বৃহস্পতিবার,২২ অগাস্ট ২০১৯
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / আমরা বসেছিলাম পার্ক বেঞ্চের ওপর
০৭/১৮/২০১৯

আমরা বসেছিলাম পার্ক বেঞ্চের ওপর

-

আমরা বসেছিলাম... কাঠের পার্ক বেঞ্চের ওপর। আমি বসেছিলাম বেঞ্চের একেবারে ডানপ্রান্তে আর তিনি বসেছিলেন বামপ্রান্তে। আমরা এমনভাবে বসেছিলাম যেন ওভাবে না বসলে বেঞ্চটির ভারসাম্য থাকবে না। উঁচু উঁচু গাছ, আর্দ্র ঘাস আর সূর্যের উষ্ণতা পার্কটিকে পরিপূর্ণতা দিয়েছে। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘আমি বন্ধুহীন, একা এবং একাকিত্বেই আমি সুখী।’
আমি বললাম, ‘আমি বন্ধুহীন, একা এবং একাকিত্বে আমি অসুখী।’

আমি আমার ছোট্ট কক্ষে ফিরে এলাম, হাতমুখ ধুয়ে নিলাম এবং তারপর হোমওয়ার্ক শেষে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন আমরা পার্কের একই বেঞ্চে বসলাম। চারপাশে শিশুদের বল খেলার শব্দ। তিনি বলতে থাকেন, ‘আমি বন্ধু পছন্দ করি না। প্রতিটি বন্ধুত্বের পরিণামই বিশ্বাসঘাতকতা।’

আমি বললাম, ‘আমি বন্ধুদের পছন্দ করি। এটা এ-কারণেও হতে পারে এ-পর্যন্ত আমি কোনো বন্ধু পাইনি।’
ধীরে ধীরে শিশুদের খেলার শব্দ €্রয়িমাণ হয়ে আসে। রুমে ফিরে যাবার আগে রুটি ও দুধ কিনতে হবে, তাই আমি মোড়ের দোকান হয়ে ফিরি। বৃষ্টি হয় পরদিন এবং আমার পার্কে যাওয়া হয় না। পরেরদিন তিনি বললেন, ‘গতকাল তোমার জন্যে অপেক্ষা করেছিলাম।’

আমি বললাম, ‘বৃষ্টির কারণে আসতে পারিনি। আপনি কেন অপেক্ষা করেছিলেন? আমরা কি বন্ধু?’
তিনি বলতে থাকেন, ‘তোমাকে বলেছিলাম আমি বন্ধুত্ব পছন্দ করি না, বিশেষ করে নারী-পুরুষের মধ্যে বন্ধুত্বে আমি একেবারেই বিশ্বাসী নই। ভালোবাসার মুখোমুখি হওয়ার এক ভীরু প্রক্রিয়া এটি।’
প্রত্যুত্তরে কিছুই বলিনি আমি। আকাশে মেঘ জমে, তাই হঠাৎ ঝেপে বৃষ্টি নামার ভয়ে আমি রুমে ফিরে আসি, টিভি দেখি আর তারপর ঘুমিয়ে পড়ি।

পার্কের কাঠের বেঞ্চিতে বসি আমরা। অপ্রত্যাশিতভাবে তিনি আমার দিকে ঘুরে বসলেন এবং শৈশবের একটি বিষাদময় গল্প শোনালেন। আমি তার দিকে ঘুরে বসলাম এবং আমার স€úর্কিত একটা সুখময় গল্প শোনালাম। শিশুদের একটা বল এসে ঠিক তার পায়ের কাছে থামে। তিনি বলটা লাথি মারেন। তারপর আরেকটা গল্প শোনান। ফেরার পথে আমি পাঠাগার হয়ে ফিরি এবং সেখানে কিছু বর্ণিল শিশুতোষ গল্প পড়ি। আবহাওয়া কিছুটা শীতল হয়ে উঠছে মনে হয়, তাই রুমে ফেরার পথে হট কফি নিয়ে আসি।
আমি কাঠের বেঞ্চের ডানপ্রান্ত হতে কিছুটা মধ্যভাগের দিকে চেপে বসি, তিনি বামপ্রান্ত হতে কিছুটা মধ্যভাগের দিকে চেপে বসেন। তিনি আমাকে তার শৈশবের আরেকটা বেদনাময় গল্প শোনান এবং দৃঢ়ভাবে মুষ্টিবদ্ধ করে দেখান কীভাবে তার বাবা তাকে মারধর করতেন। বাবা আমাকে কখনো মারধর করেননি, এটুকু বলতে লজ্জিত হয়ে আমি তাকে বলি, আমার মা-ও আমাকে মারধর করতেন। বেঞ্চের ওপর গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে থাকে; কিন্তু আমি মায়ের গল্প বলে যেতে থাকি। বাসায় ফিরে আমি মাকে কল দিতে চেষ্টা করি, কিন্তু অপর প্রান্ত থেকে কোনো সাড়া পাই না। তারপর টোস্টের গায়ে পনির মেখে দুধের সাথে খেয়ে নিই।
আগামিকাল তাকে যে প্রশ্নটা করব তা আমি জানতাম। পরেরদিন তিনি আমার আরেকটু কাছাকাছি বসলেন এবং আমি তাকে প্রশ্নটি করলাম, ‘আপনি কতবার প্রেমে পড়েছেন?’

খুব শান্তস্বরে তিনি জবাব দিলেন, ‘একবার। একবারই প্রেমে পড়েছিলাম যখন বয়স ত্রিশের কোটায়।’
একটা আইসক্রিম ভ্যানের ঝনঝন শব্দ শুনতে পেলাম। তখন আবহাওয়া শীতল। তবু আমি দুটো কোন-আইসক্রিম নিলাম, একটি আমার জন্যে অপরটি তার জন্যে। আমাদের আইসক্রিম খাওয়া শেষ হওয়ার পর তিনি বললেন, ‘প্রথম যখন তাকে চুমু খেলাম, তার মুখের আভায় চারপাশের অন্ধকার হারিয়ে যায়। হাসির এই আভাটুকু আমাকে মোহগ্রস্ত করে ফেলে।’
আমার হৃদয়ে একটা ছোট্ট চিনচিনে ব্যথা অনুভব হয় এবং সেটি সেখানেই থেকে যায়। আমি জানতে চাইলাম, ‘তারপর?’
তিনি সবকিছু বলে যেতে থাকেনÑতিনি বলে যেতে থাকেন তার স্বর্গ-নরকের কথা, বলে যেতে থাকেন নারীটির চুলের রং, কানের লতি, বাহুমূল, এমনকি তার লা€úট্যও নিষ্ঠুরতার কথাও। বলতে বলতে তার মুখ হতে চারপাশের অন্ধকারে একটা উজ্জ্বল আভা ছড়িয়ে পড়ে, যা আমরা কেউই লক্ষ্য করিনি।

সারাপথ আমি কাঁদতে কাঁদতে রুমে ফিরে এলাম এবং পোশাক বদল না করেই ঘুমিয়ে পড়লাম। পরের দিন লক্ষ্য করলাম পার্কের এই কাঠের বেঞ্চটি এক ‘অকাল প্রয়াত, প্রেমময় দুহিতা’র স্মৃতিকে উৎসর্গ করা হয়েছে। আইসক্রিমের ভ্যান আসেনি। তিনি আমাকে সেই রমণীর চুল সম্পর্কে বলেছিলেন, ফোন-কলের কথা বলেছিলেন এবং একথাও বলেছিলেন যখন তাদের পরস্পর সাক্ষাৎ হতো তখন তিনি কীভাবে স্বর্গে আসীন হতেন। বলতে বলতে অন্ধকারে আরেকবার তার মুখে উজ্জ্বল আভা খেলে যায়। বাসায় ফিরে ঘুমানোর আগে আমি একটা ছবির অ্যালবাম নড়াচড়া করলাম এবং বোনের কাছে একটা সংক্ষিপ্ত চিঠি লিখলাম।
সূর্য উঠে গেছে এবং আমার সবগুলো হোমওয়ার্ক স€úন্ন হয়েছে। রুমের ছোট্ট জানালা দিয়ে বাইরে রাস্তার দিকে তাকাই। এরপর সিদ্ধান্ত নিই আজ বাইরে যাব না। ক্ষুধা বেড়ে গেলে আমি পোশাক বদল করে বেরিয়ে পড়ি। কাছের একটা ক্যাফেতে টুনা স্যান্ডউইচ খেয়ে পার্কে ঢুকে পড়ি। ডানপাশে বসার পর লক্ষ্য করলাম তার পাশে প্লাস্টিকের কাপে দু’কাপ কফি।
তিনি বললেন, ‘তুমি দেরি করে এলে। কফি ঠান্ডা হয়ে গেছে।’
আমার প্রশিক্ষকগণের ফিতে বেঁধে দিয়েছি।
তিনি জানতে চাইলেন, ‘তুমি এখানে কী কাজ করো?’
আমি বললাম, ‘পড়াশোনা করি। আপনি কী করেন?’
‘আমি কাজ করি।’
আমরা ঠান্ডা কফি পান করিনি। তিনি বললেন, ‘এই পৃথিবীতে কিছু মানুষ ভালোবাসার উপহারের স্পর্শ পেয়ে ভাগ্যবান।’
আমি সোজাসুজি তার দিকে তাকালাম এবং বললাম, ‘তাদেরকে ভাগ্যবান বলবেন না।’
তিনি বললেন, ‘ভাগ্যবান।’
‘না।’
‘হ্যাঁ।’
এই নিয়ে আমরা তর্ক করলাম। তারপর আমি তাকে আমার জীবনের সবকিছু বললাম,Ñ তাকে বললাম, কীভাবে আমি লোকটাকে কয়েক মুহূর্তের জন্যে দেখতে পেয়েছিলাম; বলেছিলাম সে কীভাবে তার ভালোবাসার কথা আমাকে জানিয়েছে, কীভাবে সে প্রতিজ্ঞা করেছিল বিভিন্ন শহরে আমাদের দেখা হবে যদিও সবগুলো শহরই তাকে ছাড়া একা একা ভ্রমণ করেছি আমি, তাকে বলেছি কীভাবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর লোকটাকে আমি চিঠি লিখতাম, সেই দীর্ঘ চিঠিতে কীভাবে ঢেলে দিতাম ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ও অশ্রু; লোকটার প্রেমিকার কাছ থেকে একটা চিঠি পাওয়ার কথা তাকে বলেছিলাম যে, চিঠিতে সে লিখেছিল আমার চিঠিগুলো কতটা উপভোগ করেছে সে। তাকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার কথা বলেছিলাম, বলেছিলাম হাসপাতালে থাকার কথাও। তিনি আমার কথাগুলো শুনতে শুনতে ডানপাশ থেকে কিছুটা সরে এলেন আমার দিকে।
আমি জানতে চাইলাম, ‘আমি কি তাকে হত্যা করতে পারি?’
তিনি দৃঢ়ভাবে বললেন, ‘না। আমি বরং বলব, সে যথারীতি মরেই আছে।’
আমি উঠে দাঁড়ালাম। রুমে ফিরে এসে কিছু রঙিন ক্রোড়পত্রে এবং খবরের কাগজে চোখ বুলালাম। তারপর ঘুমোতে যাবার পূর্বে হট চকোলেট পান করলাম। ঘুমোবার আগে নিজে নিজেকে বললাম, একদিক থেকে তিনি এবং আমিÑদুজনের মধ্যে একটা মিল আছে আর এটা একারণেই যে, আমরা দুজন প্রতিদিন একই বেঞ্চে বসি।
পরদিন বেঞ্চে আমার ডানপাশের প্রান্তে এবং তার বামপাশের প্রান্তে কিছুটা খালি জায়গা রয়ে গেল। আমরা সবকিছু নিয়ে কথা বললাম, কথা বলতে বলতে হাতের প্লাস্টিকের খালি কাপগুলো নাড়াচাড়া করলাম, হাসলাম। তিনি আমাকে ছবি দেখালেন, তার শৈশব থেকে শুরু করে এ পর্যন্তÑসব ছবি। এরপর তিনি আমার ফোন ন€^র জানতে চাইলেন। তার আহ্বানে সাড়া দিইনি আমি। যেইমাত্র চলে যাবার জন্যে আমি উঠে দাঁড়ালাম, তিনি আমাকে বলতে থাকলেন, ‘ফিরে আসার জন্যে অনুনয় করে তাকে আমি হাজারখানেক চিঠি লিখেছিলাম। সে আমার চিঠিগুলোকে অবজ্ঞা করেছে এবং কোনো কারণ ছাড়াই আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। তার চলে যাওয়ার পর আমাকেও হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল।’

রুমে আমি একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম। তার শৈশবের ছবিগুলো দেখতে অনেকটা আমার ছোটভাইয়ের ছবির মতো মনে হয়। দুজনেই ক্যামেরার সামনে রাশভারি চেহারায় থাকে, হাসিহীন।
পরদিন আমি দেরি করে এলাম এবং তিনি আমার দিকে রুক্ষভাবে তাকালেন। আমরা কোনো কথা না বলে চুপচাপ থাকলাম। শিশুদের লুকোচুরি খেলার শব্দ বেড়ে যাচ্ছিল। আমি খুব শীতার্ত অনুভব করলাম।
তিনি বললেন, ‘তোমার ছবিগুলো কই?’
আমি বললাম, ‘আমি তো বলিনি আমি সেগুলো নিয়ে আসব।’
তিনি আমাকে নিষ্ঠুর বললেন। আমি তাকে কর্কশ বললাম এবং রুমে চলে গেলাম। ফ্রিজে দুধ, জুস বা রুটি কিছুই ছিল না। তাই নিরুপায় হয়ে ক্ষুধা নিয়েই ঘুমোতে গেলাম।

অনেকদিন কেটে গেল। আমাদের বৈরিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন সময়ে বেঞ্চে আমাদের মধ্যকার দূরত্ব কমতে এবং বাড়তে লাগল। তারপর ক্রমে আমাদের মধ্যে মতানৈক্য বাড়তে লাগল এবং আমরা তর্কবিতর্ক করতে থাকলাম কারণে-অকারণে। আমি তাকে জানালাম, তার ক্রমাগত রূঢ় আচরণে আমি ক্লান্ত। তিনি জানালেন, আমার সংবেদনশীলতায় তিনিও ক্লান্ত।
পরীক্ষার কারণে আমি দু’দিন সেখানে যেতে পারিনি। এরপর যখন আবার ফিরে গেলাম, তিনি আমার উপর ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন, ‘একজন মিথ্যেবাদীকে দেখার জন্যে তুমি প্রতিটি শহরে ঘুরে বেড়াও অথচ আমাকে উপেক্ষা করানোর মধ্য দিয়ে অপমান করে যাচ্ছ।’

আমি প্রায় বলতে যাচ্ছিলাম, ‘তার জন্যে তুমি হাজারের উর্ধ্বে চিঠি লিখেছ আর আমার সাথে এই একটুর জন্যে চেঁচামেচি করছ?’ কিন্তু আমার কিছুই বলা হলো না। রুমে ফিরে এসে শুকনো তোয়ালে দিয়ে কাঠের টেবিল এবং বিছানা মুছে পরিষ্কার করলাম এবং নোংরা কাপড়গুলোকে কাপড় ধোয়ার মেশিনে নিক্ষেপ করলাম। টিভিতে শব্দহীন কার্টুন দেখতে দেখতে ভাজা মটরশুটি খেলাম। নিজের নিচের ঠোঁটে শক্তভাবে কামড় দিলাম এবং বালিশের নিচে মাথা গুঁজে দিতে দিতে ভাবলাম : বাস্তব জীবনে কর্তব্যের কোনো বিনিময় হয় না।
পরীক্ষা শেষ এবং আবহাওয়া থেকে ক্রমশ শীতলতা হ্রাস পেতে শুরু করেছে। যখন পার্কে ফিরে গেলাম, দেখতে পেলাম, কাঠের বেঞ্চটি শূন্য পড়ে আছে।



মূল : জোখা আলহার্থি
ভাষান্তর : মাইনুল ইসলাম মানিক
[এই গল্পটি ক্লেয়ার রবার্টসের ইংরেজি অনুবাদ হতে বাংলায় ভাষান্তর করা হয়েছে।]