সোমবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / মারাদোনার বাম পা
০৫/০৪/২০১৯

মারাদোনার বাম পা

- সাদিক হোসেন

বন্ধুর মাইনে পাঁচ-দশ হাজার টাকা বেশি হলেও মাঝমাঠে ড্রিবল করে কিছুদূর এগিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু সে যদি তোমার থেকে পাঁচ-দশ গুণ বেশি পেয়ে থাকে, তখন? ভাবছ মাঠে নামব না? সেইটে হবার নয়। এসেছ যখন খেলতে তোমাকে হবেই। এখন হিসেব কষে দেখো ক’গোলে হারছ।
মিলন হিসেব কষে দেখল, বউ, ছেলের স্কুল আর অ্যালসেসিয়ানটাকে ধরলে অলরেডি সে তিনখানা গোল খেয়ে গেছে। ম্যাচ জেতা কিংবা ড্র করবার প্রশ্নই নেই। এখন যেভাবেই হোক মানে মানে ইজ্জত নিয়ে কেটে পড়তে পারলেই রক্ষে। কিন্তু কিভাবে?
মিলনের বউ, সালেহা, মাঝরাত্তিরে বরের ঘুম ভাঙিয়ে দিল। সে ওভার এক্সাইটেড। বলল, আইডিয়া।
-কী?
এসব ব্যাপারে মিলন সালেহার উপর ডিপেন্ডেন্ট। এইতো গতবারের মেয়ের জন্মদিনটা সে যেভাবে ম্যানেজ করল তা প্রায় অকল্পনীয়। মাত্র পাঁচ হাজারে পনেরোজনের ডিনার প্লাস কেক, বেলুন, রিটার্ন গিফট এসব তো ছিলই। সে আবার বলল, কী?
সালেহার চোখ তখন টর্চের মতো জ্বলজ্বল করছে। বলল, মিষ্টি নিয়ে যাবার দরকার নেই। খামোকা একগাদা খরচা। তারপর গিয়ে দেখব আমরা যা নিয়ে গেছি ওরা তার থেকেও দামি মিষ্টির অ্যারেঞ্জ করে ফেলেছে।
-তো?
-সিমই বানিয়ে নিয়ে যাব। ওরা আমাদের থেকেও সিমইটা বেশি পছন্দ করে। ঈদের সময় তোমার অফিস কলিগদের দ্যাখো না! খাবার জন্য যেচে নেমতন্ন নেয়। তাছাড়া আন্তরিকতাটাও দেখানো হলো। কেমন?
-পারফেক্ট!
মিলন ভেবেছিল, জিও, এই যাত্রায় বাঁচলাম তবে। অপনেন্ট শক্তিশালী হলে চমকের দরকার তো পড়বেই। কিন্তু সে জানত না, তার দুর্বল হবার পেছনে রয়েছে অপনেন্টের পরবর্তী চালটাকে অনুমান করতে না পারা।
পরের দিন, সন্ধ্যেবেলা প্রদীপ্তর ফোন। মিলন তখন অফিসে ঝাঁপ ফেলতে ব্যস্ত। প্রদীপ্ত বলল, তালে রোববার দেখা করছিস তো ভাই?
-হ্যাঁ।
-আমি ভাবছিলাম কী রোববার আমাদের বেহালার বাড়িতে অ্যারেঞ্জ না করে যদি বাটানগরে যাওয়া যায়? তোর তো সুবিধেই হবে।
-তুই বাটানগরে কী করতে আসবি?
-আররে তোকে তো বলাই হয়নি... দাঁড়া দাঁড়া... একমিনিট হোল্ড করো...
প্রদীপ্ত তখন ওর এসউভি চালাচ্ছিল। বোধহয় থেমে গিয়ে সামনের গাড়ির ড্রাইভারটাকে গালাগাল দিল। তারপর আবার সেই হেঁ হেঁ গলা, সেদিন তো তাড়াহুড়োতে বলাই হলো না। বাটানগরে একটা ফ্ল্যাট নিয়েছি ভাই। রিভার সাইড কমপ্লেক্সে। গতকালই চাবি পেলাম। চল ওখানেই মিট করি। ব্যালকনি থেকে হুগলী নদী দেখতে পাবি। ওখানে বসে বিয়ার খাব। কীরে বিয়ার-টিয়ার চলে তো? বউ খায়?
-চল না দেখা যাবে।
-তাহলে পাক্কা। রোববার বাটানগর। বাইইই...
প্রদীপ্ত ফোন কাটল। ওদিকে মিলনের হাতে আইসক্রিম!
একমাত্র ভরসা ছিল সালেহা। কিন্তু সেও এখন ল্যাবেনচুষ চুষছে।
মিলন ফেড-আপ হয়ে পড়ল, তালে ক্যান্সিল করে দিচ্ছি। বলব মেয়ের পরীক্ষা। জাস্ট যেতে পারছি না।
-তুমি কি পাগল? সালেহা চিড়বিড়িয়ে উঠল, তোমার মেয়ের বয়স আর ওর ছেলের বয়স এক। এই সময় যে কোনো পরীক্ষা নেই তা সবাই জানে।
-তো?
-দাঁড়াও না। অত ব্যস্ত হচ্ছ কেন? একটু ভাবতে দাও।
মিলন আর সালেহা টিভিতে ছোটা ভীম চালিয়ে ভাবতে শুরু করল। তাদের মেয়ের বয়স চার। সে গোগ্রাসে ছুটকি, রাজু, জাগ্গু বান্দার আর কালিয়াকে গিলছে।
সালেহা লাফিয়ে উঠল, ওদের ছেলের জন্য কিছু নিয়ে যাবে? বলেই চুপসে গেল, ধুর, কিছুই মাথায় আসে না। সিমইটাই বেস্ট ছিল। কেন যে না বলছ বুঝতে পারছি না।
-বললাম তো খাবার নিয়ে যেতে বারণ করে দিয়েছে। নতুন ফ্ল্যাট। সবে চাবি পেয়েছে। যা খাবার লাগবে ওরাই কিনে নিয়ে যাবে।
মিলন বিয়ারের কথাটা চেপে গেল।
সালেহা বলল, খেতে চল।
তো খাবার পর যা হয়, ঢেঁকুর তুলতে তুলতে ঘুম চলে আসে। মিলন ঢুলছিল। সালেহা আবার ব্রাশ না করে শুতে পারে না। সে বাথরুমে ব্রাশ করতে গেছিল। সেখান থেকেই দৌড়ে ছুটে এল। মুখভর্তি মাজনের ফেনা। তবু তার কথা বলা চাই, তোমার আর প্রদীপ্তর কোনো পুরনো ছবি আছে? তা দিয়ে পার্সোনালাইজড গিফট বানালে কেমন হয়? এটা এখন খুব চলছে।
ধুর! মিলন কোনোমতে চোখ চেয়ে বলল, এগুলো কলেজের ছেলেমেয়েরা দেয়। আর প্রদীপ্ত আমার প্রেমিক নাকি। আমরা বন্ধু ছিলাম। যাও মুখ ধুয়ে এসো। আমি ঘুমোলাম।
সে ডাহা ফেল করেছে, সালেহা বুঝতে পারল। তবে এত সহজে হাল ছেড়ে দেবার পাত্রী সে নয়।
পরের দিন মিলন অফিস থেকে ফিরতেই সে আরও দুটো অপশন রাখল,
এক. ওদের ছেলের জন্য ফেলুদা বা প্রফেসর শঙ্কু।
দুই. একটা সুন্দর নাইট ল্যাম্প।
চার বছরের ছেলে কী আর ফেলুদা/শঙ্কু পড়বে? এক নম্বর তাই ধোপে টিকলো না। দু’ নম্বরটায় গিয়ে মিলন মুচমুচে হাসি দিল।
-কী হলো আবার? সালেহা কিছুই বুঝতে পারছে না।
-বলছি, বলছি। সে সালেহাকে প্রায় তটস্থ করে তুলল।
-আহ বলো না! সালেহা যেন কচি মেয়ে।
-আচ্ছা মনে করো তো তুমি প্রদীপ্তকে প্রথম কবে দেখেছিলে?
-একবারই তো দেখেছি। আমাদের বিয়েতে।
-এইটাই তো। মিলন বিষ মিশিয়ে হাসল, বিয়েÑ নাইট ল্যাম্প। নাইট ল্যাম্প, বিয়ে। বুঝছো?
সালেহা মুখ ফুলিয়ে হাসল, তুমি না!
মিলন চালাক। বউ-এর ইঙ্গিতকে সে কৌশলে ওভারলুক করে গেল।
কিন্তু সংসারী মানুষেরা জানে প্রচলিত রীতিতে যখন আর সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না, তখন একটাই রাস্তা বাকি থেকে যায়, ব্যাক টু বেসিক।
মেয়ের স্কুল সকাল ন’টা থেকে শুরু। আটটার মধ্যে তাকে রওনা দিতে হবে। তার আগে স্বামীর জন্য টিফিন বানিয়ে, ব্রেকফাস্ট রেডি করে থালার পাশে মোবাইল আর হাতঘড়িটা রেখে দেওয়া। এসব তার রোজকার কাজের মধ্যেই পড়ে। আজ মেয়েকে স্কুলে ঢুকিয়ে দিয়ে সালেহা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল। কী করা যায়? সে কূলকিনারা পেল না।
প্রদীপ্ত সম্পর্কে সে যে খুব বেশি কিছু জানে তাও তো নয়। একবারই মাত্র দেখা হয়েছিল। তাও বিয়েতে। মিলনও তার বন্ধুর সম্পর্কে প্রায় মিউট। বিয়েতে যে ফটো পাওয়া যায় তা দিয়ে ধারণা করা সহজ নয়। সেখানে প্রদীপ্ত সবে মোটা হতে শুরু করেছে। একমুখ দাড়ি। গোঁফের ভেতর থেকে একখানা বিশ্রী আঁচিল উঁকি দিচ্ছে। চোখে চশমা, তাও পিচপিচে চাউনি ফটোগ্রাফের দিকে নিক্ষিপ্ত।
-ও তখনও এত বড়োলোক হয়নি। মিলন জানাল, সবে বিন্দির সঙ্গে প্রেম করতে শুরু করেছে। তা নিয়ে বীভৎস বাওয়াল। শুধু থানা পুলিশ হওয়া বাকি।
-কেন? ইন্টারকাস্ট ম্যারেজ?
-ধুর, ওটা কোনো ব্যাপারই নয়। ওদের দুজনার বাড়িই এইসব নিয়ে প্রোগ্রেসিভ। ইনফ্যাক্ট ওরা তো লিভ-ইন করতে চাইত। বলত আমাদের সম্পকের ভেতর রাষ্ট্রকে ঢুকতে দেব কেন। প্রবলেম ছিল প্রদীপ্তর সিনেমার নেশাটাকে নিয়ে। ও সবকিছু বেচেটেচে সিনেমা বানাবে আর তাই নিয়ে দুই বাড়ির টানাপড়েন।
-ও সবকিছুতেই এমন?
-তা না। এরকম হলে কী আর এত সাকসেসফুল স্ক্রিপ্টরাইটার হওয়া যায়? তাও আবার টেলি-সিরিয়ালের! ভেতরে ভেতরে ও গোছানোই ছিল।
সালেহা এই প্রথম মিলনের কথায় তেরছা ইঙ্গিত পেল। তবে দেখার চোখ থাকলে, সে দেখতে পেত, মিলন একই সঙ্গে পুরনো বাটানগরও দেখতে পাচ্ছিল তখন। বাটানগরের সেই বিশাল মাঠ। আর ফুটবল। মিলন লেফট উইং। প্রদীপ্ত মাঝমাঠ। এমনিতে প্রদীপ্ত কোনোদিনই দৌড়াতে পারত না। স্লো বলে তার বদনামও ছিল। তবে ওর পাসিং সেন্স ছিল মারাত্মক। কত ম্যাচ যে ¯্রফে পাসিং-এর জন্য বাঁচিয়ে দিয়েছে তা ভাবা যায় না। কিন্তু সেবার ইন্টারস্কুল টুর্নামেন্টে ওরা আঁতিপাঁতি মাদ্রাসার কাছে তিন গোলে হেরে গেল। মিলনের পা-টা সরসর করে ওঠে। মনে হলো, এই তো, সে ড্রাইভ দিয়ে বাম পা-টা বাড়িয়ে দিয়েছে আর ঠিক দু’ ইঞ্চি দূর থেকে বলটা চলে যাচ্ছে অপনেন্টের ডিফেন্সের পায়ে।
শাশুড়ি মরে যাবার পর নীচতলার ঘরটা প্রায় বন্ধই থাকে। সালেহা এটাকে প্রাক্টলিক্যালি গুদামঘর বানিয়ে ছেড়েছে। যতসব পুরনো, অব্যবহৃত জিনিসপত্র ডাঁই করে রাখা। এরমধ্যে জন্মদিনের সময় কেনা থার্মোকলের বাড়তি প্লেটগুলোও আছে।
দুপুরবেলা সালেহা সন্তর্পণে সেই ঘরের ভিতরে ঢুকল। কতদিন ঝাঁট দেওয়া হয়নি। মেঝেতে ধুলোর পুরু আস্তরণ। সালেহা পালঙ্কের নীচ থেকে টেনে টেনে মালপত্র বার করতে থাকল। পুরনো জুতো, ব্যাগ, একগাদা আনন্দলোক, মেয়ে হতে স্টিলের দোলনা কেনা হয়েছিল, সেটাও পাওয়া গেল। কিন্তু যার জন্য আসা, সেইটা কোথায়?
মিলন ঘরে ফিরে দেখল সালেহাকে অন্যরকম দেখাচ্ছে। মুখে ক্লান্তির ছাপ, তবে খুশিখুশি ভাবও রয়েছে। প্রথমে সে ভেবেছিল বউ হয়ত ভ্রƒ-প্লাক করেছে। উঁহু, তা তো নয়। তবে?
চা খেতে দিয়ে সালেহা ম্যাজিক দেখাল।
-ফুটবল? মিলনের বিশ্বাসই হলো না। আরে এ তো আমার স্কুল লাইফের সেই বলটা। পেলে কোথায়?
সালেহা বলল, আইডিয়া!
আইডিয়াই বটে। তা নাহলে কেউ ভাবতে পারে, আসা আর যাওয়ার মধ্যে আসলে কোনো তফাৎ নেই!
প্রদীপ্তকে ফুটবলটা দেবার সময় মিলনের এরকমই মনে হয়েছিল। সকাল এগারোটার রোদ গাড়ির উইন্ডো স্ক্রিনে রিফ্লেক্টেড হয়ে প্রদীপ্তর চশমায় হামলা করেছে। চশমার ভেতরটা চিকচিক করে উঠল যেনবা।
বিন্দির সঙ্গে মিলনের আগে থেকেই পরিচয় ছিল। কিন্তু ও এতটাই মিশুকে যে গত পাঁচ বছরের ব্যবধান নিমেষই উধাও হয়ে গিয়েছে। এখন সে সালেহার সঙ্গে দিব্যি তুই-তুকারি করছে। যেন কতদিনের আলাপ!

প্রদীপ্ত ছেলের নাম দিয়েছে গোদার। সে বেশ গম্ভীর। সামনের সিটে বসে বাটানগর দেখছে।
বাটানগর পুরো পাল্টে গিয়েছে। বিশাল বিশাল টাওয়ার উঠেছে চারদিকে। সিনেমার হল ভেঙে মাঠের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। কাজ এখনও শেষ হয়নি। প্রদীপ্ত জানালো, এটা গলফ কোর্স হবে।
-মানে? গলফটা খেলে কারা?
-ঋত্বিকের সুবর্ণরেখা মনে আছে? বীভৎস মজা চলছে ভাই। সে একটা ছোট্ট বাঁক নিয়ে আবার শুরু করল, আমিও এটার পার্ট।
মিলন গোদারকে দেখিয়ে বলল, শুধু তুই কেন? গোদারও।
প্রদীপ্ত হেসে ফেলল, হেবি দিলি মাইরি। চল তোকে একটা জিনিস দেখাই।
প্রদীপ্ত গাড়ি চালিয়ে কিছুদূর গিয়ে একটা ফাঁকা মতো জায়গায় থামল। বলল, এবার নাম।
-এসে তো গেছি। আবার নামছিস কেন? বিন্দি জিজ্ঞেস করল।
-জাস্ট দু’মিনিট। একটা সিগারেট খাব। তোদের নামতে হবে না।
প্রদীপ্ত সিগারেট ধরিয়ে বলল, এখন বল তো বৌদির চপের দোকান আর বঙ্কাদার পান-বিড়ির দোকান কোথায় ছিল? লাইব্রেরিটা কোনদিকে? দেখি বলতে পারিস কি না।
মিলন চারদিক তাকিয়ে দেখছে। কিছুই চেনা যাচ্ছে না। গাছগুলোও অচেনা লাগছে তার। পুরনো কোনো চিহ্নই আর অবশিষ্ট নেই।
সে বলল, আশ্চর্য। কিছু তো বুঝতে পারছি না। অথচ পুরো স্কুল লাইফটা আমরা এখানেই কাটিয়েছি।
প্রদীপ্ত সিগারেটটা নিভিয়ে বলল, রিয়েলি! আমিও চিনতে পারছি না। আমি ভাবছিলাম তুই ঠিক পারবি। এবার চল। ওরা ওয়েট করছে।

গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে প্রদীপ্ত আবার শুরু করল, তখন ভুল বলেছিলাম বুঝলি।
-কী কথা?
-ঐ যে সুবর্ণরেখা, ঋত্বিক! না রে এটাকে ঠিক বীভৎস মজা বলা যাবে না। ‘বীভস মজা’র মধ্যে প্রচুর ঘটনা থাকে। ঘটনাগুলো দিয়ে আমরা মজাটাকে চিনতে পারি। এখন চারদিকে যেটা হচ্ছে সেটা অন্য রকম। এই যে বঙ্কাদার দোকান, বৌদির চপের দোকান যেরকম জাস্ট উঠে গেল, একবার ভাব তো এটা ছয়-সাতের দশকে হলে কেমন হতো? এজিটেশন, বোমাবাজি এসব তো চলতই। কিন্তু তুই বাটানগরের এত কাছে থেকেও কিছু জানতে পারলি না। সামহাউ, আমার মনে হয়, এইসব দোকান, খাবার-দাবার, এইসব মানুষজন ক্রমশ আমাদের কাছে প্রয়োজনহীন হয়ে পড়েছে। তাই তাদের উঠে যাওয়াটা এত সাইলেন্টলি ঘটতে পারল। এটাই, যাকে বলে, সমাপ্তি। সমাপ্তি সবসময় ইভেন্টলেস হয়। এত সাইলেন্স আর কোথাও নেই।
দুবার হর্ন দিতেই দারোয়ান গেট খুলে দিয়েছিল। পার্কিং আন্ডারগ্রাউন্ডে। সেখানে প্রতিটা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য নির্দিষ্ট পার্কিং স্লট রাখা রয়েছে। তবে গাড়ি বেশি নেই। এত বড় জায়গাটা খাঁ খাঁ করছে। লোকজন এইখানে এখনও বসবাস শুরু করেনি বোধহয়।
প্রদীপ্ত নিজেই জিনিসপত্তর নামাল। তার মধ্যে ৫ বোতল বিয়ারও রয়েছে। খাবারদাবার বেশি কিছু আনেনি। তবে বিন্দি বুদ্ধি খাটিয়ে ঠিক ইন্ডাকশন কুকারটা সঙ্গে নিয়েছে। বিকেলে বিয়ারের সঙ্গে গরম গরম পমফ্রেট মাছ ভাজা, এই হচ্ছে প্ল্যান।
মিলন ভেবেছিল সালেহা এই বুঝি কালী মূর্তি ধারণ করল। কিন্তু কী আশ্চর্য, সে প্রায় বিন্দির মতোই চঞ্চল হতে পেরেছে। বিয়ারের বোতলগুলো দেখে একবার চোরা চাউনি দিয়েছে মাত্র। আর কিছু নয়।
ফ্ল্যাটে ফার্নিচার বিশেষ কিছু নেই। তিনটে বেডরুমের মধ্যে দুটোতে খাট রয়েছে। একটায় শুধু ডিভান। ওটাকেই টেনে ড্রয়িংরুমে আনা হলো।

বিন্দি খাবারের বন্দোবস্ত করতে ব্যস্ত। সালেহার যেন ‘বিনাযুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদিনী’ অবস্থা। কিছুতেই সে হার মানবে না। বিন্দির সঙ্গে একই তালে ড্রিবল করে চলেছে।
এদিকে প্রথম থেকেই ঝুলিয়ে যাচ্ছে মেয়েটা। সে কিছুতেই গোদারের সঙ্গে পেরে উঠছে না। সে নেহাৎ ছোটা ভীম অবধি যেতে পারে। ওদিকে গোদার অ্যাস্টেরিক্স আর টিনটিনের কমে নামছেই না।
সালেহা মেয়ের দিকে নজর রাখছিল। একবার চেঁচিয়ে বলল, মেয়েটাকে তো দেখো। ও কী খায় জিজ্ঞেস করো।
কিন্তু সে কিছুই খেতে চাইল না। আপেলে না বলল। নলেন গুড়ের সন্দেশ দেখে দৌড়ে পালাল। শেষে গোদার যখন চামচে করে পাস্তা তুলছে, ও তখন নির্দ্ধিধায় বোতলের নিপিল টানল।
এই মেয়েটাকে লোকাবে কোথায়?
সালেহা যতই তাকে টেবিলের নীচ, আলমারির পাশ, খাটের তলা, এইসবের সন্ধান দিক না কেন, গোদার দু’মিনিটেই তাকে ঠিক খুঁজে নিচ্ছে। একবার তো সে সকলের নজর পেরিয়ে সদ্য বসানো বাথটাবটায় চুপি চুপি শুয়ে থেকেছিল কতক্ষণ; কিন্তু সেবারও গোদার প্রায় অ্যাঞ্জেলের মতো উড়ে গিয়ে তাকে ধপ্পা দিল কী অনায়াসে!
বিন্দি আর সালেহার জন্য দুটো বোতল খোলা হয়েছিল। সালেহা খেল না। সেটা প্রদীপ্ত ছিনিয়ে নিল প্রায়। বিন্দি চুমুক দিচ্ছে আর খাবারদাবার গরম করছে।
সালেহা মিলনকে ব্যাল্কনিতে নিয়ে গেল, মেয়েটার সামনেই তোমরা শুরু করে দিলে?
মিলন আর কী উত্তর দেবে। কাঁচুমাঁচু মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকল খানিক।
প্রদীপ্ত বুঝি আন্দাজে ধরতে পেরেছিল। সে-ই সালেহাকে বোঝাল, দেখ, আমরা যত লুকিয়ে খাব, ওদের মধ্যে ততই কিউরোসিটি বাড়বে। এটাকে এত গুরুত্ব দিস না।
-আর যদি স্কুলে গিয়ে বলে দেয়?
-লুকিয়ে খেলে বলে দেবার চান্স বেশি।
সালেহা বুঝি এমনি একটা আশ্বাস পেতে চাইছিল। সে আর কথা বাড়াল না।
দুপুরের খাবার রেডি। ওদিকে মেয়েটা ততক্ষণে ঘুমিয়ে হাঁ।
কোথায় লুকোবে মেয়েটাকে? সালেহা কোনো নিরাপদ স্থানের সন্ধান পেল না। কোনোরকমে দু’মুঠো খেয়ে সে আর বিন্দি বডি ফেলে দিল।

গোদার বুঝি গম্ভীর হয়ে পড়েছিল। পায়ের উপর পা তুলে সে এখন ডিভানটায় আধশোয়া হয়ে আছে।
প্রদীপ্ত বলল, এই এক ঝামেলা বুঝলি। ছেলেটা এখন অ্যানাকে মিস করছে।
-অ্যানা কে?
-আমাদের মেয়ে। তোকে বলেছিলাম না অ্যালসেসিয়ানটার কথা! ওটার নাম রেখেছি অ্যানা কারেনিনা।
-তুই পারিসও!
ব্যালকনি থেকে যে নদীটা দেখা যাচ্ছে সেটা দুপুরের রোদে চিকচিক করছে। নদীর ধারঘেঁষে পরপর ইটভাটা। সেগুলোর চিমনি দিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। আকাশটা তাই ঘোলাটে। ওপারের জুটমিলগুলো আছে কি নেই, সেই ধারণা এখান থেকে করা মুশকিল।
প্রদীপ্ত মিলনকে একটা বোতল দিয়ে সিগারেট ধরাল, বল কেমন লাগছে?
মিলন দাঁত দিয়ে ছিপি খুলে নিল। প্রদীপ্তকে সোজাসুজি কোনো উত্তর দিল না। বরঞ্চ হার যখন নিশ্চিত তখন আর অত ডিফেন্সে কী লাভ, এই ভেবে সে প্রদীপ্তকে পাল্টা প্রশ্ন করল, এই যে তুই তখন সমাপ্তির প্রসঙ্গ তুললি না... ইভেন্টলেস... তোর কী মনে হয় আমাদের মধ্যে ফিলিং অফ লস ব্যাপারটাও নেই?

-হয়ত নেই। প্রদীপ্ত বোতলে চুমুক দিয়ে বলল, একটা মেগা সিরিয়ালের সমাপ্তি যেভাবে হয়, এখানেও ব্যাপারটা সেইভাবে ঘটছে।
-কিন্তু গল্প আর রিয়েলিটির ভেতর তো বিস্তর ফারাক।
-আমি এই দুটোর মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখি না।
-আলবাত পার্থক্য আছে। মিলন বোতলটা শেষ করে সিগারেট ধরিয়ে বলল, গল্পে ক্যারেক্টাররা কী কী জিনিস কিভাবে এক্সপেরিয়েন্স করছে সেটাই মেইন। আমরা ক্যারেক্টারের এক্সপেরিয়েন্সকে এক্সপেরিয়েন্স করি। রিয়েলিটিতে সেটা হয় না। রিয়েলিটিতে আমাদের এক্সপেরিয়েন্সটাই আসল। আর তাই রিয়েলিটিতে ফিলিং অফ লস থাকতেই হবে।
-তাই কি? প্রদীপ্ত মিলনের উত্তেজনা দেখে হেসে ফেলল, এই ফিলিং অফ লস ব্যাপারটা কী? মানে কোনো কিছুর থেকে কোনো কিছুর বিয়োগ, তাই তো?
-সোজাভাবে ধরলে তাই।
-তাহলে মৃত্যু থেকে ফিলং অফ লস জন্মাতে পারে?
-নিশ্চয়। মিলন বুঝতে পারল না প্রদীপ্ত এখন কোনো দিকে বল ঘোরাচ্ছে। সে সজাগ হয়ে প্রদীপ্তকে ফলো করতে থাকল।
কিন্তু প্রদীপ্ত প্রায় অবিচল। সে সেইভাবে সিপ নিচ্ছে আর বলছে, একমাত্র মানুষের ক্ষেত্রেই ডেথ মানে বিয়োগ নয়। প্রতিটা ডেথ প্রচুর স্মৃতির জন্ম দেয়। প্রতিটা ডেড বডি আবার নতুন করে বেঁচে ওঠে। একমাত্র আমরাই ডেড বডির সঙ্গে বসবাস করতে পারি। একমাত্র মানুষের সমাজেই জীবিতের থেকে মৃতের সংখ্যা বেশি।

-মানে বঙ্কাদা, বৌদির চপের দোকান এগুলোকে কী বলবি?
প্রদীপ্ত উত্তর দিতে যাচ্ছিল। বিন্দি এসে বাঁধা দিল, বিয়ার তো প্রায় শেষ করে ফেললি! এখন এই পম্ফ্রেটগুলো কে খাবে?
বিন্দির পেছনে সালেহা, তোমারাই খাও এখন। আমরা বাচ্চাদের নিয়ে পার্কটায় ঘুরছি।
সূর্য নেমে গেছে। নদীর উপর কুয়াশা ঘন হয়েছে। দূর থেকে জাহাজের ভোঁ শোনা গেল।
প্রদীপ্ত সিগারেটের মশলা বার করতে করতে বলল, ভালো তামাক আছে, নিবি?
-সালেহা জানলে ক্যালাবে।
প্রদীপ্ত হাসল, বিন্দিও জানবে না।
ব্যাল্কনি থেকে সামনের পার্কটা আবছা দেখা যাচ্ছিল। সেখানে দুই মা আর তাদের বাচ্চা খেলাধুলো করছে।
প্রদীপ্তই প্রথম লক্ষ করল, আরে ওরা আমাদের ফুটবলটা নিয়ে গেছে?
-তাই তো।
-এই দেখ গোদার শট নিচ্ছে। দেখলি বলটা কেমন রিসিভ করল? আরেব্বাস।
মিলন ভেতর থেকে কেঁপে উঠছিল। সে সন্তর্পণে মেয়েটার দিকে খেয়াল রাখছিল। এই তো সে বলটার পেছনে দৌড়াচ্ছে। গোদার ডান দিকে ঘুরতেই সে ব্লক করল। আর কী আশ্চর্য এতদূর থেকে, চারদিকটা কুয়াশায় এমন আবছা হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও সে যেন দেখতে পেল, মেয়েটা গোদারের পা থেকে বলটা কেড়ে নিয়ে, বাম পা দিয়ে ড্রিবল করতে করতে, চারদিক নাচাতে নাচাতে ঠিক মারাদোনার মতো গোলের দিকে এগিয়ে চলেছে। এখন তাকে রুখবে এমন বান্দা দুনিয়ায় জন্মায়নি।