শনিবার,২৫ মে ২০১৯
হোম / নারী / সুপার উইম্যান
০৫/০৫/২০১৯

সুপার উইম্যান

-

অনেকেই বলেন, বাঙালি নারীরা রান্না, বায়না আর কান্নাÑ এই তিনটি কাজ ছাড়া কিছুই করতে পারেন না। একজন স্বামীকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘আপনার স্ত্রী কী করেন?’ উত্তরে বললেন, ‘কিছুই করেন না, গৃহিণী।’ চোখের পর্দা সরিয়ে দেখুন, কী না করেন আপনার স্ত্রী,সবই করেন। সন্তানের পড়াশোনা, আর সংসার সামলানো নিয়ে ব্যস্ত স্ত্রীর কাজের হিসেব করে দেখুন, কখনো কখনো তার অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়াই আপনার জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। সীমিত আয়ে সংসার চালাতে দক্ষ সিএফও’র মতো হিসাব-নিকাশ করতে হয় তাকে। সন্তানের প্রোগ্রেসিভ রিপোর্ট থেকে শুরু করে রান্নাঘরের তেল-নুনের খবরটিও নারীকে রাখতে হয় নখদর্পণে। আর কর্মজীবী নারী হলে তো কথাই নেই।
ধরুন, স্বামী-স্ত্রী দুজন একই অফিসে একই দায়িত্ব পালন করেন। দুজনের রুটিনের কথা একটু ভাবুন। স্ত্রী ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাসার সবার নাস্তার ব্যবস্থা করবেন, বাচ্চাকে তৈরি করে স্কুলে পাঠাবেন, সারাদিনের বাসা কীভাবে চলবে, কে কি খাবে সব তৈরি করে স্বামীর ঘুম ভাঙাবেন। তারপর তারা একসাথে অফিসে যাবেন। দুজনে সমান কাজ করবেন। স্ত্রীকে কিন্তু একটা কান বাসায় রাখতে হবে। বাচ্চা ফিরল কিনা, ঠিকমতো খেল কিনা, শাশুড়ির ঔষধটা ঠিকমতো খাওয়া হলো কিনাÑ টেলিফোনে সব তদারকি করতে হবে। তারপর তারা একসাথেই ফিরবেন। ফিরে ক্লান্ত স্বামী পত্রিকা আর টিভির রিমোট নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দেন। কিন্তু স্ত্রীর তখন দম ফেলবার সময় নেই। ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলে, শাড়িটা কোমরে বেঁধে লেগে পড়েন সংসারে। সবার খাওয়া, সন্তানের পড়াশোনার খবর, বকাঝকা সব শেষ করে যখন বিছানার কাছে আসতে পারেন, ততক্ষণে রাত গড়িয়ে যায়। নারীদের দশটা হাত না থাকলে কারো পক্ষেই এতটা করা সম্ভব হতো না।

নারীর মস্তিষ্ক বেশি সক্রিয়

নারী-পুরুষ সাম্যের প্রশ্নে বারবার যে-বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা। সমাজের এমন কোনো স্তর নেই, যেখান থেকে এ-ধরনের সংশয় প্রকাশ করা হয়নি। সভ্যতার ইতিহাসে নারী-পুরুষ উভয়েরই সমান অবদান। যারা এ-সত্যই মানতে রাজি নন, তাদের জন্য দুঃসংবাদ হচ্ছে বিজ্ঞানীরা বলছেন, মস্তিষ্কের সক্রিয়তার দিক থেকে নারী বরং পুরুষের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষণার ফলাফল সামনে নিয়ে এসেছে জার্নাল অব আলঝেইমার’স ডিজিজ। ২০১৭ সালের ৭ আগস্ট এ-বিষয়ক গবেষণা প্রতিবেদনটির সার-সংক্ষেপ প্রকাশ করেছে সায়েন্স ডেইলি। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার আমেন ক্লিনিকস ইনকরপোরেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল জি আমেন এ-গবেষণা পরিচালনা করেন। এতে নয়টি ক্লিনিকের কাছ থেকে পাওয়া মোট ৪৬ হাজার ৩৪ ব্যক্তির মস্তিষ্কের স্পেক্ট (সিংগেল ফোটন এমিশন কম্পিউটেড টমোগ্রাফি) ইমেজ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

গবেষণাটিতে প্রতিটি মস্তিষ্কের মোট ১২৮টি অঞ্চল পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি অঞ্চলেই পুরুষের তুলনায় নারীদের মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালনের হার উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, নারীর মস্তিষ্কের বেশ কিছু অংশ পুরুষের অনুরূপ অংশের চেয়ে বেশি সক্রিয়। বিশেষত নারীর প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স বা অগ্রমস্তিষ্ক পুরুষের চেয়ে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেশি সক্রিয়। মস্তিষ্কের এ-অংশটি মনোযোগ ও উদ্দীপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এছাড়া মস্তিষ্কের অনুভূতি সংশ্লিষ্ট অংশ লিমবিকের সক্রিয়তাও নারীদেরই বেশি। এ-কারণে পুরুষের তুলনায় নারীদের আবেগ ও উদ্বেগের মাত্রা দুই-ই বেশি হতে দেখা যায়। তবে মস্তিষ্কের দর্শনেন্দ্রীয় সংশ্লিষ্ট অংশের দিক থেকে পুরুষ এগিয়ে রয়েছে।
নারীর শ্রেষ্ঠত্বের এমন হাজারটা উদাহরণ আছে। তবে তাদের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব পুরুষতান্ত্রিক সমাজে হাজারটা বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়া। তাদের ঘরে বাধা, বাইরে বাধা, পথে বাধা। ঢাকায় প্রতিদিন লাখ লাখ নারী কাজের জন্য প্রতিদিন ঘর থেকে বের হন। তাদের জন্য ঢাকায় কোনো স্বাস্থ্যকর পাবলিক টয়লেটও নেই। পুরুষদের ধাক্কায় তারা পাবলিক বাসে উঠতে পারেন না। উঠতে পারলেও শরীরে নখের আঁচড়, আঙুলের খোঁচা, লালসার দৃষ্টি আর মনে তীব্র বিবমিষা নিয়ে প্রতিদিন বাসায় ফিরতে হয়। তারপর আবার নিজেকে তৈরি করতে হয় পরদিনের যুদ্ধের জন্য। নারীদের যুদ্ধ প্রতিদিনের।


--রিয়াদ খন্দকার

মডেল : সালেহা খানম নাদিয়া
মেকওভার : পিংক ব্লাশ বিউটি লাউঞ্জ
ছবি : তানভীর আহমেদ