সোমবার,২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯
হোম / বিবিধ / সন্তানের সঙ্গে হোক মুক্ত আলোচনা
০৩/১৬/২০১৯

সন্তানের সঙ্গে হোক মুক্ত আলোচনা

প্যারেন্টিং অ্যাডিকশন

-

গতানুগতিক জীবনে নানাকিছুর উপর আসক্ত হয়ে পড়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে আসক্তি যদি দেখা দেয় একেবারে ছোট বয়সে তবে তা পরবর্তীসময় বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে বাবা-মাকে রাখতে হবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা। সন্তানের নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে আসক্তি এবং এর প্রেক্ষিতে করণীয় সম্পর্কে অভিভাবকদের থাকতে হবে স্পষ্ট ধারণা ও পরিকল্পনা।

আসক্তি

শুধু বড়রাই যে নানাজিনিসে আসক্ত হয় তা নয়। শিশু বা বাল্যবয়সেও সন্তানরা আসক্ত হতে পারে। এই আসক্তি নেশাজাতীয় দ্রব্যে হতে পারে, তবে শুধু এতেই হবে এমনও কিন্তু নয়। এক্ষেত্রে ধরনটা হয়তো সবসময় বড়দের মতো নয়। বাচ্চারা অনেক সময় টিভি না চালালে বা মোবাইল কাছে না দিলে খেতে চায় না। একসময় তা প্রকট আকার ধারণ করে, এটাও কিন্তু একরকম আসক্তি। সন্তানের আসক্তি জন্মাতে পারে ইন্টারনেটে, কম্পিউটারে, গেমস-এ, ফেসবুক বা সামাজিক মাধ্যমে, পর্নোগ্রাফি কিংবা সিগারেট ও অন্য নেশাজাতীয় বস্তুতে। একেকটির ভয়াবহতা একেক রকম।

শুরুতেই শুরু করুন

শিশুরা পরিবারের বাইরে সাধারণত বন্ধুদের মাধ্যমেই নতুন কিছুর সাথে পরিচিত হয়। ফলে এই নতুন কিছুর সাথে তাদের পরিচয়টা হয় ভাসাভাসা বা অনেক ক্ষেত্রে বিকৃত। তাই বাবা-মার দায়িত্ব হচ্ছে সন্তান একটা বয়সে পৌঁছে নিজ থেকে এসব জেনে নিবে এমনটা না ভেবে ছোটবেলায় সব খুলে বলা। মনে রাখা ভালো, ওদেরকে সবকিছু থেকে আড়াল করে রাখতে চাওয়া বরং হিতেবিপরীত হতে পারে। তাই সবকিছুর ভালোর পাশাপাশি খারাপ দিকটাও তুলে ধরুন। সেটা হতে পারে গেমস খেলা থেকে শুরু করে মাদক পর্যন্ত। তাই সিগারেট, অ্যালকোহল ইত্যাদির খারাপ দিক সম্পর্কে যেমনটা বলবেন, তেমনি অন্যান্য যে-কোনো বিষয়ে অতিরিক্ত আগ্রহ বা আসক্তি যে কেন ক্ষতিকারক তাও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে বলুন।

মাত্রাটা বয়স অনুযায়ী

তবে নিজের ছেলে বা মেয়েকে এই শিক্ষা দিতে গিয়ে আবার অতিরিক্ত করে ফেলতে যাবেন না। বরং বয়স অনুযায়ী শেখানোর মাত্রাটা একটা লিমিটে রাখুন। সবকিছু যুক্তি-তর্ক দিয়ে বোঝাতে গিয়ে সন্তানের উপর আপনার নিয়ন্ত্রণই যাতে না হারিয়ে যায় সেদিকে খেয়াল রাখুন। সন্তানকে তার চিন্তার জগতের সাথে মিলিয়ে সবকিছু শেখান। যে যুক্তি ও উদাহরণ বড়দের ক্ষেত্রে খাটেও না তাদের মনে নাও ধরতে পারে। অনেক সময় আপনার উপদেশ সে কীভাবে নিচ্ছে তা নির্ভর করে আপনি কীভাবে তা উপস্থাপন করছেন তার ওপর। একই কথা দিনের মধ্যে কয়েকবার না বলে উপযুক্ত সময়ে ভিন্নভাবে বলুন।

মেটাফোর ইউজ করুন

ধরুন, আপনার ছেলে বা মেয়ে প্রচুর পরিমাণে জাংক ফুড খাচ্ছে। এখন তার এই আসক্তি দূর করতে আপনি যদি এ ধরনের খাবারের শারীরবৃত্তীয় অপকারিতা কিংবা মেডিকাল টার্মে খারাপ দিকগুলো ব্যাখ্যা করতে যান তবে তা একেবারে উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে। এক্ষেত্রে সে বুঝবে এমন মেটাফোর বা উদাহরণ নিয়ে আসতে পারেন। যেমন ধরুন কোনো কার্টুন ক্যারেক্টার পপাই-এর রেফারেন্স টেনে বলতে পারেন কেন এসব জাংকের বদলে পালং শাক বা শাক-সবজি খাওয়া দরকার।

খোলামেলা কথা বলুন

বাবা-মার নিষ্পাপ সন্তান যে খারাপ কিছুর সাথে পরিচিত হতে পারবে না তা কিন্তু না। সে স্কুল বা কলেজের গ-িতে অনেকের সাথে মেশে ও অনেক নতুন কিছু শেখে। আর আছে ইন্টারনেট ও সামাজিক মাধ্যমের অবারিত দুয়ার। তাই কোনো খারাপ সম্ভাবনাকেই উড়িয়ে না দিয়ে তাদের সাথে আপনি সচেতন বাবা বা মা হিসেবে খোলামেলা কথা বলুন। তাদের কৌতূহল মেটানো আপনার দায়িত্ব। মাত্রাতিরিক্ত কৌতূহল কীভাবে তাদের নেশার মতো খারাপ বিষয়ে সম্পৃক্ত করে ফেলতে তা সম্পর্কে ধারণা দিন।

নিজে সৎ হোন

সন্তানদের কাছ থেকে কিছু আড়াল করে রাখলে সেটা তারা বুঝতে পারে; কিছু একটা তাদের কাছ থেকে লুকানো হচ্ছে। তাই আপনি অভিভাবক হয়ে তার কাছে সৎ ও স্পষ্ট থাকুন। একসময় আপনি নিজেও হয়ত কোনো একটা খারাপ ব্যাপারে আসক্ত ছিলেন। সিগারেট কেন খাওয়া উচিত না, এটা বুঝানোর সময় সে হয়ত আপনাকে জিজ্ঞাসা করতে পারে ‘তুমি কি কখনো এটা খেয়ে দেখেছিলে?’ কোনো দুর্বলতা ওর কাছে আড়াল না করে খুলে বলুন আপনার অভিজ্ঞতা। আপনি কীভাবে সেটা থেকে বেরিয়ে এসেছেন এবং সেটি কেন খারাপ। শিশুর আসক্তি কাটাতে বাবা-মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। আপনি যদি সারাক্ষণ মোবাইলে বা কম্পিউটারে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে সন্তানের মনে হবে, এটাই স্বাভাবিক।

ভয় দেখানোতেই সমাধান নয়


ছোট্ট সোনামণিকে হয়ত বাঘের ভয় দেখিয়ে খাবার খাওয়ানো যেতে পারে; কিন্তু তার মানে এই নয় সবকিছুতেই ভয় নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে। শিশুরা বড় হওয়ার সাথে সাথে তাদের মধ্যে যুক্তি ও সাহসের বিস্তার ঘটে। ‘খবরদার এটা কখনো করবে না’ বললেই সে তা কখনো করবে না তার নিশ্চয়তা নেই।

নানাকাজে ব্যস্ত রাখুন

সন্তানকে বাইরের কাজে উৎসাহিত করুন। নিশ্চিত করুন, সে যেন ঘরের কোণে বসে মোবাইল চালানোর সময় না পায়। প্রাকৃতিক পরিবেশে হাঁটতে অথবা খেলাধুলার কাজে সন্তানকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করুন। এতে করে অন্যান্য বিষয়ের উপর অতিরিক্ত মনোযোগ বা আসক্তি কমবে।

-রিয়াদুন্নবী শেখ
ছবি : সাইফ রিফাত ও ওয়াহেদ মাহমুদ