সোমবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / শৃঙ্খলিত নারীর আত্মশ্লাঘা
০৫/০৪/২০১৯

শৃঙ্খলিত নারীর আত্মশ্লাঘা

-

নারী জীবন মানে চারদেয়ালের বন্দিজীবনÑএটা যেন শাশ^ত। যুগ-যুগান্তের অনিবার্য এ নিয়ম। সম্প্রতি শিল্প্কলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল মঞ্চে প্রদর্শিত হলো মি-টু ট্ইাপের আত্ম-আলেখ্য ‘একা একনারী’ শীর্ষক নাটক। পুরুষরা যখন অবলীলায় পরকীয়ায় মত্ত থাকে তখন স্ত্রীকে সতী-সাধ্বী থেকে স্বামীর পক্ষে সাফাই গাইতে হয়। পরকীয়ায় নারীর পরিণতি মৃত্যু; না হয় বন্দিজীবন; কিংবা ঘৃণিত জীবন। হেনরিক ইবসেনের নোরা-র মতো নারীটি মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না। সারাক্ষণ অশ্লীল ফোন, বিপরীত ফ্ল্যাটের বাইনোকুলারের গোপন যৌনদৃষ্টি, কামার্ত দেবরের অত্যাচার, সন্তান লালন-পালন ও সংসারের ঘানিতে বন্ধ জীবনযাপন করতে হয়। এ যেন তাবৎ নারী সমাজেরই রূপ। সমাজ বাস্তবতায় বন্দিনী ‘মারিয়া’ নামের এমন এক নারীর এমন কাহিনিই আবর্তিত হয়ে উঠছিল সেদিন শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল মঞ্চে। ‘একা একনারী’ শিরোনামে নাটকটির রচনায় দারিও ফো এবং ফ্যাংকা রামে; অনুবাদ করেছেন আবদুস সেলিম, নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন দেবপ্রসাদ দেবনাথ। নাটকটি নাট্যচক্রের ৫৪তম প্রযোজনা।

নাট্যচক্র বাংলাদেশের একটি প্রথিতযশা নাট্যদল। স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে বাংলাদেশের নাট্যচর্চাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছিল এ দলটি। নাট্যচক্রই বাংলাদেশে প্রথম নাট্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছে। যদিও ‘নাট্য শিক্ষাঙ্গন’ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি অধুনা লুপ্ত। দীর্ঘদিন ধরে নাট্যচক্রের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম লক্ষ্য করা না গেলেও সম্প্রতি তারা একক অভিনয়ে ‘একা একনারী’ শিরোনামে নাটকটি নিয়ে মঞ্চে উপস্থিত হয়েছেন। এটি একক এক নারীর আত্মকথন। ফুটে উঠেছে পুরুষশাসিত সমাজে নারীর অবস্থান।
দলীয় প্রতিভাবান নাট্যকর্মী তনিমা হামিদের একক অভিনয়ে নাটকটি উপস্থাপিত। নাটকের কাহিনি অত্যন্ত সরল রৈখিক। তালবদ্ধ একটি ফ্ল্যাটে একা একনারী নিজের দুঃখের কথাগুলো পাশের বাড়ির মুখোমুখি ফ্ল্যাটের এক নারীকে অবলীলায় বলে যাচ্ছে। কাহিনিতে দেখা যায়Ñ স্বামী অফিসে যাবার সময় স্ত্রীকে তালাবদ্ধ করে রেখে যায়। একাকিত্ব ঘোচাতে পাশের বাড়ির ফ্ল্যাটের ভদ্রমহিলাকে বলতে থাকে জীবনের কাহিনি। নির্যাতিত এ নারীর নানাদুঃখগাথাগুলো অনবদ্যভাবে ফুটে উঠতে থাকে নাটকে। মি-টু আন্দোলনের মতোই নারীটি বলতে থাকে জীবনের নির্যাতনের কথা। তার দেবরের কামনা বাসনার সামনে নিজের অবস্থানের কথা। স্বামীকে সে কিছুই বলতে পারে না। বললে উল্টো তার নিজের আত্মীয়-স্বজনের প্রতি উদাসীন এমনই ধারণা পোষণ করে শারীরিক অত্যাচার করে। অতএব দেবরের অত্যাচার নীরবেই সহ্য করে যেতে হয়। অপরদিকে প্রতিদিন অজানা নম্বর থেকে ফোন আসে। ফোনে অকথ্য অসভ্য যৌনবিকৃতি ও উত্তেজক কথাগুলো তাকে সহ্য করে যেতে হয়। একই ভাবে আরেক ফ্ল্যাটের এক পুরুষের কুদৃষ্টি তাকে সারাক্ষণ ঘিরে রাখে। বাইনোকুলার দিয়ে শরীরের রূপ-সৌন্দর্য দেখে।্ নানা কৌশল করেও কুদৃষ্টি থেকে মুক্তি যেন অসম্ভব হয়ে ওঠে।

নারীটি প্রকৃতপক্ষে ভালোবাসে তার স্বামীকে। কিন্তু স্বামীও তাকে ভুল বোঝে। ফোনে কুরুচিপূর্ণ লোক ভেবে গালাগাল শুরু করলে অপর প্রান্তের স্বামীর সন্দেহ হয়। তাই প্রশ্নের উত্তরে মিথ্যা বলে নারীটি। ফলে মিথ্যার জালে আটকে যায়। পাওনাদার নামে নতুন আরেক উপদ্রব শুরু হয়। দেখা যায় সত্যি সত্যি পাওনাদার তার স্বামীর কাছে টাকা পায়। ঘটনা আরেকদিকে মোড় নেয়। ভালোবাসাহীন যৌনসঙ্গমে মুখ গুঁজে পড়ে থাকার চেয়ে পনের বছরের ছোট এক ছেলের ভালোবাসা তাকে টানে। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে ভালোবাসা-ভালোবাসাহীনতার পর্বটি। কিন্তু ঘটনা ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। ফলশ্রুতিতে শুরু হয় তালাবদ্ধ জীবন। অপরদিকে স্বামী ১৬ বছরের মেয়েকে পোয়াতি করে দিলেও কিছু হয় না। এরজন্য যেন নারীকেই তার গঞ্জনার ভার নিতে হয়। নারী যেন প্রতিনিয়ত অবদমিত। একসময় দরজায় কড়া নাড়ে পাওনাদার, প্রেমিক ছেলেটি এবং তার স্বামী। দরজার তালা কৌশলে খুলে ফেলে ছেলেটি। তার একটি হাত আটকে থাকে। শিশুসন্তানকে সিরিয়াল খাওয়াতে গেলেও দেবরের অত্যাচার সহ্য করতে হয়। আবার স্বামী যখন ঘরে ফিরে তখন স্বামী দরজার চাবি হারিয়ে ফেলে। ফলে নারীর জীবনের যন্ত্রণাই প্রধান হয়ে ওঠে। নারী জীবনের প্রতি অতিষ্ঠ হয়ে শেষপর্যন্ত দেবরকে ফেলে দেয় নিচে, পাশের ফ্ল্যাটের কুদৃষ্টির পুরুষটাকে গুলি করে হত্যা করে। এবং বন্দুক হাতে স্বামীর জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। এভাবেই নাটকের কাহিনি শেষ হয়।
নাট্যকারদ্বয় মূলত পুুরুষতান্ত্রিকতায় একজন নারীর স্বাধিকারের রূপটা কেমন হতে পারে, নারী ও পুরুষের সম্পর্কের ধরনটা কী; পারিপাশ্বিকতার সাথে নারীর সম্পর্ক এবং নারীর প্রকৃত চাওয়া-পাওয়ার স্বরূপটা কেমন হতে পারে তারই একটি রূপরেখা অঙ্কনের চেষ্টা করেছেন। একজন নারীর একাকিত্ব অসহায়ত্বের মধ্যদিয়ে পৃথিবীর নারী প্রকৃতির চিত্র অঙ্কনে প্রচেষ্ট হয়ে উঠেছেন। নির্দেশক দেবপ্রসাদ দেবনাথের মধ্যেও সে ধরনের প্রবণতাই লক্ষ্য করা গেছে। নির্দেশক বিষয়কে আরো হৃদয়স্পর্শী আবেগঘন তৈরিতে নানাউপকরণ-উপাদান প্রয়োগ করেছেন। মঞ্চের ডিজাইনে অত্যাধুনিক একটি ফ্ল্যাটের সাজেশন তৈরি করেছেন। রান্নাঘর, বসারঘর, শোবার জায়গা, আরাম কেদারাসহ সবকিছুই রয়েছে।
অভিনয়ের স্বতঃস্ফূর্তটা থাকলেও কখনো কখনো সাত্ত্বিক একাগ্রতায় ভিন্নতা ঘটেছে। অভিব্যক্তিগুলোর প্রকাশ চরিত্রবৈশিষ্ট্যকেই শানিত করেছে। কণ্ঠের মড্যুলেশন, ব্লকিং সবমিলিয়ে স্বচ্ছন্দ পদচারণাই ছিল মঞ্চে। তবে দ্বৈত চরিত্রগুলোর উপস্থাপনে যে ইলিউশন তৈরি করেছে সমস্ত নাটকটা ঘিরেই সে মন্ত্রমুগ্ধতা সৃষ্টি হতে পারত। আলো ও মিউজিক অসাধারণ যৌক্তিক ভূমিকা প্রকাশ করেছে চরিত্রের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম আবেগ প্রকাশে; নাটকবস্তু উপস্থাপনে। সেট কিংবা কোনো কিছুর বাগাড়ম্বর অর্থাৎ অতিকীয়তা নেই নাটকে। অত্যন্ত সহজ-সরল স্বচ্ছন্দ উপস্থাপনা। দৃশ্যকল্পগুলো তৈরিতে নির্দেশকের বিশেষ প্রযত্বের ছাপ স্পষ্ট। ইদানীং একক অভিনীত নাটকের মধ্যে একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করতে সম্ভব। নাটকটি দীর্ঘ মঞ্চজীবী হোক।

--আবু সাঈদ তুলু