রবিবার,২০ অগাস্ট ২০১৭
হোম / বিবিধ / বর্ষবরণ উৎসব: যুগে যুগে, দেশে দেশে
০৪/১৬/২০১৬

বর্ষবরণ উৎসব: যুগে যুগে, দেশে দেশে

- মশহ শিহাব

উৎসবের মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর ইতিহাস হাজার বছরের। নতুন বছরকে বরণ করে নেয়ার নানা সভ্যতার নানা রীতি নানাভাবে এখনো পৃথিবীর নানা প্রান্তে টিকে আছে। কেমন ছিল প্রাচীন বর্ষবরণ উৎসবগুলো? আসুন জেনে নিই।

ব্যাবিলনিয়ান আকিতু

‘ব্যাবিলনিয়ান আকিতু’ হলো ‘বসন্ত উৎসব’। ব্যাবিলন সভ্যতা গড়ে উঠেছিল মেসোপটেমিয়ায়। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় গড়ে ওঠা আরো অনেকগুলো সভ্যতার মাঝে ব্যাবিলনেই প্রথম বর্ষবরণ উৎসব পালন শুরু হয়। আজকের দিনের মানচিত্রে ইরাক বলে যে দেশকে আমরা চিনি, ৪ হাজার বছর আগে এ এলাকাতেই গড়ে উঠেছিল ব্যাবিলনিয়ান সভ্যতা। প্রাচীন ব্যাবিলনে বছর শুরু হতো শীতের শেষে বসন্তের প্রথম চাঁদ ওঠার সাথে সাথে। এখনকার ক্যালেন্ডারের মার্চ মাসের কোনো একটা দিনে। এ উৎসব চলতো ১২ দিন।
ব্যাবিলিয়ন বর্ষবরণ উৎসবের সাথে জড়িয়েছিল পৌরাণিক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। উৎসব চলার সময়ে দেবতাদের মূর্তি রাস্তায় সারি করে সাজিয়ে রাখা হতো আর সাথে থাকত অশুভ শক্তির শেষকৃত্যের মঞ্চায়ন যেন দেবতাদের কাছে পরাজিত হয়েছে তারা। দেবতাদের উদ্দেশ্যে করা এসব আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাবিলিয়নিয়নরা বিশ্বাস করত দেবতারা নতুন বছরকে সামনে রেখে প্রতীকীভাবে পৃথিবীকে পরিশুদ্ধ করে নতুনভাবে তৈরি করবে।
মারদুক (গঅজউটক) ছিল প্রাচীন ব্যাবিলিয়ন দেবতাদের একজন। বসন্ত উৎসবের সময় শাসক রাজাকে মারদুকের মূর্তি বা ভাস্কর্যের সামনে হাজির করা হতো। রাজদ-ের সামনে রাজাকে নগ্ন করে বলতে বাধ্য করা হতো যে, সে সম্মানের সাথেই রাজ্যে নেতৃত্ব দিয়েছে। এসময় প্রধান পুরোহিত রাজাকে চড় মেরে কান ধরে টেনে নিয়ে আসতো। সে-সময়ে রাজার চোখ দিয়ে যদি পানি বের হতো তবে ধরে নেয়া হতো দেবতা মারদুক রাজার উপর তুষ্ট এবং রাজ্য শাসনের মেয়াদ বাড়িয়ে দিয়েছেন। ইতিহাসবিদদের ধারণা, আকিতুর মাধ্যমে রাজারা তাদের রাজ্য শাসনের মেয়াদ বাড়িয়ে নিতেন এবং প্রজাদের দেখাতেন, দেবতাদের আশীর্বাদ তাদের সাথে আছে।

রোমান নববর্ষ

ব্যাবিলয়নদের মতো রোমানদের বর্ষবরণ উৎসব হতো বসন্তের প্রথম চাঁদ ওঠার সাথে সাথে। চাঁদ ওঠার উপর ভিত্তি করে রোমানরা ক্যালেন্ডারও তৈরি করেছিল। মার্চ ১ ছিল রোমান ক্যালেন্ডারে বছরের প্রথম দিন। রোমান ক্যালেন্ডার চন্দ্রবর্ষ হওয়ায় নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল সে-সময় বিশেষত চাষিদের। বছরের পর বছর নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এক সময় সৌরক্যালেন্ডার চালু করে তারা। নতুন এ ক্যালেন্ডারে বছরের প্রথম দিন হয় ১ জানুয়ারি, যা সারা পৃথিবীর মানুষ এখন বছরের প্রথম দিন হিসেবে পালন করে। রোমানদের জন্য জানুয়ারি মাস ছিল বিশেষ তাৎপর্যের। জানুয়ারি নামটি এসেছে পরিবর্তন ও শুরুর দেবতা, দুমুখো দেবতা জানুসের নামানুসারে।
রোমানরা জানুয়ারির ১ তারিখে দেবতা জানুসকে অনেক কিছু উৎসর্গ করে নতুন বছরকে বরণ করে নিত। জানুসের প্রতি এ উৎসর্গ তাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন করবে বলে তারা আশা করত। দিনটিকে দেখা হতো পরবর্তী ১২ মাসের শুরু হিসেবে। এদিন তারা একে অপরের সাথে বিভিন্ন উপহার বিনিময় করতো, সাথে শুভেচ্ছা। বছরের প্রথম দিন কাজ না করলে সারা বছর অলসতায় কাটবে- এমন বিশ্বাসে বছরের প্রথম দিন তারা কোনো-না কোনো কাজে কিছু সময়ের জন্য হলেও নিজেদের ব্যস্ত রাখত।

মিশরীয় নববর্ষ

প্রাচীন মিশরে বছর শুরু হতো মধ্য জুলাইয়ে, নীলনদে বর্ষার প্লাবন শুরু হওয়ার ঠিক আগে। নীলনদ মিশরীয় সভ্যতার সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে। নীলনদের প্লাবনে জমির উর্বরতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে এমন প্রত্যাশা দিয়েই শুরু হতো তাঁদের বছর। ৭০ দিন অন্ধকারে থাকার পর আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা লুব্ধক যেদিন আকাশে হতো সেদিন থেকেই শুরু হতো নতুন বছর। মিশরীয়রা উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে নতুন শুরুকে বরন করে নিত। এ উৎসবকে বলা হতো ডবঢ়বঃ জবহঢ়বঃ যার বাংলা ‘নতুন বছরের শুরু’। নতুন বছরকে তারা পুনর্জন্ম ও পুনর্যৌবনপ্রাপ্তি হিসেবে বিবেচনা করত। আজকের দিনের অনেকের মতো সে-সময়েও অনেকে মদ্যপান করার উপলক্ষ হিসেবে দিনটিকে ব্যবহার করতো।

চাইনিজ নববর্ষ

সবচেয়ে পুরানো ঐতিহ্যে এখনো যে নতুন বছর বরণ করে নেয়ার অনুষ্ঠান উদ্যাপিত হয়, সেটি হলো চাইনিজ নববর্ষ। প্রায় তিন হাজার বছর ধরে এ ঐতিহ্যকে লালন করে আসছে চাইনিজরা। বছরের প্রথম ফসল চাষের সাথে নতুন বছরের সম্পর্ক থাকলেও পরবর্তীতে এ-উৎসবের সাথে যুক্ত হয়ে যায় কিছু মিথ আর রূপকথা। সবচেয়ে প্রচলিত রূপকথার একটি হলো, বছরের প্রথম দিন ক্ষুধার্ত দৈত্য ‘নিয়ান’ পাহাড় থেকে গ্রামে নেমে আসে শিকার করার জন্য। ফসল, গবাদিপশু এমনকি ছোট্ট শিশুরাও বাদ যায় না নিয়ানের হাত থেকে। একবার নিয়ান লালরঙা পোশাকপরা এক শিশুকে দেখে ভয় পেয়ে যায়। তা দেখে পরের বছরে গ্রামবাসীরা ঘরগুলো সাজায় লাল রঙের নানা অলংকরণে। বাঁশে আগুন জ্বালিয়ে আর নানা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে উচ্চশব্দ করতে থাকে তারা। কাজ হয় এতে। নিয়ানকে ভয় দেখিয়ে তাড়ানোর রঙিন এ কৌশল ধীরে ধীরে উৎসব উদ্যাপনে পরিণত হয়। আর কালে কালে এ উৎসবের ব্যাপ্তি বাড়তে বাড়তে ১৫ দিনে এসে পৌছে। নতুন বছরকে কেন্দ্র করে চাইনিজরা ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে থাকে, অনেক আগের বছরের বাকিবাট্টা শোধ করে দেয়। রঙ্গিন কাগজে ঘর সাজায়, পরিবারের স্বজনদের নিয়ে বিশেষ ভোজের আয়োজন করা হয়। দশম শতাব্দীতে যখন গানপাউডার আবিষ্কার হয়, চাইনিজরাই প্রথম নতুন বছরকে বরণ করে নিতে আতোশবাজি পোড়ানো শুরু করে। জানুয়ারি শেষ অথবা ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে চাঁদ ওঠার উপর নির্ভর করে চাইনিজ নববর্ষ উদ্যাপন। চাইনিজ রাশিচক্রে প্রতিবছর একটি প্রাণীর নামে বছরের নামকরণ করা হয়। এবছর ছিল গড়হশবুবুধৎ বা বানর বছর।

নওরোজ নববর্ষ

নওরোজ পার্সিয়ান শব্দ, এর অর্থ নতুন দিন। প্রায় তিন হাজার বছর ধরে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে নববর্ষ উৎসব হিসেবে নওরোজ পালিত হয়ে আসছে। ইরানের প্রাচীন জরাথ্রুস্থয়ান ঐতিহ্যমতে সূর্যের উত্তরায়নে যেদিন দিনরাত সমান থাকে সেদিনই পালিত হয় নওরোজ। সাধারণত ২১শে মার্চ বা পারস্য ক্যালেন্ডার মতে ২১শে মার্চের ২/১ দিন আগে বা পরে সূর্যের বসন্ত বিষুবের দিন শুরু হয়ে থাকে পারস্যদের ঐতিহ্যবাহী নওরোজ উৎসব। এ উৎসব চলে ১৩ দিন পর্যন্ত। অন্যান্য প্রাচীন বর্ষবরণ ঐতিহ্যের মতো এটিও বসন্ত উৎসব। এ-উৎসবের সময় রাজারা বিশাল ভোজের আয়োজন করত, যেখানে কোনো মিতব্যয়িতা থাকত না। নওরোজ উৎসব পালনকারীরা নিজের মধ্যে উপহার বিনিময় করত। আগুন জ্বালিয়ে, ডিম রং করে, পানি ছিটিয়ে উৎসবের মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হতো। সময়ের সাথে সাথে নওরোজ উৎসবের অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও এখনো টিকে আছে আগুন জলানো আর ডিম রং করার ঐতিহ্য।