সোমবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯
হোম / পার্শ্বরচনা ও অন্যান্য / স্মার্ট প্যারেন্টিং- দুষ্টুমি ও শাস্তি
০৭/২৭/২০১৯

স্মার্ট প্যারেন্টিং- দুষ্টুমি ও শাস্তি

-

মাত্র অফিস থেকে ফিরেই ফ্যান ছেড়ে ড্রয়িং রুমটায় বসলেন, ওমনি বাচ্চাটা কোত্থেকে ঝাঁপিয়ে কোলে এসে জুটল। দারুণ খুশি আপনি, কিন্তু কোলে এসেই শেষ না, সেকেন্ডেই নেমে গিয়ে সে একবার সোফায় চড়ে তো দেয়াল বেয়ে ওঠার চেষ্টা করে আবার ব্যুকশেলফে বাড়ি খেতে নেয় কত কি! কতক্ষণ আর চোখে চোখে রাখা যায়, এই শুরু হতে থাকে মেজাজ খারাপ। আর সেই থেকে যেন আপনার ৫ বছর বয়েসি বাচ্চা সন্তানের সঙ্গে আপনার
মনোমালিন্য না হয়ে যায়। এজন্যই আপনাকে হতে হবে পরিমিত ও বিচক্ষণ। বিশ্বাস করুন, সন্তানের দুষ্টুমির এই মারাত্মক সমস্যায় আপনি একা নন, আমরা সবাই ই পড়েছি, পড়ছি নিয়তই। আর তাই এর সমাধানও খুবই সহজ।

বাচ্চারা দুষ্টুমি কেন করে

প্রথমেই আমাদের বোঝার চেষ্টা করতে হবে যে দুষ্টুমিটি বাচ্চাটা করছে সেটা সে কেন করছে। সেটা যদি কোনো নির্দিষ্ট কারণে হয়ে থাকে, সেই কারণটা পূরণ করলেই কিন্তু বাচ্চাটা থেমে যাবে। কিন্তু কেবল তার চাহিদা পূরণ করলেই কিন্তু হবে না। তাকে বুঝাতে হবে ভবিষ্যতে যেন সে এই দুষ্টুমিটা আর না করে। ধরুন, আপনার শিশুটি রেস্তোরাঁয় গিয়ে দারুণ
ণ লাফালাফি করছে, ইচ্ছে করে আপনাকে এ€^্যারাস করার ট্রাই করছে, কারণটা এমন হতে পারে যে, সে চাচ্ছে আপনি তাকে আইসক্রিম কিনে দেন। আপনিও জানেন তাকে আইসক্রিম কিনে দিলে সে চুপ হয়ে যাবে। কিন্তু এখানে তাকে কেবল আইসক্রিম কিনে দিলে তাকে সাহসই দেওয়া হবে ভবিষ্যতেও এমন করার জন্য, যেটা তার দুষ্টুমির মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে কয়েক শত গুণ। আপনার উচিত হবে তাকে প্রথমে বুঝিয়ে বলা কেন তার এরকম করাটা ঠিক হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত আপনি জানতে চাইবেন তার আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে হচ্ছে কি না। সে হ্যাঁসূচক মাথা নাড়লে এবার তাকে বোঝাবেন কেন বাবা-মা হিসেবে আপনারা আইসক্রিম খেতে বারণ করেন, এসময় শারীরিক অসুস্থতার ভয় দেখানো যেতে পারে। এরপর আপনি তাকে আইসক্রিম কিনে দেবেন এই শর্তে, যেন সে এরকম দুষ্টুমি আর না করে। মনে রাখবেন, আপনার সন্তান কিন্তু অবুঝ নয়। তাকে বকাঝকা না করে, বোঝালেই সে বুঝবে।

দুষ্টুমি : কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য হাসিল করতে হাইপার এক্টিভ আচরণ।

শাস্তি : সন্তানকে বোঝানো ও ভবিষ্যতে এমন না করার শর্তে উদ্দেশ্যটি পূরণ করা।

এমন অনেক সময় দেখা যায় বাচ্চাকাচ্চারা কোথাও কিছু একটা দেখে সেটা নকল করে দুষ্টামি করছে। যেমন ছোটবেলায় আপনি নিজেও করেছেন ম্যাকগাইভার কিংবা গডজিলা দেখে। বাচ্চা হিসেবে এই অপরাধটা গুরুতর কেননা এই দুষ্টুমির অধিকাংশই সুপারহিরো ধরনের, আর এর মানেই দুর্ঘটনার স
সম্ভাবনা। তাই এক্ষেত্রে শাস্তিটাও কিছুটা গুরুতর। প্রথমেই আপনাকে বুঝতে হবে সন্তান কোত্থেকে এই দুষ্টুমিটা শিখল। জানবার পরে অবশ্যই আপনার উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতিতে এটা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। চেষ্টা করতে হবে যেন সে এরকম কোনো কিছুই আর না দেখে। আর তা যদি স€¢ব না হয়, তাহলে তার সেই নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানটাকে আপনি রিওয়ার্ড হিসেবে দেখাতে পারেন, সে যদি এমন দুষ্টামি আর না করে সারাদিন, তাহলে সে আধঘন্টা দেখতে পারবে, এমন কিছু।

দুষ্টুমি : টিভি থেকে দেখে নকল করা।

শাস্তি : টিভিতে তার দেখার অনুষ্ঠান সীমিত করা ও পর্যবেক্ষণে রাখা।

অনেক সময়েই কোনো কারণ ছাড়াই আপনার শিশু সন্তানটি অফ ট্র্যাক আচরণ বা দুষ্টুমি ধরনের কিছু করতে পারে। অযথা বিরক্ত করা, ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হওয়া (রং ছড়ানো, কাগজ ছেঁড়া)। এরকম কিছু করলে আমাদের রেগে যাওয়া টাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের মাথায় রাখতে হবে এই বয়সে তার সাথে রাগারাগি করতে গেলে হিতে-বিপরীত হবার সম্ভাবনাই বেশি। তাকে ভয় পাইয়ে নয়, এক্ষেত্রে বুঝিয়েই সর্বোচ্চ সফলতা লাভ করা স€¢ব। তাই এইখানে শাস্তিটাও শূন্য। সন্তানের সাথে নিজের সম্পর্ক আরো ভালো করে তোলাটাই বরঞ্চ মুখ্য। সে এরকম কিছু করলে তাকে পাশে বসিয়ে তার সাথে কথা বলুন। তাকে বোঝার এবং বোঝানোর চেষ্টা করুন। এক ধরনের নির্ভরতা হয়ে উঠুন আপনার সন্তানের যেন সে আপনাকে তার বন্ধু মনে করে।

দুষ্টুমি : কোনো কারণ ব্যতীত ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হওয়া।

শাস্তি : কোনো শাস্তি না দিয়ে সন্তানের সঙ্গে আরো সহজতর সম্পর্ক তৈরি করা।

ইতিবাচক বা পজিটিভ প্যারেন্টিং-এ ডিসিপ্লিনারি আচরণ কম থাকলেও ভবিষ্যতে দেখা গিয়েছে সন্তানেরা বুঝদার এবং ধীস€úন্ন হয়ে গড়ে উঠতে পেরেছে। কিন্তু নেতিবাচক আচরণে তার ভেতরে তৈরি হওয়া ভয় বেশিরভাগ সময়েই শৈশবের পরেও তার ভিতরে থেকে যায় ও তাকে জটিল করে তোলে। পড়াশোনা, খেলাধূলা অথবা নিছক গল্পে আপনার উচিত আপনার সন্তানের বন্ধু হয়ে ওঠা। বাবা-মার ভয়ে না পড়ে সে যেন তার বন্ধুর মুখে হাসি তোলার জন্য পড়াশোনা করতে উদ্গ্রীব হয় সেই খেয়ালটুকুই রাখতে হবে।
জানি, ভাবছেন, বকাঝকা না করে কি করে সন্তান বেড়ে ওঠা স€¢ব? কেবল কাগজে কলমে লিখলেই হয়ে যায় না? তাহলে ধৈর্য ধরে দু’সপ্তাহ আপনার সন্তান কে না বকে, তাকে বুঝিয়ে এবং শাস্তিগুলোও তার বোঝার সাপেক্ষে পুরস্কারের মতো করে দিয়েই দেখুন না, আপনার সন্তানের সাথেই আপনার সম্পর্কটা আরো সহজতর হয় কিনা!


--শাফায়াত সোপান