সোমবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯
হোম / বিবিধ / প্রতিটি প্রাণ প্রতিটি প্রাণকে ভালোবাসুক
০৫/০৯/২০১৯

প্রতিটি প্রাণ প্রতিটি প্রাণকে ভালোবাসুক

-

প্রাণীদের কল্যাণে কাজ করার বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে নতুন। গ্রামবাংলার মানুষের জীবন-জীবিকার সাথে প্রাণীদের সম্পর্ক অন্তরীণ। শিল্পবিপ্লবের পর আধুনিক সমাজের ব্যস্ততার সাথে সাথে মানুষ হারিয়েছে সংবেদনশীলতা। কাজেই, প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম ব্যাহত হচ্ছে, প্রয়োজন পড়ছে নানাধরনের সংস্কার কাজ। তারই একটি ধারা এই প্রাণীকল্যাণ।
উন্নত দেশগুলোতে প্রাণীদের সুরক্ষার জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান কাজ করে। আমাদের দেশে প্রাণীদেরকে রক্ষার জন্য আইন থাকলেও তা যথাযথভাবে প্রয়োগ ঘটে না। প্রতিটি প্রাণীর প্রতি সংবেদনশীল আচরণের মনমানসিকতাও আমাদের মাঝে গড়ে ওঠেনি। তবে ধীরে ধীরে তা পরিবর্তন হচ্ছে। অনেকেই এগিয়ে আসছেন। তরুণরা উদ্যমী হয়ে কাজ করছেন।
প্রাণীদেরকে নানাক্ষেত্রে নির্যাতিত হতে হয় বা প্রাণের ধারক হয়েও নিষ্প্রাণ বস্তুর মতো ব্যবহৃত হতে হয়। এমন অনেক চিত্রই আমরা দেখি। প্রাণীকল্যাণ বলতে সমস্ত প্রাণীর কল্যাণ। এখানে মানুষ কোনোভাবে উহ্য তো নয়ই, বরং সবশেষে এই কল্যাণ কাজের সুফলটা ভোগ করবে সবচেয়ে বেশি যে প্রাণীÑ সে হলো মানুষ। পরিবেশের সবচেয়ে নিম্নস্তরে অন্যান্য প্রাণীরা স্থান পেয়েছে। এই নিম্নস্তর থেকেই মানবিকতার চর্চা শুরু হতে হবে। যিনি নির্বাক প্রাণীর প্রতি সহমর্মী হবেন, তিনি স্বজাতির প্রতিও সম্মানজনক আচরণ করবেন, এটিই অবশ্যম্ভাবী।

‘প’ ফাউন্ডেশন বা ‘পিপল ফর এনিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’ গড়ে তোলা হয়েছিল প্রাণীদের অবস্থার উন্নতির জন্য। শুরুটা কুকুরবিড়াল নিয়েই। এই বিশেষ দুই প্রাণী মানুষের বন্ধু হলেওÑ রাষ্ট্র তাদেরকে ‘বেওয়ারিশ’ কোটায় অবস্থান দিয়েছে। বেওয়ারিশ মানেই যেন এদের প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধকে অস্বীকার করা। অথচ মনুষ্য শহরে এরাই কিন্তু আমাদের প্রতিবেশি। নিজেদের প্রয়োজনেই সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে এদেরকে ব্যবহার করলেওÑএখন সভ্যতার নানাউপকরণ পেয়ে এই বিপদের বন্ধুকে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলেছি আমরা। প্রতিনিয়ত বঞ্চনা সহ্য করে টিকে থাকতে হয় পথে পথে। কেউ হয়তো মেরে যাচ্ছেন, কেউ গাড়ির চাকা তুলে দিচ্ছেন, কেউ বা পিটিয়ে আধমরা করে ফেলে রাখছেন। তরুণ স্বেচ্ছাসেবকরা আহত প্রাণীদের রাস্তা থেকে উদ্ধার করে নিজেদের ক্লিনিকে চিকিৎসা দিচ্ছেন। সুস্থ করে তুলছেন। কেউ শ্রম, কেউ অর্থ আবার কেউবা নানাউপকরণ দিচ্ছেন। প্রাণ বাঁচানোর অপার এক প্রশান্তিতে এই তরুণরা কাজ করে যাচ্ছেন। এই তরুণেরা এক-একজন মানবতার দৃষ্টান্ত। যারা পথের অসহায় নির্বাক কুকুর-বিড়ালকে বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়েনÑ তারা কি কোনো মানুষের বিপদে চুপ করে বসে থাকবেন?
বন্যপ্রাণী এবং লাইভস্টকের আওতাভুক্ত প্রাণীরাও রয়েছে নিদারুণ কষ্টে। খাদ্য হিসেবে ভোগ্য প্রাণীদেরকে পরিবহন-ধারণে দেখা যায় অমানবিক নিষ্ঠুরতা। মুরগি থেকে শুরু করে গরু-মহিষকে ঝুলিয়ে, কষে বেঁধে, পিটিয়ে মাইলের পর মাইল পরিবহন করা হয়। এটি কিন্তু কোনো সভ্য সমাজের চিত্র নয়। বর্তমানে উন্নতবিশ্বে এধরনের নিষ্ঠুরতা থেকে বেরিয়ে আসবার পরিকল্পনা হচ্ছে। জীবন্ত প্রাণী পরিবহনের পরিবর্তে মাংস পরিবহন অধিক মানবিক। আরো রয়েছে চিড়িয়াখানায় অভুক্ত-অসুস্থ প্রাণীদের গ্লানি, মটরযানের যুগে অনর্থক বিনোদনের জন্য রুগ্ণ ঘোড়ার গাড়ি, বন্যপ্রাণী হাতিকে দিয়ে খেলা প্রদর্শন এবং চাঁদাবাজি। এসবই আমাদের নজরে রয়েছে।

প্রাণীদের রক্ষায় সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি এখন স্বেচ্ছাসেবকরা নির্দয়ভাবে প্রাণী হত্যার দায়ে মামলা পরিচালনা, দেশব্যাপী গণহারে কুকুর নিধন বন্ধে রাজপথে সোচ্চার আন্দোলন, জলাতঙ্ক প্রতিরোধ এবং কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে চাপ প্রয়োগ, আইন সংস্কারের জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ, মানববন্ধন করে যাচ্ছেন। চালু হচ্ছে চিকিৎসাকেন্দ্র, সেবাকেন্দ্র। এসব কাজের পেছনে বহু তরুণ এবং সমাজের প্রবীণ সচেতন মানুষ সরাসরি যুক্ত হচ্ছেন। যেমন এটা আশার কথা, নানাস্তরের মানুষকে ‘প ফাউন্ডেশনের’ কার্যক্রম নাড়া দিতে পেরেছে। প্রায়শই দেখা যায়, বর্তমান প্রজন্মকে আমরা ধিক্কার দেই। বলে থাকি এরা দেশপ্রেম, দায়িত্ব সম্পর্কে উদাসীন। বিষয়টি ভুল প্রমাণিত হয় নতুন প্রজন্মের সাথে কাজ করলে। আর সবসময় তরুণদেরকে অনুপ্রেরণা জোগানোর কাজটা করে যেতে হবে প্রবীণদেরকে।
মানবতার সংজ্ঞা নিয়ে নতুনভাবে ভাববার সময় এসেছে। মানবতা মানেই কেবল মানুষ নয় বরং প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টি মানুষের মানবিক আচরণের দাবি রাখে। পরিবেশের ভারসাম্যের যে জাল রয়েছে, তার প্রতিটি উপাদান সার্বিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একটি মানবিক সমাজ গঠন হলে, সবল মানুষ কোনো দুর্বলের উপরই অত্যাচার করবে না। শিখবে প্রতিটি প্রাণকে মূল্য দিতে।


--রাকিবুল হক এমিল

ফাউন্ডার চেয়ারম্যান
পিপল ফর এনিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন