বুধবার,২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮
হোম / খাবার-দাবার / পুরান ঢাকার বৈশাখি উৎসব : হালখাতা থেকে পান্তা-ইলিশ
০৪/০১/২০১৬

পুরান ঢাকার বৈশাখি উৎসব : হালখাতা থেকে পান্তা-ইলিশ

-

একসময় আমাদের দেশে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা ঘিরে। সেই সাথে বৈশাখিমেলা ছিল সাধারণ মানুষের প্রধান আকর্ষণ। দেশের অন্যান্য স্থানের মতো পুরান ঢাকায় ব্যবসার জন্য প্রসিদ্ধ চকবাজার, বাদামতলি, শাঁখারিবাজার, ইসলামপুর, পাটুয়াটুলি, তাঁতিবাজার ইত্যাদি নানাস্থানে ব্যবসায়ীরা পহেলা বৈশাখে মূলত নববর্ষের প্রারম্ভে তাঁদের পুরানো যাবতীয় হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসাবের নতুনখাতা খুলতেন আর এই শুভ কাজটির শুভসূচনা হতো উৎসবমূখর পরিবেশে খদ্দরদের মিষ্টিমুখ করিয়ে। পুরান ঢাকায় এখনও আনেক স্থানে বিশেষ করে স্বর্ণের ব্যসায়ীরা পহেলা বৈশাখে সকাল থেকেই খদ্দেরদের মিষ্টি বিতরণের মাধ্যমে নতুন বাংলা বছরের হালখাতা পালন করেন।

মনে পড়ে, প্রতিবছর গেন্ডারিয়ার ধুপখোলা মাঠে বছরের প্রথমদিনে বৈশাখিমেলা অনুষ্ঠিত হতো, যা এখনও অব্যাহত আছে। তখন খাল ছিল আর সেটিতে নৌকায় করে কুমোররা নানাধরনের মাটির খেলনা আর নানাপ্রকার হাতে বানানো দ্রব্য মেলায় বিক্রির উদ্দেশ্যে নিয়ে এসে সেই মাঠে বিক্রি করত। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এই মেলার আকর্ষণে ছুটে আসত। পহেলা বৈশাখের দিন সকাল থেকেই ছোটদের মেলায় যাবার জন্য আগ্রহ আর আনন্দ-উত্তেজনা পাড়ায়-মহল্লায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি করত। মেলায় নাগরদোলায় চড়ার পাশাপাশি রং-বেরংয়ের নানাপ্রকার মাটির পুতুল, খেলনা হাঁড়ি-পাতিল, বাঁশি, টমটম গাড়ি, হুক্কা হাতে সাদা দাঁড়িওয়ালা বুড়া, পানির গামলায় তেল দিয়ে চলা জাহাজ, ঢোল, ডুগডুগি, মাটির তৈরি ঘোড়া কিনে ঘরে ফেরার মধ্যে যে নির্মল আনন্দ ছিল তা বোধকরি এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের অনেকেরই জানা নেই।

মেলা থেকে কিনে আনা মিরচিনি, মুরালী, বাতাসা, খই, ওখড়া, চিড়া, মুড়ির মোয়া, কদমা, আর ঘরে বানানো যবের ছাতু, নানারকম পিঠা ছিল পহেলা বৈশাখের পরম আনন্দ। তখনও পান্তা-ইলিশ খাবার ধূম পড়ে যায়নি, যেটি এখন না হলেই নয়। ঢাকার নানা স্থানে মেলা হতো আর চকবাজারের মেলা ছিল প্রসিদ্ধ।

প্রতিবছরের মতো এবারেও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে পুরান ঢাকার রেস্তোরাঁগুলোতে থাকবে নানা আয়োজন বিশেষ করে পান্তাভাতের সাথে নানা ভর্তার আয়োজন; কিন্তু অবাক করা কথা হচ্ছে নববর্ষের এদিনে শাহীখানার প্রতিও মানুষের আগ্রহের কমতি নেই। তাই দেখা যায় পোলাও বিরিয়ানির বিক্রি বছরের অন্যান্য সময়ের থেকে কম নয় বরং বেশিই হয়। ৪০০ বছরের অধিক পুরানো ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকার আদি ঢাকাইয়া মানুষদের রয়েছে আতিথেয়তার সুনাম সেই সাথে রয়েছে সেরা শাহী রান্নার খ্যাতি। পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজার, নারিন্দা, লালবাগ, নাজিরাবাজার, নাজিমুদ্দিন রোড, আবুল হাসনাত রোড ইত্যাদি স্থানে রয়েছে নানা জনপ্রিয় ঐতিহ্যবাহী খাবারের প্রতিষ্ঠান।

পুরান ঢাকার ভোজনরসিক মানুষেরা পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশের পাশাপাশি অনেকেই শাহী মোরগ পোলাও, শাহী বিরিয়ানি, মোরগ মোসাল্লাম, শাহী টুকরা, মালাইকারী, কালাভূনা ইত্যাদি খাবারকে বেছে নিবেন তাতে সেন্দেহ নেই। তাছাড়া আমাদের পুরান ঢাকায় সকালের নাশতা ছাড়াও যেকোনো উৎসবে প্রিয় বাকরখানি (নিমসুকা) রুটির সাথে মিষ্টি, ফিরনি বা ঝাল মাংস পরিবেশন করাটা ব্যাপক জনপ্রিয়। এছাড়াও রাস্তায় বসা অস্থায়ী দই আর লেবুর শরবত বিক্রির দোকানের সাথে বিখ্যাত শরবত ও ফালুদার দোকানগুলো তো আছেই।
বর্তমানে পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাওয়া একটা রীতিতে দাঁড়িয়ে গেলেও পুরান ঢাকায় অনেকের কাছেই কয়েকগুণ দাম দিয়ে এত আগে মজুদ করা ফরমালিন দেয়া মাছ না খেয়ে শাহী মোরগ পোলাও, বিরিয়ানি বা তেহারির সাথে নতুন বছর উদ্যাপন করাই অনেক বেশি প্রিয়।

গতবছর পুরান ঢাকার লালবাগে জনপ্রিয় একটি খাবার হোটেলে গিয়ে দেখা যায় পহেলা বৈশাখে তাদের পান্তা-ইলিশের আয়োজন না থাকলেও প্রতিদিনের নিয়মিত আয়োজন মোরগ পোলাও, খাসির কাচ্চি আর খাসির বিরিয়ানি খেতে ঢাকাসহ নানাজায়গা থেকে আসা মানুষের উপচেপড়া ভিড়।

প্রতি বছরের মত তাই এবারও বাঙালির প্রিয় উৎসবে সবাই যে যার মতো করে মেতে উঠবে - আনন্দের নানা রঙ মাখিয়ে বৈশাখি সুরে।

মোহাম্মদ ওয়াসিম
ক্রিয়েটর ফেইসবুক পেইজ : পুরান ঢাকার খাবার