সোমবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯
হোম / বিনোদন / নতুন এক রূপকথার রূপায়ণ
০৭/১৮/২০১৯

নতুন এক রূপকথার রূপায়ণ

-

গত ১০ মে, ২০১৯ তারিখে ঢাকার সেগুনবাগিচার শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল মঞ্চে সন্ধ্যে সাড়ে সাতটায় উদ্বোধনী প্রদর্শনী হলো নতুন নাটক ‘ঘুমকুমারী’। নাটকটি রচনা করেছেন ড. আফসার আহমদ এবং নির্দেশনা দিয়েছেন রবাইৎ আহমেদ। গল্প উপস্থাপনের অসাধারণত্বে টানটান উত্তেজনায় প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় দর্শককে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ধরে রাখে। নাট্যকার তার বক্তবে যদিও উল্লেখ করেছেন এটি দ্য স্লিপিং বিউটি গল্পের ছায়া অবল€^নে। কিন্তু নাটকে যে বাস্তবতা তা বাংলাদেশের গ্রামীণজীবনের রূপকথার গল্পকেই প্রতিনিধিত্ব করে। বলার ঢঙ, গল্পের গাঁথুনি নতুন এক শিল্পসত্যে রূপান্তরিত করেছে। মনেই হয় না কোনো একক রচিয়তার লেখা। এ যেন যুগ যুগ ধরে বহমান বাঙালি সমাজের প্রচলিত রূপকথার মতোই। এ গল্প বাঙালির শিল্পরুচির জারিত রসেই সিক্ত।
নাটকের কাহিনিতে দেখা যায়Ñভাগ্যবিড়€ি^ত বঙ্গদেশের রাজপুত্র ঘুরতে ঘুরতে হাজির হন কাঞ্চনপুর নামের রাজ্যে। সেখানে এসে জানতে পারেন রাজ্যটির দুর্দশার কাহিনি। সে দেশের রাজার ত্যাগ ও সাধনায় প্রাপ্ত কন্যা সন্তান লাভ করলেও পঞ্চদশ বয়সে এক ক্ষুব্ধ পরীর চক্রান্তে রাজকন্যাটি ঘুমিয়ে পড়েন চিরদিনের জন্য। তার ঘুমের সাথে সাথে ঘুমিয়ে পড়ে সমস্ত রাজ্য।

সবাই জানে কোনো রাজপুত্র এসে রাজকন্যাকে ঘুম ভাঙালে সবাই জেগে উঠবে। কিন্তু তা কী করে স€¢ব। অবশেষে বঙ্গদেশের রাজপুত্র অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে রাজপুরীতে প্রবেশ করে। কিন্তু রাজকন্যাকে জাগাবে কীভাবে। রূপকথার রাজ্যের সেই সোনার কাঠি রূপার কাঠি তো শিয়রে নেই। রাজকন্যার প্রেমে পড়ে যায় রাজকুমার। রাজকুমার তাকে জাগাতে বহুবিধ চেষ্টা করেও ব্যর্থই হন। অবশেষে ব্যর্থতাকে ঢাকতে রাজপুত্র নিজের আঙুল কেটে রক্ত দিয়ে ভালোবাসা-চিহ্ন অক্ষয় করে যেতে চান। কিন্তু কপালে রক্তের ছোঁয়া পেয়ে রাজকন্যার ঘুম ভেঙে যায়। কারণ দুষ্ট পরীর শর্তই ছিল কোনো রাজপুত্র নিজের রক্ত দিয়ে রাজকন্যার কপালে রক্ততিলক এঁকে দিলে ঘুম ভাঙবে তার। রাজকন্যা জেগে ওঠে স্বপ্নে মেঘে দেখা তার রাজকুমারকেই যেন খুঁজে পান। এভাবেই কাহিনি এগিয়ে চলে।

নাট্যকার অনুবৃত্তির কোনো আশ্রয় নেননি। স্বতন্ত্র গল্প তৈরিতে সচেষ্ট ছিলেন। গল্পের নানাবাঁকে নানাভাবে কথাশিল্পের নানা কুশলী প্রয়োগবিদ্যার আশ্রয় নিয়েছেন। নাটক কিংবা গল্প-গাথার নানাপ্রচলিত বিষয়কেও নবব্যঞ্জনায় উপস্থাপন করেছেন। গল্প প্রধান বিনোদননির্ভর নাট্য উপস্থাপনায় এটি অনবদ্য গুরুত্ববহ। উপস্থাপনের সরলতা থাকলেও নানানাট্যিক অলংকার তৈরি হয়েছে মঞ্চে। রাজার বীরত্ব বোঝাতে গ্রিক ইডিপাস নাটকের মতো তিনটি প্রশ্নের অবতারণা করেছেন। এটি যে নাটক কিংবা রূপকথা দেখছেন তেমন দর্শক মনোযোগ ভাঙনি বৈচিত্র্যও তৈরি করেছেন। নৃত্য-গীত-অভিনয়ে বাঙলার শিল্পঐতিহ্যিক দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পের আলোকে উপস্থাপন করেছেন।

নির্দেশকের নির্মাণ কৌশলেও প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে গল্পের উপস্থাপন। দৃশ্য নির্মাণে মেটাফোর তৈরি করা কিংবা ইমেজ তৈরি করার চেয়ে নিরাবরণ খোলা মঞ্চে সাজেস্টিক বিভিন্ন মাত্রার ব্যবহার ও কোরিওগ্রাফির মাধ্যমে ঘটনার ক্রমপ্রবহমানতার দিকে জোর দিয়েছেন। স্পেস ব্যবহারে নানাবৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করেছেন। কখনো কখনো নাট্যচরিত্র দর্শক মধ্য পর্যন্ত চলাচল করেছে। নির্দেশকের লক্ষ্য ছিল আলোর বর্ণিল বিভায় মিউজিকের মূর্চ্ছনায় কোরিওগ্রাফি-নৃত্য-গীত, অভিনয় ও সাজেস্টিক মঞ্চবিন্যাসে কাহিনি উপস্থাপন। সোনারকাঠি রূপারকাঠি নয়; রক্ততিলকে জেগে উঠা প্রভৃতি বাঁকনির্ভর রূপকথা আশ্রিত অসাধারণ এক গল্প অপরূপ পরিমিতিবোধে দৃশ্যের পর দৃশ্যে ফুটে উঠেছে মঞ্চে।
অভিনয় নিয়ে প্রচুর ভাববার আছে। কণ্ঠ-সংলাপ, আলো ও পোশাক নিয়েও নতুন করে ভাববার আছে। নাটকটি প্রসেনিয়াম মঞ্চে উপস্থাপিত। রূপকথার অবাস্তবতা কিংবা ভাড়ামির কোনোটাই উপস্থাপনাটিকে স্পর্শ করতে পারেনি। নিছক বিনোদনই সুখানুভূতির আবেগে আপ্লুত করেছে। সংগীত তো চরিত্রের আবেগের চেয়ে দর্শকের আবেগ সৃষ্টিতেই তৎপর ছিল। নানাত্রুটি থাকতেই পারে। যারা জীবনে কখনো নাটকই দেখেনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের এমন প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের দিয়ে এত চমৎকার উপস্থাপন নিঃসন্দেহে কৃতিত্বের।


--আবু সাঈদ তুলু