শনিবার,২৫ মে ২০১৯
হোম / ভ্রমণ / বৈসাবি সুর পাহাড়ে পাহাড়ে
০৪/২০/২০১৯

বৈসাবি সুর পাহাড়ে পাহাড়ে

-

আমাদের পাশাপাশি নববর্ষের উৎসবে মাতেন আমাদের দেশের আদিবাসীরাও। তবে তা আমাদের বর্ষবরণের মতো না হলেও তাদের ঐতিহ্য অনুযায়ী অনেক মজার বর্ষবরণ উৎসব হয়। বাংলাদেশের একটি বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে আদিবাসীদের বাস। বাংলাদেশে মোট ৩১টি আদিবাসীগোষ্ঠী রয়েছে? এদের মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলাতেই ১১টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস। বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলেও আদিবাসীরা গুচ্ছ গুচ্ছ আকারে বসবাস করে। আর বাস করে উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্রঅঞ্চলে। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান তিনটি আদিবাসীদের পহেলা বৈশাখের উৎসবের নামগুলোকে মিলিয়ে আলাদা নামই দেওয়া হয়েছে বৈসাবি। তঞ্চঙ্গ্যা আর ত্রিপুরাদের বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাই আর চাকমাদের বিঝু, তিনটার প্রথম অক্ষর মিলিয়ে বৈসাবি। চলুন তাহলে জেনে আসি সেই বর্ষবরণের গল্প।

চাকমাদের বিঝু


পার্বত্য চট্টগ্রামে ১১টি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে চাকমারা সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি। তারা প্রায় সবাই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। আর তাদের প্রধান সামাজিক উৎসব ‘বিঝু’। বাংলা বর্ষপঞ্জি মতে বছরের শেষ দুদিন ও নববর্ষের প্রথম দিন তাদের এই বিঝু উৎসব হয়। অর্থাৎ, চৈত্রের ২৯ ও ৩০ আর বৈশাখের ১ তারিখ। উৎসবের প্রথম দিন, অর্থাৎ ২৯ চৈত্রফুল বিঝু আর দ্বিতীয় দিন, ৩০ চৈত্র মূল বিঝু। তবে ওদের আসল উৎসব হয় পহেলা বৈশাখে, ঠিক আমাদের মতো। ওদের ভাষায় অর্থাৎ চাকমা ভাষায় এদিনটার নাম গর্যাপর্যা দিন। মানে গড়াগড়ি খাওয়ার দিন! বছরের প্রথম এই দিনে ওরা সবাই মাছ-মাংসসহ আরো নানা ভালো ভালো আর মজার মজার খাবার রান্না করে। দিনের শেষে ছেলেমেয়েরা বয়স্কদের আশীর্বাদ নেয় আর মেয়েরা বয়স্কদের অর্থাৎ, বাবা-দাদাদের যত্ন করে গোসল করিয়ে দেয়। এভাবেই চাকমারা নববর্ষ পালন করে।

মারমাদের সাংগ্রাইং

মারমাদের বর্ষবরণ উৎসবের নাম সাংগ্রাইং পোয়ে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ওরা কিন্তু বাংলা পঞ্জিকা অনুসরণ করে না। ওরা মেনে চলে বর্মীপঞ্জি, অর্থাৎ বার্মা ক্যালেন্ডার। কিন্তু ঠিকই আমাদের পহেলা বৈশাখেই সাংগ্রাই পালন করে। এই অনুষ্ঠানটি চারদিনের হলেও মারমাদের মধ্যে কিন্তু পুরো সপ্তাহজুড়েই উৎসবের আমেজ থাকে। এইদিন মারমা কিশোরীরা খুব ভোরে উঠে ফুল দিয়ে ঘর সাজাতে থাকে। আর গৃহিণীরা ঘরদোর আর ঘরের সব জিনিসপত্র ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে একদম চকচকে রাখে। আর বয়স্করা এদিনে বৌদ্ধমন্দিরে গিয়ে উপোস করে। মানে, সারাদিন কিছুই খায় না, শুধু পূজা-অর্চনা করে। বোমাং রাজার নেতৃত্বে শোভাযাত্রা বের করে। তারপর গোয়াইন বুদ্ধমূর্তিকে গোসল করানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় ওদের মূল উৎসব। সাংগ্রাইং অ্যাক্রেই বা পূর্ণতার দিনে এই মৈত্রী পানিবর্ষণ উৎসব অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়। পুরনো বছরের সমস্ত কালিমা ধুয়ে ফেলে অপরজনকে মৈত্রী বা বন্ধুত্বপূর্ণ শুভেচ্ছা জানাতেই তারা একজন আরেকজনের গায়ে পানি ছুঁড়ে ভিজিয়ে দেয়। এভাবে সবাই পুরোনো বছরের সব কালিমা ধুয়ে নতুন করে নতুন বছর শুরু করে।

এ-উৎসবের ভাগ নিতে পারেন আপনিও

পুরানো বছরের বিদায় ও নতুন বছরকে বরণের মধ্যদিয়ে পালন করা হয় বর্ষবরণ উৎসব। পার্বত্যাঞ্চলের শুধুমাত্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা নয়, এ উৎসবে মেতে উঠে বাঙালি, হিন্দু ও বড়ুয়া সম্প্রদায়ের মানুষও। এদিন জাতিগতভাবে থাকে না কোনো দ্বন্দ্ব। একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরো সুদৃঢ় হয়। সব মিলে বৈসাবির রঙে রঙিন হয়ে উঠে পাহাড়। এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হয় এ উৎসব, চলে প্রায় অর্ধমাসব্যাপী। বাংলা বর্ষের শেষ দু’দিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিন মোট তিনদিনই মূলত বর্ষবরণ উৎসব ‘বৈসাবি’ পালিত হয় বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায়। এ সময়টা বিশেষ করে ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের বেশি আকর্ষণ করে। তাই আর দেরি না করে বেড়িয়ে আসতে পারেন রাঙ্গামাটির রঙিন পাহাড় থেকে। আর এ উৎসবের ভাগ নিতে পারেন আপনিও।

ত্রিপুরাদের বৈসুক

ত্রিপুরাদের বর্ষবরণ উৎসবের নাম বৈসুভিম। চৈত্রের শেষ দুদিন ও নববর্ষের প্রথম দিনÑ এ তিনদিন বৈসু উদযাপন করে। উৎসবের প্রথম দিনকে ওরা বলে হারিবৈসু, দ্বিতীয় দিনকে বৈসুম্মা আর তৃতীয় দিনকে, অর্থাৎ পহেলা বৈশাখের দিনটিকে বলে বৈসুভিম। পুরোনো বছরের গ্লানি, জরা আর হতাশা ঝেড়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে নতুন প্রাপ্তির প্রত্যাশায় মঙ্গল কামনা ও আশীর্বাদ নেওয়ার দিন হচ্ছে বৈসুভিম। বড়োরা এদিন ছোটদেরকে আশীর্বাদ করে। আর কিশোরীরা কলসি কাঁখে নিয়ে বড়োদের খুঁজে খুঁজে গোসল করায়। তরুণ-তরুণীরা রং খেলায় মেতে ওঠে। একজন আরেকজনকে রং ছিটিয়ে রঙিন করে দিয়ে গোসল করে আবারো আনন্দে মেতে ওঠে।

তঞ্চঙ্গ্যাদের বিসু

তঞ্চঙ্গ্যাদের বর্ষবরণ অনেকটা চাকমাদের মতোই। বান্দরবান ও রাঙামাটির পার্বত্য অঞ্চলে তঞ্চঙ্গ্যারা বাস করে। পহেলা বৈশাখের দিনকেও ওরা চাকমাদের মতোই গর্যাপর্যা দিন বলে। তঞ্চঙ্গ্যাদের ভাষায় এই বিসু উৎসব চলে তিনদিন ধরেই। নববর্ষের দুদিন আগেই মেয়েরা বন থেকে ফুল সংগ্রহ করে সেই ফুল দিয়ে ঘর সাজায়। আর উৎসব উপলক্ষে হরেকরকমের পিঠাও বানানো হয়। গৃহিণীরা তাদের বাড়িঘর ও ঘরের রাজ্যের জিনিসপত্র পরিষ্কার করে ঝকঝকে তকতকে করে রাখে। আর পরদিন ভোরে সবাই গোসল করে নতুন জামা-কাপড় পরে খুব আনন্দ-ফূর্তি করে। ঘরে ঘরে ওদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী খাবার আর পিঠার আয়োজন করে। রাতে ‘ঘিলা’ নামের এক খেলায় মেতে ওঠে সবাই। আর সেই সঙ্গে গ্রামে গ্রামে বসে লোকজগানের আসর।

যাতায়াত ও থাকা

ঢাকা থেকে সরাসরি রাঙ্গামাটি যায় শ্যামলী, ইউনিক, এস আলম, ডলফিন ও সেন্টমার্টিন পরিবহনের এসি বাস। ভাড়া ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২শ’ টাকা। এছাড়া ডলফিন পরিবহন, এস আলম, সৌদিয়া পরিবহন, শ্যামলী পরিবহন, ইউনিক সার্ভিসের নন এসি বাসও রয়েছে। রাঙ্গামাটি শহরে থাকার জন্যে রয়েছে বিভিন্ন আবাসিক হোটেল, মোটেল ও রেস্তোরাঁ। ভাড়া ১ হাজার টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত।


-সৈয়দ তাওসিফ মোনায়ার