সোমবার,২২ এপ্রিল ২০১৯
হোম / বিশেষ সংবাদ / স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ও অন্যরকম এক মুক্তিযুদ্ধ
০৩/২৪/২০১৯

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ও অন্যরকম এক মুক্তিযুদ্ধ

-

একাত্তর আমাদের জীবনে অনিঃশেষ গৌরবের এক অধ্যায়। আর এই অধ্যায়ের পাতায় পাতায় কত যে বীরত্বের গল্প আছে। কোনো কোনো বীরত্বের গল্প রচিত হয়েছিল স্টেনগানে, কোনো বা পাকবাহিনীর ক্যাম্পে নির্মম নির্যাতন সহ্য করে। তবে এসবের বাইরেও একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে পায়ে ফুটবল নিয়ে যুদ্ধ করেছিল একদল যুবক! বলছিলাম নয় মাসের মুক্তিসংগ্রামে অনন্য নিজের দেশকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের কথা।

২৫ মার্চ কালোরাতের পর সারা দেশজুড়ে যুদ্ধের দামামা শুরু হয়। আপামর জনতা যখন সশস্ত্র যুদ্ধে যোগ দিচ্ছিল, দেশমাতৃকা স্বাধীন করার প্রয়াসও চলছিল জোরেশোরে। তবে যুদ্ধ মানে তো শুধু অস্ত্রের ব্যবহার নয়, শুধুমাত্র দুটি দেশের অভ্যন্তরীণ কোনো ব্যাপারও নয়। গোটা বিশ্বের চোখ তখন পূর্বপাকিস্তানের দিকে। আর বিশ্ববাসীকে পাকবাহিনীর চালানো বর্বর অত্যাচার সম্পর্কে সচেতন করতে কাউকে না কাউকে দেশের পতাকা উঁচু করে সবার সামনে পরিচয় করানো লাগত।

তাই দেশের সংস্কৃতি ও খেলাধুলার সঙ্গের জড়িত মানুষদেরও এগিয়ে আসতে হতো। এই বিষয়টি মাথায় রেখে তৎকালীন মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম আরো একবার বিচক্ষণতার পরিচয় দিলেন। স্বাধীন বাংলার ফুটবল দল গঠন করে নিজেদের পরিচয় বাইরের পৃথিবীতে তুলে ধরার জন্য ফুটবলারদের বরাবর চিঠি দিলেন তিনি। আকাশবাণীতে এই ঘোষণা শোনার পরপরই প্রায় ৪০জন ফুটবলার কিছুদিনের মধ্যে মুজিবনগর ক্যাম্পে যোগ দেন। এই খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করা থেকে শুরু করে সার্বিক তত্ত্বাবধানের কাজে এগিয়ে আসেন উদ্যোক্তা, সংগঠক ও খেলোয়াড় ফুটবলার সাইদুর রহমান প্যাটেল। যাচাই-বাছাই এবং পরবর্তী অন্তর্ভুক্তির পর মোট ৩১জন ফুটবলারকে নিয়ে গঠিত হয় স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। এর মাধ্যমে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুদ্ধকালীন ফুটবল দল গঠিত হলো। আর সেই ফুটবল দলের অধিনায়ক হলেন বরেণ্য ফুটবলার জাকারিয়া পিন্টু।

ননী বসাকের কোচ এবং তানভীর মাজহার তান্না পেলেন ম্যানেজারের দায়িত্ব। দেশপ্রেমের মন্ত্র উজ্জীবিত এই দলে কে ছিলেন না? বর্তমান বাফুফে প্রেসিডেন্ট কাজী সালাউদ্দিন, সাইদুর রহমান প্যাটেল, প্রতাম শঙ্কর হাজরা, অমলেশ সেন, শেখ আশরাফ আলী, বিমল কর, সুভাষ সাহা, আইনুল হক, আলী ইমামসহ তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের সেরা সব ফুটবলার যোগ দেন এই দলে। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে জনমত অর্জন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যের জন্য অর্থ সংগ্রহ করার লক্ষ্যে ভারতের বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচ খেলতে থাকে দলটি। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর স্টেডিয়ামে নদীয়া জেলা একাদশের বিপক্ষে খেলা দিয়ে এই অভিনব যাত্রা শুরু করে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল।সেদিন ২-২ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচটিতে জয়-পরাজয় ছাপিয়ে লাল-সবুজের পতাকা মুখ্য হয়ে উঠেছিল। সবুজের পটে লালসূর্য এবং সোনালি মানচিত্রের তখনকার পতাকার উঁচিয়ে ধরার মাধ্যমে যে মুক্তির বার্তা তৈরি হয়েছিল তা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এদিন মেহেরপুরের সীমানা পেরিয়ে অনেক বাংলাদেশি খেলা দেখেছিলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না তাদের সবার মন সেদিন দেশপ্রেমের মূর্ছনায় মেতে উঠেছিল, একই সাথে শত্রুবধের সংকল্প আরেকটু মজবুত হয়েছিল।

স্বীকৃতি ছাড়া বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানোর দায়ে সেদিন নদীয়ার ডিসিকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে ইতিহাস রচিত হয়ে গিয়েছে। এই পতাকা আর মুখে ‘আমার সোনার বাংলা’ গান নিয়ে বাংলার দামাল ফুটবলাররা ভারতের মাঠ মাতিয়েছেন। এভাবে মুক্তিযুদ্ধের জন্য যেমন জনমত গঠন হয়েছে, তেমনি মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যের জন্য বিপুল অর্থও উঠে এসেছে। ভারতের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ১৬টি ম্যাচ খেলার মাধ্যমে জমাকৃত টাকা মুক্তিযোদ্ধা ফান্ডে জমা দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব পালন করে দলটি। শুধু তাই নয়, প্রাথমিক দল থেকে পরবর্তীকালে সরাসরি যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন সাইদুর রহমান প্যাটেলসহ আরো অনেকেই। তৎকালীন সময়ে তাদের এই অবদানের কথা সুদূর ইংল্যান্ডে সংবাদপত্রেও উঠে এসেছে। এর পাশাপাশি ফুটবল পায়ে একদল যুবকের এমন সাফল্য অনুপ্রাণিত করেছে এ দেশের অসংখ্য মানুষদের।
একাত্তরে দেশকে ভালোবেসে ফুটবল পায়ে নিজেদের মতো করে যুদ্ধ করে গিয়েছেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের একেকজন সদস্য। ফুটবল পায়ে এই যোদ্ধাদের অনেকেই আজ নেই। স্বাধীনতার এই মাসে তাদের জন্য রইল বিন¤্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

-নাসিফ রাফসান
ছবি : ইন্টারনেট