শনিবার,২৪ অগাস্ট ২০১৯
হোম / বিনোদন / মঞ্চ- রাজনৈতিক বাস্তবতায় জীবনের মহাবয়ান
০৪/১০/২০১৯

মঞ্চ- রাজনৈতিক বাস্তবতায় জীবনের মহাবয়ান

-

‘রাজাকার বদু মওলানার পুনর্বাসন ও দাম্ভিকতার বিপরীতে অসহায় বেঁচে থাকা মুক্তিযুদ্ধে নিপীড়িত পরিবারের আবদুল মজিদের পায়ের জুতোর ফিতা ফস করে ছিঁড়ে যায়।’ মুক্তিযুদ্ধ যে শেষ হয়ে যায়নিÑ তা যেন নতুন করে অনুভূত হলো শহীদুল জহিরের উপন্যাসকে ভিত্তি করে সৈয়দ জামিল আহমেদ নির্দেশিত ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ নাটকে। রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তে একজন নিপীড়িত আব্দুল মজিদের মানসিক অভিঘাতই এক নাটকের উপজীব্য। গত ১৪ থেকে ২০ মার্চ পর্যন্ত নাটকটি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মূল হলে প্রদর্শিত হয়। নাটকটি প্রযোজনা করেছেন সদ্যগঠিত ‘স্পর্ধা’ নামে নতুন একনাট্য সংগঠন। এ নাটক নির্মাণ ও সপ্তাহব্যাপী প্রদর্শনীতে সহযোগিতা করেছেন শিল্পকলা একাডেমি ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

নাটকের কাহিনি মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী অবস্থা ঘিরে। মুক্তিযুদ্ধের প্রায় একযুগ পরে পুরাতন ঢাকার এক যুবক আবদুল মজিদ বাজারে যাবার পথে রাজাকার পক্ষে শক্তির পুনরুত্থান দেখে তাদের পায়ের জুতোর ফিতা ফস করে ছিঁড়ে যায়। কারণ এ রাজাকারদের জন্যই আবদুল মজিদের পরিবারের বসতি এলাকা লক্ষ্মীবাজারের শ্যামাপ্রসাদ লেনে হত্যাযজ্ঞ, খুন, ধর্ষণ সংগঠিত হয়েছে। এমনকি মজিদের বোনকেও তুলে নিয়ে যায় রাজাকাররা। চারদিন পর বোন মোমেনার ছিন্নভিন্ন ধর্ষিত দেহের সন্ধান পায়। আবদুল মজিদ ক্ষমতাহীন রাজনৈতিক দলের নেতার শরণাপন্ন হয়েও রাজাকারদের সাধারণ ক্ষমার ঘোষণায় শুনতে পায়। ‘রাজনীতিতে চিরকালের শত্রু-মিত্র বলে কিছু নাই।’ এমন কথাগুলো আবদুল মজিদকে আরো অসহায় করে তুলে। নানাঘটনার আবর্তে এগিয়ে চলতে থাকে নাটক। এক সময় আবদুল মজিদের নবজাতক কন্যার পিতা হলে কন্যার নাম রাখেন বোনের নাম অনুসারে মোমেনা। এতে রাজাকার বদু মওলানা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে ‘বোনের নামে মেয়ের নাম রাখছো। বোনরে ভুল নাই।’ রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তের তুলসীগাছের অসহায়ত্বের মতো আবদুল মজিদ এক সময় সিদ্ধান্ত নেয় বাড়ি বিক্রি করে অন্যত্র চলে যাবার। এক জাদুকরী বাস্তবতায় এভাবে কাহিনি এগিয়ে চলে।
প্রচলিত কোনো সাহিত্যকর্মের প্রতি যে এত বেশি বিশ্বস্ত থাকা যায় তা সৈয়দ জামিল আহমেদের নির্দেশিত এ-নাটক। সাহিত্যরসের বিপরীতে নাট্যরসে কোনো ভিন্ন অনুভূতি হয়েছে বলে মনে হয়নি। বরং নাটকের মূল যে পাঠ, উপস্থাপনায় সে বিষয়টিতেও বিশ্বস্ত থেকেছেন। তারপরও নাট্যটি হয়ে উঠেছে স্বতন্ত্র। অনবদ্য এক শক্তি ও ক্ষমতার জন্ম দিচ্ছে প্রতি প্রেজেন্টেশনে।

‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ উপন্যাসটিতে শহীদুল জহির আশ্রয় করেছেন মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাস্তবতাকে। অত্যন্ত কমপ্লেক্স গল্পকে কী চমৎকার সরলতা ও নান্দনিকতা-নাটকীয়তায় উপস্থাপন করেছেন নির্দেশক। গল্পের মজিদের সেন্ডেল ছিঁড়ে যাওয়া, রাজাকারদের সাধারণ ক্ষমা, ধর্ষিতা বোনের নাম অনুসারে মেয়ের নাম রাখা প্রভৃতি নানানাটকীয় অভিঘাতে হৃদয় রক্তক্ষরণের করুণ আনন্দানুভূতিই তৈরি হয়েছে নাটকে। গল্পের চেয়ে ছোট ছোট গল্প ইমেজগুলো মেটাফোরক্যালি নানা অনুভূতিতে নিয়ে যাচ্ছিল বারবার। মজিদ, মমিন, মায়ারাণী যেন বেদনার্তে ঘিরে রেখেছে।
দৃশ্যনির্মাণগুলো উঁচুতর সৃজনশীল। চরিত্র, কোরিওগ্রাফি, আলো, সংলাপ, চলনগতি প্রভৃতির মাধ্যমে কখনো অ্যামফেসিস, কখনো সাজেক্টিভিটি-অবজেক্টিভিটি, কখনো ফ্র্যাগমেন্টেশন কিংবা কখনো বায়োনারী অপজিশনের ধারায় বিষয়-ভাবের গভীর অনুভূতি ও গল্পের আবেগগুলো তুলে ধরেছেন। থিয়েট্রিক্যাল গেমসগুলো কী অসাধারণ। একই দৃশ্যের পুনঃপুন ব্যবহার দিয়ে বিরক্তির পরিবর্তে ভিন্ন ভিন্ন অর্থের ব্যঞ্জনার এ্যাস্থটিক্যাল রিলেটিভিটি তৈরি করেছেন। একই ঘটনার নানা ব্যাখ্যা নাটকটিতে করেছে অনন্য। বহু থেকে একে এবং এক থেকে বহুমাত্রিকায় উদ্ভাসিত। দর্শক যে থিয়েটার দেখছে এমন এলিনিয়েটেড রিডাররেসপন্স মাত্রা তৈরি করেছেন নির্দেশক। নির্মাণে সাবজেক্টিভিটি-অবজেক্টিভিটি কিংবা ফোকাল পয়েন্ট নির্মাণগুলো কী অসাধারণ। প্রথম দৃশ্যে মঞ্চে ২০টি চরিত্রের মধ্যে ক্রিয়াশীল অবস্থায় ১৯টি শোয়ে পড়লে যখন ১টি চরিত্র দাঁড়িয়ে থাকে তখন নতুন আরেক অন্তঃপাঠ তৈরি হয়ে ওঠে দৃশ্যটির ভেতর দিয়ে। এরকম আরেকটি দৃশ্যে মোমেনাকে যখন ধরে নিয়ে যায় তখন মঞ্চের সবক্রিয়া থেমে গিয়ে পূর্ণমনোযোগে মোমেনা বলে উঠে ‘ওরা আমায় কিছু করবে না।’ তখন যেন ভিন্নমাত্রিক আবেগ তৈরি হয়। উঁচুতর শিল্পবোধ ও নির্মাণক্ষমতা ছাড়া তা নির্মাণ অসম্ভব। নানাউপকরণ-উপাদানে নানামুখী ভাবনার সম্মিলনে এক অনবদ্য টানটান জাদুকরী বাস্তবতার নাটক। ম্যাজিক রিয়ালিজমের মতো একধরনের হাইপার রিয়ালিজম তৈরির প্রচেষ্টাও লক্ষ্য করা গেছে। ভাঙনবাদী কিংবা ডিকন্সট্রাটিভ নানামাত্রাও আছে নাটকটিতে। কী অসাধারণ অন্তঃগতি নাটকটির। মিউজিক, কোরিওগ্রাফি, বর্ণনা, মেটাফোর, অভিনয় ও দৃশ্যালঙ্করণ, দৃশ্যে ইমেজের টানটান গাঁথুনিতে প্রায় দু’ঘণ্টার অধিক সময় ধরে পরিমিতিবোধে শিল্পনন্দনে অভিভূত রেখেছে দর্শকদের। নাটকটির উত্তরোত্তর মঞ্চসাফল্য কামনা করি।


-আবু সাঈদ তুলু