শুক্রবার,১৯ Jul ২০১৯
হোম / ফিচার / চলছে বিশ্বকাপ ক্রিকেট
০৭/০৫/২০১৯

চলছে বিশ্বকাপ ক্রিকেট

ড্রয়িং রুমেও বাইশগজের উন্মাদনা!

-

বারো বছরের ছেলে তূর্য সকালে ঘুম থেকে উঠেই বাবার কাছে বায়না ধরেছে তাকে বাংলাদেশের জার্সি কিনে দিতে হবে। তার অন্য বন্ধুরা এই জার্সি পরে ঘুরছে। অতএব তাকেও জার্সি এনে দিতে হবে, তা না হলে সে বন্ধুদের সামনে মুখ দেখাতে পারবে না। পাশ থেকে অষ্টাদশী অর্ণাও বলল, ‘বাবা আমার জন্য কিন্তু এক্সএল সাইজ।’ তা শুনে রান্নাঘর থেকে উকি দিয়ে রেহানা পারভীনও বলল, ‘শোনো, আমারও কিন্তু একটা লাগবে। ব্যাংক কর্মকর্তা আজমল সাহেবের একটি সকাল কাটল বিশ্বকাপ জ্বরে আক্রান্ত পরিবারের এমন বায়না শুনে।

গাটা দেশ এখন এই জ্বরে আক্রান্ত। এবারের বিশ্বকাপ ক্রিকেট ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হলেও সাতসমুদ্র তের নদীর পাড়ে বসেও বাঙালির উন্মাদনা বরাবরের মতো আকাশছোঁয়া। বিশ্বকাপ মরশুমে বাঙালি সব কাজ ফেলে বাইশ গজের লড়াইয়েই গা ভাসায়! সেই পররায় ছেদ পড়েনি, ইতিমধ্যেই ঘরে ঘরে ঢুঁ মারলেই চোখে পড়বে বাঙালির বিশ্বকাপ ম্যানিয়ার নিদর্শন। কোথাও ঝুলছে জাতীয় পতাকা, কোথাও আবার মাশরাফী, সাকিবদের বড় বড় কাটআউট। কেউ আবার পরিবারসমেত টিম বাংলাদেশের জার্সি গায়ে চাপিয়েই টিভির সামনে বসছেন। কেউ আবার টিভিতে সাকিবের ব্যাটিং দেখতে দেখতে রান্নাঘরে চুলায় বসিয়ে আসা তরকারির কথা বেমালুম ভুলে যায়। বর্তমানে ক্রিকেট শুধু আর পুরুষের খেলা এবং উপভোগের বিষয় নয়। ঘরে ঘরে নারীরাও ক্রিকেটের অন্ধ ভক্ত হয়ে উঠছে। সাধারণত নারীদের বিনোদনের সীমাবদ্ধতার মাঝে ক্রিকেট যেন তাদের জন্য নতুন উচ্ছ্বাসের বিষয় হয়ে উঠেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঘরের নারী সদস্যটি মূলত পরিবারের সকল সদস্যদের নিয়ে একসঙ্গে খেলা উপভোগ করার মূল উদ্যোক্তা হয়ে উঠে। তাই মুড়ি চানাচুর চিপস পপকর্ণ হাতে খেলা দেখতে বসা বর্তমানে একপ্রকার রেওয়াজ হয়ে গেছে। বিশেষ করে লক্ষণীয় বাংলাদেশের খেলার দিনদুপুরের পর অনেকেই কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়ে নিজ বাসায় বা বন্ধুদের সঙ্গে খেলা দেখার জন্য ছুটছেন। সবাই মিলে গলা ফাটিয়ে বাংলাদেশের চার-ছক্কার জয়ধ্বনি দিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বড় পর্দায় খেলা দেখার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

এবারের বিশ্বকাপ নারীদের কাছে যে-কারণে আলাদা

ক্রিকেটের আইনে ইংরেজি ভাষ্যে ‘হি’ বা ‘হিজ’-এর মতো পুরুষবাচক সর্বনাম আর থাকছে না. তার পরিবর্তে লেখা হচ্ছে ‘ফিল্ডার’, ‘বোলার’ ‘ব্যাটসম্যান’ বা ‘প্লেয়ার’। তাছাড়া এবারের বিশ্বকাপকে আইসিসির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে বর্ণনা করা হচ্ছে আইসিসি মেন’স ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপ বলে। এটাও একটা বড়ো পরিবর্তন বৈকি।
পুরুষের চেয়েও বেশি নারী দর্শক ম্যাচের টিকিট কিনেছেন
বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো এবারই প্রথম ম্যাচ দেখতে যাচ্ছেন প্রায় দুই লাখের বেশি মানুষ এমন তথ্য জানিয়েছে আইসিসি। এই ক্রিকেটপ্রেমী টিকিট ক্রেতাওয়ালার মাঝে বৃহৎ জায়গা করে নিলেন নারী সমর্থকরা। বিশ্বকাপের নারীদর্শকের টিকিট ক্রয়ের সংখ্যা একলাখের বেশি। এমন সব তথ্য জানিয়েছেন আইসিসির টুর্নামেন্ট ডিরেক্টর স্টিভ এলওর্থি। তিনি বলেন, ‘ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংখ্যা পাওয়া গেল, যা এক কথায় অবিশ্বাস্য। ১ লাখ ১০ হাজারের মতো নারী এবার টিকিট কিনেছেন। আবার অনূর্ধ্ব-১৬ কোটায় এই সংখ্যা একলাখ। এরা এবার বিশ্বকাপ উপভোগ করতে আসবে।’

টিকিট কিনতে আবেদনের সংখ্যাটাও চোখে পড়ার মতো ছিল এবার। নির্দিষ্ট খেলায় তা জমা পড়েছে প্রায় চার লাখের মতো! বাংলাদেশের খেলা শুরুর পাঁচদিন আগে টিকিট শেষ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও নজিরবিহীন।
ক্রিকেট নিয়ে আমাদের আবেগ দিনে দিনে প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে। বাংলাদেশ মাঠে নামা মানে ছাপান্না হাজার বর্গমাইলে আবেগের জোয়ার বয়ে যাওয়া। প্রবল আবেগের সেই জোয়ারে ভাসে ষোল কোটি বাঙালি। আর বাঙালির কাছে ক্রিকেট নামক খেলাটি এখন শুধু পুরুষদের একমাত্র খেলা নয়। নারীরাও ক্রিকেটে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। গত বছরই আমাদের সালমা-জাহানার-রুমানারা জয় করে নিয়ে এসেছিল এশিয়া কাপ। দারুণ তৃপ্তির এবং স্বস্তিতে ভরে গিয়েছিল গোটা দেশ।


বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জয়ে আমরা যেমন উচ্ছ্বসিত হই তেমনি হারলেই যেন গেল গেল রব না ওঠে। ‘এদের দিয়ে হবে না’ এ-রকম কোরাস গাইতে শুরু না করি আমরা। শুধু একটা কথা মনে রাখলেই চলবে, ওরা হয় সফল হবে, না হয় ভুল থেকে শিখবে। সেই কথাটাই কিন্তু গতবছর এশিয়া কাপে সালমা-জাহানারারা মনে করিয়ে দিয়েছেন। প্রথম ম্যাচে শ্রীলংকার কাছে হেরেছিলেন তাঁরা। তখন কেউ হয়তো ভাবতে পারেননি, এই দলটাই ফাইনাল খেলবে। ভারতকে উড়িয়ে দিয়ে কাপ জিতবে। মানুষ ব্যর্থ হতে পারে না। হয় সফল হবে। না হয় শিখবে।


--রিয়াদ খন্দকার