সোমবার,২২ এপ্রিল ২০১৯
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / অস্তিত্ব
০৪/১০/২০১৯

অস্তিত্ব

- আলমগীর রেজা চৌধুরী

ক্লান্ত শরীরে গলিতে ঢুকতেই ফজলু দেখতে পেল ম্লান অন্ধকার। এলাকার বৈদ্যুতিক বাতিগুলো সব নিভে গেছে। শুধু দু’তিনতলা বিশিষ্ট বাড়িগুলোর জানালা দিয়ে মোমবাতি অথবা হারিকেনের মৃদু আলো এসে পড়ছে রাস্তায়। তাও অস্পষ্ট, একদৃষ্টিতে কোনো কিছু দেখার উপায় নেই। কাঁকর বিছানো রাস্তা। সতর্ক হয়ে না চললে পায়ের নখে আঘাত পাবার সম্ভাবনা। আলো না থাকলে এই এলাকা ভৌতিক মনে হয়। গলিতে ঢুকতেই নিজকে একটু আনমনা মনে হয়। শরীরটা ধকল দিয়ে উঠে। মেইন রাস্তা থেকে সরু গলি গেছে। তার বিশ গজ দূরে লাইট পোস্টের নিচে রজব আলীর পান-সিগারেটের দোকান। দোকানটার কাছে আসতেই ফজলু দেখতে পেল কুপি জ্বালিয়ে রজব আলী কোরান পড়ছে। ফজলু তার কোরান পড়ার মিষ্টি সুর শুনতে পায়। এক অজানা অস্তিত্ব বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে ওঠে। ফজলুর মাঝে দ্রুত একটা চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সময় সময় মানুষকে ভাবিয়ে তোলেÑ মৃত্যুর পর আরেক জগৎ, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনন্ত সময়ের এক ব্যবধান এবং সেই সময়ের বৈতরণী পার হয়ে মানুষ ঈশ্বরের কাছে পৌঁছে যাবে। ভাবতে ভাবতে এখন আর ফজলু কোরান পড়া শুনতে পাচ্ছে না। প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে চলে এসেছে। কিন্তু কুপির আলো মিটমিট করে জ্বলছে।
রজব আলী মাথা ঝুঁকে ঝুঁকে কোরান পড়ছে। ফজলু অনুভব করে ওর বুকের ভিতর এখনো কোরানের সুর বিরাজ করছে। ছোটবেলায় পাশের গেরামের দরাজ মৃধার কেতাব পড়া শুনে মা’র আঁচল ধরে কয়েকদিন কেঁদেছিল ফজলু। এক অজানা আশঙ্কায় সব সময় বুক ঢিপঢিপ করে কাঁপত। অদ্ভুত সব কল্পনা চোখের সামনে ভেসে উঠত। মনে পড়ত দরাজ মৃধার চোখের পানিতে বুক ভেসে যাওয়া মুখ। ইনিয়ে-বিনিয়ে যেন তার সমস্ত অস্তিত্ব আল্লাহতায়ালার কাছে সমর্পণ করছে। মা’র কাছে অদ্ভুত সব প্রশ্ন করত, ‘আল্লাহ দেখতে কেমন, ফেরেস্তোরা আগুনের শিক নিয়ে বসে আছে কিনা ইত্যাদি।’ মাঝে মাঝে ঘুমের ভিতর কেঁদে উঠত ফজলু। বাবা-মা নানান সুরা পড়ে ফুঁ দিত। তারপর মা’র বুকের সঙ্গে জড়িয়ে আবার ঘুমিয়ে যেত।
বড় হয়ে কতবার যে দরাজ মৃধার কেতাব পড়া শুনেছে ফজলু তার ইয়ত্তা নেই। প্রতিবছর মাঘ মাসের শেষের দিন বারবাড়ি ভরে যেত মানুষে। সারারাত ধরে নানান গান-বাজনা, দরাজ মৃধার কেতাব পড়া হতো। দরাজ মৃধা না হলে যেন আসর জমত না।
বাবা খুব পছন্দ করত দরাজ মৃধার কণ্ঠ। কী আনন্দের জোয়ার বয়ে যেত। মা বাটাভর্তি করে পান পাঠাত বারবাড়িতে। পাড়ার বউ-ঝিরা সারারাত জেগে ওই সব গান শুনত।
আজ হঠাৎ দরাজ মৃধাকে মনে পড়ল ফজলুর। কী দিলখোলা মানুষ ছিল! একদিন সংসার ফেলে কোথায় অদৃশ্য হয়। লোকে বলাবলি করে সন্ন্যাসী হয়ে কোথায় চলে গেছে দরাজ মৃধা। আর কারো সঙ্গে নাকি দেখা হয়নি। অথচ কত সচ্ছল অবস্থা ছিল। সুরপাগল মানুষটা আর কোনোদিন কি ঘরে আসবে না?
সেবার গেরামে গিয়েছিল ফজলু। ফসলহীন মাঠ কেমন খাঁ খাঁ করছে। বন্যাকবলিত মানুষগুলো শহরে ভিড় করছে। শরীরের অস্থিগুলো বেরিয়ে কংকালে পরিণত হয়েছে। পুরোনো দালানের পলেস্তরা খসে গেলে ইটগুলো যেমন দাঁত বের করে থাকে তেমনি। বন্যায় ভাসিয়ে নিয়েছিল ফসলের সাথে সাথে ঘরদোর, গরু, বাছুর। সারাজীবনের সঞ্চিত সংসার ভেঙে গেছে বাংলাদেশের মানুষের। তাই তারা ছুটছে শহরে। দু’মুঠো খাদ্যের জন্য।
বন্যার পানি সরে গেছে। ধূসর মাঠ। নতুন করে আবার ঘরদোর উঠছে। স্টেশন থেকে মাইলখানেক হঁাঁটলে বাড়ি। সারা রাস্তা চেয়ে চেয়ে দেখে, দেখে গেরামের চেহারা। বাড়িতে পৌঁছে ভাবতে পারে না এই গ্রাম, এই বাড়িতে শৈশব, কৈশোর কেটেছে। ধসে পড়ছে আঁচালা টিনের ঘর? যে ঘরটায় ফজলুর জন্ম হয়েছিল। মানুষ বোধহয় ভাগ্যের সঙ্গে এইভাবে সংগ্রাম করছে যুগ যুগ ধরে।
বাবা-মা’র কবরটার মুলি বাঁশের বেড়া কোথায় চলে গেছে। একদম উদোম। আব্রুহীন মানুষের অবস্থা। পরদিন গেরাম দেখতে বের হয় ফজলু। সারা গেরাম ঘুরে ও পাড়ার দরাজ মৃধার বাড়ি গিয়েছিল।

একটা টিনের ঘর। গোয়ালে চার-পাঁচটা গরু। দোরগোড়ায় বসে হুঁকে টানত দরাজ মৃধা। ক্লান্তিহীন একটানা হুঁকো টানতে পারত। অসম্ভব পান খেত। দুই মেয়েকে নিয়ে সংসার। বড় মেয়ে বানুকে দূর গাঁয়ে বিয়ে দিয়েছিল আজ থেকে দশ বছর আগে। মনু তখন ছোট। এইসব চিত্র ছোটবেলায় দেখা।
বসতভিটায় গাছ-গাছালি হয়েছে প্রচুর। টিনের ঘরের জায়গায় ছনের ঘর। গোয়ালঘরের কোনো অস্তিত্ব নেই। ভীষণ বুড়িয়ে গেছে দরাজ মৃধার বৌ মালেকা চাচি। ফজলুকে প্রথমে চিনতে পারেনি। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে ফজলুকে। সুখ-দুঃখের কথা বলে। দরাজ মৃধা নিখোঁজ হবার পর সংসার কেমন করে চলছে? মনুকে ও পাড়ার রফিকের সাথে বিয়ে দিয়েছে। কতগুলো চাপা দুঃখবোধ হয়তো মনের মধ্যে গুমরে মরছিল, অনেকদিন পর সব যেন প্রকাশ করল।
‘তোমরা শহরে থাক, মনুর বাপের খোঁজ-খবর পাও-টাও না?’
মালেকা চাচি বসে আছেন দরাজ মৃধার জন্য। এমনি বুঝি হয়। বাংলাদেশের মেয়েরা একবার কাউকে স্বামী বলে স্বীকার করলে তার জন্য মরণ পর্যন্ত অপেক্ষা করে। অথবা তার স্মৃতির মধ্যে নিজের অস্তিত্বের বিলুপ্তি ঘটায়।
বয়সের ভারে মুহ্যমান, তবু প্রতীক্ষা করছে একদিন না একদিন দরাজ মৃধা ঘরে ফিরে আসবে।
সেবারেই শেষ দেখা। আর যাওয়া হয়নি গেরামে। ফজলু পুরোপুরি নগরবাসী হলেও মাঝে মাঝে গেরামের কথা মনে পড়ে বুকের ভিতরটা আনচান করে ওঠে। কিছু কিছু মুখ ভীষণভাবে নাড়া দেয়। সেসব মুখের সঙ্গে জীবনে একটিবার কি দেখা হবে না? এই ভাবনা মাঝে মাঝে ভাবে ফজলু।
ভাবতে ভাবতে বাসায় ফিরে ফজলু। রজব আলীর কোরান পড়ার সুর ক্রমাগত বেজেই চলছে, এই রকম একটা অনুভব সমস্ত শিরায় বিচরণ করছে।
ঘরে ঢুকতে সালমা বলে উঠে, ‘সন্ধ্যার দিকে বাতি চলে গেছে। মোম জ্বালিয়ে বসে আছি। খোকন ঘুমিয়ে পড়েছে।’
ফজলু কোনো কথা না বলে কাপড় ছেড়ে বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে।

সালমা জিজ্ঞেস করে, ‘শরীর খারাপ লাগছে কি? কোনো কথা বলছো না যে?’
‘মনটা ভালো লাগছে না!’
‘চা দেব কি?’
ফজলু মৃদুকণ্ঠে বলল, ‘দিতে পার।’
সালমা রান্না ঘরে চলে যায়। বাইরে গাঢ় অন্ধকার, স্তব্ধ নিঝুম পরিবেশ। চন্দ্রমল্লিকা ঝোপ থেকে ঝিঁ ঝিঁ ডাকছে। চোখের সামনে কতগুলো মানুষের অস্তিত্ব কিলবিল করতে থাকে।
ওই দিন রাতে স্বপ্ন দেখে ফজলু। কী চমৎকার জায়গায়। ও ক্রমাগত হেঁটে যাচ্ছে। অনন্তকাল।