শুক্রবার,১৯ Jul ২০১৯
হোম / ফিচার / দেশে নারীর অগ্রগতি ও সাম্প্রতিক অবস্থা
০৩/০৩/২০১৯

দেশে নারীর অগ্রগতি ও সাম্প্রতিক অবস্থা

-

বরাবরের মতো এবারো ৮ মার্চ বিশ্বজুড়ে পালিত হবে আন্তর্জাতিক নারীদিবস। বিশ্বের নানাপ্রান্তে নারীর প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানো এবং সামাজিক, রাজনৈতিক ও আর্থিকভাবে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে আয়োজিত এই দিবসটি আমাদের দেশেও সমান মাহাত্ম্য নির্দেশ করে। তবে শুধুমাত্র উদযাপনের জন্য নয়, দিনটির সঠিক মাহাত্ম্য অন্তর্নিহিত থাকে একটি দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর সামগ্রিক অবস্থার ওপর। স্বাধীনতার পঞ্চম দশকে অবস্থান করা বাংলাদেশের ভিন্ন ভিন্ন খাতে নারীর অবস্থান নিরূপণের প্রয়াস থাকছে আজ।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ:

কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে নারীর অবস্থান নিরুপণ করার জন্য ভালো, মন্দ দুটি দিক বিবেচনা করার বিকল্প নেই। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ সম্পর্কে বলতে গেলে শুরুর দিকে ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে বলাটাই শ্রেয়।

কর্মক্ষেত্র : কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের হার আগের তুলনায় বেড়েছে। গেল বছরের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৫ কোটি ৪১ লাখ কর্মজীবী মানুষ রয়েছেন, যাদের মধ্যে ১ কোটি ৬২ লাখ নারী। আশার কথা হলো, সংখ্যাটা দিনে দিনে বাড়ছে। সামরিক বাহিনীতে চাকরি, রিটেইল সেলস, ড্রাইভিংসহ কর্পোরেট দুনিয়ার চ্যালেঞ্জিং জবগুলোতে নারীর অংশগ্রহণ দিনে দিনে বাড়ছে।
অর্থনীতি : দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হচ্ছে পোশাকশিল্প। আর এই শিল্পে কাজ করছেন এমন ব্যক্তিদের মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগই নারী। এছাড়া অর্থনীতির অন্যতম আরেকটি প্রধান ভিত্তি-কৃষিক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ শত বছর ধরে চলে আসছে। এই খাতের প্রধান ২২ টি কাজের ১৭টি নারীই করেন কোনো ধরনের স্বীকৃতি ছাড়াই! এভাবে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে দেশের নারী সমাজ।

শিক্ষা : নারীর শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিতকরণে গত দুই দশকে অনেকটা পথ এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যরোর গত বছরের হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রাথমিকে মোট ছাত্রছাত্রীর মধ্যে প্রায় ৫১ শতাংশ ছাত্রী। মাধ্যমিকে মোট শিক্ষার্থীর ৫৪ শতাংশের বেশি ছাত্রী। এইচএসসিতে ছাত্রীর অংশগ্রহণের হার ৪৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ। তাই বলা চলে, শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে নারী-পুরুষের সমতা প্রায় প্রতিষ্ঠার পথে।
উদ্যোগ ও উদ্যোক্তা : দেশে বর্তমানে প্রায় ১৭ হাজার নারী উদ্যোক্তা রয়েছেন যারা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে কাজ করে চলেছেন। একটা সময় নারী উদ্যোক্তা বলতেই মূলত কুটির শিল্পপ্রধান কাজের উদাহরণ এলেও বর্তমানে ভিন্ন ভিন্ন খাতে নারীর অংশগ্রহণ বেশ বেড়েছে।

পারিবারিক জীবন : দেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের একক হচ্ছে পরিবার। সেই পারিবারিক জীবনে কন্যা, পুত্রবধূ, জননী ইত্যাদি ভূমিকায় নারী যে পরিমাণ অবদান রাখছেন তার আর্থিক মান জানলে চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর একটি গবেষণা মতে, পরিবারে নারী নীরবে যে কাজ করেন তার অর্থমূল্য প্রায় ১০ লাখ ৩৭ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা, যা দেশের মোট জিডিপির ৭০ শতাংশেরও বেশি!

বিদ্যমান সমস্যা:

ইতিবাচক নানাদিক নিয়ে কিঞ্চিৎ আলোচনা তো হলো। তবে পূর্ণাঙ্গ চিত্রটা তখনই সামনে আসবে যখন বিদ্যমান সমস্যার ওপরেও সমান জোর দেয়া হবে। পশ্চাৎপদ সমাজ ব্যবস্থা থেকে ধীরে ধীরে উঠে আসার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ, আর সে পথে অন্যতম প্রধান বাধা হচ্ছে নারীর প্রতি বিদ্যমান বৈষম্য ও অন্যায় যা থেকে মুক্ত হতে না পারলে সার্বিকভাবে উন্নতির গ্রাফটা তলানিতেই থেকে যাবে। বর্তমানে প্রকট এমন কয়েকটি সমস্যা সম্পর্কে জানা যাক এবার।

নারীর অংশগ্রহণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে নিরাপত্তার অভাব। পুলিশ সদর দপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী গত পাঁচ বছরে দেশে ১৯ হাজারেরও বেশি মামলা হয়েছে। ঘরে, বাইরে ও কর্মক্ষেত্রে যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন দেশের অনেক নারী, যা বর্তমানে দেশের প্রধানতম সামাজিক সমস্যা বললেও ভুল বলা হবে না।

বাল্যবিবাহের মতো প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা সমস্যা থেকে এখনো মুক্তি পায়নি দেশের নারীরা। বাল্যবিবাহের পরিমাণ কমতির দিকে থাকলেও এখনো এর হার পঞ্চাশের আশেপাশে যা গোটা জাতির জন্য বারবার অশনিসংকেত নির্দেশ করছে।

এছাড়া যৌতুক, ইভটিজিং, এসিড সন্ত্রাসের মতো ঘটনাগুলো বরাবরের মতোই নারীর চলার পথে বাধা সৃষ্টি করে আসছে যা থেকে পুরোপুরি উত্তরণের পথ এ জাতি এখনো খুঁজে পায়নি।

প্রসঙ্গটা সবার শেষে এলেও মহাগুরুত্বপূর্ণ; আর তা হলো- রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ। দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি পদে নারী রাজনৈতিক থাকলেও সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। ২০০৮ সালে নির্বাচন কমিশন সব স্তরের কমিটিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব অন্তত ৩৩ শতাংশ করতে হবে এমন বিধান দিয়েছিল। তার মেয়াদ ২০২০-এ শেষ হচ্ছে। কিন্তু দেশের বড় বড় দলগুলো সব স্তরে বড়জোর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব আনতে পেরেছেন। একেবারে নেতৃত্বস্থানীয় পদের কথা ধরলে তা আরো কম। রাজনীতিতে কাজের সুযোগ এমন সীমিত হওয়া নিঃসন্দেহে নারীর ক্ষমতায়নের পথে বড় বাধা।

সবমিলিয়ে উন্নতির সূচকে সমাজে নারীর অবস্থা আগের চেয়ে ভালো হলেও এখনো অনেকটা পথ পাড়ি দেওয়া বাকি। নারীকে সবদিক থেকে সমান সুযোগ দিতে হবে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। আর যদি তা সম্ভব হয় তবে এশিয়ার গ-ি পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চের শীর্ষস্থানের দিকে এগোতে পারবে আমাদের বাংলাদেশ।

-নাসিফ রাফসান