সোমবার,২২ এপ্রিল ২০১৯
হোম / নারী / বৃক্ষজননী ও তার ৮ হাজার সন্তান
০৪/০৭/২০১৯

বৃক্ষজননী ও তার ৮ হাজার সন্তান

সালুমারাদা থিম্মাক্কা

-

ভারতের কর্নাটকের গুব্বি তালুকের এক অসহায় দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করা সালুমারাদা থিম্মাক্কাকে সমাজের মানুষ অবহেলা করলেও প্রকৃতি দু’হাত ভরে তাকে ভালোবেসেছে। প্রকৃতিপ্রেমিক এই নারীর কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। কিন্তু স্বশিক্ষিত মানুষ হিসেবে তিনি জানেন, প্রকৃতির মাঝেই খুঁজেই পাওয়া যায় জীবনের প্রতি ভালোবাসা।

শৈশবে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পাননি। ছোটবেলা থেকেই ফসলের মাঠে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন। ২০ বছর বয়সে পাশের গ্রামের মাগাদি তালুকের হালিকাল গ্রামের বাসিন্দা বেকাল চিক্কাইয়ার সাথে তার বিয়ে হয়। চিক্কাইয়ার ছিলেন দিনমজুর। পরিবারে ছিল না সচ্ছলতা। সংসারের অভাব মেটানোর জন্য স্বামী-স্ত্রী দুজনেই মাঠে কাজ করতেন। বিবাহিত জীবনের ২৫ বছর কেটে গেলেও তারা ছিলেন সন্তানহীন। এত বছরেও থিম্মাক্কার গর্ভে কোনো সন্তান জন্ম না নেওয়ায় সমাজের লোকেরা তাদেরকে প্রতিনিয়ত উপহাস ও অবজ্ঞা করতে থাকে। সমাজ থেকে তাদেরকে একঘরে করে দেওয়া হলো। এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও থিম্মাক্কা ছায়ার মতো তার স্বামীর পাশে ছিলেন। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বামী-স্ত্রীর দিনগুলো কাটছিল বেশ একাকী, নিঃসঙ্গ।
তখন থিমাক্কা আর চিক্কাইয়া দুজনে সিদ্ধান্ত নিলেন, তারা গাছ লাগাবেন। সন্তানের মতো তাদের প্রতিপালন করবেন। পরিবার-পরিজন ও সমাজ থেকে দূরে সরে গিয়ে এ যেন প্রকৃতির মাঝেই নিজেদের সান্ত¡না খোঁজার অপার চেষ্টা। আর এভাবেই তারা সমাজের বঞ্চনা আর অপমানের জবাব দিতে চান। কিন্তু গাছের চারা পাবেন কোথায়? চারা কেনার পয়সা তো নেই। তাই দুজনে ঠিক করলেন, পথের আনাচে-কানাচে অবহেলায় জন্ম নেওয়া বটগাছের চারা তুলে এনে লাগাবেন।

এবার চিন্তা-চারাগুলো লাগাবেন কোথায়? গাছ লাগানোর মতো তাদের তো নিজস্ব কোনো জমি নেই। সিদ্ধান্ত নিলেন, কর্ণাটকের কুদুর এবং হালিকালের মধ্যকার মহাসড়কের দু’পাশে তারা গাছের চারা লাগাবেন। যে-ই ভাবা, সে-ই কাজ।
প্রথম বছর কষ্ট করে দশটি বটের চারা জোগাড় করে তা রাস্তার ধারে রোপণ করলেন। দ্বিতীয় বছরে ১৫টি, তৃতীয় বছরে ২০টি বটগাছের চারা লাগালেন। একসময় এই সন্তানদের যত্নাত্তি করার জন্য চিক্কাইয়া দিনমজুরের কাজ ছেড়ে দেন। থিম্মাক্কা সারাদিন ফসলের মাঠে কাজ করে যা রোজগার করতেন, তা দিয়েই দুজনের সংসার চলত। কাজ সেরে বাড়ি ফিরে এসেই থিম্মাক্কা স্বামীর সাথে সন্তানদের দেখভালে নেমে পড়তেন।
নিত্য অভাবের মধ্যেও এই দম্পতি থেমে থাকেননি। নিত্য নিয়ম করে গাছগুলোকে প্রতিপালন করে গেছেন। গাছগুলোকে ভালোবেসে বড়ো করে তুলেছেন। প্রতিদিন খুব ভোরে উঠে আশপাশের পুকুর থেকে জল তুলে নিয়ে দীর্ঘ চার কিলোমিটার রাস্তায় লাগানো গাছগুলোতে স্বামী-স্ত্রী দুজনে জল দিতেন, নিড়ানি দিতেন, আগাছা পরিষ্কার করতেন।

১৯৯১ সালে চিক্কাইয়া মারা যাওয়ার পর থিম্মাক্কা একা হাতে নিজের এবং তার গাছেদের দায়িত্ব তুলে নেন। কী রোদ, কী বৃষ্টি কিংবা চরম শীতেও থেমে থাকেনি তার এই কাজ। গাছের প্রতি তার এই ভালোবাসা একসময় গ্রামবাসীদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। তার কাজকে সম্মান জানিয়ে গ্রামবাসীরা তাকে ‘সালুমারাদা’ বলে ডাকতে শুরু করেন। কন্নড় ভাষায় যার অর্থ ‘গাছেদের সারি’। সময়ের সাথে সাথে হালিকাল থেকে কুদুর পর্যন্ত প্রায় ৩০০টি গাছের চারা লাগিয়ে সন্তানের মতো বড়ো করে তোলেন থিম্মাক্কা। বিশ্ববাসী তাকে এক মহান পরিবেশবিদ হিসেবে চিনতে শুরু করে।
বোটানিক্যাল সার্ভের এক তথ্যমতে, থিম্মাক্কা ৬৫ বছর ধরে যে গাছগুলো লাগিয়েছেন, তার প্রতিটি গাছের বাণিজ্যিক মূল্য কোটি টাকার উপর। চাইলে এই সব গাছ বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করতে পারতেন থিম্মাক্কা। কিন্তু তার সে চিন্তা নেই। অর্থের প্রতি তার কোনো মোহ নেই। তিনি তার রোপণকৃত সব গাছ রাষ্ট্রকে দান করেছেন, বিনিময়ে চাননি কিছুই।

নারীশক্তির এক বড়ো দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছেন ১০৫ বছরের বৃদ্ধা থিম্মাক্কা। ২০১৬ সালে বিবিসি’র এক জরিপে বিশ্বের ১০০জন প্রভাবশালী নারীর মধ্যে স্থান করে নিয়েছেন তিনি। বিবিসি’র সর্বশেষ এক জরিপে জানা যায়, গত ৮০ বছরে প্রায় ৮হাজার গাছ পুঁতে তাদের বড়ো করে তুলেছেন ১০৬ বছর বয়সি এই বৃক্ষমাতা।

এই মহীয়সী নারী বিভিন্ন পর্যায় থেকে সম্মানিত হয়েছেন বারবার। ২০১৫ সালে তার জীবনী নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘সালুমারাদা সর্দারনি’। ১৯৯৬ সালে পরিবেশ রক্ষায় তার অসাধারণ ভূমিকার জন্য থিম্মাক্কাকে ‘জাতীয় নাগরিক সম্মান’-এ ভূষিত করা হয়। ১৯৯৭ সালে তাকে ‘ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী বৃক্ষমিত্র’ পদকে সম্মানিত করা হয়। এছাড়া নিজ রাজ্য, দেশ এবং দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক স্তরেও তিনি বহু পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১৯ সালে ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ পদকে ভূষিত হন এই গুণী ব্যক্তি।


তথ্যসূত্র : সালুমারাদা থিম্মাক্কা এ রো অব ট্রি
-সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার