সোমবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯
হোম / বিবিধ / ২০০০ বছর আগে কেমন ছিল সন্তানকে স্তন্যদানের পদ্ধতি
০৫/০১/২০১৯

২০০০ বছর আগে কেমন ছিল সন্তানকে স্তন্যদানের পদ্ধতি

-

সভ্যতার উন্নয়ন, বিশ্বায়ন আর ব্যবসার ব্যাপক সম্প্রসারণের দরুন মানুষের খাবারের জায়গাটিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে। সেই সুপ্রাচীনকালের মানুষের শিকার করে খাওয়া কিংবা বিনিময়ের মাধ্যমে খাবার সংগ্রহের পদ্ধতির ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। খাবারের এই বিপ্লব যে কেবল সাধারণ খাদ্যের ক্ষেত্রেই ঘটেছে এমন কিন্তু নয়। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের খাবার থেকে শুরু করে শিশুখাদ্যের অবস্থানেও এসেছে পরিবর্তন। এক সময়ে যেখানে সন্তান জন্মাবার পর সন্তানের খাবার হিসেবে মায়ের দুধের কোনো বিকল্প ছিল না, আজ সেখানে বাজারে রকমারি দুধের সম্ভার। এমনকি উন্নত দেশগুলোতে সরাসরি মায়ের দুধ ও বাণিজ্যিকভাবে বাজারে চলে এসেছে। তাই আজকের দিনে একটি বাচ্চার জন্মের পর তার খাদ্যের ব্যাপারটা খুব বেশি গুরত্বপূর্ণ নয়। জন্মের পর বাচ্চার জন্য সবার প্রথমেই মায়ের বুকের দুধের কথা আসলেও এর বিকল্প এখন বাজারে সহজলভ্য। কিন্তু আজ থেকে কয়েক শত বছর আগের পরিস্থিতি কিন্তু এমন ছিল না। বাজারে তখন মায়ের বুকের দুধের বিকল্প বলে কিছুই ছিল না। অপরের সন্তানকে সেচ্ছায় স্তন্যদানের পেশার সর্বপ্রথম নজির দেখা যায় আজ থেকে প্রায় ২ হাজার বছর আগে। একে পরবর্তী সময়ে ওয়েট নার্স ও বলা হতো।
সন্তানের জন্য মায়ের বুকের দুধের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সেই সময়ে বিস্তারিত ধারণা না থাকলেও মানুষের বিশ্বাস ছিল এই দুধে বাচ্চার জন্য জাদুকরী কোনো উপাদান রয়েছে, যা বাচ্চাকে সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে সহায়তা করে। তাই সেই সময়েও মায়েদেরও নিজ নিজ সন্তানকে স্তন্যদানে উৎসাহিত করা হতো। এই পেশাটি চলেছিল প্রায় বিংশ-শতাব্দী পর্যন্ত। একজন মা তার সন্তানের জন্য ওয়েট নার্স নিয়োগ দেবেন কিনা এটা তার ইচ্ছা এবং কখন কখন তার পরিস্থিতির উপর নির্ভর করত। কিছু মায়ের দেহে সন্তানের জন্য পর্যাপ্ত দুধ উৎপন্ন না হওয়ার দরুন তাদের সন্তানের জন্য এই ধরনের নার্সদের নিযুক্ত করা ছাড়া কোনো উপায় সেই সময়ে ছিল না। এই সকল নিযুক্তির ক্ষেত্রে তাদেরও বেশ কিছু নিয়মকানুন মেনে চলতে হতো।

সেই সময়ে গ্রিসের উচ্চবংশীয় নারীরা মূলত ওয়েট নার্সদেরই নিয়োগ দিতেন। বাচ্চাদের বয়স ৩ বছর হওয়ার আগপর্যন্ত তারা স্তন্যদান করে থাকতেন। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দ থেকে শুরু করে ৪০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রোমান সা¤্রাজ্যে মেয়ে শিশুদের, দেখাশোনার জন্য ওয়েট নার্সদের সাথে লিখিত চুক্তি করা হতো। কারণ এই সকল মেয়ে শিশুদের বড়ো করে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করা হতো বলে জানা যায়। উনিশ শতকের দিকে শিশুদের দুধ খাওয়ানোর বোতলের আবিষ্কার হওয়ার সাথে সাথে ওয়েট নার্সিং পেশারও বিলুপ্তি ঘটে। প্রায় উনিশ শতক পর্যন্ত এই পেশার টিকে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ হলো সেই সময়ে অনেক ধনীনারী এবং তাদের পরিবার সন্তানকে দুধ পান করানোকে ‘আনফ্যাশনেবল’ বলে ভাবত। তাদের টাকার পয়সার অভাব ছিল না বলে অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের সম্পদের জানান দিতেও অনেকে এই কাজ করত। উনিশ শতক থেকে বাচ্চাদের বিভিন্ন প্রাণীর দুধ পান এবং বোতলে করে দুধ পান করানো বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে বাচ্চাদের দুধ পান করানোর জন্য বোতলের ব্যবহার হাজার হাজার বছর আগেও হয়েছিল। আনুমানিক ৪৫০ খ্রিস্টপূর্বের দিকে ব্যবহৃত গ্রেসিয়ান টেরাকোটার একটি ফিডার পাওয়া গিয়েছে, যাতে করে বাচ্চাদের ওয়াইন বা তরল খাবার পান করানো হতো বলে ধারণা করা হয়। প্রাচীনকালের অনেক কন্টেইনারেই দুগ্ধজাত দ্রব্যের উপস্থিতির প্রমাণও পাওয়া গিয়েছে। যা প্রমাণ করে বোতল অথবা কনটেইনার বহুকাল আগে থেকেই ব্যবহার করা হতো। রোমান, মধ্যযুগীয় এবং রেনেসাঁর সময়কালে এই বোতল পরিষ্কার করা ছিল একটি ঝামেলার বিষয়। তবে শিল্পবিপ্লবের ফলে এই সমস্যা দূরীভূত হয়। যারফলে দুধের গুণগতমান বৃদ্ধি পায় বহুগুণে। এখনকার সময়ে আমরা সকলেই বাচ্চাদের ফিডারের একটি আকৃতির সাথে অধিক পরিচিত। কিন্তু প্রথমদিকে পরিস্থিতি এমন ছিল না। সেই সময়ে কিছু ফিডার সিরামিক ও কাঠ দিয়ে বানানো হতো। সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল প্রাণীর শিং দিয়ে তৈরি করা ফিডারগুলো। এরপর সপ্তদশ শতকে পিউটার ও ইস্পাতের তৈরি ফিডারের ব্যাবহার বেড়ে যায়। এছাড়াও ইউরোপে সেই সময়ে বেশ জনপ্রিয় ছিল ইংরেজ চিকিৎসক হিউ স্মিথের উদ্ভাবিত বেবি পট। এটি পরিষ্কার করা ছিল একটি দুঃসাধ্য কাজ যারফলে শিশুরা অসুস্থ হয়েও পড়ত। উনিশ শতকের মধ্যভাগে বাজারে আসে কাচের তৈরি ফিডার। পরবর্তীসময় কাচের বিভিন্ন ডিজাইনের ফিডার বাজারে এসেছে। কিন্তু উপহাস করে এগুলোকে ‘খুনে বোতল’ বলা হতো। কারণ এই বোতলগুলো ঠিকমতো পরিষ্কার করা যেত না, যারফলে অল্পদিন ব্যবহারেই এগুলো হয়ে যেত অস্বাস্থ্যকর। সেই সময়ে এক ধরনের কৃত্রিম স্তনও উদ্ভাবন করেছিলেন এক ব্যক্তি। যার ভেতরে তরল দুধ ভরে একজন মা সেটি গায়ে জড়িয়ে রাখতে পারতেন। পরবর্তীসময় সুবিধামতো সন্তানকে সেখান থেকে দুধ পান করাতে পারতেন। ১৯০০ সালের পর বাজারে আসে প্লাস্টিক ও রাবারের বোতল যেগুলো শিশুদের দুধ পানের ও উপযোগী। এগুলো পরিষ্কার করাও বেশ সহজ ছিল এবং দামেও সস্তা ছিল। ফিডারের উপরে এখন আমরা যে রাবারের নরম অংশটি দেখি যা মূলত নিপল নামেই অধিক পরিচিত। এর আবিষ্কার প্রথম হয়েছিল ১৮৪৫ সালে; কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে জনপ্রিয়তা পায় ১৯০০ সালের পর থেকে। বর্তমানে শিশুখাদ্যকে বিশেষত দুধকে উন্নত থেকে উন্নততর করার জন্য প্রচুর গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কাজ চলছে। উন্নতবিশ্ব সরাসরি মায়ের দুগ্ধ বোতলে করে বাজারজাত করেছে। সকলেই শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য কাজ করে চলছে।
তবে এ কথা চিরকালই সত্যিই শিশুর বিকাশে মাতৃদুগ্ধের বিকল্প নেই।


--মীর মাইনুল ইসলাম