সোমবার,২২ এপ্রিল ২০১৯
হোম / বিনোদন / ‘ফাগুন হাওয়ায়’ বিপ্লবের সুবাস
০৩/২৪/২০১৯

‘ফাগুন হাওয়ায়’ বিপ্লবের সুবাস

মুভি রিভিউ

-

২১শেফেব্রুয়ারি, ১৯৫২। মাতৃভাষায় কথা বলার স্বাধীনতা রক্ষায় সেদিন রাজপথে নেমে এসেছিল ছাত্র-জনতা। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে সেদিন স্বৈরাচারের বন্দুক রুখতে পারেনি। বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে ভাষার অধিকার বুঝে নিয়েছিল বীর বাঙালি। মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসার এই অনন্যকীর্তি বিশ্ববাসীকে বিস্মিত করেছে। বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনসহ পরবর্তী সকল আন্দোলন সংগ্রামের অনুপ্রেরণা হিসেবে ’৫২’র ভাষা আন্দোলন ভূমিকা রেখেছে।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বড় পর্দায় অসংখ্য উল্লেখযোগ্য কাজ হয়েছে। ওরা ১১জন, আগুনের পরশমণি, জয়যাত্রাসহ আরও অনেক সিনেমার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে বড় পর্দায় কোনো কাজ হয়নি। আর তাই গতবছর পরিচালক তৌকির আহমেদ যখন ভাষা আন্দোলন নিয়ে ‘ফাগুন হাওয়ায়’ সিনেমাটি নির্মাণের ঘোষণা দেন, তখন থেকেই সিনেমাপ্রেমীদের অপেক্ষার পালা শুরু হয়েছিল। সমাজের বিভিন্ন ইস্যু এবং দেশের ইতিহাস নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে তৌকির আহমেদের ভূমিকা প্রশংসনীয়। রূপকথার গল্প, জয়যাত্রা, অজ্ঞাতনামা, হালদা ইত্যাদি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ক্রমেই নিজের শিল্পকে উন্নত করার প্রচেষ্টায় থাকা তৌকিরের জন্য ফাগুন হাওয়ায় একটি চ্যালেঞ্জ ছিল বৈকি।
ভাষা আন্দোলনের মূল কর্মসূচিগুলো ঢাকায় সংঘটিত হলেও দেশের মফস্বল অঞ্চলগুলোতেও সমানভাবে জেগে উঠেছিলেন প্রতিবাদী জনগণ। মফস্বলের তেমনই এক অঞ্চলে গড়ে ওঠা আন্দোলনের পটভূমিতে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্রটি। ভাষার অধিকার রক্ষায় খুলনার চন্দ্রনগর থানার উর্দুভাষী পুলিশকর্তার বিরুদ্ধে এলাকাবাসির রুখে দাঁড়ানোর গল্প ‘ফাগুন হাওয়ায়’। নিজেদের পরিচয়, সংস্কৃতি, ভাষা, ঐতিহ্য, অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে লালন করার এবং যে-কোনো বাঁধার শেকল ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্মারক ‘ফাগুন হাওয়ায়’।

ছবির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয়ের জন্যে তৌকির আহমেদ একঝাঁক প্রতিভাবান অভিনেতা-অভিনেত্রীর সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন। সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন নুসরাত ইমরোজ তিশা, সিয়াম আহমেদ, আবুল হায়াত, ফজলুর রহমান বাবু, সাজু খাদেম, রওনক হাসান, ফারুক আহমেদ, শহিদুল আলম সাচ্চুসহ আরও অনেকে। আর সিনেমার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উর্দুভাষী পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্র রূপায়ণ করেছেন ভারতীয় অভিনেতা যশপাল শর্মা।

প্রত্যেক অভিনেতা, অভিনেত্রীই নিজেদের চরিত্রগুলো রূপায়ণ করার ক্ষেত্রে দারুণ মুনশিয়ানা দেখিয়েছে। পোড়ামন ২-এর মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেকের পর থেকেই প্রিয়মুখ সিয়াম আহমেদের চলচ্চিত্র যাত্রা বেশ সাফল্যের সাথেই এগিয়ে চলছে। পুরোপুরি বাণিজ্যিক ধারার দুটি সিনেমায় অভিনয় করার পর ফাগুন হাওয়ায়-এর মতো কন্টেন্ট ভিত্তিক পিরিয়ড সিনেমায় তার সাবলীল অভিনয় দর্শকদের মন জয় করেছে। এছাড়াও ছোটপর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী তিশাও কিছু সময় পরপর নতুন সিনেমা নিয়ে ভক্তদের সামনে আসেন। সময়ের অন্যতম সফল এই অভিনেত্রী ফাগুন হাওয়ায় তার স্বভাবসুলভ অভিনয় প্রতিভার ঝলক দেখিয়েছেন। চরিত্রের নির্যাসটুকু পর্দায় তুলে আনতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। আর বিশেষভাবে যশপাল শর্মা পাকিস্তানি পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রের গভীরে গিয়ে চরিত্রের অভ্যন্তরীণ ভাব এবং রূঢ় দিকটি পর্দায় তুলে আনার ক্ষেত্রে নিজের অভিজ্ঞতার ঝলক দেখিয়েছেন।

এবার আসি চিত্রনাট্য এবং সংলাপের কথায়; সিনেমাটির গতিশীল চিত্রনাট্য এবং হিউমারে পূর্ণ, বাস্তবিক সংলাপগুলো দর্শকদের মনোরঞ্জনের সাথে সাথে গম্ভীর বিষয়বস্তুর প্রতি সুবিচার করেছে। বিশেষভাবে সংলাপে মেটাফোর-এর ব্যবহার করার মাধ্যমে তৌকির আহমেদ চিত্রনাট্যকে শক্তিশালী করেছেন। কারিগরি দিকগুলোতে এবার নিজের পূর্বের অন্যান্য সিনেমাগুলোর চেয়ে বেশি নজর দিয়েছেন পরিচালক। চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনা, শিল্প-নির্দেশনায় সিনেমার কলাকুশলীরা প্রশংসনীয় কাজ করেছেন। চিত্রগ্রাহক এনামুল হক সোহেল গ্রামীণ ল্যান্ডস্কেপে ড্রোন শটের ব্যবহার এবং কালারের কাজে পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন।
বাঙালি জাতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে রূপালি পর্দায় তুলে আনতে পরিচালক তৌকির আহমেদের নিরলস এই প্রচেষ্টার প্রশংসা করে শেষ করা যাবে না। বাঙালির সব আন্দোলন, সংগ্রামের সূচনা যেই ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে, সেই আন্দোলনের ঘটনা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই সিনেমা অবদান রাখবে বলে আশা করা যায়।

-হোসেইন আব্দুল্লাহ