শুক্রবার,১৯ Jul ২০১৯
হোম / জীবনযাপন / কর্মস্থলে মানসিক স্বাস্থ্য
০৫/০৬/২০১৯

কর্মস্থলে মানসিক স্বাস্থ্য

মানসিক স্বাস্থ্য

-

কর্মক্ষেত্র আমাদের জীবনের একটি গুরত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিটি মানুষের মধ্যেই রয়েছে অপার সম্ভাবনা। এ সম্ভাবনা বিকাশের অন্যতম ক্ষেত্র হলো আমাদের কর্মক্ষেত্র। মানসিকভাবে ভালো থাকা যেমন কর্মক্ষেত্রে আমাদের কাজের মান বা উন্নতিকে প্রভাবিত করে তেমনি কর্মক্ষেত্রের এ দীর্ঘ সময়টা কেমন যাচ্ছে সেটা অনেক ক্ষেত্রেই নির্ধারণ করে আমাদের সার্বিক ভালো থাকা, না থাকা।

কর্মক্ষেত্র ও মানসিক চাপ

কর্মক্ষেত্র যেমন হতে পারে একজন মানুষের ভালো থাকার অন্যতম উৎস, একইভাবে তা হতে পারে মনোসামাজিক চাপ এবং অনুৎপাদনশীলতার অন্যতম কারণ।

অতিরিক্ত কাজ বা কাজ কম থাকা : ব্যক্তির ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত কাজ (যখন অনেক কাজ অল্প সময়ে স্বল্প ব্যবস্থাপনার মধ্যে করতে হয়) বা জটিল ও কঠিন কাজ মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। কাজের ডেড-লাইনের মধ্যে কাজ শেষ করা, কাজের মান ঠিক রাখা ইত্যাদি যেমন আমাদের মনকে উদ্বিগ্ন করে তেমনি অতিরিক্ত কাজ বা সবসময় কাজ নিয়ে থাকা আমাদের মনের মধ্যে নেতিবাচক চাপ তৈরি করতে পারে। আবার কাজ কম থাকা বা ব্যক্তির দক্ষতা ঠিকভাবে ব্যবহৃত না হলেও সেটা বিষণ্ণতা তৈরি করতে পারে।

কাজের ধরন : একঘেয়েমি, একই ধরনের উদ্দীপনাহীন কাজ, অর্থাৎ যে কাজে নিজের দক্ষতা বা সৃজনশীলতা প্রমাণের সুযোগ থাকে না সে কাজ একধরনের বিরক্তি ও উদ্যমহীনতা তৈরি করে। তেমনি আপাতভাবে অর্থহীন, অপছন্দের কাজও মনের উপর চাপ ফেলতে পারে।

কাজের সঠিক মূল্যায়ন/স্বীকৃতি না পাওয়া : মূল্যায়ন বলতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা বেতন বৃদ্ধি বুঝালেও মৌখিক প্রশংসা, কাজের স্বীকৃতি, পুরস্কার ইত্যাদির মাধ্যমেও ব্যক্তি মূল্যায়িত হতে পারে। আর্থিক মূল্যায়নে বস্তুগত বিষয় ছাড়াও সম্মান ও মর্যাদার বিষয়টি সম্পর্কিত। কাজেই কাজ করা সত্ত্বেও এর যথাযথ মূল্যায়ন না পাওয়া আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

পারস্পরিক সম্পর্ক : উর্ধ্বতন কর্মকর্তার অপর্যাপ্ত, অবিবেচক, কর্তৃত্বমূলক এবং অসহযোগী আচরণ, সহকর্মীদের সাথে খারাপ সম্পর্ক, মানসিকভাবে হেনস্তা হওয়া (সূক্ষ্ম সমালোচনা, অশোভন মন্তব্য, যৌনহয়রানি, ব্যক্তিগত বিষয়ে অহেতুক কৌতূহল বা নাক গলানো) ইত্যাদি মানসিক উদ্বেগ, বিষণ্ণতা বাড়িয়ে দেয়।

কাজের পরিবেশ : শব্দ, ধূলা, আলো, গুমোট পরিবেশ, অফিসসজ্জার অবিন্যস্ত বিন্যাস, কর্মঘণ্টা ইত্যাদি শারীরিক ও মানসিক সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।

কাজ ও ঘরের দ্বন্দ্ব : ব্যক্তিগত সমস্যা থাকলেও কর্মক্ষেত্রের অসহযোগিতা (প্রয়োজনে ছুটি না দেওয়া, অসুস্থতার ক্ষেত্রে অসহযোগী মনোভাব) যেমন মনের মধ্যে নেতিবাচক চাপ তৈরি করে তেমনি কাজের বিষয়ে যদি পরিবারের অসহযোগিতা থাকে সেটিও আমাদের মনের মধ্যে নেতিবাচক চাপ তৈরি করে এবং আমাদের কর্মদক্ষতাকে কমিয়ে দেয়।

বৈষম্য : পদোন্নতি, কাজের চাপ, বেতনভাতা ইত্যাদি নানাকিছুতেই সহকর্মীদের সাথে বৈষম্য বা সমভাবে মূল্যায়িত না হওয়ায় আমাদের হীনম্মন্যতা তৈরি, কাজে হতোদ্যম করে বা ক্ষেত্রবিশেষে আমাদের উদ্বেগ বা বিষণœতা বাড়িয়ে দিতে পারে।

মানসিক উপসর্গ

খিটখিটে মেজাজ; মনোসংযোগের অভাব; ভুলে যাওয়া; কাজে অনুৎসাহ; আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া না হীনম্মন্যতাবোধ, ঘুমের সমস্যা (ঘুম আসতে দেরি হওয়া, ভেঙে ভেঙে ঘুম হওয়া, দুঃস্বপ্ন দেখা);

শারীরিক ঊপসর্গ

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানসিক চাপ শারীরিক উপসর্গ হিসাবে প্রকাশিত হয়, যেখানে শারীরিক বা ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় ডাক্তার কোনো সমস্যা পান না; মাথাব্যথা, ঘাড়ব্যথা, শরীরের নানাজায়গায় দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা; মাথা ঘোরানো; বমি বমি ভাব, পেটে সমস্যা/গ্যাস/চাপ; বুক ধড়ফড়, বুকে চাপ/অস্বস্তি, বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট; অস্থিরতাবোধ করা, মাঝে মাঝে শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া।
নিজের কর্মক্ষমতা কিভাবে বাড়াবেন?

ইতিবাচক আবেগের চর্চা : রসবোধচর্চা, নিজের ভালো লাগা-মন্দ লাগা অন্যকে আঘাত না দিয়ে দৃঢ়ভাবে প্রকাশ, ক্ষমা করে দেওয়া, কৃতজ্ঞ থাকা, এমন কিছু না করা যা নিজের কাছে গ্রহণযোগ্য না বা নিজেকে ছোট করে, রাগ নিয়ন্ত্রণ। প্রতিদিন অন্তত অল্পকিছু সময়ের জন্য হলেও নিজের জন্য সময় রাখুন এবং নিজের ভালো লাগার কাজ করুন।

সামাজিক জীবন : সপ্তাহে অন্তত একদিন কিছু সময়ের জন্য হলেও পরিবার, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সময় কাটান, বিনোদনমূল্অক কাজ করুন। যে-কোনো সামাজিক বন্ধন আমাদের নিরাপত্তাবোধ দেয়, আত্মবিশ্বাস বাড়ায় যা চাপ মোকাবেলা করতে সাহায্য করে।

কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ : কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ এমন রাখুন যেন প্রতিদিন সেখানে যেতে ভালো লাগে। অফিসের নিম্নস্তন কর্মচারী থেকে উর্ধ্বতন কর্মকর্তা পর্যন্ত সকল সহকর্মীদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখুন (কুশল বিনিময় করা, সময় দেওয়া, ভালো কাজে পরস্পরের প্রশংসা করা ইত্যাদি)।

বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা : মনকে সবসময় মুক্ত, কৌতূহলী, সজাগ ও সৃজনশীল রাখা, প্রতিদিন নতুন কিছু জানার ও শেখার চেষ্টা।


--ডা. মেখলা সরকার
সাইকিয়াট্রিস্ট, সহযোগী অধ্যাপক (সাইকিয়াট্রি),
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা।