শনিবার,২৫ মে ২০১৯
হোম / সাহিত্য-সংস্কৃতি / জাল
০২/১৯/২০১৯

জাল

- আফরোজা পারভীন

মাছ ধরার জালটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়েছিল সেলিম। জালে অনেক মাছ আটকা পড়েছে। কী এক উপায়ে ছোট মাছগুলোকে ফেলে ফেলে বড় বড় দু’চারটে মাছ জালে রাখল হুরমত মিয়া। তারপর টেনে তুলল ওপরে। তুলল তাও বেশ কিছুক্ষণ খেলিয়ে। বড়শি দিয়ে মাছ ধরার সময়ও এমন করে। ওর তখন চোখ চকচক করে। দুটো ছেলে মাছের আপেক্ষায় বসেছিল। তারা ছুটে এল। হুরমত কাউকেই মাছ ধরতে দিল না। দক্ষ হাতে মাছগুলো টপাটপ তুলে বালতিতে চালান করল। পরক্ষণে ছুঁড়ে মারল জাল পুকুরে। বিড় বিড় করে বলল,
: মাছ খেলাতে যে কী আনন্দ !
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দেখল সেলিম । হুরমতের কথাটা ওর মাথায় গেঁথে রইল, মাছ খেলাতে যে কী আনন্দ! যে বিলে মাছ ধরা হচ্ছে ওটা গ্রামের দুইজন বড়লোক মিলে লিজ নিয়েছে। একসময় এ বিল ছিল সবার সম্পত্তি, প্রকৃতির দান। যে যেমন করে পারত মাছ ধরত, খেতো। সেই প্রকৃতির সন্তান কি করে লিজে গেল আর তার আবার একটা লিজ দলিলও হলো জানে না সেলিম। এখন আর ইচ্ছে করলেই কেউ মাছ ধরতে পারে না। এখন এ বিল চলে গেছে হাইব্রিড চাষের আওতায়। বড় বড় মাছ হয়, স্বাদ নেই মোটেও। বাক্সবন্দি হয়ে চলে যায় ঢাকায়, তারপর কোথায় কার পাতে যায়, দেশি না বিদেশি কে জানে।
ওসব নিয়ে বেশি ভাবে না সেলিম। ওর মনে ছেয়ে থাকে জালটা আর হুরমতের কথাটা। ওর কেমন যেন একটা ভাবান্তর হয় জাল দেখলে। জাল দেখার পর সে ভাবান্তর কিছুক্ষণ আনমনা করে রাখে ওকে। কী যেন ভাবায়। মনে মনে বুঝি একটা ছক কাটতে চেষ্টা করে। ছকটা কাটা হয়েও হয়ে ওঠে না। এমন ওর হয় জিলাপি দেখলে, মাকড়সার জাল দেখলে, মানে জড়ানো কিছু দেখলেই ওর মাথায় কী যেন হয়। আজও হলো।
ও বাড়িতে এল। বাবা মায়ের বড় এবং এক ছেলে। বেকার। নি¤œপদস্থ চাকুরে বাবা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন সেলিমকে লেখাপড়া করাতে। সেলিম বিএ পাস করার পর আর পড়েনি। এ নিয়ে বাবার আফসোসের অন্ত নেই। তার সহকর্মির ছেলেমেয়েরা কেউ হয়েছে ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার আর তার ছেলে কীনা এমএটাও পাশ করল না। সেলিমের এই ব্যর্থতাকে পিতা সোলেমান নিজের ব্যর্থতা বলেই মনে করে। যদিও এ ব্যর্থতার জন্য কোনো দায় সে খুঁজে পায় না। তারপরও মনে মনে অপরাধবোধে ভোগে, ছেলেকে নিশ্চয়ই ঠিকমতো শিক্ষা দিতে পারেনি। নইলে এমন হবে কেন?
বাবার এই অপরাধটাবোধটা বোঝে সেলিম। তার কিছুটা সুযোগও সে নেয়। সুযোগ পেলেই বলে,
: খাওয়াতেই নাকী পুষ্টি। কী আর খেয়েছি ছেলেবেলায়! না দুধ না ডিম না ঘি মাখন। আর কোচিং-ওতো করিনি। বিএ যে পাস করেছি সেই তো ঢের।
ছেলের কথার ওপর মুখ চালাতে পারে না বাবা। কথা তো মিথ্যে না। যথাসাধ্য চেষ্টা করেও প্রতিদিন ডিম জোগাড় করতে পারেননি এটা ঠিক। পাঁচজনের সংসার। তাতে বাবা-মাকেও টাকা পাঠাতে হয়েছে তখন নিয়মিত। চেষ্টার তো আর কমতি করেননি। চাকরির পরও ছাত্র পড়িয়েছেন। গভীর রাতে বাড়ি ফিরেছেন। তাতেও ছেলের চাহিদামতো সবকিছু সঙ্কুলান হয়নি।
ছেলেকে মৃদুস্বরে চাকরি খোঁজার কথা বলেন। ছেলে বলে চেষ্টা করছে । মাঝে মাঝেই বলে,‘রেফারেন্স ছাড়া চাকরি হয় না’। সোলেমানের এমন কেউ নেই, যার কাছে চাকরির জন্য বলতে পারেন। তাই ছেলেকে ভয়ে জোর দিয়ে কিছু বলতেও পারেন না।
মেয়ে দুটো টপাটপ বড় হচ্ছে। কারো কোনো বিয়ের জোগাড় নেই। সোলেমান সারাজীবন ঢাকায় চাকরি করলেও সেখানে মাথা গোঁজার ঠাঁই করতে পারেননি। চাকরি থেকে অবসর নিয়ে চলে এসেছেন বাপের পৈতৃক ভিটে ভাওয়ালগড়ের কাছের এই গ্রামে। ভাগ্যিস, এই ভিটেটুকু ছিল। ততদিনে বাবামা মারা গেছেন। দুভাই তাদের ভাগ বুঝে নিয়ে দূরে গিয়ে বাড়ি করেছে। বোনের ভালো বিয়ে হয়েছে, সে আর ভাগ নিতে আসেনি। নিজের ভাগের টিনের ঘর দুটোতেই এসে উঠল সোলেমান। প্রাইভেট চাকরিতে পেনশন সেই। টাকা-পয়সা পেল যৎসামান্য। ওতে আর কদিন চলবে। ঘরে ভাতটা হয় এটুকুই যা বাঁচা। ঘুম আগেই কম হতো, এখন আর মোটেই হয় না। বেকার ছেলে, অনূঢ়া দুটো মেয়ে আর সংসারের চিন্তায় নির্ঘুম জাগেন। পাশের ঘরে ঘুমায় সেলিম। অবশ্য যতক্ষণ সে জেগে থাকে তার কপালে জালের মতো অনেকগুলো চক্রাকার রেখা ঘুরপাক খায়। ও কী ভাবে কে জানে!
সেলিম দেখতে দারুণ! ৫ ফিট ৮ ইঞ্চি লম্বা। টকটকে ফর্সা রং। স্কুল কলেজে নাটক করত। যে-কোনো গলা শুনলেই নকল করতে পারে। বন্ধুদের সাথে কথা বলতে বলতে ওদের গলাতেই কথা বলতে শুরু করত। বন্ধুরা বলত ওর জন্ম হয়েছে নায়ক হবার জন্য। সেটা মনে মনে বিশ্বাস করে ফেলেছিল সেলিম। নিজেকে নায়কই মনে করত। ওসব ছোটখাট কেরানি বা ওই জাতীয় চাকরি করার কথা সে ভাবতেই পারত না। কিন্তু নায়ক তো দূরে চাকরের রোলও ওকে কেউ অফার করল না। এফডিসির ভেতর বাইরে বেশ কিছুদিন ঘুর ঘুর করেছে, দুচারজন পরিচালকের জিনিসপত্র বয়ে দেয়ার চেষ্টাও করেছে। তারপরও কেউ সদয় হয়নি। কেউ বলেনি, একটা রোল করে দাওনা বাবা। অন্তত অডিশন নিয়ে দেখতে তো পারত সে পারে কীনা! এই ইচ্ছের কথা বারবার জানিয়েছেও, কেউ ভ্রƒক্ষেপ করেনি। অথচ দু’একবার ডাবিং-এ আটকে গিয়ে পরিচালকরা বিনাপয়সায় তার গলাটা ব্যবহার করেছে।
দুই বোনের এক ভাই হলে যা হয়, ছেলেবেলা থেকেই বাড়তি আদর পেয়েছে। এমনকি ছোট বোনগুলোও নিজেরা না খাইয়ে তাকে খাইয়েছে। সেলিমও ধরে নিয়েছে এর পুরোটাই তার প্রাপ্য। ওর দামি সিগারেট খেতে ইচ্ছে করে, পারে না। বড় রেস্টুরেন্টে যেতে ইচ্ছে হয়, রাত জেগে কনসার্ট দেখতে ইচ্ছে করে, পারে না। কোনো ইচ্ছেই ওর পূর্ণ হয় না। নায়ক হতে চেয়েছিল, নিদেনপক্ষে অভিনেতা, সেটাও হলো না। বারবার ওকে ফিরে আসতে হয় হলদিতলি গ্রামে। কচুশাক, ডাটাশাকের সাথে বাড়তি একটা ডিমের ব্যবস্থা করতে মার নাভিশ্বাস হয়। পালের মুরগি যেতে যেতে এখন আর অবশিষ্ট নেই। মার চোখে বিষাদের ছায়া নামে। বাবার মুখের কোমল রেখাগুলো দারিদ্র্যের গ্রাসে বদলে যায়। এখন উনি আর সেলিমের দিকে তাকান না। তাকালে নিশ্চয়ই বিরক্তির চোখে তাকাতেন। কিন্তু পুত্র বেকার হলে, অলসভাবে বসে বসে খেলেও বৃদ্ধ পিতারা বিরক্তি প্রকাশ করার সাহস দেখান না আজকাল। সময় বদলে গেছে।
ঘর থেকে নামলেই বিল। বিল ছাড়া গতি নেই। তাই বার বার বিলের পাড়েই যেতে হয়। আজও যায় সেলিম। ম্ছা ধরা চলছে। অনেকগুলো জাল আজ। জালগুলো ওর চোখের সামনে খলবলিয়ে ওঠে। জালের প্যাঁচগুলো ও দেখতে থাকে একমনে। রোদ তেতে ওঠে। ঘরে ফেরে। দরজা বন্ধ করে বিছানায় এলিয়ে পড়ে পা লম্বা করে দেয়ালের দিকে তাকায়। দেয়াল বেয়ে উঠছে একটা আরশোলা। জাল ছড়িয়েই যাচ্ছে। অনেকক্ষণ দেখে। তারপর বাম হাতে রিমোটে টিপ দেয়। একের পর এক চ্যানেল ঘুরায়। বিরক্তি, বিরক্তি। টক শো, নির্বাচন, এক্সিডেন্ট, সংলাপ, স্ক্রল স্ক্রল। ছুঁড়ে ফেলে রিমোট। আজকাল দেখার কিছু নেই, করারও কিছু নেই। একটু পর অধৈর্য হয়ে আবারও চ্যানেল ঘুরায়। একটা সিরিয়াল চলছে। একজন হরবোলা পুরুষ। সে রাস্তায় বসে মেয়েলি কণ্ঠে কথা বলে আর গান গেয়ে টাকা রোজগার করছে। ও নির্নিমেষে দেখে, উৎকর্ণ হয়ে শোনে। একসময় শেষ হয় হরবোলার কথা-গান। ততক্ষণে দেয়ালে মাকড়সার জালটা বেশ বড় হয়েছে। সেলিম অনেক অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে সেদিকে।
দুই
আজকাল ঘন ঘন ঢাকায় যায় সেলিম। মাঝে মাঝেই বেশ কিছু দামি জিনিস নিয়ে ঘরে ফেরে। টেবিল ল্যাম্প, দামি ঘড়ি, দামি মোবাইল। একদিন বেশ দামি একটা সিল্ক শাড়ি এনে বোন রিতুকে দেয়। সামনে ঈদ। রিতু ভাবে, ভাই বুঝি ঈদের উপহার এনেছে।
ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে খুশি মুখে বলে,
: বাহ সিল্কের শাড়ি, মেরুন কালারের, খুব দামি। কিন্তু ইতুরটা কই?
এ সম্ভাবনার কথা মনে আসেনি সেলিমের। কি বলবে প্রথমে বুঝে ওঠে না। তারপর বলে,
: পরের ঈদে দেব।
ইতুর মুখটা মলিন হয়ে যায়। চোখে পানি হানা মারতে চায় । রিতু শাড়িটা ওর হাতে দিয়ে বলে,
: থাক থাক অসুবিধা নেই, দুজনে ভাগাভাগি করে পড়ব।
সে ঈদে দুবোনের কেউ শাড়িটা পরে না। শাড়িটা পড়ে থাকে। মা একদিন বিড়বিড় করে বলেন,
: দামি টেবিল ল্যাম্প, ঘড়ি, মোবাইল কোথায় পায়। চাকরি পেলে তো রোজ যেতো। তাও তো যায় না। এসব না এনে বাজার সদাই আনলে তো বাপের কষ্ট বাঁচে!
বিড় বিড় করেই বলে মা। ছেলেকে বলার সাহস হয় না। আজকাল কীসের থেকে কী যে হয়! এই তো কিছুদিন আগে মায়ের আত্মীয়ের এক ছেলে বাপের ওপরে রাগ করে আত্মহত্যা করেছে। ওরা মনে করে আত্মহত্যা করলেই সমাধান হয়। তাছাড়া আজকাল বাপ-মা নয়, ছেলেমেয়ে কথা শুনায়। ছেলের কড়া কড়া কথা শোনার শারীরিক মানসিক কোনো সামর্থ্যই এখন আর নেই। তাছাড়া ছেলেকে কিছু বললে তার দ্বিগুণ কষ্ট নিজের বুকে বাজে। কী বলবে ওকে!

ছেলে ঘরেই বেশি থাকে। দোর বন্ধ করে বেশিরভাগ সময় মোবাইলে কথা বলে। এত কথা কার সাথে বলে ? এত কথা বলার টাকা কোথায় পায় এ প্রশ্ন বারবার মা বোনের মনে উঁকি দেয়। প্রশ্ন করার সাহস হয় না। খাবার সময় ভয়ে ভয়ে দরজায় টোকা দেয়। কখনও জবাব দেয়, কখনও দেয় না। ওর খাওয়া না হওয়া পর্যন্ত মা রিতু ইতুর খাওয়া হয় না। খাবারে মাঝে মাঝেই টান পড়ে। আগে সেলিম ভরপেট খাবে তারপর যা থাকে খাবে ওরা এমনই যেন অলিখিত নিয়ম। যেদিন ফোনে কথা বলতে বলতে রাত দুটো তিনেটেয় খায় সেদিন রিতু ইতু না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। মা খায় কীনা জানতে পারে না ওরা। না থাকা ঘরের অনেকগুলো ভাত তরকারি নষ্ট হয়। ঘরে ভাতের চাল আছে, কিন্তু পর্যাপ্ত তো নয়। ভাতগুলো ফেলা যাবে না তাই তিন চার ধোয়া দিয়ে সকালে পান্তা খায় ইতু রিতু। তরকারির উচ্ছিষ্টাংশ থেকে গন্ধ বেরিয়ে গেছে বলে ফেলে দিতে দিতে ওরা চোখের জল ফেলে। আহা ্এক টুকরো মাছ ছিল। মাছখানা দুবোন ভেঙে খেতে পারত!
দিন গড়িয়ে যায়। যেদিনই শহরে যায় সেদিনই নতুন নতুন জিনিস হাতে ফেরে সেলিম। ওর ঘর ভরে যেতে থাকে দামি জিনিসে। মাঝে মাঝে তার দু চারখানা বিক্রিও করে বুঝতে পারেন মা। ভয় লাগে। একদিন মা সাহস করে বলেন,
: এসব জিনিস কোথায় পাস?
ছেলে চোখ কুঁচকে তাকায়।
: কেন কিনি?
: টাকা পাস কোথায় ?
: কামাই করি
: কীভাবে ?
: অত প্রশ্ন করছ কেন, ব্যবসা করি । গলা চড়ে।
তারপরও সাহস করেন মা,
: কীসের ব্যবসা?
: আশ্চর্য সমানে প্রশ্ন করে যাচ্ছ, ঠিক আছে আর আনবো না কিছু। আনলেও দোষ না আনলেও দোষ। অদ্ভুত!
কবে না আনার জন্য দোষ ধরেছেন মনে করতে পারেন না মা। ছেলের ধমক খেয়ে ঘাবড়ে যান। কি বলবেন বুঝে উঠতে পারেন না। তিনি ছেলেকে বলতে চেয়েছিলেন,
: ব্যবসা যদি করিস বাবা এভাবে এটা সেটা না এনে মাস মাস কিছু টাকা দিস বাবার হাতে। তাতে সংসারের সাশ্রয় হবে। বোন দুটোও তো বড় হচ্ছে। কিন্তু কিছুই বলতে পারেন না আর।
একদিন ইতুকে এনে একটা লেডিজ ঘড়ি দেয়, রিতুকে দেয় একটা কসমেটিকস বক্স। এত দামি বক্স দিয়ে কী করে, কীভাবে ব্যবহার করেজানে না রিতু ইতু।
খাবারের সংস্থান করাই এখন কঠিন। মার শাড়িতে তালি পড়ে। চালের টিন ফেটে অঝোর ধারা পড়তে থাকে ভিতরে। মেঝে ভেঙে পলেস্তারা উঠে সিমেন্ট বেরিয়ে যায়। ঘরের বাইরেটা দেখে ভেতরটা বুঝতে কারো অসুবিধা হয় না। পাড়ার মোড়লকে বলে কয়ে সোলেমান রাজি করায়। তার মেয়েকে ইংরেজিটা দেখিয়ে দেবে সেলিম। ওনার হাত দরাজ। ভালো টাকা দেবেন। রাজি হয় না সেলিম। গ্রামে একটা কোচিং সেন্টার গড়ে উঠেছে। সেখানেও বলা-কওয়া করেন সোলেমান, ছেলেটা ঘরে বসে আছে, সংসার চলছে না, একটা কাজ দিন ছেলেকে। ডাক পড়ে সেলিমের। বাপ মা বলেও রাজি করাতে পারেন না। নাক কুঁচকায় সেলিম। মাঝখান দিয়ে বেশি কথা শুনতে হয় সোলেমানকে।
কী এমন ব্যবসা করে সেলিম যে হাতে নগদ টাকা আসে না, খালি উপহার আসে! আর বাইরে যেতে হয় না ঘরে বসেই টেলিফোনে কথা বলতে হয়! বোঝে না মা। ভয়ে স্বামীকে বলে না। মেয়েদের বারণ করে ওদের বাবাকে না জানাতে। উপহার আসতেই থাকে। পারফিউম মোবাইল ওয়ালপেন্টিং আরও নানান কিছু।
তিন
সেদিন হঠাৎ বাড়িতে এসে হাজির হয় সাদা পোশাকে দুজন পুলিশ। ওরা খুঁজতে থাকে সুমনা হক নামের এক মেয়েকে। এই লোকেশন থেকে দুটো ফোনে যে অনর্গল কথা বলে পাঁচজন ছেলের সাথে। তারা সবাই বড়লোকের ছেলে, প্রতিষ্ঠিত, টাকা আছে, গাড়ি আছে, বাড়ি আছে।
ওরা সেলিমদের বাড়িতে আসে। আশপাশের বাড়িগুলোতে যায়। সেলিমের বাবা মা বলেন,
: এখানে সুমনা নামে কোনো মেয়ে নেই। আমাদের দুই মেয়ে ইতু আর রিতু। আর এক ছেলে।
: মেয়েটা দারুণ সুন্দরী, পাঁচফিট আট ইঞ্চি লম্বা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী । অবশ্য ঠিকানা বলেছে সিদ্ধেশ্বরীর। পরে প্রমাণ হলো এটা সিদ্ধেশ্বরী নয় হলদিতলি। পুলিশের একজন বলে।
: আমার মেয়ে দুটিই সুন্দরী। এই তো ওরা। তবে ওরা পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি লম্বা না। আশপাশে এত লম্বা কোনো মেয়ে আছে বলে তো মনে হয় না। অবশ্য আমার ছেলেও খুব লম্বা। কিন্তু সে তো ছেলে।
: ডাকেন তাকে।
সেলিম বেরিয়ে আসে। পুলিশের সাথে হাত মিলায়। ওর চেহারা আর কথা শুনে মুগ্ধ পুলিশ দুজন।
: আরে আপনার তো নায়কের মতো চেহারা। আপনি সিনেমায় নামলে এদেশের ভটকু ভটকু নায়কেরা ভাত পাবে না।
সেলিম হাসে। চা খেতে বলে। নিষ্পাপ কণ্ঠে বলে,
: কী হয়েছে বলেন তো?
আর বলবেন না, একটা ফ্রড কেস। পুলিশ বিস্তারিত বলে না।
সেলিমদের বাসা আর আশপাশের নাম্বারগুলো চেক করে পুুলিশ। সন্দেহজনক কিছু পায় না। এখানে সুমনা নামে সত্যিই কেউ নেই। তাছাড়া যে দুটো নাম্বারে সুমনা কথা বলত, সে দুটোও সুমনার নামে রেজিস্ট্রি নয়। রেজিস্ট্রিওর দুজন প্রেমিকের নামে। যাদের পটিয়ে ও নাম্বার নিয়েছে। আশ্চর্য এই লোকেশন থেকে ফোন, মেসেজ গিয়েছে কিন্তু এই নাম্বারের কারো নামে ও ফোন নেই। তাহলে! ফোন দুটোও তো এখন বন্ধ!
পুলিশ দুজন কিছুটা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে। অদ্ভুত ব্যাপার তো। ওই মেয়ে ফোন করত আর পাঁচ প্রেমিক হরদম ওর নামে গিফট পাঠাত মতিঝিলের একটা কুরিয়ারে। তারপর কেউ একজন সেগুলো নিয়ে আসত কুরিয়ার থেকে। যুক্তি ছিল, বাসায় পাঠালে বাপ-মা সন্দেহ করবে। একজন প্রেমিক লুকিয়ে তাকে দেখতে চেষ্টা করেছিল। বেশ কিছুক্ষণ ফলোও করেছিল। ভালো করে দেখতে পারেনি। একসময় হারিয়ে গিয়েছিল। তবে যে গিয়েছিল সে সুমনা নয়, একজন ছেলে। সুমনা পরে প্রেমিককে বলেছে, নিজে যেতে পারেনি বলে ওর এক বন্ধুকে পাঠিয়েছিল। বারবার দেখা করতে বললেও নানা অজুহাতে দেখা করেনি ও প্রেমিকদের সাথে। কখনও নানির অসুখ, কখনও লেখাপড়ার অতিরিক্ত চাপ আবার কখনও পা ভেঙে যাওয়া। পাঁচজনকেই নিজের অনেকগুলো করে ছবি পাঠিয়েছে। সে ছবি দেখে মাথা ঘুরে গেছে ছেলেগুলোর। হলিউড বলিউডের নায়িকারাও এত সুন্দর না। অর্থনীতিতে এমএ বাবার বিশাল বিজনেস, ইংলিশে এম এ মায়ের ছেলেমেয়ের জন্য চাকরি ছেড়ে দেয়া, ডুপ্লেক্স বাড়ি, অস্ট্রেলিয়ায় থাকা ভাই, মীরপুরে দাদা নানাদের বাড়ি সবই বলেছে ও প্রেমিকদের। বাবা-মা-ভাইয়ের ছবিও দেখিয়েছে। অস্পষ্টতা কিছুই নেই। পাঁচজনকেই বিয়ে করার অঙ্গীকার করেছে। একজনকে দিয়ে বিয়ের বাজারও করিয়েছে। বলেছে,
: আগে স্যুটকেসটা পাঠাও। বিয়ের দিন পাঠালে সাজতে দেরি হয়
: সিদ্ধেশ্বরী বাসা তাতো জানি। এড্রেস দাও।
: আরে এখন তোমার আমার ব্যস্ততার সময়। এককাজ করো, এটাও কুরিয়ারে পাঠাও। সকালে পাঠালে বিকালে চলে আসবে।
: বিয়ের স্যুটকেস কেউ কুরিয়ারে পাঠায় ! না না এড্রেস দাও।
: তুমি দেখছি নাছোড়বান্দা। আমি আসছি।
এত দারুণ হলো। যাকে দেখা হয়নি দেখা হয়ে যাবে এবার।
কিন্তু না, দুঘন্টা পরে ফোন। ও অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। হসপিটালে সবাই ওকে নিয়ে ব্যস্ত। কাজেই কুরিয়ারেই পাঠাতে হবে। না হলে বিয়ে পিছিয়ে যাবে। তাই হলো। আর এড্রেস! বিয়ে যখন হচ্ছে ওটা তো পাওয়া যাবেই। পরমাসুন্দরীকে বিয়ে করতে পারছে এই আনন্দে বিভোর প্রেমিক। না দেখেই বিয়ে করতে রাজি। আর ছেলের চাপে বাপ মাও রাজি হয়েছে। ছেলে অবশ্য বলেনি সুমনাকে সে দেখেনি। ৮৫ হাজার টাকা দামের হিরের আংটি কিনতে কিনতে ছেলের মার মন অবশ্য বেশ খুঁত খুঁত করছিল। ছেলেকে সে কথা বলাতে সুমনার সাথে বাবা মা খালার কথা বলিয়ে দিয়েছে ছেলে। কথা বলে ওদের ভালো লেগে্েছ। মেয়েটার কেমন যেন জাদু করার একটা ক্ষমতা আছে। কেমন যেন মায়া মায়া লাগতে থাকে। তারপরও ছেলের মা বলেছে,
: কিন্তু একবার দেখে নিলে ভালো হতো না?
ছেলে মাকে নেগেটিভ মাইন্ড বলে তার কথা উড়িয়ে দিয়েছে। সুমনা জানিয়েছে তার জন্যও আংটি শেরওয়ানি বোতাম কাফলিং কেনা হয়েছে। পাঠিয়ে দেবে।
বিয়ের সুটকেস পাঠানোর পর থেকেই ফোন বন্ধ।
তারপর আর মা বাবা কথা শোনেনি। ঘটনাটা চলে যায় পুলিশের কাছে। অনেক ঘুরে এ অবধি এসেছে পুলিশ। কিন্তু ওরা ব্যর্থ। না এখানে কোনো সুমনা নেই। কীভাবে কী যে হলো!
পুলিশ চলে যাবার দিন কয়েক পর সিলিং-এর ওপর থেকে একটা সুটকেস নামিয়ে ফূর্তিতে ভরপুর কণ্ঠে সেলিম মাকে বলে,
: আর চিন্তা করো না মা, রিতুর জন্য শুধু একটা ছেলে জোগাড় করে আনো। বিয়ের সব বাজার আমি করে এনেছি। গয়না থেকে শুরু করে ক্লিপ পর্যন্ত। হিরের আংটিও বাদ যায়নি।
বিয়ে ঠিক হবার আগেই বিয়ের বাজার, তাও এত টাকার! মা কী যেন বলতে চান। ছেলের দিকে একবার অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকান। ছেলে বেরিয়ে গেলে ঘরের ভেতরে ঢুকে আঁতিপাতি করে খুঁজতে থাকেন একটা জায়গা যেখানে স্যুটকেসটা লুকানো যায়। পান না।
সেদিন অমাবস্যার রাত। ছেলে আজ বন্ধুর বাড়িতে থাকবে। ভারি স্যুটকেসটা খোলেন মা। একে একে ভরেন টেবিল ল্যাম্প ঘড়ি, পারফিউম আর ঘরে ছড়ানো নানান জিনিস। আলমারি থেকে বের করেন রিতু ইতুকে দেয়া শাড়ি, কমমেটিকস ঘড়ি। তারপর আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে থাকেন দুটো সিম। পেয়ে যান। লম্বা একটা শ্বাস টানেন মা। কষ্টে স্যুটকেসটা টেনে মা এগিয়ে যান বিলের দিকে। চাকার ঘড়ঘড় শব্দ যেন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখেন। তারপর আস্তে আস্তে নামিয়ে দেন বিলের পানিতে। গভীর বিলে সড়াৎ করে কোথায় যেন মিলিয়ে যায়। এতবড় বিল কোথার থেকে কোথায় চলে যাবে ওটা! নির্ভার হয়ে যান মা। এক মুহূর্তও দেরি করেন না। ঘরে ঢুকে পরদিনের জেরার জন্য তৈরি হতে থাকেন।