শনিবার,২৫ মে ২০১৯
হোম / জীবনযাপন / ‘অসম’ সম্পর্ক
০৫/০৮/২০১৯

‘অসম’ সম্পর্ক

-

সম্পর্কের ক্ষেত্রে মেয়েরা ছেলেদের থেকে বয়সে ছোট হবে, এমনটাই ভাবে সবাই। কারণ বয়সের ধারণাটি আমাদের সমাজব্যবস্থাই তৈরি করে দিয়েছে। নিজের থেকে বয়সে বড় এমন একজন নারীর প্রেমে যে-কেউই পড়তে পারেন, তাকে ভালোবাসতে পারেন, এমনকি বিয়েও করতে পারেন। কিন্তু আমাদের সমাজ ও পরিবার এমন ‘অসম’ বয়সের সম্পর্ক সহজে মেনে নিতে চায় না। এ বিষয়ে কিছু সমস্যার সমাধান নিয়ে আমাদের এবারের আলোচনা-

সমস্যা- ১
স্বামীর চেয়ে স্ত্রীর বয়স বেশি হলে পারিবারিক ও সামাজিক নানাসমস্যার ফলে উভয়ের মধ্যেই মানসিক চাপের সৃষ্টি হয়। এই মানসিক চাপ যেমন দুজনের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করে, তেমনি সম্পর্ক ভেঙেও যেতে পারে।


স মা ধা ন

স্বামীর চেয়ে স্ত্রীর বয়স বেশি হওয়াটা বিশ্বে বিরল কোনো ঘটনা নয়। উন্নত বিশ্বে হরহামেশাই এ-ধরনের বৈবাহিক সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়। তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি এমনও পুরোপুরি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ফলে স্বামী-স্ত্রীকে নানাসময় নানাধরনের কটূক্তি বা নেতিবাচক আচরণের সম্মুখীন হতে হয়। আত্মীয়-স্বজন এবং মুরুব্বিদের কাছে জবাবদিহিতার ব্যাপারটি তো রয়েছেই।
সম্পর্কের ভিতটা যদি শক্ত হয় তবে পারিবারিক এবং সামাজিক বাধা কোনোভাবেই সংসার ভাঙার কারণ হতে পারে না। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালো বোঝাপড়া থাকলে পারিবারিক এবং সামাজিক সমালোচনা উপেক্ষা করে সুখী হওয়া সম্ভব। প্রয়োজন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আস্থা, বিশ্বাস, ভালোবাসা, প্রতিশ্রুতি এবং শ্রদ্ধাবোধ।

সমস্যা- ২
আমাদের পরিবারগুলো এখনো গতানুগতিক সম্পর্কের বাইরে বেরোতে পারেনি। খুব কম পরিবারই আছে, যারা এমন বিয়ে সহজেই মেনে নেয়। পরিবারের সদস্যরা এ-সম্পর্কের ব্যাপারে কোনো ধরনের সহযোগিতাই করেন না।


স মা ধা ন

এক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ অত্যন্ত জরুরি। সমাজবিজ্ঞানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কন্সেপ্ট হলোÑ ‘ংড়পরড়ষড়মরপধষ রসধমরহধঃরড়হ’ অর্থাৎ দৃষ্টিকে প্রসারিত করে কোনো বিষয়বস্তুকে তার প্রেক্ষাপটের আলোকে বিশ্লেষণ করা। পরিবারের সদস্যরা যদি এ ধরনের সম্পর্কের প্রেক্ষাপট উদঘাটন করেন এবং যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ করেন তার নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটবে বলে আশা করা যায়। সবাইকে বুঝতে হবেÑজীবনের মূল লক্ষ্য সুখী হওয়া। স্বামী নিয়ে সুখী হতে পারেন তার পরিবার ও সমাজের তাতে বাধা হয়ে দাঁড়াবার কোনো কারণ নেই। আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবেÑ আমরা যেন ‘লঁফমবসবহঃধষ’ হয়ে না পড়ি। নিজেকে ভালোর মানদ- হিসেবে বিবেচনা না করি। অন্যের মতামতের প্রতি সহনশীলতা এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে শ্রদ্ধাবোধ এ-ধরনের সমস্যার সমাধান এনে দিতে পারে।

সমস্যা- ৩

স্বামী-স্ত্রীর বয়সের পার্থক্যের কারণে মানসিক বয়সের পার্থক্যও দেখা দেয়। এই মানসিক বয়সের পার্থক্যের কারণে মাঝে মাঝেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বোঝাপড়ার অভাব হতে পারে, হতে পারে ভুল বোঝাবুঝিও।


স মা ধা ন

প্রতিটি মানুষের বেড়ে ওঠার কিছু ধাপ রয়েছে। বিয়ের ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর বয়সের পার্থক্য থাকলে তারা দুটি ভিন্ন ধাপে অবস্থান করেন। ফলে তাদের মানসিক চাহিদার মধ্যেও একটি অসামঞ্জস্যতা লক্ষ্য করা যায়। এ ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রী যিনি অপেক্ষাকৃত বয়সে বড় তার একটি মুখ্য ভূমিকা রয়েছে। বয়সে যিনি বড় তার পক্ষেই ছোটজনের মানসিক চাহিদাগুলো অনুধাবন করা সম্ভব। ধৈর্য এবং ত্যাগের ব্যাপারটি তাই বড়জনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তবে সবাই যে বেড়ে ওঠার সকল ধাপ অতিবাহিত করে বেড়ে ওঠেন তাও নয়। ব্যক্তিত্বে, পার্থক্য নানাবিধ কারণে হতে পারে। খোলামেলা আলোচনাই এনে দিতে পারে এ সকল সমস্যার সমাধান। প্রত্যেকে যদি তার মানসিক চাহিদার ব্যাপারটা খোলাখুলি অপরকে বলেন এবং অপর ব্যক্তিটি যদি তা শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখেন তবে মানসিক পার্থক্য অনেকাংশেই কমে আসবে। তাই সবচেয়ে বেশি জরুরি হলো শ্রদ্ধাবোধ।


সমস্যা- ৪

সাধারণত ৩০-৩৫ বছরের পরেই গর্ভধারণের ব্যাপারটি মেয়েদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। তাই স্ত্রীর বয়স বেশি হলে তা আরো বেশি সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।


স মা ধা ন

চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে ৩০-৩৫ বছরের পরে মেয়েদের গর্ভধারণের সম্ভাবনা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক্ষেত্রে বলা আছে যে, গর্ভধারণের বিষয়টি অনেকখানি নির্ভর করে ব্যক্তির স্বাস্থ্য এবং জীবনাচরণের ওপর। তাই ৩০ বছরের কম বয়সি মেয়েদের গর্ভধারণের জটিলতা এড়াতে নানাবিধ সতকর্তামূলক ব্যবস্থার কথা বলা আছে, বিদ্যমান আছে আধুনিক বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতিও। তবে সমস্যা হতে পারে এ সম্ভাবনা মাথায় রেখে মেয়েদের ৩০ বছরের আগেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।


সমস্যা- ৫

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বয়সের পার্থক্য খুব বেশি হলে একটা সময়ে গিয়ে যৌনজীবনে সমস্যার সৃষ্টি হয়। আর এর ফলে দাম্পত্য সম্পর্কে কলহ সৃষ্টি হয়।


স মা ধা ন

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বয়সের পার্থক্য খুব বেশি হলে যৌনজীবনে সমস্যার সৃষ্টি হতেই পারে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, যৌনকার্যই দাম্পত্য সুখ নির্ধারণের একমাত্র ভিত্তি নয়। একটি বয়সের পর দাম্পত্য জীবনে মুখ্য হয়ে ওঠে পারস্পরিক বোঝাপড়া, যত্ন ও মায়া-মমতা। স্বামী-স্ত্রী হয়ে ওঠেন একে অপরের বিপদের আশ্রয়স্থল, দুঃসময়ের বন্ধু। তাই যৌনকার্য সম্পাদনকেই যারা দাম্পত্য জীবনে সুখী হবার একমাত্র নিক্তি মনে করেন তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হওয়া খুব জরুরি। মনে রাখতে হবে যৌনতা সাময়িক, কিন্তু সম্পর্ক টিকে থাকে শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসার জোরে।



-- ড. ফারহানা জামান
সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়