শনিবার,২৩ মার্চ ২০১৯
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / নদীর নাম ভড়োমোহনা
০৩/০৬/২০১৯

নদীর নাম ভড়োমোহনা

- রুমা মোদক

বাংলাদেশের সব নদী দেখতে একরকম, একই স্রোত, নিয়ন্ত্রণহীন ছুটে চলা কচুরিপানার ঝোঁপ, হঠাৎ একটা জলজ উদ্ভিদের ফুস করে ভেসে ওঠা আর ভুস করে ডুবে যাওয়া...। টানের দিনে ভেসে উঠা চরা, ভরাযৌবনের নদীগুলো তখন বৃদ্ধার চুপসে যাওয়া লাবণ্য। ঘাটগুলোও দেখতে একদম একরকম। সে খোয়াই হোক কিংবা কালনি কিংবা ভড়োমোহনা।

পাড়ঘেঁষে বাজার, টিনশেডের ছাপড়া আর সারি সারি হরেক মুদির মালামাল। সময়ের ¯্রােত বেয়ে নেমে গেছে পানির স্তর, তবু বাজারঘেঁষে যে ঘাট বছরভর দাঁড়িয়ে থাকে তাতে ইঞ্জিনের নৌকা বেয়ে মাঝে মাঝে চড়ে আটকা পড়ে শিশুর প্লাস্টিকের খেলনা, চিপ্সের প্যাকেটের সাথে আসে কন্ডমের প্যাকেটও, পৌঁছায় নতুন রিলঞ্চ করা মিনিপ্যাক শ্যাম্পু তেল। ইউনিয়ন পরিষদের পিচ করা রাস্তা থেকে নেমে থাম্বাগুলো ধানের ক্ষেতে নির্দিষ্ট বিরতিতে জিরিয়ে জিরিয়ে বৈদ্যুতিক লাইন নিয়ে গ্রামে ঢুকে পড়েছে আর তার হাত ধরে ঢুকে পড়েছে আকাশ সংস্কৃতিও।

সন্ধ্যার পর ক্লান্ত শ্রান্ত মানুষগুলোর একঘেয়ে নিরানন্দ দিনগুলো সন্ধ্যায় বেশ রঙচঙে হয়ে উঠে জামাইরাজার শাশুড়ি- জামাইয়ের ঝগড়াঝাঁটি আর প্রতিবাদী পুত্রবধূর দাপট দেখতে দেখতে। মাঝে মাঝে তাদের হাতগুলো ভিতরের উত্তেজনা প্রকাশ করে ফেলে পুনঃপুন তালির মাধ্যমে। যদিও তাদের ঘরের নারীদের কোনো ব্যাপারে নাক গলানো তাদের একদম পছন্দ নয়।
সেদিন সক্কাল সক্কাল মাটির উনুনে ডেংগা পুড়াতে পুড়াতে ধোঁয়ায় নাক চোখ মুখ দমবন্ধ হয়ে আসতে আসতে ললনা রানির কানে ধাক্কা দেয় হালকা কোলাহল। ক্রমে সে কোলাহল বাড়তে থাকলে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে বুড়ির বিলাপও- আমার কেউ নাই গ বেইট্টাইন, আমার কুনতা নাই। অতলা বেইল অইল কেউ এট্টুতা খাওন দিল না।

ললিতারানি মুখ ঝামটায় অভ্যাসমতো, আরে খাড়ৈন না, এক্টুট্টা দিরং ছবুর করন যায় নানি? বুড়ি ক্ষাণিক চুপ করে, ললিতা রানি শুনতে পায় গুঞ্জন ক্রমে হৈ চৈ-এ রূপান্তরিত হচ্ছে। চুলার ভিতরে আরো ডেংগা ঠেসে ঠেসে ঢুকাতে ঢুকাতে অপরিচিত কোলাহল তার কৌতূহল উঁচকে দেয় ক্ষিদা পেটে ভাতের মাড়ের গন্ধের মতো। একবার উঁকি দিয়ে দেখার ইচ্ছেটার গলা টিপে ধরে সে। বুড়িরে এই খুদ সিদ্ধ না খাইয়ে গেলে বুড়ির বিলাপ বাড়ির অদৃশ্য পাঁচিল ডিঙিয়ে মাঠে পুলার বাপের কান অব্দি গিয়েও থামবে না। দূরে, আরো দূরে হাটে পাঁচজনের কান পর্যন্ত যাবার প্রস্তুতি নিতে থাকবে। বুড়ির বয়স হলে হবে কী, গলায় যেনো এখনো বিশ বছরের জোয়ানকী।

ললিতারানির নানান যন্ত্রণা। অতিবৃষ্টির কারণে এবার বৈশাখের ফসল উঠেনি। পুরা দরে চাল কিনে খেতে হয়। সাড়ে ছয় কেজিতে একপুরা। একপুরায় বাচ্চার টাইট হয়ে যাওয়া প্যান্টের ইলাস্টিকের মতো টেনেটুনে সপ্তাহ পার করতে হয়। কোনোবেলাই কারো ভরপেট হয় না।
নিজেদের জন্য তবু তিনবেলা মোটা চালের ভাত হলেও বুড়ির জন্য একবেলা। সকাল আর রাতে সস্তা দরের খুদ সিদ্ধ। বুড়ির পোলার মতে দাঁত নাই মায়ের, এই সিদ্ধ খুদই তার খেতে সুবিধা। পোলার এই দরদের অন্তরালে চাতুরিটুকু পোলা নিজে যেমন জানে, ললিতারানিও জানে। জানে না খালি বুড়ি। প্রতিবেলাই বুড়ি প্যানপ্যান করে, খুদ খেতে চায় না।

ললিতারানি সক্কাল সক্কাল ডেংগার ধোঁয়ায় নাক মুখ জ্বলিয়ে ক্ষুদ সিদ্ধ করে বুড়ির জন্য, নিজেরা আগের দিনের বাসি ভাতই খেয়ে নেয় যদিও। এবছর ধান না হওয়ায় খেরও নেই,এমনকি গরুটাকে পর্যন্ত ডেংগা (ধান গাছের গুড়ি বা শেকড়) খাওয়াতে হয়,তায় আবার চুলার জ্বালানি!
বাপের জন্মে চাল কিনে খেতে দেখেনি সে, না বাপের ঘরে না শশুরের ঘরে। অথচ এ বছর অতিবৃষ্টিতে বৈশাখের ধান তো গেছেই এই আঘনেও যে হারে বৃষ্টি হচ্ছে, এই মৌসুমের ফসলও ঘরে উঠারও সম্ভাবনা কম। জনমে সে আকাল দেখেনি, শাশুড়ির মুখেই শুনেছে যে বর্ষায় বঙ্গবন্ধু মরলো তার আগের বর্ষা থেকেই আকাল লেগেছিল। ঘরে ঘরে ভাত নেই। বাজারে চাল নেই, কাজ নেই, ফসল নেই। কী আকাল! কী আকাল! সিদ্ধ খুদ নিয়ে গেলে, বুড়ি যখন প্যানপ্যান করে, ললিতা বুড়ির গল্পই শুনায় বুড়িকে, কিতার লাইগ্যা চিল্লান, হোনান নাই তখন চাইয়াচিন্তা চোদ্রি বাড়ির থন আইন্যা ভাতের মাড় খাইছেন। অখন ত ভাত পাইতাছইন, মাড় না। প্যানপ্যান কইরেন না।

বুড়িও সেই কথা শুনামাত্র চুপ করে যায়, কিন্তু বুড়ির বার্ধক্যের ক্লান্ত ভাঁজে ভাঁজে কী যে এক স্মৃতি ঝিলিক মেরে হাওরের ঘাঘট মাছের মতো আবার গহিন জলে লুকিয়ে যায়। ললিতা রানির তা চোখে পড়ে না। সে শাশুড়িকে চুপ করিয়ে নিজের বিজয় উদযাপন করে বিড়বিড়িয়ে, কেমনে থুতা মুখ ভোঁতা কইরা দিলাম, বেডি আমি জানি এই একডা কথা কইলেই তুই ঠান্ডা।

নদীতে ভেসে উঠা লাশটির ফুলে ফেঁপে আসল চেহারা প্রায় বিকৃত। নদীর ভাঙনে তলিয়ে যাওয়া নিশ্চিহ্ন গ্রামের মতো এর নাক চোখ মুখ সব সমান। মাছের খুবলে খুবলে খাওয়া মাংসে পচন ধরেছে, রক্তের রং কালো আর মাংসের রং কালচে ফ্যাকাশে সাদা। পেট ফুলে ঢোল, গায়ের শার্টের দুর্বল বোতাম সেই ফোলা আটকাতে না পেরে ছিঁড়ে গিয়ে হাঁফ ছেড়েছে। শার্ট প্যান্ট আঁটো শরীরের সাথে সেটে গেছে, আর তার ফাঁকে বের হয়ে থাকা হাতের তালু, পায়ের তালু তে ঠিক বুঝা যাচ্ছে না লাশটির গায়ের রং সাদা না কালো। বীভৎস বিকৃত লাশটি কার এ নিয়ে মৃদু কোলাহল ক্রমে হৈচৈ এ রূপ নিতে থাকে। সকাল সকাল হাটগামি লোকদের গবেষণা দিনের তাড়াকে স্থগিত করে রাখে কিছুক্ষণের জন্য। কেউ পকেট হাতড়ায় মোবাইলের খোঁজে, থানায় না হোক নেহাৎ চেয়ারম্যানের কানে তো খবরখানা পৌঁছানো উচিত। নদীতে ভেসে আসা বেওয়ারিশ লাশ, না জানি পিছনের কেইসটা কী? আত্মহত্যা না হত্যা। তারা আবার সভয়ে মোবাইলখানা পকেটে রেখে দেয়। অতি সক্রিয় আর সচেতন চেতনা সাবধান করে তাদের। থাকুক, কে আবার আগে ফোন করে বিপদ ডেকে আনে! কার লাশ, কিসের মরা, কেমনে এখানে এই নদীতে এসে ভিড়েছে কেউ যেমন জানে না, না জানাই ভালো। জানতে চাওয়ার সাথে যদি বিপদও ঘাড়ে আসে! উত্তুরে বাতাসের সাথে একটা উৎকট গন্ধ নাকে ঝাপটা দিলে পানঅলা, মাছঅলা আর সবজি অলা তাড়াতাড়ি তাদের ঝাঁপিগুলো মাথায় তুলে হাটমুখি হাঁটা দেয়। কারো ঘরে শাশুড়ি বঊয়ে ঝগড়া লাগলে সে খবর হাটে বসে পাওয়া যায় আর এতো জলজ্যান্ত একটা লাশ। কার লাশ, কিসের লাশ, হিন্দুর লাশ নাকি মুসলমানের, হত্যার নাকি আত্মহত্যার হাটে বসে নিশ্চিন্তেই খবর পৌঁছে যাবে কানে। প্রাথমিক দেখার কৌতূহল নিবৃত্তির পর শুধু শুধু এখানে সময় নষ্ট করার মানে হয় না।

(২)

দুলাল আর দুলালের বউ পায়ে কাঁনতে কাঁনতে ঝাঁপিয়ে পড়লে হরমুজ মহাজন থানা পুলিশের পরিকল্পনা থেকে সরে আসে। মাছি মারতে কামান দাগিয়ে লাভ কী! নেহাৎ দরিদ্র কর্মচারী দুলাল। সালিশ-বৈঠকেই সুদে আসলে আদায় করে নেয়া যাবে। বেচারা! কোন আমলে কাকা মুক্তিযুদ্ধ করেছিল, তার আবার বীরপ্রতীক খেতাবও আছে। হরমুজ মহাজনের কানে এসেছে কাকার পরিচয়টা নিয়ে শহরের দুচার দরজায় সাহায্যের জন্যও হেঁটেছে সে। বড় দলে বড় নেতা আর টাকাওলা আত্মীয় হলেও এ যুগে গরিবরে কেউ পুঁছে না, আর তোর তো কোথাও কেউ নেই, এক মরে ভূত হয়ে যাওয়া কাকা ছাড়া! তার নামে কে দাঁড়াবে তোর পাশে!
শনিবার বাজারের সাপ্তাহিক বন্ধ। ঐদিনই নিজ দোকানে সালিশের আয়োজন করে হরমুজ মহাজন, সালিশের আনুষঙ্গিক পান সুপারি জর্দা আর জিলাপিও তৈরি রাখে সময়মতো।
হরমুজ মহাজনের এরচেয়ে বেশি কিছু ভাবার দরকার নেই। এই যেমন পক্ষ-বিপক্ষ, সাক্ষী-প্রমাণ, হাদিয়া ইত্যাদি সালিশের আবশ্যিক বিষয়গুলো নিয়ে বিশেষ ভাবনাগুলো অবস্থানগত কারণেই তার ভাবতে হয় না। এই চৌধুরীবাজারে একমাত্র হজ্ব করা হাজী সে। সবার সমীহ আর সম্ভ্রমের মানুষ। সবাই নানা সালিশ বিচার ফতোয়ার প্রয়োজনে তার কাছেই আসে। আজ সালিশে যারা আসবে বলা যায় সবাই তার পকেটের মানুষ। আজ তার নিজের প্রয়োজনে দোষ নির্দোষ বিবেচনায় সবাই যে চোখ বন্ধ করে তার পক্ষেই কথা বলবে এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হয়েই সালিশ ডেকেছে সে।
সন্ধ্যায় সব পরিকল্পনা মতোই ঘটে। সালিশে উপস্থিত মুরুব্বিরা হরমুজ মহাজনের দাওয়াত পেয়ে বর্তে গেছে। বালানি মাজন সাব’ বলে পান খাওয়া দাঁত বের করে সালাম আদাব দিয়ে স্ব স্ব আসন গ্রহণ করতে করতে তাদের বিগলিত হাসি বন্ধ করতে বেশ কয়েক মিনিট পার হয়ে যায়।
সালিশের অপরপক্ষ দুলাল আর তার ক্রন্দনরত বউয়ের দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না।
দুলাল কিংবা তার বউ সেটা আশাও করে না। ভিটার মাটিটুকু বাঁচানো আর থানা পুলিশ থেকে বাঁচা এই দুই প্রত্যাশার কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করেই সালিশে হাজির হয়েছে তারা। যে লাখ পাঁচেক টাকার মামলা কোটি টাকার মালিক হরমুজ মহাজন ইচ্ছে করলেই মাফ করে দিতে পারে। পরে না হয় স্বামী-স্ত্রীতে ভিক্ষে করে খাবে। শুধু উপস্থিত টাকাটুকুতো মাফ হোক। মাথা গুঁজার ঠাঁইটুকু হারিয়ে রাস্তায় না নামতে হোক।
কিন্তু উপস্থিত কারোর কাছেই তাদের বাস্তবতা বিবেচিত হয় না, করুণার একখানা শব্দ কিংবা বাণীও তাদের উপর বর্ষিত হয় না। দুই ম্যানেজারের এক ম্যানেজার পলাতক এই দিবালোকের মতো সত্যটা সবাই বেমালুম ভুলে যাবার সুচতুর অভিনয় করে। দুলাল নাকের জল চোখের জলে ভাসতে ভাসতে দুয়েকবার মিনমিন করে বলতে চায়, একবার খায়রুলরে ধইরা আনউইন আফনেরা,পায়ে পড়ি আফনাদের। খায়রুলের আপন চাচাতো ভাই সরকারি যুবসংগঠনের বড় নেতা, বিষয়টা অনুচ্চারিত হয়ে ঝুলে থাকে সালিশী কার্যক্রমের আদ্যোপান্ত। ফলে খায়রুলের প্রসঙ্গের ধারেকাছে কেউ যায় না। দুলালের মিহি করুণ অনুচ্চ কান্না সুবিচারের ডামাডোলে সামান্য চিড়ও ধরাতে পারে না। আত্মপক্ষ সমর্থনের সামান্যতম সুযোগও ফাঁক ফোঁকড় গলে কোনো তরঙ্গ জাগাতে পারে না সালিশ বৈঠকে।
বাজারদরের বিবেচনায় ভিটেবাড়িখানা হরমুজের নামে লিখে দেয়ার শর্তে সালিশের শান্তিপূর্ণ সমাপ্তি ঘটে এশার নামাজের আগে আগেই। পূর্বপরিকল্পনা মতোই পাঁচ লাখ টাকার সুদ আসল আর বাড়ির বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় সমানে সমানে প্রমাণ করতে সমর্থ হয় উপস্থিত সালিশকারীরা।
দিনকয় ধরে কালিগাছতলার মোমবাতি আগরবাতির মানত ভেস্তে যাওয়ার দুঃখ আর মাথা গুঁজার ঠাইঁটুকুও হারানোর বেদনায় নীল দুজন, দুলাল আর দুলালের বউ রাস্তায় নামে। দুলালের তখন হিসাবে আসে না সত্যিকারের বিষ খেলে কতোটা নীল হয় মরদের শরীর। মদ-জুয়ার বদভ্যাস টুকটাক আছে বটে দুলালের। এরজন্য সুদে কিস্তিতে ঋণও অঢেল। মাসের বেতন পেয়ে তার জোগান দিতে গিয়ে পেটের ভাতের জোগান হয় না। তাই বলে হরমুজ মহাজনের মতো প্রতাপশালী ব্যবসায়ীর ক্যাশবাক্সে হাত দেয়ার মতো পুরু কলিজা তার নয়। এ সত্য যেমন হরমুজ মহাজন জানে, তেমনি জানে সালিশের মুরুব্বিয়ান রা। আর জানতো একজন দুলালের সহকর্মী অপর ম্যানেজার খায়রুল। খায়রুল খুব ভালো করে জানতো, কাকা যত বেপরোয়া যোদ্ধা হোক না কেন, এই দুলাল কারণে অকারণে পলায়নপর পাঁচজন হিন্দুর মতোই নিরীহ হিন্দু ছাড়া কিছুই নয়। এর সাহসের দৌড় বড়জোর জুয়া আর মদের পাট্টা পর্যন্তই।
আর জানতো বলেই সুযোগটা নেয়া তার পক্ষে সহজ হয়েছে। খায়রুল দুলালের মদ-জুয়ার আসক্তির বিষয়টা মহাজনের সামনে পুনঃপুন উত্থাপন করেছে চতুরতায়। যেনো বা মহাজনের জন্য চিন্তার অন্ত নেই তার, এভাবেই সাবধান করছে তাকে, অন্যদিকে আখের গুছিয়েছে পরিকল্পনা মতো। তারপর সটকে পড়েছে সুবিধা বুঝেই।
বিষয়গুলো দিবালোকের মতো স্পষ্ট হলেও সালিশে উপস্থিত সকলেই যেন দিনকানা হয়ে যায়। পক্ষে দাঁড়ানোর মতো প্রভাব প্রতিপত্তিশীল কেউ না থাকলে এমন দিনকানা বিচার হয় এতে অবাক হবার কী আছে?
ঘরে ফিরে একমাত্র বংশধর সজল দাসের গলা জড়িয়ে ধরে মরাকান্না শুরু করে দুলালের বউ। বিলাপ করে, তর বাপের কাকায় দেশের লাগি জান দিছে। একনামে হক্কলে চিনে তারে। ইদিনঅর লাগি নি জান দিছিলঅ!! তার বংশের বাত্তি সর্বস্ব খুইয়া ভিক্ষা করত! অ বাপ সজল! অহন আ¤্রা কিতা করমুরে বাপ!
দুলালের পেটে তীব্র খিদে,সালিশে বসে থেকে সারাদিন কিচ্ছু খাওয়া হয়নি আজ। ক্ষুন্নিবৃত্তির আবশ্যিক ডাক, কিন্তু ইচ্ছে আর প্রয়োজন বিপরীতমুখী। তীব্র ক্ষিদেতেও খাওয়ার ইচ্ছে জাগে না। সামনে অনন্ত অন্ধকারের ভবিষ্যৎ। স্ত্রীর অসহনীয় বিলাপ। দুর্বিষহ এই মৃত্যুপুরী, সত্যি কাল থেকে পথের ভিখারি সে। এর চেয়ে মৃত্যু ভালো। কী হবে স্ত্রীর, কী হবে একমাত্র বংশধরের...দূর শালা থাকুক সব। আগে তো নিজে মরে বাঁচুক।

(৩)

রাধারানি জমে যাওয়া নারকেল তেলের শিশিটা রোদের আঁচে গলতে দেয়। মাথাভর্তি উকুন পাঞ্জাবির মতো বিরামহীন আক্রমণ করে চলে দিনভর। শান্তিতে দুদ- বসবার জো নেই। গলা তেল নিয়ে পড়ন্ত শীতের বেলায় রোদে চিরুনি নিয়ে বসতেই মা গলা খ্যাঁকরি দিয়ে উঠে. তাইর শইরল রং লাগছে, তেল হাবান দিয়া হাজন বইছে। মাইজ্ঞো মাই, মাগীর ডর ভয় নাই, হাইঞ্জাকালও নদীর কান্দাত মাগী হাজাত বইছে। মাগীর ভাতার আইব...।
মায়ের ইশারা কোনদিকে রাধারানি বুঝে। আশেপাশের গ্রামগুলোতে দাউদাউ আগুন, নিত্য রাতে আগুন, ঠাস ঠাস অবিশ্রান্ত গুলির আওয়াজ। প্রতিদিন গ্রামের পর গ্রাম বিরান হবার খবর। পাহাড়পুর, মাকালকান্দি, নজিপুর...বিরান হচ্ছে ভাটি। বর্ষার জলে উজান থেকে প্রতিদিন ভেসে আসছে লাশের সারি...নারী, পুরুষ, শিশু...গরু...ছাগল...। মাঝে মাঝে পচা লাশের বিকট দুর্গন্ধ উঠান পেরিয়ে এসে ঘরে বিছিয়ে রাখা চাটাইয়েও ঘাপটি মেরে বসে থাকে যেনো। প্রথমদিকটায় লাশ দেখলেই ভয়ে পালাতো সবাই, এখন দেখতে দেখতে অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। কখনো মাছে খুবলে খাওয়া নিষ্প্রাণ কোনো মানুষ ভুল করে বাড়ির ঘাটায় আটকে গেলে কেউ কারো অপেক্ষা করে না, যে আগে দেখে সেই লাঠি দিয়ে ঠেলে ভাসিয়ে দেয়। আজ কয়মাস গ্রামের মানুষ কেউ মাছ খায় না।
তবু এরই মাঝে সবাই এক দুঃসাহসী নাম জপে গ্রামবাসী কৃষ্ণ নামের মতো। অশরীরী এক ত্রাস যেন সে। কোথা থেকে উড়ে এসে উড়িয়ে দেয় শত্রুর আবাস।
নামটা কানে আসে তার। শ্যাম, তার প্রাণের শ্যাম। কৃষ্ণেরই তো অন্য নাম শ্যাম। হাওরের জলে পাঞ্জাবিদের ত্রাস জগৎজ্যোতি দাস। তার দাসপার্টি নিয়ে ভাটি এলাকা মোটামুটি শত্রুমুক্ত রাখার আপ্রাণ লড়াই করছে সে। রাতে সোনাকাকা হারানকাকাদের গল্প শুনে রাধারানি, পাঞ্জাবিরা তার মাথার দাম হাঁকিয়েছে লাখ টাকা। নিবু নিবু কুপির শিখায় মোটা চাটাইয়ে শুয়ে ঘুম আসে না রাধারানির। এ মানুষটা তার, একান্তই তার। ভাবনাটার আপাদমস্তক শিহরন তাকে সারারাত ঘুমাতে দেয় না।
শেখ সাব যেদিন ভাষণ দিল ঢাকায়, পরদিন ঢাকা থেকে ফেরার পথে দেখা দিয়ে গিয়েছিল সে। ক্ষেতের আল ধরে ফিরতে ফিরতে বলে গিয়েছিল, দেশ স্বাধীন করে তার কাছেই ফিরে আসবে। রাধাই যে শ্যামের ঠিকানা...।
রাধারানি বৌদির কাছে শুনতো বটে ভাইয়ের গল্প, সুনামগঞ্জ কলেজে ভাই তার মিছিল মিটিং করে। বড় নেতা। কিন্তু আজ যে কান পাতলেই শুনে জামালগঞ্জে পাঞ্জাবির নাও ডুবিয়ে দিয়েছে, শাহজীবাজারে কারেন্টের স্টেশন উড়িয়ে দিয়েছে, বানিয়াচং থানায় চল্লিশজন পাঞ্জাবিরে ব্রাশ ফায়ার করেছে, এ যে তার শ্যাম বিশ্বাসই হতে চায় না।
ঠিক দুপুরে হাঁফাতে হাঁফাতে বাড়িতে ঢুকে গোগ্রাসে ভাত খেয়ে হাওরের জলে হাত ধুয়ে যে সুযোগ খুঁজতো রাধারানির আঁচলে মুছবে বলে। সেই শ্যাম? নিজের শ্রবণেন্দ্রিয়কে অবিশ্বাস হয় কখনো, কখনো বা শংকাও গ্রাস করে বৈশাখে ঈশান কোণে জমা মেঘের মতো, মানুষটা ফিরবে তো? সত্যি ফিরবে তো বেঁচে?
তার ভরসাতেই না আশপাশের পাঁচ গ্রামের মানুষগুলো গ্রামেই রয়ে গেছে। কিন্তু যে অবস্থা! পানি কমে যতোই চর জাগছে ততোই রাজাকাররা পথ চিনিয়ে নিয়ে আসছে পাঞ্জাবিদের। কৃষ্ণপুর, নজিপুর গ্রামগুলোতে নির্বিচারে মানুষ মেরে রেখে গেছে পাঞ্জাবিরা। শ্যাম আর তার দাসপার্টি তাদের সাথে পেরে উঠবে তো শেষ পর্যন্ত?
আজ এই চারদিকে যে অলৌকিক ত্রাণকর্তার মতো কেবল জগৎজ্যোতি আর দাসপার্টির রূপকথা এ তো তার শ্যাম, তারই শ্যাম...। রাধার শ্যাম। ফিরবে তো সে? তার জন্য যে অপেক্ষার দিন ফুরায় না আর।

(৪)

খাওয়া শেষ করে বুড়ি বায়না ধরে ভেসে আসা লাশখানা দেখবে। মহামুশকিল তো! ঠিকমতো হাঁটতে পারে না, কে নিয়ে যায় বুড়িকে নদীর ঘাট অব্দি? নিজেরও মনে মনে যে অদম্য কৌতূহল উঁকি দেয় না তা নয়। শাশুড়ির উছিলায় একবার দেখে আসলে হয়, না জানি কোন মায়ের পুলা কিংবা কোন স্ত্রীর স্বামী এমন বেঘোরে পড়ে আছে নদী ভেড়ামোহনার পাড় ঘেঁষে। আহারে পরিবারের লোকজন
কতই জানি খুঁজতেছে তাকে!
ততক্ষণে থানা পুলিশ চেয়ারম্যান মেম্বার সব জমে গেছে। উৎসুক মানুষের ভিড়ও পাতলা হয়ে গেছে, রোদ উঠলে যেমন পাতলা হয় কুয়াশার আস্তরণ। ললিতারানি ভাবে এই ফাঁকে একবার দেখে এলে মন্দ হয় না। জামাই কিছু বললে শাশুড়ির দোহাই দিলেই চলবে। শাশুড়ির প্যানপ্যানানিও বাড়তে থাকে, অ বউ চল না বেডি একবার আমারে লগে লইয়া, একনজর দেইখ্যা লই। এই ভেড়ামোহনায় একটা লাশ আইবার কথা বেডি, বিশ্বাস কর, আমি এরে চিনি। চলছ না বেডি একবার। ললিতা রানি চমকে উঠে, কিতা কইন আপনে? মাথামুথা গেছে নি এক্কেবারে। পুলিশে হুনলে আপ্নের গুষ্ঠিশুদ্ধা বাইন্ধা নিব। বুড়ি ক্ষনিক হকচকিয়ে যায়,তারপর বলে, আইচ্ছা আমি কইতাম না আমি চিনি, একবার লইয়া ল, অ বেডি।
ললিতা রানি মূলত নিজের কৌতূহলও নিবৃত্ত করতে পারে না, তবু কণ্ঠে অনিচ্ছার সুর ফুটিয়ে বলে, চলঅইন। ললিতারানি শুনেছে, যুদ্ধের পরের বছর যখন তার শশুরের সাথে তার শাশুড়ির বিয়ে হয় তখন শশুর প্রচুর জোত জমির মালিক। সারাদিন খেত-খামারেই পড়ে থাকতেন। আর বউয়ের আচরণে গ্রামের সবাই বলাবলি করত, নয়া বউয়ের উপরি দোষ। কী ভরদুপুর কী মধ্যরাত তার শাশুড়ি গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো ভেড়ামোহনার তীরে, লাজ-লজ্জা, ভয়-ডর কিচ্ছুর বালাই নেই! পুলা জন্ম নেয়ার পর ঘরে মন ফিরেছিল শাশুড়ির। আজ এতোবছর পর কী সেই বাতিক আবার চিলিক দিয়েছে বুড়ির? মনে মনে বলে, বেডির যেমন শখ তেমন হুঁশ, একবার কয় চিনে আবার কয় পুলিশের ধারে কমুনা।
বীভৎস বিকৃত মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত থমকে থাকে বুড়ি। খুবলে খাওয়া চোখ, ঝুলেপড়া, খুলেপড়া ঠোঁট ঠেলে বের হয়ে আসা দাঁতের পাটি, কিচ্ছুতে চেনার উপায় নেই লোকটি কে। লাঠি ভর দিয়ে বসে পড়ে পাশে। উৎকট পচা গন্ধ তার নাকে যেন লাগেই না এভাবে পরম মমতায় হাত বাড়াতে চায় সে লাশটির মাথার দিকে।
ঠিক তখন একটি ভ্যান এসে দাঁড়ায় লাশের পা ঘেঁষে, পুলিশ বাঁশি বাজায়, সরেন সরেন। হাতের লাঠি দিয়ে বাড়ি দিয়ে টুকটাক জটলা সরাতে সরাতে বুড়ির কাছে এসে সামলে নেয়,উডেন উডেন-বলে ইশারায় ভ্যান গাড়িটিকে এগুতে বলে। লাশ সদরের মর্গে যাবে।
ললিতা শাশুড়ির হাত ধরে টানতে টানতে বাড়ির পথ ধরে, শাশুড়ি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দুই পা আগায় আর পিছনে তাকায়, আমি ত এরে চিনি, অ বউমা এক্কেরে টিক হেই চুল, এক্কেরে...। মাত্র দুই কুড়ি বছরে ভুইল্লা যামুগা? অ বউমা......।

(৫)

২৭ নভেম্বর ১৯৭১, মৃতদেহ ঘিরে বিকৃত উল্লাসের পর বীর যোদ্ধা শহিদ জগৎজ্যোতির ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ ভেড়ামোহনায় ছুঁড়ে ফেলে দেয় রাজাকার আলবদর বাহিনী।
স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর আবার নদী ভেড়ামোহনায় ভেসে উঠে যে অজ্ঞাতনামা বিকৃত মৃতদেহ, তা জগৎজ্যোতির উত্তরাধিকারী দুলাল চন্দ্র দাসের। মর্গে পোস্টমর্টেমের পর স্থানীয় পত্রিকায় ছবি দেখে লাশ শনাক্ত করেন তার স্ত্রী।
[বি.দ্র. সহৃদয় পাঠক, স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসাবে এ আমার ব্যক্তিগত দায় এটুকু জানানো যে, সালিশের রায়টুকু পর্যন্ত লেখক জ্ঞাত আর বাকিটা কাল্পনিক।]