শনিবার,২৩ মার্চ ২০১৯
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / কবিতা
০৩/০৬/২০১৯

কবিতা

-

উড়াল শিখেছি
-তাহমিনা কোরাইশী

কে যেন ডাকলো আমায় বহু বহুদিন পর
আয় আয় উড়বি চল-
ঐ খোলা আকাশটা দেখবি চল
কি যে ভয়ছিল এই ডানা দুটো নিয়ে
স্থবির হয়ে যায়নি তো !
ঝোড়ো হাওয়ার তোড়ে মুখ থুবড়ে
পড়বে না তো এঁদো কোন জলাশয়ে!
নানা এই তো বেশ উড়ছি
ভালোই তো উড়ছি
মানুষ গাছ পাহাড় নদী কাশবন
বন-বনান্তর সবুজে শ্যামল প্রান্তর
মাথার ওপর নীল আকাশ সাদা মেঘ
প্রাণ জুড়ানো শিশির ভেজা হাওয়া
পাঁজরের খাঁজে খাঁজে শুষে নেয়া যায়।

উড়ছি তো ঘুড়ির মতো ঘুরে ঘুরে
কে যেন আবার বলল-
না না তুমি কেন ঘুড়ি হতে যাবে
ওর বুকের আঁচল বাঁধা আছে অন্য ডোরে
নাচিয়ে নাচিয়ে ঘুরাতে জানে ভালো
ইচ্ছে মতো লাগাম ছেড়ে ধরতেও জানে ভালো...
তুমি উড়ে যাও স্বাধীনতার সুবাতাসে
ছিলে তো বহুকাল আবদ্ধ গ্রন্থিতে
যাও উড়ে মিহিদানা বৃষ্টির ফোঁটায়
সূর্যের মিঠেল আলোয়
মেঘবৃষ্টি খেলায় উড়িয়ে তোমার আঁচল
যাও উড়ে যাও রঙধনু আকাশ ছুঁয়ে
ইচ্ছেরা বুঝি সাত রঙে রাঙা হতে জানে।


কিভাবে সে নারী হয়
-কামরুল হাসান

কিভাবে সে নারী হয়
ভীরু লজ্জা ভিড়ে চোখের গভীরে
সংকোচের কারুকাজ হয়ে যায় বোনা
জানে না সে
কখন প্লাবন নামে, দেহের সীমানা ঘিরে
থৈ থৈ বরষার মাতোয়ারা জল।

সঙ্গীকে ছুঁতে গিয়ে অজানা দ্বিধায়
কখন আঙুল ফিরে আসে, আনত সত্ত্বায়
ভালোবাসা বহু বিভিন্ন ব্যঞ্জনা আনে।

ক্রমশ সে সরে যায় সঙ্গহীন দ্বীপে
বয়স বিরোধী জল, চারপাশে তুলে ধরে
নিষেধের কোমল প্রহরা; লতা-গুল্ম জড়িয়ে ছড়িয়ে
উচ্ছ্বসিত তার হাসি পুকুরের পাড়ে
কখন নিঃস্তব্ধ হয়, কী গোপনে পাতা হয়
উত্তরাধিকারের সোনালি শয্যা, অন্দরের মধু!

জানে না সে, কিছুই জানে না
পুতুলের বিয়ে-টিয়ে ইত্যাকার খেলা
ভেঙে যায়, বধূবেশে অন্যগৃহে
একদিন পদার্পণ তার, এক সুবর্ণ রাতে
অপরিচিত বাসরে সাজে রহস্যের রানি
সেই নারী!

একবাক্যে প্রবাহিত সাঁকো
-ফারহান ইশরাক

দেখেছি তো আকাশের লাল অনুচ্ছেদ
‘মৃত্যুর আন্তরিক আভা, একাকী সুন্দর
রঙ’-এ ভরসা না পেলে বাঁচবো না
কাঁঠালের মোচা ভাঙা ভোর, রঞ্জিত
নয় অতি, প্রকৃতি সুন্দর নিত্য পরিধি,
কুয়োতলা, অতল মাত্রা, মুদ্রা ভঙ্গিমার
শিহরণগুলো! ছেঁড়া পাতাতীব্র ঘ্রাণ!
একবাক্যে নদী প্রবাহিত, এক সুরে
আবাদের লিপ্ত রূপ রেখা, তা বলে
উড়ালসেতু যেতে যেতে শ্যাওলা ঘাটে
একটু থামবে? এখানে কাটলো বেলা
বয়োত্তীর্ণ নখ! নির্জনতা ফেটে পড়া হ্রদ
বহুতল অন্ধকার চুয়ে চুয়ে এইখানে
কান্নার দিঘি, ইস্পাতের আবৃত্তিমুখর
প্রতিটি কারখানা, হাতা গোটানোর
প্রতিটি ইশারা শব্দ করে বলে, যাবো!


ঝড়
-কাজী রোজী

ঝড়ের বৃত্ত থেকে সবাই আমরা বেরিয়ে আসতে চাই।
যে ঝড় দেখা যায় সময়ে তা থেমে যায়
ক্ষয়-ক্ষতির ধ্বংসাবশেষ আগলে ধরে
আবার মানুষ বাঁচতে চায়
উজ্জীবিত করতে চায়
সৃষ্টি করতে চায় নতুন ইতিহাস।
মানুষ তা পারেও।

কিন্তু যে ঝড় দেখা যায় না...
তীব্র ক্ষরণে দাউ দাউ দহনে
ল-ভ- ছারখার
সবটাই অনাচার অবিচার
সে ঝড়ের সমাচার কী!
‘আইলা’ দেখে মানুষ বলেÑ‘দ্যাশের কুনহানে
বাঁচন নাই।’
ঝড়ের কতো রকম ভেদ আছে।
মেঘ যখন ঝড়কে অন্তরে ধারণ করে রাখে
আমরা কেউ বুঝি কেউ বুঝি না।
ঝড় যখন বেসামাল বৃষ্টিতে উড়িয়ে নিয়ে যায়
আমার থেকে তোমার কাছে কিংবা তোমার থেকে আমার
আমি তার সবটা গায়ে মাখি। যতনে গোলাপ
ফোটার মতো আমি নিজেকে প্রস্ফুটিত করি।
ঝড় যখন আকাশের ঈশান কোণে বাসা বাঁধে
নানী দাদী বলে ওঠেনÑ
এ বড় দারুণ ইশারা ঝড়ের হালখাতায়
ভেতরে বাইরে সবটা সমান
গরু ছাগল হাঁস-মুরগির সঙ্গে
মানুষের নির্বিচারে হারিয়ে যাওয়া।
ফুল পাখি লতা পাতা তাও লুটায়।
মসজিদ মন্দির গির্জা প্যাগোডা
সবখানে শেষতক মেলে না বিশ্বাস।

ঝড় যখন যুদ্ধ হয়ে নামে
একটি বৃক্ষ তার তাবৎ শক্তি দিয়ে
নিজেকে বাঁচাতে চায়।
কিন্তু নিমেষেই ঝড় মুছে দেয়
দূর্বাঘাসের জীবনগাথাও।
ভিটেমাটির গভীর খনন থেকে উপড়ে এনে
ধরাশায়ী করে দেয় ইচ্ছের ঘরবাড়ি।
সবুজ বনানীর বুকে লাম্পট্য বিহার করে ঝড়।
বিশাল বিরাণ ভূমির অট্টহাস্য
সেখানে জেগে ওঠেÑ
ভ্রুকুটি প্রদর্শন করে মানুষের শক্তির কাছে ঝড়।

ঝড় যখন নিত্যদিনের ওঠানামায় আসে
রাজনীতি অর্থনীতি সমাজনীতি ও দুর্নীতির পাশে
ঝড় যখন নির্ভাবনার ঘরানাতে অবিশ্বাসের মৌচাকে চাক বাঁধে
তখনি ঝড় সবলোকে যায় সব মানুষের উচ্চারণের সাথে।
ঝড় যখন স্বপ্ন ভাঙে
কেড়ে নেয় সমুদয় মানুষের উচ্ছল হাসির মৃদঙ্গ।
যখন সে পোয়াতি বউটার প্রসব বেদনার
চিৎকার শুনতে পায় না
দেখতে চায় না নবজাতকের নির্মল পবিত্রতা...
আমি তখন দেখতে পাই
শিশুর সাথে মায়ের ব্যবচ্ছেদ
শুনতে পাই নাড়ি কাটার শব্দ।
শিশুটি তখন ঝড়ের বন্ধ-জীবনের অঙ্গীকার।
অতঃপর ঝড় যখন সম্পর্কের বাস্তুভিটায় আঘাত করে পরম্পরায়
সারকারামার মতো সার্বিক চিত্র প্রবাহের খ-খ- রূপ মিছিল করে।

ঝড় যখন মানচিত্রের বুকে ছোবল মারে
দেশ-বিদেশের সাহায্যের ভালবাসায় জড়িয়ে নেয়
বাংলাদেশকে
মানুষের ভালবাসায় ইস্পাত কঠিন হয় মানবতা
আমি কিন্তু তখন আমার ভেতরে
কোন ঝড়ের প্রকোপ দেখিনে।
মাতৃগর্ভ থেকে ঝড়ের ভ্রুণ নিয়ে জন্মেছি আমি
তখন আমি স্থির অচঞ্চল ঋদ্ধ থাকি
ঝড় জল বন্যার দারুণ স্থায়ী আবাসটিকে
ভেঙে ভেঙে বাঁচি।
আসলে ঝড়ের বৃত্ত থেকে আমরা সবাই
বেরিয়ে আসতে চাই।