রবিবার,২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭
হোম / সম্পাদকীয় / বাংলা নববর্ষ : আমাদের ঐক্য ও ঐতিহ্যের অম্লজান
০৪/১৬/২০১৬

বাংলা নববর্ষ : আমাদের ঐক্য ও ঐতিহ্যের অম্লজান

-

ঋতুরাজ বসন্তের মলয় বাতাস জুড়িয়ে দেয় প্রাণ। কোকিলের কুহুরব মাতোয়ারা করে গ্রামবাংলা। বিবর্ণ, বিষণ্ণ মনে নতুন রং লাগায়। আর এই বসন্তের হাত ধরেই আমরা শুনতে পাই বাংলা নববর্ষের পদধ্বনি। প্রকৃতিও যেন উদ্যাপন করে বৈশাখকে- ফুল-ফলময় করে গড়ে তোলে। বৈশাখ কত অকৃপণ, এ-জগৎ কত সুন্দর, নান্দনিক, প্রাণময়- আমরা আয়তনয়নে দেখতে পাই এর নব-নতুন নন্দনকানন। ফুল-ফল সম্ভারে রসালো বৈশাখ আমাদের সেই অমরাবতীর কথা শোনায়- যেখানে দুঃখ আছে, মৃত্যু আছে, তারই পাশাপাশি আছে নতুন দিনের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হয়ে আমরা মেতে উঠি নতুন সৃজনে।
যেসব উৎসব আমাদের মধ্যে বিভেদের রেখা মুছে দেয়, তার মধ্যে বাংলা নববর্ষ অন্যতম প্রধান। সম্প্রতি এই উৎসবকেও কলুষিত করার চেষ্টা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এই উৎসব এটা বিরোধী ওটা বিরোধী ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ সৌর-বর্ষভিত্তিক এই বাংলা সন চালুই হয়েছিল বাংলার ঋতুভিত্তিক কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়ের সার্বিক দিক বিবেচনা করে। এ কারণে বাংলা পঞ্জিকাকে বলা হয় ফসলি পঞ্জিকা। গ্রীষ্ম ও বর্ষা হলো আউশ ধানের, শরৎ ও হেমন্ত আমন ও পাটের এবং শীত ও বসন্ত রবিশস্য ও বোরো ধানের। এখনো আবহমান বাংলায় বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী বছর ধরা হয় ব্যবসার ক্ষেত্রে। এ কারণে চৈত্র মাসের শেষ দিনগুলো চৈত্রসংক্রান্তি এবং নতুন বছরের প্রথম দিনের উৎসব হালখাতা হিসেবে প্রচলিত। প্রাকৃতিকভাবেও বাংলা পঞ্জিকার গুরুত্ব আন্তর্জাতিক। বাংলা পঞ্জিকা কেবল বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গ নয়, সারা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একই সময়ে (১৪-১৫ এপ্রিল) বিশেষ ধুমধামের সঙ্গে পালন করা হয় এই নববর্ষ। এসব দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে কম্বোডিয়া, লাওস, থাইলান্ড, মিয়ানমার, চীন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার কিছু অংশ; শ্রীলংকা, পাঞ্জাব, কাশ্মীর, তামিলনাড়–, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরালা, ওড়িয়া, বিহার, আসামসহ সমগ্র উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারত; ভুটান এবং নেপাল।
মাটি ও প্রকৃতি এমনই বস্তু, যা নির্ধারণ করে দেয় মানুষের কর্ম ও যাপিতজীবন। তাই, যতই বিভেদরেখা টানার চেষ্টা হোক বাংলা নববর্ষ নিয়ে, এটা আসলে আমাদের জীবনেরই অংশ। ক্রিকেট, ফুটবল বিজাতীয় খেলা হয়েও আমাদের প্রাণের খেলা হয়ে উঠতে পেরেছে। প্রত্যন্ত জনপদ থেকে এখন আমরা মুস্তাফিজের মতো ক্রিকেটারও পাচ্ছি। তার কারণ এই খেলাকে সর্বান্তঃকরণে গ্রহণ করেছি আমরা। এখানে কোনো ভিন্নমত বা ভেদাভেদ নেই। তাহলে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনে কেন ভেদাভেদের প্রশ্ন উঠবে? কেন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হেনস্থার শিকার হবে উৎসবমুখর নারীরা? রমনাবটমূল থেকে কেন মূলোচ্ছেদের চেষ্টা হবে বোমা হামলার মাধ্যমে?
সময় এসেছে সারা বিশ্বকে চক্ষু মেলে দেখবার। সেই সঙ্গে দৃষ্টি দিতে হবে নিজের অন্তরের দিকে, নিজের মাটি ও প্রকৃতির দিকে। তাহলেই বুঝতে পারব, আমরা আলাদা কেউ নই। একটি সূক্ষ্ম বিনিসূতায় গেঁথে রয়েছি সবাই পরস্পরের সঙ্গে।
সকল ভেদাভেদ ভুলে নিজেকে রাঙাতে হবে উৎসবের রঙে।

তাসমিমা হোসেন