সোমবার,২২ এপ্রিল ২০১৯
হোম / বিশেষ সংবাদ / মুক্তির বহ্নিশিখা শহিদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন
০৩/২৪/২০১৯

মুক্তির বহ্নিশিখা শহিদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন

-

ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এক রাতের শেষে পুব আকাশে মুক্তির বার্তা নিয়ে যখন সূর্য উঁকি দিতে থাকে, তখন ভয়, শঙ্কা কেটে গিয়ে নতুন জীবনের আবাহন শুরু হয়। বাংলাদেশও বিজয়ের প্রহর গুনছিল ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের স্বাধীনতাপূর্ব দিনগুলোতে। বিজয় এসেছিল ঠিকই; কিন্তু মুক্তির সূর্যের আলোকে ম্লান করে দিয়েছিল হায়েনারা।
বিজয়ের ঠিক আগমুহূর্তে এ-জাতির সূর্য সন্তানদের হত্যা করে আমাদের মাথা তুলে দাঁড়ানো থামিয়ে দিতে চেয়েছিল শত্রুরা। হীন এই হত্যাযজ্ঞে শহিদ হন হাজারো বুদ্ধিজীবি, গুণি ব্যক্তিগণ। শহিদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন জাতির সেই সূর্য সন্তানদের একজন। এই লেখনী অসম্ভব গুণী, পথপ্রদর্শক অমর এই নারীকে নিয়ে।

সেলিনা পারভীনের জন্ম ১৯৩১ সালের ৩১ মার্চ, ফেনী জেলাতে। তাঁর পিতা মো. আবিদুর রহমান পেশায় ছিলেন শিক্ষক। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তিনি সাহিত্যের অনুরাগী হয়ে গল্প ও কবিতা লেখা শুরু করেন। তখনকার গ্রামীণ সমাজের মারপ্যাঁচে তার পড়ালেখার সাময়িক ইতি ঘটে তখন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তার অমতে তখনকার প্রথামত বিয়ে দেওয়া হয়। এত কম বয়সে স্বামীর সাথে থাকার কথা ভাবতে পারেননি। ১০ বছর টিকেছিল সে বিয়ে।

পরবর্তীসময় তিনি আবার পড়ালেখা শুরু করেন; কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত মেট্রিকুলেশনে কৃতকার্য হননি। ১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকা চলে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল পরিচালকের চাকরি নেন। পরের বছর কর্তৃপক্ষের সাথে মতের অমিল হওয়ায় তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। পরে তিনি ‘ললনা’ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বিভাগে কাজ শুরু করেন। বিজ্ঞাপন সংগ্রহ, টাকা তোলা সব কাজ একাই করতেন। পত্রিকা অফিস থেকে বেতন হিসাবে অনেক সময় তেমন কিছুই পেতেন না। ললনায় কাজ করতে করতেই ১৯৬৯ সালে বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বের করেন ‘শিলালিপি’ নামে একটি পত্রিকা। নিজেই এটি সম্পাদনা ও প্রকাশনার দায়িত্ব নেন। নিজের সন্তানের মতো ‘শিলালিপি’-কে আগলে বড় করছিলেন। শহিদুল্লাহ কায়সার, মুনির চৌধুরী, জহির রায়হান, ড. বোরহান উদ্দিন খানসহ দেশের অসংখ্য বুদ্ধিজীবী লিখতেন এই পত্রিকায়। এই সুবাদে ঢাকার বুদ্ধিজীবীমহলে অনেকের সাথেই ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেন তিনি। শিল্পী হাশেম খান এটির প্রচ্ছদ করতেন। স্বাধীনতার পক্ষের পত্রিকা শিলালিপি যে শুধু সকলের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছিল তাই নয়, তুমুল জনপ্রিয়ও হয়ে ওঠে ১৯৪৫ সাল থেকেই সেলিনা পারভীন লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

'৬৯’র উত্তাল সময়গুলো থেকেই তিনি দেশের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন। গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলন কর্মকা-ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। ছেলেকে সঙ্গে নিয়েই বেরিয়ে পড়তেন ২১ ফেব্রুয়ারির জনসভায় বা শহিদ মিনার থেকে বের হওয়া নারীদের মিছিলে যোগ দিতে। শরিক হতেন বুদ্ধিজীবীদের প্রতিবাদে আর সভায়ও মায়ের সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সেলিনা পারভীনের একমাত্র ছেলে লেখক সুমন জাহিদ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “মা সরাসরি রাজনীতি করতেন না। কিন্তু রাজনীতিসচেতন ছিলেন। সভা-সমাবেশগুলোতে তিনি অংশহগ্রহণ করতেন। আমাকেও নিয়ে যেতেন। আমার তখন ৮ বছর বয়স। আমার স্পষ্ট মনে আছে। একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরিতে গিয়েছি, ৭ মার্চের ভাষণ শুনতে গিয়েছি।”

মুক্তিযুদ্ধের সময় সেলিনা পারভীন নানাভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছেন। যুদ্ধ চলাকালে তার বাসায় মুক্তিযোদ্ধারা আসতেন। খাওয়া-দাওয়া করে চলে যাওয়ার আগে তারা সেলিনা পারভীনের কাছ থেকে সংগৃহীত ঔষধ, কাপড় আর টাকা নিয়ে যেতেন। শিলালিপি বিক্রির টাকা দিয়েই তিনি এই স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতেন। চারদিকে তখন চলছে আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ আর প্রতিরোধ। সারাদেশে তখন শুধু রক্ত¯্রােত আর মৃত্যু। দেশের এ অবস্থায় ললনা প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। শিলালিপির উপরও নেমে আসে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর খড়গ। হাশেম খানের প্রচ্ছদ করা একটি শিলালিপির প্রকাশিতব্য সংখ্যা নিষিদ্ধ করে দেয় পাকিস্তান সরকার। পরে অবশ্য প্রচ্ছদ পরিবর্তনের শর্তসাপেক্ষে প্রকাশের অনুমতি মেলে। আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে শিলালিপির শেষ সংখ্যা বের করেন। কিন্তু এর আগের সংখ্যার জন্যই সেলিনা পাকিস্তান সরকার ও তাদের দালালদের নজরে পড়ে যান। এ-সংখ্যাটি ছিল দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের লেখায় ভরা। সব লেখাই ছিল স্বাধীনতার পক্ষে। এটাই কাল হলো সেলিনার জন্য। নতুন আরেকটি সংখ্যা বের করার আগে নিজেই হারিয়ে গেলেন তিনি।

১৩ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সাল। সাংবাদিক সেলিনা পারভীন তখন বাস করতেন সিদ্ধেশ্বরীর ১১৫ নিউ সার্কুলার রোডের বাসায়। শিশুপুত্র সুমন, মা আর তার ভাই উজিরউদ্দিনকে নিয়ে এই বাড়িতে থাকতেন তিনি। সেদিন শীতের সকালে তারা সকলেই ছিলেন ছাদে। সারা শহরজুড়ে তখন কারফিউ চলছিল। রাস্তায় পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণের জন্য বিমান থেকে চিঠি ফেলা হচ্ছে। সেলিনা পারভীনের বাড়ির উল্টো দিকে ই.পি.আর.টি.সি-এর গাড়ি এসে থামলো। বাসার প্রধান গেট ভেঙে ভিতরে ঢুকল কয়েকজন লোক। তাদের সবাই একই রঙের পোশাক পরা। মুখ রুমাল দিয়ে ঢাকা। ফ্ল্যাটে এসে কড়া নাড়ে তারা। সেলিনা পারভীন নিজে দরজা খুলে দেন। লোকগুলো তার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। এ সময় সেলিনা পারভীনের সাথে লোকগুলোর বেশ কিছু কথা হয়। এরপর তারা সেলিনা পারভীনকে তাদের সাথে নিয়ে যায়।

১৮ ডিসেম্বর সেলিনার গুলি-বেয়নেটে ক্ষত-বিক্ষত মৃতদেহ পাওয়া গেল রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে। তার পায়ের সাদা মোজা জোড়া দেখে তার লাশ শনাক্ত করা হয়। ১৪ ডিসেম্বর আরও অনেক বুদ্ধিজীবীর মতো পাকিস্তানের দালাল আলবদর বাহিনীর ঘৃণিত নরপশুরা সেলিনা পারভীনকে হত্যা করে। পরে ১৮ ডিসেম্বর আজিমপুর কবরস্থানে শহিদদের জন্য সংরক্ষিত স্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।
কথায় আছে শহিদেরা জেগে থাকেন, তারা ঘুমান না। দেশমাতৃকার পাহারা দেন তারা। শহিদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন তার জীবদ্দশায় আলোর প্রদীপ হাতে নিয়ে পথ দেখিয়েছেন মুক্তিকামী মানুষগুলোকে, জেগে থাকার সাহস জুগিয়েছেন নিরন্তর। স্বাধীনতার এই এত বছর পরও তিনি আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন, প্রেরণার উৎস হয়ে বেঁচে আছেন কোটি প্রাণে, মুক্তির বারতা নিয়ে।

-তানভীর জাহান