শনিবার,২৪ অগাস্ট ২০১৯
হোম / বিবিধ / নারীর স্বাধীনতা নারীর অধীনতা
০৪/০৭/২০১৯

নারীর স্বাধীনতা নারীর অধীনতা

-

নারীজাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন তার ‘অবরোধবাসিনী’-র বিভিন্ন গল্পে তদানীন্তন নারীসমাজের পর্দাপ্রথা রক্ষণের চিত্র তুলে ধরেছিলেন। এর একটি গল্পে তিনি তুলে ধরেছিলেন একজন পর্দানশীন নারীর কাহিনি, যিনি তার বাড়িতে আগুন লাগার জন্য গহনাসহ মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে বেরিয়ে এসে যখন দেখেন পরপুরুষেরা আগুন নিভাতে ব্যতিব্যস্ত, তখন পর্দা রক্ষার স্বার্থে তিনি তার ঘরে ঢুকে খাটের নিচে লুকিয়েছিলেন। ফলশ্রুতিতে তিনি তার পর্দাসহ পরপারে গমন করেন। কালের প্রবাহে সতীদাহকে পায়ে মারিয়ে আমরা এখন বেরিয়ে এসেছি পর্দাপ্রথার অবগুণ্ঠন থেকে। উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে। জয় করছি এভারেস্ট, এশিয়া কাপ ফাইনাল, খেলছি অলিম্পিকের মতো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে আসলেই কি আমরা নারী হবার আগে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি? সমাজের কিছু কিছু স্তরে সংঘটিত পরিবর্তন কি আসলেই আমাদের মনমানসিকতায় নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা তৈরি করতে পেরেছে, নাকি বাহ্যিক লৌকিকতার অন্তরালে এখন গোড়াতেই গলদ থেকে গেছে?
মূলত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নকল্পে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও বহু বছর ধরে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মন-মানসিকতার জন্য নারী এখনও অর্জন করতে পারে নেই তার কাক্সিক্ষত পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার। কিছুদিন আগে প্রচারিত একটি বিজ্ঞাপন এক্ষেত্রে উল্লেখ করতে চাচ্ছি। বিজ্ঞাপনটিতে দেখা যায়, একজন নারী বিউটি পার্লারে তার মাথার চুল কাটাতে গেলে দায়িত্বরত বিউটিশিয়ান তাকে এত সুন্দর চুল না কাটার জন্য অনুনয় করা সত্ত্বেও নারীর বারবার অনুরোধে তিনি কোমর সমান চুল কান বরাবর কেটে ফেলেন। কিন্তু এরপরও আরও ছোটো করার অনুরোধ করে নারীটি বলে ওঠেন, এত ছোটো করে কাটুন যেন চুলগুলো মুঠো করে না ধরা যায়। স্বল্পদৈর্ঘ্য এ-বিজ্ঞাপনটি একজন নারীর প্রতি পুরুষশাসিত সমাজের যে চিত্র আমরা পাই, তা কি তথাকথিত ভদ্রসমাজের প্রতি চপেটাঘাত নয়?

১৯৭৯ সালে জাতিসংঘে নারীর প্রতি সর্বপ্রকার বৈষম্য দূরীকরণে যে সিডও সনদ অনুমোদিত হয়, তা কার্যকর হয় ১৯৮১ সাল থেকে। নারী ও শিশুর প্রতি যৌনহয়রানি বন্ধে বাংলাদেশ উচ্চআদালত ২০০৯ সালে সিডও সনদের আলোকে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাঙ্গনে যে দিকনির্দেশনা প্রদান করেন, তার কতটুকু বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয়েছে,তা বিবেচনায় রাখা দরকার। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে ২০১০ সালে প্রণয়ন করা হয়েছে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন, প্রণয়ন করা হয়েছে নারীনীতি, মানবপাচারসংক্রান্ত আইন, পর্নোগ্রাফি আইন, শিশুনীতিসহ আইন, কিন্তু এত কিছুর পরও নারীর প্রতি সহিংসতা কি আদৌ থামাতে পেরেছি আমরা? মানবাধিকার সংস্থা আইন ও শালিসকেন্দ্রের এক তথ্য মতে, ২০১৮ সালে ৭৩২জন নারী এবং ৪৪৪জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক তথ্যানুযায়ী ২০১৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ৭৯টি ধর্ষণের ঘটনাসহ ২৯৮জন নারীর প্রতি বিভিন্ন ধরনের অত্যাচার ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। নারীর প্রতি এই বিরূপ মনোভাব শুধুমাত্র আমাদের এ দেশেই নয় বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশেও বর্তমান। জাতিসংঘের এক পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিশ্ব কর্মঘণ্টার দুই-তৃতীয়াংশ সময় কাজ করে নারী অথচ বৈশ্বিক আয়ের মাত্র ১০ শতাংশ তারা আয় করে থাকেন। বিশ্বসম্পদের এক শতাংশেরও কম সম্পদে নারীর মালিকানা আছে।
বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ হওয়া সত্ত্বেও নারীর অগ্রযাত্রায় ছাড়িয়ে গেছে বিশ্বের অনেক ধনী দেশকে। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের প্রথম দশটি দেশের একটি। প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী, হাইকোর্টের বিচারপতি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, সেনাবাহিনী, সরকারের উচ্চপর্যায়ের আমলাসহ সকল ক্ষেত্রে রয়েছেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী। শুধুমাত্র জাতীয় সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন নয় বরং সরাসরি প্রত্যক্ষ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন অনেক নারী সদস্য। গত চার বছরে ১ লাখ ২০ হাজার নারীকর্মী সুনির্দিষ্ট চাকরি নিয়ে বিদেশে গেছেন। ভূমিকা রাখছেন দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে।
নারীর এত অর্জনের মাঝেও থেমে থাকেনি নারীর প্রতি সহিংসতা, অত্যাচার। নারীকে তাঁর মুক্তচিন্তার জন্য হতে হয় দেশ ছাড়া, শিকার হতে হয় তালেবানি হামলার। যুক্তির কথা শোনালে নারীকে শুনতে হয় ‘মেয়ে মানুষের আবার বুদ্ধি’!! যেন বিধাতা নারীকে তৈরি করেছেন বিচার বিবেচনাহীন মাংসের পি- হিসেবে। আর এই নারী যদি হয় শিক্ষিতা তাহলে যেন তাঁর প্রতি সমাজ আরও রূঢ়। বেগম রোকেয়ার মতো বলতে হয়, আমাদের এ সমাজ অশিক্ষিত স্ত্রীলোকের অনেক অপরাধ ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখলেও শিক্ষিত স্ত্রীলোকের অনেক কল্পিত অপরাধ তাঁর শিক্ষার ঘাড়ে চাপাতেই বেশি ভালোবাসে।
মূলত কেবলমাত্র আইনপ্রণয়ন বা সমাধিকার প্রদানের মাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ সম্ভব নয়, প্রয়োজন আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং পারিবারিক ও সামাজিক সুশিক্ষা। আমাদের বুঝতে হবে নারীকে কোনো অধিকার প্রদান মূলত তাঁর প্রতি কোনো দয়াপ্রদর্শন নয়, বরং যুগ যুগ ধরে তাঁর সাথে চলতে থাকা অবিচারের মুচলেকা মাত্র। একজন নারী, নারী হবার আগেই এ পৃথিবীতে মানুষ হিসেবে জন্ম নেয়। আর একজন মানুষ হিসেবে একজন পুরুষ যে অধিকার ভোগ করতে পারে, একজন নারীরও আছে তা উপভোগ করার স্বাধীনতা। তাই বিষয়টি সমাধিকারের নয় বরং সমদৃষ্টিভঙ্গির। প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন, স্ব-শিক্ষিত ব্যক্তিমাত্রই সু-শিক্ষিত। আমাদের চিন্তায় ও মননে হতে হবে স্ব-শিক্ষিত। নারীর প্রতি সহমর্মিতা আর ভালোবাসার মোড়ক উন্মোচন হোক আমাকে দিয়ে, আপনাকে দিয়ে। তবেই বাঁচবে নারী, বাঁচবে মানবতা।


--রুদমিলা মাহবুব
প্রভাষক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়