মঙ্গলবার,২২ অক্টোবর ২০১৯
হোম / অন্দর-বাগান / বৈশাখ দিনের অন্দর রচনা
০৪/২০/২০১৯

বৈশাখ দিনের অন্দর রচনা

-

ঠক ঠক ঠক। রঙিন বৈশাখ কড়া নাড়ছে দরজায়। বৈশাখ প্রতিবছরই ঘরের দুয়ার খুলে চলে আসে আপনার অন্দরে। বাঙালির এই উৎসবকে প্রতিটি ঘরে আমন্ত্রণ জানানো হয়, রঙের খেলায় মেতে উঠতে। বৈশাখী রং ফুটে ওঠে কারও পোশাকে, কারও দেয়ালে, কারও দরজায়, কখনো চাদরে কিংবা পর্দায়। প্রাণের উচ্ছ্বাসে, নাড়ির টানে একে অপরের ভেদাভেদ ভুলে সব এক হয়ে যায় পহেলা বৈশাখে। প্রতিটি ঘরে চলে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি। অন্দর সাজ বা অতিথি আপ্যায়নেও প্রকাশ পায় পুরো মাত্রার বাঙালিয়ানা। তাই অন্দরের প্রতিটি জায়গায় থাকে নান্দনিকতার ছোঁয়া।
এজন্য প্রস্তুতি তো থাকা চাই আগে থেকেই।

রং হোক মনের মতো

ঘরের দেয়ালের রং কেমন হবে তা নির্ভর করবে ঘরের আসবাব, আনুষঙ্গিক জিনিস এবং অবশ্যই ব্যক্তিগত রুচির ওপর। শুধু সঠিক পরিকল্পনায় দেয়ালে রঙের ব্যবহারে পাল্টে ফেলতে পারেন আপনার অন্দরমহল, যারা বৈশাখের আগে রং করাবেন ভাবছেন দেরি না করে এখনই সিদ্ধান্ত নিন। আধুনিক অন্দর সজ্জায় আপনার ঘর রাঙাতে যে-কোনো একটি দেয়ালকে গাঢ় এবং বাকি দেয়ালগুলোকে হালকা রঙে রাঙিয়ে তুলুন। পর্দা থেকে একটি গাঢ় রঙ নিবার্চন করুন ঘরের দেয়ালের জন্য। প্রতিটি ঘরের রং নিবার্চন করার সময় ঘরের চারপাশের পরিবেশকে মাথায় রাখুন। গাঢ় রং যেই দেয়ালের জন্যই নিবার্চন করুন না কেন, লক্ষ্য রাখবেন যাতে রোদ কোনো ব্যাঘাত না ঘটায়। কারণ গাঢ় রঙের তাপ শোষণ ক্ষমতা অনেক বেশি হওয়ার কারণে জানালা দিয়ে আসা রোদের আলো দেয়ালে প্রতিফলিত হয়ে ঘরকে আরও গরম করে তোলে। যদি সময় স্বল্পতা থাকে এবং বাকি ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে চান তাহলে রঙের পরিবর্তে দেয়ালকে হাইলাইট করতে ওয়াল পেপার বেছে নিন। অনেকে আবার নিজের পছন্দের কবিতার অংশবিশেষ দেয়ালে পেইন্ট করে নিজের অন্দরমহলকে দিচ্ছেন ভিন্নমাত্রা।

পর্দায় থাকুক নান্দনিকতার ছোঁয়া


বৈশাখ মাসের সাথে গরম ও ঝড়-বৃষ্টির একটা সম্পর্ক থাকে বরাবরই। নানারঙের ছড়াছড়ির মাঝে সাদা রঙের স্নিগ্ধতা দেয় প্রশান্তি। আর লাল রঙের পর্দা ফিরিয়ে দিতে পারে পূর্ণ বৈশাখী আমেজ। বাড়িতে ঢোকার সময় সবাই প্রথমেই ঢোকে বসার ঘরে। তাই বসার ঘরের পর্দা নির্বাচনের ক্ষেত্রে সর্তক থাকতে হবে, যেন বসার ঘরের প্রতিটি আসবাবের সাথে সামঞ্জস্য থাকে। আপনি বৈশাখকে ভিন্ন আমেজে ফুটিয়ে তুলতে থিমভিত্তিক অন্দর সাজকে বেছে নিতে পারেন।

এ বৈশাখের থিমে যদি আপনি ফুল, পাখি, লতাপাতাকে প্রাধান্য দিতে চান তাহলে ফ্লোরাল মোটিফকে গুরুত্ব দিন। আপনি বসার ঘরের সাদা পর্দা নির্বাচন করুন আপনার পছন্দের ফুলের মোটিফের। প্রিন্টের পর্দার সাথে একরঙের পর্দার মিশ্রণে ঘরে ফুটিয়ে তুলুন কন্ট্রাস লুক। বসার ঘরের পর্দা একটু উজ্জ্বল হলে ভালো। সাদার সাথে কমলা, লাল, সবুজ। শোবার ঘরের জন্য বেছে নিন সাদার সাথে টিয়া, হলুদ, টমেটো লাল রঙ। বাচ্চাদের ঘরে ফুলের পাশাপাশি লতা-পাতা, পাখি, প্রজাপতির মোটিফের পর্দা ব্যবহার করতে পারেন। একটু ভিন্ন মাত্রা আনতে সাদার মধ্যে লাল অথবা লালের মধ্যে সাদা বল প্রিন্টের কাপড় ব্যবহার করতে পারেন ঘরের পর্দার জন্য। আবার অনেক সময় ঘরে ব্যবহৃত কুশন কভার, সোফার কভার, বালিশ এবং বিছানার চাদর সুতার কাজ করা থাকে, সেখানকার একটি নির্দিষ্ট রং নির্বাচন করে সাদা অথবা অফ হোয়াইট পর্দার ভেতরে সই রঙের সুতা, ব্লক অথবা টাক ডাই-এর কাজ করিয়ে নেওয়া যায়। সঠিক পর্দা নির্বাচন আপনার ঘরের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিবে বহুগুণ।

বৈশাখী আলপনা

অনেকের আবার আল্পনা বেশ পছন্দ। যে-কোনো স্থায়ী আল্পনা করাতে না চাইলে অস্থায়ী আল্পনা করে নিতে পারেন ঘরের প্রবেশমুখে, সিঁড়িতে, বারান্দায় কিংবা মেঝেতে। অনেকে যাদের টাইলসের মেঝে তাদের জন্য ফুলের আল্পনাই ভালো। কয়েক ধরনের ফুলের পাপড়ির মিশ্রণে আল্পনার নকশা ফুটিয়ে তুলুন। আল্পনার সূক্ষ্ম কারুকাজের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলুন উৎসবের বর্ণিল রং।

উৎসবধর্মী আমেজ

এ তো গেল ঘরের সাধারণ সাজসজ্জা। উৎসবধর্মী ভাবগাম্ভীর্য আনতে চাই খানিকটা বাড়তি আয়োজন। ঘর সাজানোর জন্য নানা দিনের দেশীয় উপকরণ বেছে নিন। উৎসব উৎসব আমেজ আনতে এসব সামগ্রীর জুড়ি নেই। অন্দরমহলে বাঙালি সংস্কৃতি ফুটিয়ে তুলতে ঘরের বিভিন্ন দেয়ালে লাগানো যেতে পারে নানা ডিজাইনের টেরাকোটার কাজ অথবা দেয়ালে মুখোশের ব্যবহার মনে করিয়ে দিবে মঙ্গল শোভাযাত্রার কথা। ঘরের বিভিন্ন কর্নারে রেখে দিতে পারেন মাটির পটারি। প্রশান্তিতে মনকে ভরিয়ে তুলতে পটারিতে যোগ করুন বিভিন্ন ধরনের ইনডোর প্লান্টস এবং ফুল। অতিথি আপ্যায়নে মাটির চাড়িতে ফুলের পাপড়ি এবং ফুল স্বাগত জানিয়ে বৈশাখের অভ্যর্থনা সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালিয়ে ঘরের চারপাশে প্রচ্ছন্ন আবহ তৈরি করতে পারেন।

সঙ্গে আরও নানান সাজ

বৈশাখের দিনে খাবার টেবিলকেও রাখতে হবে দেশি আমেজে খাবার পরিবেশনের জন্য, মাটির বাজা, বেত নারিকেল দিয়ে তৈরি থালা, বাটি, জগ, গ্লাস, মগ, চামচ, ট্রে ইত্যাদি ব্যবহার করুন। বৈশাখ মানেই চোখের সামনে ভেসে উঠে পান্তা ইলিশ। তাই প্লেটের পরিবর্তে মাটির সানকি ব্যবহার করতে পারেন। অনেকের আবার কাচ বা সিরামিকের তৈজসপত্র পছন্দ। সেক্ষেত্রে উজ্জ্বল রঙকে প্রাধান্য দিয়ে আবার পরিবেশনের পাত্র নির্বাচন করুন। টেবিলে টেবিলে ম্যাট এবং টেবিল রানার যাই ব্যবহার করেন না কেন, তাতে যেন থাকে দেশি আমেজ।
ঘরের শোপিস ও অন্যান্য অনুষঙ্গিক জিনিসপত্র একটি বিরাট ভূমিকা রাখে অন্দরসজ্জায়। তাই নকশিকাঁথার কারুকাজ করা ওয়ালমেট, বাঁশের তৈরি ল্যাম্প, ছিকায় মাটির হাঁড়ি, তালপাখা, শীতলপাটি, মাদুর ইত্যাদির ব্যবহারে বৈশাখের আমেজে নিয়ে আসতে পারেন খুব সহজেই। ঘরের সিটিং এ্যারেন্জমেন্ট বাড়াতে মোড়ার জুড়ি নেই।


-ফারজানা গাজী
ইন্টেরিয়র ডিজাইনার
স্বত্বাধিকারি, ফারজানা’স ব্লিস