শনিবার,২৩ মার্চ ২০১৯
হোম / বিশেষ সংবাদ / একজন শাহনাজ ও আজকের বাংলাদেশ
০৩/০৩/২০১৯

একজন শাহনাজ ও আজকের বাংলাদেশ

-

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অল্প সময়ের জন্যও ভিজিট করে থাকেন তারাও নিশ্চয় উবার চালক শাহনাজের কথা শুনেছেন। নারী এই বাইকারের জীবন সংগ্রাম দেশের মানুষদের যেমন উজ্জীবিত করেছে তেমনি তার বাইক চুরির ঘটনায় সবাই যেভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন তাতে বলাই যায়- নারীর জন্য প্রতিকূল এই সমাজে কিছুটা হলেও আশার আলোর ছটা দেখা যাচ্ছে।

শাহনাজের এগিয়ে চলা
ফেসবুকে জনৈক ব্যক্তি তার উবার রাইডের অভিজ্ঞতা শেয়ার করছিলেন। আপাততদৃষ্টিতে তা সাধারণ কোনো ঘটনার বর্ণনা বলে মনে হলেও ফেসবুকের বিশাল জগতে তা রীতিমতো ভাইরাল হয়ে যায়। এর মূল কারণ, ভেসপা চালিয়ে সেদিন রাইডটা কমপ্লিট করেছিলেন শাহনাজ নামের এক নারী। না, একজন নারী মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন এটাকে মাহাত্ম্যপূর্ণ করাটা এখানে মূল উদ্দ্যেশ্য নয়, তার বিন্দুমাত্র প্রয়াসও করছি না। তবে আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় একজন নারী সকাল থেকে মধ্যরাত মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন এমন ঘটনা যথেষ্ট ব্যতিক্রম ও সাহসী তো বটেই।

তবে শাহনাজের এই সাহসের গল্প কিন্তু মোটরসাইকেল চালানোতে সীমাবদ্ধ না। এর পেছনে রয়েছে বেশ কমন কিছু ঘটনা, স্বামীর স্বেচ্ছাচারিতা এবং নারীকে অসহায়ত্বের শেকলে বেঁধে ফেলার প্রয়াস। শাহনাজ স্বামী পরিত্যক্তা নারী। ঐ মানুষটি অন্য আরেকজনকে যখন বিয়ে করলেন, দুই কন্যা সন্তান নিয়ে শাহনাজ তখন একেবারে অকূল পাথারে। এমন অবস্থায় দুই কন্যাকে নিয়ে ঢাকার মতো ব্যয়বহুল একটা স্থানে কীভাবে কী করবেন তা ভেবে অনেকেরই হয়তো জীবন থেমে যেত। কিন্তু শাহনাজ থেমে যাননি, বরং মোটরসাইকেলের চাকায় বেছে নিয়ছেন জীবনের নতুন গতি। শাহনাজের ভাষায়- “আমাকে তো রোজগার করতেই হবে। আমার দুইটা মেয়ে আছে, ওদের পড়াশোনা করিয়ে মানুষ করতে হবে!”
সততা ও সম্মানকে জীবনের মূল পুঁজি ভেবে চলা এই নারী সব প্রতিকূলতা পাশে ঠেলে কাজ করে যাচ্ছেন নিজের দুই সন্তানের জন্য। অনেক প্যাসেঞ্জার কেবলমাত্র মেয়ে হওয়ার জন্য তার বাইকে বসতে চান না, অনেকে আবার পিক-আপ পয়েন্টে আসার পর রাইড ক্যান্সেল করে দেন। শাহনাজ তাতে দমে যান না। এ সমাজে অনেকের মেল ইগো মেনে নিয়েই চলছে অনিঃশেষ অনুপ্রেরণাদায়ী এই নারীর জীবন।

মোটরসাইকেল চুরি ও সমাজের জেগে ওঠা:

স্কুটির চাকায় সংসার চালানো এই নারীর ভাগ্যে হঠাৎ নেমে আসে আরো এক ভয়াল অন্ধকার। রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে এক দুষ্কৃতিকারীর খপ্পরে পড়ে শেষ সম্বল স্কুটিটি হারান শাহনাজ। এরপর শাহনাজের সেই অশ্রুমাখা ছবি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমের সর্বত্র। ফেসবুকের ভাইরাল শব্দটা অনেক সময় অগুরুত্বপূর্ণ জিনিস নির্দেশ করলেও শাহনাজের বেলায় উলটো চিত্র দেখা যায়। দেশের নানাপ্রান্তের মানুষ শেয়ার করেন এই খবর, মুহূর্তের মধ্যেই শাহনাজের বাইক চুরির ঘটনা সংবাদমাধ্যম ও টিভির পর্দায় চলে আসে। এরই প্রেক্ষিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেয় পুলিশ। পুলিশের প্রচেষ্টায় অল্প কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই স্কুটিটি উদ্ধার করে শাহনাজের হাতে ফিরিয়ে দেয়া হয়।
জনগণ ও পুলিশ বাহিনীর সার্বিক সহায়তার নির্দেশ করে- নারীর সঙ্গে করা অন্যায় প্রতিবার অগ্রাহ্য করা হবে না। মাত্র অল্প সময়ের মধ্যে শাহনাজকে সহায়তা করার জন্য যে পরিমাণ মানুষ যোগাযোগ করেছেন তাতে নারীর প্রতি সহিষ্ণু আচরণের প্রমাণ মিলেছে। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি উবার, ব্র্যাক-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো শাহনাজের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। উবারের পক্ষ থেকে শাহনাজের মেয়েদের এক বছরের বৃত্তি দেয়া হচ্ছে, নিজেদের খরচে শাহনাজকে গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ দিয়েছে ব্র্যাক। এবার তাই স্থায়ী একটা চাকরির স্বপ্ন দেখছেন শাহনাজ। তার স্বপ্ন সফল হোক, নারীর কাজের ক্ষেত্র তৈরিতে এভাবেই এগিয়ে আসুক সর্বস্তরের মানুষ।

-নাইব রিদোয়ান
ছবি : ডেইলি স্টার, ঢাকা ট্রিবিউন