বৃহস্পতিবার,২২ অগাস্ট ২০১৯
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / অ-সুখের শব্দ
০৭/১৮/২০১৯

অ-সুখের শব্দ

- সাদিয়া সুলতানা

ভাঙনের শব্দ শোনা যায়। কখনো কড় কড় কড়াৎ। কখনো ঝমঝম, থমথম। কখনো টুকটুক, ঠুকঠুক...। মাথার ঠিক ওপরে ভাঙচুর চলছে। আর ভাঙনের সেই শব্দ আছড়ে পড়ছে নাজনীনের বুকের ঠিক মাঝখানে।
আজকাল সামান্য শব্দ শুনলেই আঁতকে ওঠে ও। বাতাসের স্রোতে উড়ে বেড়ানো প্রতিটা মিহি শব্দ ওর কানের ছিদ্রমুখে এসে কী করে যেন জোরালো হয়ে যায়। আর জোরালো শব্দগুলো হয়ে ওঠে ভয়ংকর গর্জনের মতো অসহনীয়। এই শব্দ কানের বদলে গিয়ে বাড়ি খায় ওর হৃৎপি-ে। সমস্ত শরীর নিথর করে দিয়ে। এরপর শব্দের ধারালো কাঁচটুকরো খুব যতœ করে ওর হৃদপি-কে ফালা ফালা করে কাটে। কেটে কেটে ওকে রক্তাক্ত করে, ক্ষতবিক্ষত করে ওর সমস্ত শরীর।

বিষয়টা অসুস্থতার পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। আজ অস্বস্তি একটু বেশি। রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়নি। ভীষণ কুৎসিত একটা ঘটনা ঘটেছে। শরীরী লড়াই শেষে ক্লান্ত যাবিদের নিরবচ্ছিন্ন নাক ডাকার শব্দ যখন ওর মাথার ভেতরে জাঁকিয়ে বসে ওকে ঘুমাতে দিচ্ছিল না তখনই উদ্ভট এক শব্দের তীক্ষèতা নাজনীনকে বধির করে দিয়েছিল। নাজনীন আতংকে কেঁপে উঠে ভীষণ জোরে চিৎকার করে উঠেছিল। শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে মাকে ডেকেছিল। ছোটবেলায় ঘুম ভেঙে গেলে যেমন মাকে ডাকতো, মা, ও মা...মা রে।
কেউ সাড়া দেয়নি।

একবারই, মাত্র একবারই শব্দটা শুনেছিল নাজনীন। এরপর বাধ্য হয়ে রাতভর নিদারুণ ছটফটানিতে নির্ঘুম থেকেছে। শব্দের উৎসমূল খুঁজতে একবার খাওয়ার ঘরের দিকে যাবে ভেবেছিল; কিন্তু ওর সাহসে কুলায়নি। যাবিদকে ডাকতে গিয়েও ডাকতে পারেনি। নাজনীনের চিৎকারে ঘুমের মধ্যে যাবিদ উসখুস করে উঠেছিল; কিন্তু ঘুম ভাঙেনি ওর। রতিক্রিয়া সেরে এমনই বেঘোরে ঘুমায় যাবিদ যে, কাছেধারে কোনো বিস্ফোরণ ঘটলেও সে টের পাবে না।

যাবিদ আপাদমস্তক সুখী মানুষ। পেটের ঊর্ধ্বভাগে থলথলে ভুঁড়ি, থুতনির নিচে ঝুলন্ত মাংস, প্রতিদিন বেতন পাবার মতো পকেটভর্তি কাঁচা টাকা, মুখে হিন্দি আইটেম গানের গুনগুনানি আর দুপুরের খাবার সেরে জর্দা-খয়েরসমেত ঝাঁঝালো পান চাবানোÑএকেবারে নিখাদ সুখী মানুষের পরিতৃপ্ত চেহারা যাবিদের।
নাজনীনের ধারণা, অতিরিক্ত সুখী মানুষের ওপর এক ধরনের বিকৃতি ভর করে। রুটিনমাফিক খাওয়া-দাওয়া, ঋতুভিত্তিক অসুখ-বিসুখ, রতিক্রিয়ার অভ্যস্ততা ইত্যাদি জীবনের প্রতি মানুষকে বীতশ্রদ্ধ করে তোলে। তাই মাঝেমাঝে নিজেকে বিরুদ্ধস্রোতে ভাসিয়ে সেই মানুষ বিমলানন্দ পেতে চায়, কখনো বা হিংস্র নখরে জলের সরলরেখায় বিচিত্র দাগ টেনে নতুন কোনো রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা অর্জনে আগ্রাসী হয়।

নাজনীনও সুখী। আপাতদৃষ্টিতে ওদের দাম্পত্যজীবনে কোনো অ-সুখের তালিকা নেই। তবু জীবনের এই আশ্চর্য শোকহীনতায় আজকাল অদ্ভুতরকম বিমর্ষ থাকে নাজনীন।
বিষয়টা বেশ জটিল। এই জটিল বিষয় নিয়ে যাবিদের সাথে কথা বলা যায়। তবে নাজনীনের ধারণা যাবিদ ওর কথার গভীরে যাবার কোনো চেষ্টাই করবে না। উল্টো টুথপিক দিয়ে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে দাঁতের ফাঁক থেকে মাংসের টুকরো বের করে ফের তা মুখে চালান করে দিতে দিতে হালকা চালে বলবে, ‘সারাদিন আজাইরা ঘরে শুইয়া বইসা থাকলে কত কী চিন্তা আইবো মাথায়! বলি কী শইলটারে একটু নাড়াও। আজকাল মাইয়ারা অনলাইনে কীসব ব্যবসাপাতি করে, সেই সব করো। দুইটা পয়সা আইবো।’
যাবিদের এই হালকা অথচ ঠেস মারা কথায় মনে মনে অভিমানের পাহাড় গড়ে দুঃখিনী ঘুঁটেকুড়ানির মতো অনায়াসেই সারাদিন কাটাতে পারে নাজনীন। একটা শরীরসর্বস্ব মানুষের আগ্রাসী থাবায় ইচ্ছের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত হবার দুঃখ-শোকে ঠোঁট ফুলিয়ে ফুলিয়ে কাঁদতে পারে দিনভর। এতে ওর নিস্তরঙ্গ জীবনে হয়তো নতুন একটা প্রবাহ আসতে পারে। কিন্তু নিস্পৃহ নাজনীন কিছুই করে না।
বহির্জগতের উটকো শব্দ নিয়ে মানসিকভাবে যতটা বিক্ষিপ্ত থাকে নাজনীন, ঠিক ততটাই উদাসীন থাকে যাবিদের মুখে এ ধরনের কথাবার্তা শোনার পর। উদাসীনতা না বলে এক্ষেত্রে অভ্যস্ততা শব্দটা ব্যবহার করা হয়তো বেশি যৌক্তিক।
আবার শব্দ হচ্ছে। এবার ঠাস-ঠাস, দ্রুম-দ্রুম শব্দাতঙ্কে বুকের উষ্ণতা ক্রমশ শীতল হয়ে আসছে ওর। বাড়িওয়ালা তিনতলার কাজ শুরু করার পর থেকে ও এই যন্ত্রণা থেকে কিছুতেই নিস্তার পাচ্ছে না।

দুপুরের খাওয়া সেরে মিস্ত্রিরা আবার কাজ শুরু করেছে। চলন্ত রিকশার সরসর শব্দ আর টুংটাং ঘণ্টাধ্বনি, পথচারীদের হট্টগোল, হঠাৎ হঠাৎ গাড়ির চাকার ঘ্যাসঘ্যাসে শব্দের সাথে হর্নের বিকট আওয়াজ কিংবা ছাদের কার্নিশ ভেঙে রড বের করার শব্দÑএসব শব্দের প্রচ-তা থেকে থেকে ক্ষতবিক্ষত করছে ওকে।

আর সহ্য হয় না এসব। টেবিলে খাবার ফেলে উচ্ছিষ্ট মাখা হাতে বিছানায় শুয়ে কানে বালিশচাপা দেয় নাজনীন। পিছু পিছু একটা মাছি উড়ে এসে কানের কাছে ভনভন ভনভন করে ওকে আরো বিরক্ত করার চেষ্টা করে।
দুপুরের খাবারের বিরতিতে কাকেরা ছাড়া কেউ ছিল না এই গলিতে। একটা কাক মারা গেছে একটু আগে। বিদ্যুতের ঝটকায় কালো তারের জাল থেকে ছিটকে রাস্তায় পড়েছে। মিনিটদশেক সময়ের জন্য বিদ্যুৎ ছিল না। এখন আবার খট করে পাখা চলতে শুরু করেছে। এই শব্দটা এবার ওর মাথার খুলি বিদীর্ণ করে মগজের নরম ভাঁজে আটকে যায়, খটখট...খটখট শব্দ করতেই থাকে।
অসহিষ্ণু নাজনীনের শরীর মাথা ব্যথার প্রচ-তায় কুঁকড়ে যায়। সেই সাথে ওর মনে নতুন এক উপলব্ধি জাগে; তাই তো, ব্যথার কোনো শব্দ নেই। শরীরী যাতনায় যতই কাতরে উঠুক না কেন মানুষ, ব্যথা শব্দহীন পায়েই আসে।

এবার রড কাটার শব্দ আসছে। ঝনঝন শব্দে খুলির একেবারে মাঝখানে আছড়ে পড়ছে ভারি ভারি রড। নাজনীন উপুড় হয়ে বালিশের ভেতরে মাথা গুঁজে দেয়। চারপাশের কোনো ভারি বা সূক্ষ্ম শব্দ এখন এড়াতে পারে না ও। এমন কী বাড়ির দেয়ালঘেঁষা মেহগনি গাছের প্রতিটা পাতা ঝরে পড়ার নমনীয় শব্দও তীরের বেগে ছুটে এসে ওর কানের লতিতে সজোরে ধাক্কা মারে।
যাবিদ যতক্ষণ বাসায় থাকে ততক্ষণ বাসায় শব্দের অবিশ্রান্ত ঝড় থাকে। একটা সেকেন্ডও শব্দহীন থাকতে পারে না সে। সেই সময়টুকু বড় বিপন্ন লাগে নাজনীনের। সকালে নাস্তা খাওয়ার ছপছপ শব্দ আর খাওয়া শেষে বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে যাবিদের কুলকুচার ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দ ওর শরীরকে এত অসুস্থ করে তোলে যে আজকাল একসাথে নাস্তা করতে বসে না নাজনীন। এ নিয়ে সামান্য ভ্রকুঁচকে যাবিদ স্থ’ূলরসিকতা করে, ‘একলা একলা কি দুই একপদ বেশি খাইবানি। না আমার সামনে বড় নোলা কইরা খাইতে শরম করে’বলে ঠা ঠা শব্দে হাসে।

যাবিদ অফিস চলে গেলেও ঘরের চারদেয়ালে সেই ঠা ঠা শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। স্বস্তি পেতে রান্নাঘরে ঢুকে কাজে লেগে যায় নাজনীন। রান্নাঘরের বাসন-কোসনের মুখরতায় ওর ভেতর-বাইরের অস্থিরতা ক্রমশ থিতিয়ে আসে।
গত দুই বছর ধরে এভাবে একই তালে এই বাড়িতে নাজনীনের এক একটি দিন কেটে যাচ্ছে।


২.
চল, চল, চিনির দলা দেখা যাচ্ছে। লাল লাল মোটা দানার চিনি। দর্শনার। কতদিন পর! আমার শুঁড় লালায় ভিজে গেছে।
তোর নোলা ঝোলা। অত লোভ করিসনে। বউটা মারবে।
মারবে না। বউটা উদাসীন। মায়াবী। সাহসও কম। দেখছিস না আমাদের দেখে হৈ হৈ করে ছুটে আসার বদলে কেমন খাটের ওপর পা তুলে বসে আছে।
দুপেয়ে মানুষ দেখে অত তাড়াতাড়ি খাবারের মতো ওদের স্বাদ-গন্ধ বিচারে বসিস না।
তুই নিজে মানুষের ঘরে থাকতে থাকতে ওদের মতো হয়ে যাচ্ছিস। মনের ভেতরে গোবরে পোকার গন্ধ।
ক্ষ্যাপাবি না। কামড়ে দিবো।
চল চল, তোর কামড়কে যেন খুব ভয় পাই।
নাজনীনের বিশ্বাস হচ্ছে না, এমন কিছু ঘটতে পারে বা ঠিকঠাক ওর চোখের সামনেই ঘটছে। গুনগুন গুনগুন শব্দের দ্যোতনায় দুটো লালপিঁপড়ে ওর পায়ের নিচ দিয়ে টেবিল বরাবর চলছে। এদের কথোপকথন পুরো স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে ও। দেখতে দেখতে সরলরেখায় সামিল হচ্ছে অসংখ্য শিকারি পিঁপড়া। ওদের পিলপিল পিলপিল পথচলার শব্দ আদতে গমগমে, ভারি। চিনির প্যাকেট সরাতে ব্যাকুল না হয়ে নাজনীন চুপচাপ শৃঙ্খলাবদ্ধ পিঁপড়েদের হৈ-হট্টগোল শুনতে থাকে।
বারান্দায় ছটফট করতে করতে এদিকওদিক ছোটে দুটো আদুরে চড়ুই। কিচকিচ করে ওকে ডাকে।
আজ দুপুরে বারান্দায় খুদ ফেলোনি মেয়ে?
একটা ঘুঘু মেহগনির ডালে বসে ঘাড়ের বাদামি পালক ফোলায়। সাথে কর্কশকণ্ঠে কা কা রব তোলে শহরের সবচেয়ে নির্লজ্জ পাখির দল।

আমাদের ভাত দিতেও ভুলে গেছো? পানির মগটি পর্যন্ত খরখরা!
দিনতিনেকের মধ্যে প্রাথমিক বিস্ময় আর আতঙ্ক কেটে যায় নাজনীনের। এখন বিষয়টা উপভোগ করে ও।
পাখি, পতঙ্গকুল, পতঙ্গভূক পোকা বা প্রাণী যাদের সরব বা নীরব উপস্থিতি এই বাসার চৌকাঠজুড়ে, তাদের প্রাত্যহিক আলাপচারিতায় কী করে মানুষ আর উচ্চমাত্রার দার্শনিক চিন্তা ঢুকে যায় তা জেনে রীতিমতো মুগ্ধ নাজনীন। এই মুগ্ধতা জেগে ওঠার সাথে সাথে ওর শব্দাতঙ্ক কেটে গেছে। শ্রবণেন্দ্রিয় এখন কোনো চেনা-অচেনা শব্দে উত্যক্ত বোধ করে না। বরং শব্দের পৃথক পৃথক মাত্রা অনায়াসেই ধরতে পারে ও।
আজকাল রাতে যাবিদের নাক ডাকার ঘড়ঘড়ে শব্দের মাঝেও নাজনীনের দুচোখের পাতা ঘুমে লেপ্টে আসে। মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে গেলে নৈঃশব্দ্যের অখ-তায় হঠাৎ বেডসাইড টেবিলের ড্রয়ার খোলার শব্দ বা ওর ‘মাই ডিয়ার ডায়েরি’র পাতা ওল্টানোর খসখসে শব্দ বুকে আর তোলপাড় করে ভাঙন তোলে না। এমনকি ওর সাইলেন্ট মুডের মোবাইলের টাচ স্ক্রিনের নিঃশব্দে আলো জ্বলে ওঠায় আগ্রাসী টিকটিকিটা ক্ষেপে উঠে টিকটক টিকটক করে উঠলেও কোনো ভাবান্তর হয় না নাজনীনের।

দা€úত্য স্বত্ব চর্চায় নিবেদিত একজোড়া কামুক হাত রোজ রাতে ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে সুখে-তৃপ্তিতে অবিরাম জান্তব আওয়াজ তুললেও ওর বুকে জমা হিমশীতল বরফখ- চুইয়ে একফোঁটা পানি পড়ার শব্দ হয় না। এ এক অদ্ভুত নিঃস্পৃহতা। শরীরের সবচেয়ে নাজুক গহ্বরে বিষধর সাপের ছোবলে সমস্ত শরীর বিষে নীল হয়ে গেলেও মুখে বাক্সময় কোনো ধ্বনি ফোটে না। কেবল টের পায় বিষ ঢালা শেষ হলে সরসর শব্দে সাপটি শরীর থেকে নেমে যায়।
প্রতি রাতে বিষের ক্লেদ শরীরে মেখে গেলে ও অস্থির হয়ে বিছানা ছাড়ে। থপথপে পা ফেলে বাথরুমে ঢুকতে ঢুকতে নাজনীনের মনে পড়ে জাদুঅনুভবে কেউ বলতো, ‘আমার মায়ের হাঁটাচলায় কোনো শব্দ নাই। মাটিরেও দুঃখ দেয় না আমার মা। বড় লক্ষ্মী মেয়ে আমার, বড় পয়মন্ত। রাজপুত্রের মতো বর পাইবো।’

স্মৃতির ঠকঠকানি বন্ধ করতে মাথায় ঝপঝপ করে মগভর্তি পানি ঢালে নাজনীন। শরীর জুড়িয়ে এলে মাথার ওপরের কৃত্রিম ঝরনা ছেড়ে দিতেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি হতে থাকে। নির্মল ঠান্ডা জলরাশিতে উরুসন্ধির আঁঠালো প্যাঁক ধুয়ে যেতে যেতে ওর শরীরে নিজের স্পর্শে কামভাব জেগে ওঠে। নিজের শুভ্র কোমল প্রতিটা অঙ্গ ছুঁয়ে দেখতে দেখতে অপার্থিব এক অনুভবে তীব্রভাবে তৃপ্ত হয় নাজনীন। বহুদিন যা পায়নি তা পেয়ে লোভীর মতো উপভোগ করে সেই স্বর্গীয় সুধা।
আহ! এত সুন্দর এই শরীর! এত কোমল শরীরের আনন্দানুভব! এ যেন বিনাতারে বীণার ঝংকার ওঠা।
আজও গোসল সেরে চটচটে চাদরের ওপরে শুয়ে থাকা যাবিদের পাশে আলগোছে শুয়ে পড়ে নাজনীন। ওর দুচোখের পাতা বারবার বন্ধ হয়ে আসতে চায়। কিন্তু প্রতিবারই ও পাখিদের ডানার ঝাপটানি শুনে কান পেতে রাখে।
বিচিত্র সব শব্দ করতে করতে আকাশ চুইয়ে নামা তরল অন্ধকারে মিশে যায় নাম না জানা পাখির ঝাঁক। নাজনীন কান খাড়া করে।
এখানটায় মৃত্যুপুরীর মতো অন্ধকার। দেখেছো? কেমন নিস্তব্ধ চারপাশ?
হুম, অন্ধকারেও ঠিক দেখতে পাই। মৃত্যুপুরীই। যেখানে কোনো কোনো মানুষ রোজ একবার করে মরে।
কঠিন কথা।
কিছু মানুষের জীবন বড় কঠিন। নিজেরাও জানে না কতটা অসুখী তারা।
হুম। এত অ-সুখ দেখতে আর ভালো লাগে না। ইচ্ছে করে ধাই ধাই করে আগুন জ্বেলে দিই। ছারখার করি সব।
ও কী কথা! মানুষের মতো অতো রেগে কথা বলছো কেন?
বলবো না!
না। চলো যাই, এই বাড়িটা পেরিয়ে সামনে গেলেই দেখবে আকাশে জোছনার চাদর বিছানো। ওম ওম আরাম সেই চাদরে।
শুনশান রাস্তায় একদল কুকুর হল্লাবাজি করে। সতর্ক পায়ে ছুটে অন্ধকার অলিগলি থেকে এরা নিজ দায়িত্বে অশরীরী উৎপাত তাড়ায়। জানালার গ্রিলে বিলি কেটে অন্ধকারের ঢেউ নাজনীনের ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। ফিনফিনে একটা হাওয়া এসে জানালার পর্দায় মৃদু দোলা দেয়। একসময় নাজনীন টের পায় সব শব্দ থেমে গিয়ে ওর শরীরের খুব কাছেই বিকট ঘড়ঘড়ে শব্দ শুরু হয়েছে। যাবিদের একটা হাত সাঁড়াশির মতো আঁকড়ে রেখেছে ওর বুকের পাঁজর।
হ্যাঁচকা টানে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় নাজনীন, পালকের মতো নরম পা ফেলে রান্নাঘরে ঢোকে। এরপর আশ্চর্য শব্দহীনতায় অন্ধকার হাতড়ে তেলের জারিকেন আর দিয়াশলাই বাকসো হাতে নিয়ে শোবার ঘরে ঢোকে ও। নাজনীনের বুকের ভেতরে শোঁ শোঁ শব্দে প্রচ- ঝড় বইছে। কতদিন কতরাত চেনা-অচেনা কত শত শব্দ এসে ওর কানে কানে বলে গেছে, ‘ধাই ধাই করে আগুন জ্বেলে দে, ছারখার করে পুড়িয়ে দে সব। পুড়িয়ে দে সব অ-সুখ।’ পারেনি ও।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ঘরের ভেতরে নানারকম শব্দের বৃষ্টি শুরু হয়। জীবনে প্রথমবারের মতো চামড়া পোড়ার পটপট শব্দ শুনতে শুনতে ঘরের আগুনআলো দেখতে থাকে ও।

মানুষপোড়া ঘ্রাণে বাতাস ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। গরম বাতাসের ঝটকা এড়াতে দ্রুত হাতে ঘরের দরজা আটকে দেয় নাজনীন। চুপচাপ পাশের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়তে পড়তে ও টের পায় আর্তনাদ স্তিমিত হয়ে এলেও সদর দরজায় ধুপধাপ বাড়ি দিচ্ছে কেউ। খুব পরিশ্রান্ত লাগছে ওর। দরজা খুলতে ইচ্ছে হচ্ছে না।
চোখ না মেলে নাজনীন শব্দহীন নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে বাতাসে উন্মুখ কান পাতে। দেখে মনে হয় ও রাতজাগা কারো জাদুমাখা কথোপকথন শোনার অপেক্ষায় আছে।