ধক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করার কথা। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশের জ্বালানি সাশ্রয় ও নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাসের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানাইয় মন্ত্রণালয়টি।
এদিকে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় বলছে, জেন্ডার সংবেদনশীল নয়, এমন সাংস্কৃতিক কার্যক্রম যাতে পরিচালিত না হয় সেজন্য আচরণবিধি বা পেশাগত নীতিমালা বা স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা প্রণয়ন ও সে বিষয়ে উপযুক্ত আইন প্রণয়ন করা হবে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের নারীদের নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, নারীর প্রতি অবমাননাকর, নেতিবাচক, সনাতনী প্রতিফলন এবং নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধের লক্ষ্যে প্রচার বৃদ্ধি করা হবে। পাশাপাশি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ বলছে, সাইবার দুনিয়ায় নারীর জন্য অবমাননাকর বিষয়গুলো দূর করা, আদালতে প্রয়োজনীয় তদন্ত প্রতিবেদন পেশের ব্যবস্থা করা, ডিজিটাল অপরাধ বিষয়ে মেয়েদের সচেতন করা ও একই সঙ্গে আইসিটি সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে নারীর জন্য কোটা সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া বাল্যবিবাহ রেজিস্ট্রেশন বন্ধ ও প্রতিরোধে নিকাহ রেজিস্টারদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা তাদের প্রতিবেদনে বলেছে আইন ও বিচার বিভাগ।

এই বাজেট প্রস্তাবনায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় তাদের দেওয়া প্রতিবেদনে নারীদের জন্য আগামী দিনে তাদের করণীয় নিয়ে ইতিমধ্যেই সুপারিশ করেছে ভিন্ন ভিন্ন উদ্যোগ। এর মধ্যে নারীর জন্য কাজের পরিবেশ সৃষ্টি, ডে কেয়ার সেন্টার প্রতিষ্ঠা, তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি বিশেষ প্রাধান্য পাচ্ছে। তবে নারীর জন্য নেওয়া মন্ত্রণালয়গুলোর নানাবিধ উদ্যোগ তাদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলন হলেও গত কয়েক বছর ধরে জেন্ডার বাজেটের যে আয়োজন এই মন্ত্রণালয়গুলো করে আসছে, সেগুলো কতটা কার্যকর হয়েছে কিংবা কতটুকু মনিটর করা হয়েছে, সে বিষয়ে জানতে চান দেশের নারী নেত্রীরা।



সরকারের আয় ও ব্যয়ের নীতির প্রভাব জেন্ডারের ওপর কতটুকু পড়ে তার বিস্তারিত বিশ্লেষণ থাকে জেন্ডার বাজেটে। তবে নজরদারির অভাবে বাজেট বরাদ্দের কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে, নারীর জীবনে কোনো কোনো ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, তার কোনও সুস্পষ্ট তথ্য এবারের বাজেটে নেই।
বরাবরের মতই এবারের বাজেট পরিমাণগত দিক থেকে বেড়েছে। এবারের নারী উন্নয়নে বরাদ্দ মোট বাজেটের ৩০.৮২ শতাংশ। যা ২২ শতাংশ হারে বেড়েছে। আর এটা জিডিপি’র ৫.৫৬ শতাংশ। এটি বাজেটের একটা ইতিবাচক দিক। তবে জেন্ডার বাজেট তৈরির প্রক্রিয়ায় আমার কিছুটা দ্বিমত রয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়গুলো তাদের প্রকল্পগুলোর জেন্ডার সংবেদনশীলতা স€úর্কে হিসাব করে থাকে। তাদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে অর্থ মন্ত্রণালয় নিজস্ব নির্দিষ্ট মডেলের মাধ্যমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে জেন্ডার বাজেট তৈরি করে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় যেভাবে তাদের প্রকল্পগুলোর জেন্ডার সংবেদনশীলতা নির্ণয় করে সেই পদ্ধতি নিয়ে আরও অধিকতর বিচার বিশ্লেষণের দরকার রয়েছে। যেভাবে জেন্ডার সংবেদনশীলতা বিচার করা হয় সেটা সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা তা যাচাইয়ের জন্য, বোঝার জন্য। বিভিন্ন প্রকল্পগুলোতে নারীর চাহিদা, প্রয়োজনীয়তা কতটুকু গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সেটা বোঝাও জরুরি। জেন্ডার বাজেটে বরাদ্দ বাড়লেই উন্নয়ন হবে, নারীরা উপকৃত হবেন এমন ভাবার কিছু নেই। এই বাজেট নারী উন্নয়নে কতটা কাজে লাগবে সেটাই মূলকথা।


ড. সায়মা হক বিদিশা
সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জেন্ডার সংবেদশীলতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এর ফলে গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট-২০১৮ অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের ১৪৯টি দেশের মধ্যে ৪৮তম এবং দক্ষিণ এশিয়ার ৭টি দেশের মধ্যে শীর্ষস্থান অধিকার করেছে। চলতি অর্থ বছরে জেন্ডার বাজেট বেড়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ২৪৭ কোটি টাকাতে, যা মোট বাজেটের ৩০ দশমিক ৮২ শতাংশ ও জিডিপির ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। পাশাপাশি এই বাজেটে নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি, নারীর উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমবাজার ও আয়বর্ধক কাজে নারীর অধিকতর অংশগ্রহণ এবং সরাসরি সেবাপ্রাপ্তিতে নারীর সুযোগ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। তবে এতোসব উদ্যোগ গত কয়েক বছরে আদৌ কতটা কার্যকর হয়েছে সেটা এখনও প্রশ্নবিদ্ধ। নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ৪৩টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেট সঠিকভাবে প্রণয়ন ও উপযুক্ত খাতে ব্যয় হবে কিনা এবং বাজেটের সঠিক মূল্যায়ন হবে কিনা সেটা দেখার বিষয়।
শিক্ষাখাত ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে বৈষম্য হ্রাসকরণের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা সমূহ বৃদ্ধিকরণ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে শ্রমজীবী নারীর সুরক্ষা, কৃষিবাজারে নারীর অভিগম্যতা, ক্ষুদ্র নারী ব্যবসায়ীদের ভ্যাট পরিশোধে প্রণোদনা, প্রতিবন্ধী নারীদের ভাতা, গবেষণা ভাতা ইত্যাদি বিষয়ে বাজেট বরাদ্দ রাখলেও কোনো বিস্তারিত নির্দেশনা না থাকায় এটিকে গতানুগতিক জেন্ডার বাজেট বলেই মনে হচ্ছে।

রাবিতা সাবাহ্
সহকারী অধ্যাপক
একাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস্ বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

‘নারীদের উন্নয়ন সঠিক পথে পরিচালিত হচ্ছে কিনা তা স্পষ্ট করছে এই নারী বাজেট। এই বাজেটের ফলে নারীদের ভবিষ্যৎ উন্নত হবে। তবে নারীদের উন্নয়নে যে বাজেট দেওয়া হচ্ছে যথাযথ তত্ত্বাবধানের অভাবে তা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
বাজেটের সুফল প্রান্তিক নারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের আরও তৎপর হওয়া উচিত।
নারীদের জন্য যে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে তা পর্যাপ্ত নয়। তবে যেটুকু বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে সেটাও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। নারী বাজেটকে যেসকল মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে সেসব মন্ত্রণালয়ে মনিটরিং সেল গঠন করে তা যথাযথ তত্ত্বাবধান করলে নারীদের যথাযথ উন্নয়ন সম্ভব হবে।

শারমিন্দ নীলোর্মি
সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়