শনিবার,২৪ অগাস্ট ২০১৯
হোম / ভ্রমণ / ঘুরে আসুন সাগরকন্যা কুয়াকাটা
০৩/২৪/২০১৯

ঘুরে আসুন সাগরকন্যা কুয়াকাটা

-

প্রতিদিনের কাজের চাপ ও শহুরে জীবনের শেকলে আবদ্ধ আপনি, আমি। তবে এই বদ্ধতা শরীরের হলেও মন কিন্তু কখনো এক জায়গায় থমকে থাকে না। তাই গতানুগতিক রুটিনমাফিক লাইফস্টাইলের মাঝেও মনের প্রশান্তির জন্য মাঝে মাঝে কোথাও না কোথাও ঘুরে আসতেই হয়। আর ঘোরাঘুরির স্থান যদি হয় সমুদ্রসৈকত তবে তো কথাই নেই। সমুদ্র অভিমুখে সৌন্দর্যের সন্ধানে এমনই এক যাত্রার গল্প বলি আজ।
ভুবনবিখ্যাত কক্সবাজার ছাড়াও বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে আরো একটি সমুদ্র সৈকত ও পর্যটনকেন্দ্র আছে। ভৌগোলিকভাবে জায়গাটার নাম কুয়াকাটা, আমাদের মতো ভ্রমণবিলাসীরা যাকে ‘সাগরকন্যা’ বলে অবহিত করি। অফিসের ব্যস্ততা আছে যাদের তাদের উইক এন্ড ছাড়া কোথাও যাওয়ার সুযোগ এমনিতেই খুব কম। এমন একটি উইক এন্ডে কয়েকজন বন্ধু মিলে সদরঘাটের লঞ্চে চড়ে রওনা হলাম পটুয়াখালীর উদ্দেশ্যে। প্রচ- ভিড়ে কেি বন না পেয়ে তিনশ টাকা খরচ করে ডেকে চড়েই যাত্রা করতে হলো। রাত সাড়ে আটটায় শুরু হয় লঞ্চ জার্নি। নদীর বুকে বয়ে চলা লঞ্চ, আর শীতের মৃদু হাওয়া মিলিয়ে অদ্বিতীয় এক অভিজ্ঞতা হলো। মৃদু ¯্রােত আর মিহি হাওয়ায় ভাসতে ভাসতেই ভোর ছয়টায় পটুয়াখালী পোঁছালাম। সদ্য উঁকি দেওয়া সূর্যের আলোয় রাঙা নদীর পাড় দেখে ক্যামেরার শাটারে বারবার ক্লিকের শব্দ শোনা গেল। হাতে সময় বেশি না থাকায় খুব বেশিক্ষণ থাকা গেল না, পটুয়াখালী থেকে বাস ধরে পরের গন্তব্য কুয়াকাটা।
গড়পড়তা চারঘন্টা সময় লাগলেও কিছুটা তাড়াতাড়িই পৌঁছালাম স্বপ্নের কুয়াকাটায়। সবার আগে হোটেল খুঁজে নেওয়ার পালা। এখানে বলে রাখা ভালো, মাসের শেষের দিকে পকেট যখন হায় হায় করছে তখনই এই হঠাৎ ভ্রমণ চিন্তা মাথায় এসেছিল। তাই শুরু থেকেই বাজেট ভাবনা ছিল ট্যুরের প্রতি স্টেপে। ক্ষাণিকক্ষণ খোঁজার পরেই মাঝারি মানের একটা হোটেল রুম পেয়ে গেলাম, দিনপ্রতি এক হাজার টাকা ভাড়ার রুমটায় চারজন দিব্যি কাটানো যাবে।


একেবারে সৈকতঘেঁষা হোটেলে খুঁটি স্থাপনের পর ক্ষণিক বিশ্রাম শেষেই নেমে পড়লাম সমুদ্র বিলাসে। বিস্তৃত জলরাশি, উপচেপড়া ঢেউ এবং তার কোলঘেঁষে চলা প্রায় আঠারো কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত। এক কথায় ভ্রমণ পিয়াসুদের তীর্থস্থান। কিছুক্ষণ সমুদ্রের বাতাস গায়ে লাগানোর পর অনিন্দ্যসুন্দর জলরাশির টান আর অগ্রাহ্য করা গেল না। পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ভ্রমণক্লান্তি যেন অনেকটাই কমে এল। এভাবে কিছুক্ষণ গর্জনশীল কিন্তু একইসঙ্গে পরম শান্ত সমুদ্রের বিশালতা উপভোগের পর উঠে আসতে হলো, পেটের মধ্যে ইতিমধ্যেই ছুঁচোর কেত্তন শুরু হয়েছে।
হোটেলে এসে ফ্রেশ হয়ে এবার লাঞ্চের পালা। সৈকতের নিকটে দাঁড়ানো হোটেলগুলোতে খাবারের দাম দেখে আনন্দই হলো। প্রতিজন ১৩০ থেকে ১৮০ টাকার প্যাকেজে রূপসা, রূপচাঁদা মাছ এবং তার সাথে ভাত-ভর্তার আইটেম দিয়ে ভরপেট লাঞ্চ সেরে নেওয়া গেল। পরের সময়টুকু নিখাদ আনন্দ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের। কুয়াকাটায় ঘুরে দেখার মতো অন্তত আঠারোটি স্পট রয়েছে, সবগুলো সমান সুন্দর না হলেও কিছু স্থান একেবারে না দেখলেই নয়। তবে সব স্পটে পায়ে হেঁটে যাওয়াটা বেশ সময়সাপেক্ষ। ভ্যান বা মোটরসাইকেলে করে ঘুরলে কম সময়ে বেশি স্পটে যাওয়া যাবে। দরদাম করে সাড়ে সাতশ টাকা করে দুটি মোটরসাইকেল ভাড়া করে প্রথমেই গেলাম লেবু বাগান। নামে লেবু বাগান হলেও সেখানে যে থোকায় থোকায় লেবু পাওয়া যাবে তা কিন্তু নয়, তবে বীচের মাঝখানে নিরিবিলি একটা স্পটের সন্ধান মিলবে। কেওয়া আর গেওয়াসহ গাছগাছালির ছায়ায় বসে একটু বিশ্রাম বা ছবি তোলার জন্য এই স্থানের জুড়ি মেলা ভার। তবে এ জায়গার প্রধান বিশেষত্ব হলো কিছু গাছের ধ্বংসাবশেষ। ২০০৭ সালে দেশের উপকূলবর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে আঘাত হানা ভয়ংকর সিডর থেকে এই গাছগুলো কীভাবে যুদ্ধ করে আমাদের রক্ষা করেছিল তা বুঝবেন এখানে এলে, শুধুমাত্র শেকড় অবশিষ্ট আছে এই গাছগুলোর।

লেবু বাগান থেকে সামনে পরের স্পট তিন নদীর মোহনা। একপাশে সাগর আর আরেক পাশে তিন নদীর মোহনা মিলেমিশে একাকার। ঠিক আরেক পাশে আছে উপকূলীয় বন এবং ওপারে ফাতরার বন; সবমিলিয়ে অপার্থিব এক সৌন্দর্যের দেখা মিলবে এখানে। ভেজা মাটিতে ওপার দাঁড়িয়ে কয়েকবার বুকভরে নিশ্বাস নেওয়া গেল। সামনে অল্প পানিতে ছোট্ট নৌকা আর চারদিকে সবুজ প্রকৃতি, সবমিলিয়ে একেবারে দেখার মতো যাকে বলে। চলার পথে শুটকি পল্লিসহ আরো কয়েকটি স্পট থাকলেও সময় স্বল্পতার জন্য এরপর সোজা চলে এলাম শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহার। কলাপাড়াতে অবস্থিত এই স্থানেই রয়েছে একটি কুয়া যাকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলের নামকরণ করা হয়েছিল কুয়াকাটা। তবে কুয়া দেখতে গিয়ে সেখানে ফেলা চিপস বা সিগারেটের প্যাকেট দেখে খুবই হতাশ হলাম, ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দর্শনে এলেও আমরা আমাদের বদঅভ্যাসও স্বেচ্ছাচারিতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছি!

ভেতরে বিশালাকার বুদ্ধের মূর্তির সামনে মানবমনের এই দৈন্য নিয়ে ভাবতে ভাবতে সৈকতে ফিরে এলাম।
সন্ধ্যা নামলেই অন্যরকম এক উৎসব যেন নামে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত। আর তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে এই ব্যাপারটা- কুয়াকাটা হচ্ছে এমন এক দুর্লভ স্থান যেখান থেকে সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয় দুটোই দেখা যায়। অন্তত বাংলাদেশের কোথাও এটা দেখা সম্ভব নয়। সমুদ্রের পাড় থেকে শেষ বিকেলের রক্তিম সূর্য আমরা তাই দেখলাম একেবারে মনের সবটুকু মাধুরী মিশিয়ে; এ এক অনন্য, অকৃত্রিম সৌন্দর্য।

দিনের তুলনায় মানুষের উপস্থিতি যেন একটু বেশি মনে হলো, সমুদ্রপাড়ের অনিঃশেষ টানের সঙ্গে সঙ্গে যেটার আকর্ষণ সবচেয়ে বেশি মনে হলো সেটা হচ্ছে সমুদ্রপাড়ে বারবিকিউ করার সুযোগ। এমন জম্পেশ খাবার আয়োজন আপনি সবসময় কক্সবাজারেও পাবেন না। সমুদ্রতীরের কাছাকাছি দোকানগুলোতে যেন সামুদ্রিক মাছের মেলা বসেছে। কোরাল, টুনা, রূপচাঁদা, ইলিশ থেকে শুরু করে বিভিন্ন আকৃতির কাঁকড়া ও চিংড়ি কী নেই সেখানে। চারশ টাকায় প্রায় আড়াই কেজি ওজনের টুনা মাছের বারবিকিউ-এর স্বাদ অনেকক্ষণ মুখে লেগেছিল। এর পাশপাশি ৬০ থেকে ১২০ টাকায় কাঁকড়া ও ৮০ থেকে ১০০ টাকায় ছোট রূপচাঁদা মিলিয়ে অনেকদিন মনে রাখার মতো এক ভোজনবিলাস হলো। পরের সময়টুকু কেটে গেছে সমুদ্রের গর্জন শুনতে শুনতে। রাতে হালকাভাবে খাবারের পর অনেকটুকু সময় বীচের চেয়ারে বসে আড্ডাবাজিতে রাতের অনেকটা সময় কাটলো।

মোটরসাইকেলে কুয়াকাটার স্পট দর্শন কিন্তু এখানেই শেষ হয়নি। পরের দিন ঠিক ভোর ৫টার ও আগে মোটরসাইকেল এল ঠিক হোটেলের নিচে। এবারের মিশন সকালের সূর্য দেখা। ভোরের ঠিক আগে আগে শীত শীত আমেজে প্রায় দশ কিলোমিটার মোটরসাইকেলে চড়ে যাওয়াটাই আলাদা এক আনন্দের উৎস ছিল। আলোআঁধারির মধ্যে অনেকগুলো মোটরসাইকেল একসাথে যাচ্ছে এমন এক স্থানে যেখানে নতুন সূর্যের আলো দেখবে একদল মানুষ। কে বলবে প্রতিদিনের জীবনে একবার আকাশের দিকে তাকানোর সময়ই হয় না তাদের! গঙ্গামতির লেকের কিছুটা আগে আগেই সূর্য দেখার জন্য থামলাম। কিছুটা ভাগ্য বিড়ম্বিত যাত্রা ছিল বলতে হয়, হঠাৎ কুয়াশা ও মেঘের আনাগোনায় সূর্য উদয়নের প্রবল প্রতাপ কিছুটা হলেও মিস হয়েছে। তবে নবসূর্যের কিরণ যতটাই দেখা হয়েছে ততটাতেই ইট কাঠের ঢাকাবাসী আমার মন প্রফুল্ল হলো। কিছুক্ষণ পর যখন মেঘ কেটে সূর্য আরো প্রখর হলো, চারদিকের যে অপার্থিব সৌন্দর্য চোখে পড়েছে তা মনের ক্যানভাসে উজ্জ্বল থাকবে আরো অনেকদিন।

শীতের কারণে লাল কাঁকড়ার চরে কাঁকড়ার আনাগোনা খুব বেশি একটা দেখা যায়নি। তবে গঙ্গামতির লেক নৌকায় পার হয়ে ঝাউবনের সৌন্দর্যে সব অপ্রাপ্তি মিটে গিয়েছে। ঝাউবনে রাখা নৌকার ওপর বসে কিছুক্ষণ আড্ডা ও ছবি তোলাপর্ব চললো। এরপর ঝাউবন পেরিয়ে লোকালয়ে এসে নাস্তাপর্ব সারলাম, সুস্বাদু ডাবে তৃষ্ণাও মিটলো। মোটরসাইকেলে চড়ে সুন্দরবনের কিছু অংশ দেখতে দেখতে আমরা এবার এলাম রাখাইন পল্লি। রাখাইন পল্লির সামনেই আছে মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধমন্দির। কথিত আছে এখানে রয়েছে উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধমন্দির। রাখাইন পল্লিজুড়ে রয়েছে বিভিন্ন দোকান। এখানে রাখাইনদের বানানো তাঁতের কাপড়ের পাশাপাশি বিভিন্ন শো-পিজ, ঝিনুকের মালা, কাঠের কারুকাজময় জিনিসপত্র পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে কুয়াকাটার কথা ভেবে নস্টালজিক হতে এক-দুটো জিনিস কিনে নিলাম।
দুদিনের এই ট্যুরের সমাপ্তি এখানেই টানতে হলো। হোটেলে ফিরে কুয়াকাটা থেকে সরাসরি পটুয়াখালী। কিছুটা তাড়াহুড়ো করেই লঞ্চ ধরতে হলো। দুই হাজার টাকা খরচ করে ডাবল কেবিন ঠিক করলাম আরামে ফিরে আসার জন্য, পরেরদিনই আবার ব্যস্ততা শুরু। লঞ্চে ঢাকা ফেরত আসার জার্নিটাও মনে রাখার মতো ছিল। তবে সবকিছু ছাপিয়ে মনের মধ্যে তখনো কুয়াকাটা, আর ছোট্ট একটা আক্ষেপ-ইশ, আরেকটু যদি থাকা যেত!

-নাইব রিদোয়ান
ছবি : ফুয়াদ তানভীর অমি