সোমবার,২২ এপ্রিল ২০১৯
হোম / নারী / ‘এ-জীবনে আর ভয়ের কোনো জায়গা নেই’
০৪/০৭/২০১৯

‘এ-জীবনে আর ভয়ের কোনো জায়গা নেই’

-

গত বছরে জুলাই মাসে সিনেমা, টিভি অনুষ্ঠান আর নিজের প্রতিষ্ঠিত বুকক্লাব নিয়ে দারুণ ব্যস্ত থাকা সোনালী বেন্দ্রের নিমিষেই সব যেন থমকে যায়। ‘সারফারোশ, হাম সাথ সাথ হ্যায়, জখম, কাল হো না হো’-র এই জনপ্রিয় অভিনেত্রীর উচ্চমাত্রার ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার খবর বলিউড এবং তার ভক্তদের নাড়িয়ে দেয়। এরপর দ্রুতই তিনি চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান, এবং ক্যান্সারের সাথে ক্লান্তিকর ও সুদীর্ঘ এক লড়াই করেন। ক্যান্সারের সাথে এই দীর্ঘ লড়াইয়ে সোনালী অনেকের কাছেই এখন এক অনুপ্রেরণার নাম। গত ২ মার্চ ‘ইন্ডিয়া টুডে কনক্লেভ-২’-এর দ্বিতীয় দিনে সোনালী বেন্দ্রে তুলে ধরেন ক্যান্সারের সাথে তার সুদীর্ঘ লড়াইয়ে ভয়কে জয় করার গল্প। ছিল কষ্টকর দিনগুলোর এক আবেগী বর্ণনা।

তার সাক্ষাৎকার থেকে নেওয়া :

“কেন এমন করছি?”- আমি নিজেই আসলে ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। এখন যখনই কোনোকিছু করতে খুব ভয় পাই, তখনই তা করে বসি। ভয় যেন এখন আমার জীবনে কোনো জায়গাই রাখে না। আমি ভয় পেতেই ভুলে গেছি। অবশ্য আমি শুরু থেকেই এমন ভয়হীন। আমি এমন একটা ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছিলাম যা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না। মহারাষ্ট্রের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে আমার বেড়ে ওঠা। সিনেমায় ঢুকে পড়া তখন আমার জন্য এক বিশাল পদক্ষেপ ছিল। আমার পরিবারও অনেকটা হতভম্ব হয়ে পড়ে। কিন্তু আমি নিজে একেবারে নির্ভয়ে সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলাম। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে কেমন করে যেন নিজের অজান্তেই আমার ভীতি বেড়ে গেল। বিশেষ করে মা হবার পর ভয় আমাকে গ্রাস করল। গোল্ডি আর আমার জন্য এখন সবই ভয়কে জয় করার এক চলমান যাত্রা। আর এই যাত্রার সবচেয়ে সেরা ব্যাপারটা হলো আমার বেঁচে থাকা এবং তার পাশে থাকা। এর জন্য বিশ্বজগতের কাছে আমি ধন্য।

সত্যি বললে, এই চুল না থাকায় খুব খারাপ না। বরং অনেকখানি বোঝা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। আর চুল পড়ে যাবার পরেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম চুলের পেছনে আমার নিজেকে কতটা ঢেকে ফেলেছিলাম। চুল পড়ার পরে আমার শরীরটাই বদলে গেল; কিন্তু আমি এর সাথে মানিয়ে নিয়েছি।

চুলের সকল ধরনের প্রসাধনীর বিজ্ঞাপনই আমি করেছি। আমার রূপই ছিল আমার ধ্যান-জ্ঞান। আমাদের সমাজ তো রূপটাই বিচার করে। তারপর তো আমার জগৎটাই পালটে গেল যখন আমি শুনলাম আমার ক্যান্সার হয়েছে। আমার টিমকে ব্যাপারটা জানালাম এবং বললাম যে, যেসব স্বাস্থ্যকর পণ্যের বিজ্ঞাপন আমি করেছি আজ একজন রোগী হিসেবে আমি সেই ব্র্যান্ডের প্রতিচ্ছবি আর থাকতে পারছি না। আমাকে চিকিৎসার জন্য যেতে হচ্ছে এবং এর শেষ কোথায় আমি জানি না। আমি ভাগ্যবান যে, তাঁরা সব শুনেও আমার পাশে ছিল। আমি এটাও বলেছি যে, আমি কারো দয়া-দাক্ষিণ্য চাই না। আমি ওসবে বিশ্বাস করি না। আমি এটা অনুভব করতেই পছন্দ করি। আমার মেয়ে প্রায়ই আমাকে বলে ধীরে চলতে। এখন তো মেনেই নিয়েছি, ধীরে চলো।
সবাই বলত, “তুমি তো কখনো এমন ছিলে না। এমন হলো কেন?” আমার মনে হচ্ছিল, যা ঘটেছে তার জন্য দায়ী আমিই। আমি নিউইয়র্কে মনোবিদের শরণাপন্ন হয়েছিলাম। কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম না, আমার সাথে কি ঘটছিল। আমি ইতিবাচক মানসিকতাসম্পন্ন মানুষ; কিন্তু এসব ভাবনা কেন এল? আমি কি কোনো ভ্রান্তির মধ্যে আছি, নাকি নিজেকে লুকিয়ে রাখছি? আমি কি আমার ভয়কে অবচেতন মনের এত গভীরে ছুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি, সেই ভয় বুঝতেই পারছিলাম না। আমার সাথে যা হচ্ছিল তা আমার বোঝা উচিত। নিউইয়র্কের সেই মনোবিদের মুখ দিয়ে যেন আমার জীবনের গোপন সত্যটাই বেরিয়ে এল। তিনি বললেন, “সোনালী, ক্যান্সার হয় ভাইরাস আর জিনগত সমস্যা থেকে। যদি চিন্তার সাথে ক্যান্সারের সম্পর্ক থাকত, তবে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ হতাম”-ঐ কথা শুনে বুক থেকে পাষাণভার নেমে গেল। আমার মনে হচ্ছিল আমি পারব। আমাকে নিজের সাথে আর লড়তে হবে না। অথচ পুরোটা সময় আমি নিজের সাথেই লড়ছিলাম আর ভাবছিলাম আমার অপরাধটা কি? আমি বুঝলাম, এই ক্যান্সার আমার কোনো অপরাধের সাজা নয়। প্রত্যেকটা ক্যান্সারই আলাদা। প্রত্যেকতা ক্যান্সারেরই আলাদা লক্ষণ থাকে আর তার চিকিৎসাও আলাদা, মানুষের শরীরও প্রত্যেকটা ক্যান্সারের সাথে আলাদাভাবে লড়াই করে। এর কোনো স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম নেই। ওই অনুধাবনই আমার জন্য মোড় পরিবর্তনকারী ছিল।

আমি সবচেয়ে বেশি সাহায্য পেয়েছি। গোল্ডি আর আমার বোন রুপা আমার পাশে ছিল পুরোটা সময়। যখন রনবীর ব্যাপারটা জানতে পারল তখন সে স্কুল ট্রিপে ছিল। আমি তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু তা না করে আমি তার সাথে দেখা করতে চাইলাম। গোল্ডি আর আমি তাকে এভাবেই বড় করেছি। তাকে সত্যটা পরিষ্কারভাবে জানিয়েছি। তাকে ব্যাপারটা জানানো না হলে বরং সে ব্যাপারটা ভুলভাবে নিত। আর গোল্ডি যখন তাকে বলেই দিল, তখন সে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। এরপর সে বলল, “আমি আর মাম্মি একটা বই পড়েছিলাম। সে কাহিনির মতো আমাদেরও এখন খারাপ সময় যাবে। এই খারাপ সময়ে আমাদের শক্ত থাকতে হবে।”
এটা নিয়ে আমি পরিষ্কার ছিলাম যে, আমার কাহিনিটার নিয়ন্ত্রণে আমিই থাকব। ব্যাপারটা অনেক কষ্টকর আর কঠিন ছিল। সবচেয়ে কঠিন ছিল অপারেশনের পরের পর্যায়টা। আমার একটা ২০ইঞ্চি ক্ষত আছে। অপারেশনে ঢোকার আগে আমার বোন আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমি তাকে বললাম, “নাটুকেপনা দেখাস না, আমি ঠিকই ফিরে আসছি।” হসপিটাল থেকে বের হবার পরই আমার মনে হলো, হ্যাঁ, আমি বেঁচে আছি। শারীরিক ব্যথাটা কষ্টকর, কিন্তু মানসিক কষ্টটা অসহ্য।

আমার যুক্তির দরকার ছিল। আমি যুক্তির খোঁজ করছিলাম। নির্দেশনা আর উপদেশের কোনো অভাব ছিল না। তাই আমি সবকিছু বন্ধ করে দিলাম। এরপর চিকিৎসাটা অনেক সহনীয় হয়েছিল। আমি নিজেও সেরে উঠছি। আমার জন্য অনেক দোয়াদরুদও করা হয়েছে। আমার মনে হয় ভালোবাসাই আমাকে এতদূর নিয়ে এসেছে। এতদূর আসার জন্য আসলে আমাদের নিজেদের ভালোবাসা উচিত। আমার জন্য আধ্যাত্মিকতার মানেটা হলো, সেই ভালোবাসা।


অনুবাদ : নূর হোসেন নয়ন